ইমাম

তারা নামাজে আমার পেছনে দাঁড়ায়। জীবনে আমি তাদের পেছনে।

পর্ব ২৬ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

মাওলানা আকরাম ফজরের নামাজের জন্য উঠে পড়েন রাত সাড়ে তিনটায়।

অন্ধকারে ওযু করেন। মসজিদের পেছনে একটা কল আছে, সেখানে। শীতের রাতে পানি বরফের মতো। আকরামের হাত কাঁপে। পা কাঁপে। কিন্তু ওযু করেন। বত্রিশ বছর ধরে করছেন, একদিনও বাদ যায়নি।

মসজিদটা ছোট। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, একটা গলির ভেতরে। দোতলা। নিচে নামাজের ঘর, ওপরে মাদ্রাসার ক্লাস চলত একসময়, এখন বন্ধ। আকরামের ঘর মসজিদের পেছনে, একটা ছোট রুম। দশ বাই আট ফুট। এক পাশে চৌকি, অন্য পাশে রান্নার জায়গা। এটাই তার সংসার।

বউ রাবেয়া। তিন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে হাসিনা, ক্লাস সেভেনে পড়ে। মেজো ছেলে ইয়াসিন, ক্লাস ফোর। ছোট মেয়ে সুমাইয়া, তিন বছর। পাঁচজন মানুষ, একটা ঘরে।

আকরামের বেতন আট হাজার টাকা। মাসে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ান। ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা।

প্রতি ওয়াক্তে আসেন পনেরো-বিশজন মুসল্লি। ফজরে পাঁচ-ছয়জন। জুমায় দেড়শো। জুমায় মসজিদ ভরে যায়, পাশের ফুটপাতে চাটাই বিছাতে হয়।

আকরাম খুতবা দেন জুমায়। আরবিতে খুতবা, তারপর বাংলায় তাফসির। তিনি কোরআনের তাফসির ভালো বোঝেন। মানুষ শোনে। কেউ কেউ চোখ মোছে। কেউ ঘুমায়। আকরাম দেখেন কে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু কিছু বলেন না।

জানাযা পড়ান। পাড়ায় কেউ মারা গেলে আকরামকে ডাকা হয়। দিন-রাত যেকোনো সময়। গত মাসে রাত দুইটায় ডাক এসেছিল। পাশের বাড়ির বৃদ্ধা মারা গেছেন। আকরাম গেলেন। জানাযা পড়ালেন। লাশের মুখ দেখলেন। শান্ত মুখ। আকরাম ভাবলেন, মৃত্যু শান্ত, জীবন না।

নিকাহ পড়ান। যৌতুকের দরদাম শোনেন, কিন্তু কিছু বলার অধিকার নেই তার। নিকাহর সময় দেনমোহর পড়েন, যেটা কাগজে লেখা থাকে। আসল দেনমোহর কেউ দেয় না, এটা সবাই জানে।

মসজিদ কমিটির সভাপতি হাজি মনসুর আলী।

গার্মেন্টস ব্যবসা। তিনটা ফ্যাক্টরি। গাড়ি দুটো। বাড়ি তিনতলা। হাজি মনসুর আলী রমজানে ইফতারের আয়োজন করেন মসজিদে। বড় বড় তেলের ডেকচি, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি। পুরো পাড়া খায়। আকরামও খান। হাজি সাহেবের দানে।

কমিটিতে আরো আছেন জামাল উদ্দিন, হার্ডওয়্যারের দোকান। শফিকুল ইসলাম, ফার্মেসির মালিক। নুরুল হক, জমির ব্যবসায়ী। তারা প্রত্যেকে মাসে লাখ টাকার ওপরে কামান। কেউ কেউ তার চেয়ে বেশি।

আকরাম তাদের ইমাম। নামাজে তারা আকরামের পেছনে দাঁড়ান। আকরাম সামনে। আকরাম আল্লাহু আকবার বলেন, তারা বলেন। আকরাম রুকু করেন, তারা করেন। আকরাম সেজদায় যান, তারা যান।

নামাজ শেষে আকরাম ঘুরে দাঁড়ান। দোয়া করেন। তারা আমিন বলেন।

তারপর তারা চলে যান। গাড়িতে। আকরাম থাকেন। ঘরে।

আকরামের মেয়ে হাসিনার স্কুলের বেতন তিনশো টাকা। গত মাসে দিতে পারেননি। হাসিনা বাড়ি এসে বলল, "বাবা, টিচার বলেছেন বেতন না দিলে পরীক্ষা দিতে পারব না।"

আকরাম সেদিন মাগরিবের নামাজে সূরা আদ-দোহা পড়লেন। "তোমার রব তোমাকে ত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি।" তিনি তিলাওয়াত করলেন, গলা ভাঙল না। চোখ ভেজেনি।

বাড়ি এসে রাবেয়াকে বললেন, "আগামীকাল বেতন দিয়ে দেব।" কোথা থেকে দেবেন জানেন না।

রমজান মাস। আকরামের জন্য রমজান দুইভাবে আসে।

আধ্যাত্মিকভাবে, রমজান তার প্রিয় মাস। তারাবির নামাজ। লম্বা তিলাওয়াত। রাতের গভীরে কোরআন পড়া। মসজিদ ভর্তি মানুষ। আকরামের তিলাওয়াত শুনে মানুষ কাঁদে। আকরামের গলা সুন্দর। কোরআন যখন পড়েন, গলায় একটা কম্পন আসে, যেটা শেখানো না, এটা তার নিজের।

আর্থিকভাবে, রমজান মানে বাড়তি আয়। তারাবির জন্য আলাদা ভাতা দেয় কমিটি। পাঁচ হাজার টাকা। এক মাসের জন্য। এই পাঁচ হাজার দিয়ে আকরাম হাসিনার বেতনের বকেয়া মেটান। ইয়াসিনের জুতো কেনেন। সুমাইয়ার জন্য দুধ কেনেন গুঁড়ো দুধ, তরল দুধ কেনার সামর্থ্য নেই।

বাকি এগারো মাস পাতলা ভাত।

রাবেয়া হিসাব করে রান্না করেন। চালের পরিমাণ মেপে রাখেন। একদিন মাছ, তিনদিন ডাল। মাংস মাসে একবার, সেটাও মুরগি, গরু না। আকরাম খান। কম খান। রাবেয়া বলেন, "আরেকটু নেন।" আকরাম বলেন, "পেট ভরে গেছে।" মিথ্যা। পেট ভরেনি। কিন্তু বাচ্চাদের জন্য রেখে দেন।

হাজি মনসুর আলীর ছেলের বিয়ে।

আকরামকে নিকাহ পড়াতে ডাকা হলো। কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান। ঢাকার গুলশানে। আকরাম গেলেন বাসে, ভাড়া পঁয়ত্রিশ টাকা। কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ঝাড়বাতি। ফুলের সাজ। মঞ্চে কাপড়ের ড্রেপারি, সোনালি রঙের। খাবারের গন্ধ ভেসে আসছে, বিরিয়ানি, রোস্ট, রেজালা।

আকরাম একপাশে বসলেন। পাঞ্জাবি পরেছেন সাদা, পরিষ্কার, কিন্তু পুরোনো। কলারে একটু হলুদ দাগ। টুপি আটকে আছে মাথায়, সাদা, সুতির।

নিকাহ পড়ালেন। দেনমোহর দশ লাখ টাকা। আকরাম পড়লেন। কবুল? কবুল। কবুল? কবুল। কবুল? কবুল।

বিয়ের খরচ ত্রিশ লাখ টাকা। আকরাম পরে শুনলেন। ত্রিশ লাখ। তার বেতনের তিনশো বাহাত্তর মাস। একত্রিশ বছর। একটা বিয়েতে আকরামের একত্রিশ বছরের বেতন।

নিকাহর পর আকরামকে একটা খাম দেওয়া হলো। পাঁচশো টাকা। আর একটা প্লেটে খাবার। বিরিয়ানি, মুরগির রান, সালাদ, বোরহানি।

আকরাম খেলেন। বিরিয়ানি স্বাদু। মুরগির মাংস নরম। তিনি ভাবলেন রাবেয়ার কথা, হাসিনার কথা, ইয়াসিনের কথা। তারা কী খাচ্ছে এখন? ডাল-ভাত।

আকরাম প্লেটের মুরগির একটা টুকরো রাখলেন। টিস্যু পেপারে মুড়ে পকেটে ঢুকালেন। সুমাইয়ার জন্য।

ঈদুল ফিতর। মসজিদে ঈদের নামাজ।

সকাল সাতটায় মাঠে জায়নামাজ বিছানো হয়। হাজার মানুষ আসে। নতুন জামা পরে। আতর লাগিয়ে। বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করে। আকরাম নামাজ পড়ান। তাকবির বলেন। খুতবা দেন।

ঈদের দিন আকরামের ছেলেমেয়েদের নতুন জামা নেই। রাবেয়া পুরোনো জামা ধুয়ে ইস্ত্রি করে দিয়েছেন। ইয়াসিন বলে, "বাবা, আমার বন্ধুরা সবাই নতুন জামা পরেছে।" আকরাম বলেন, "পরিষ্কার জামাই নতুন জামা।" ইয়াসিন চুপ হয়ে যায়। তিন বছরের সুমাইয়া বোঝে না নতুন-পুরোনো। সে হাসে।

ঈদের পর সালামি আসে। কমিটির সদস্যরা দেন কিছু। হাজি সাহেব দেন দুই হাজার। জামাল উদ্দিন দেন এক হাজার। মোট পাঁচ-ছয় হাজার জমে। আকরাম এটা দিয়ে পরের মাসের বাজার করেন।

আকরাম ভোররাতে কোরআন পড়েন।

একা। মসজিদে। ফজরের আগে। লাইট জ্বলে ম্লান। পাখা ঘোরে ধীরে। আকরাম মুসহাফ খোলেন। পড়েন। আস্তে আস্তে, ঠোঁট নড়ে, গলায় ফিসফিস।

এই সময়টা তার। এই সময়ে কেউ বেতনের কথা বলে না। কেউ কমিটির মিটিংয়ের কথা বলে না। কেউ ছেলেমেয়ের স্কুলের কথা বলে না। শুধু তিনি আর কোরআন।

আকরাম কোরআন হাফেজ। ষোলো বছর বয়সে হিফজ শেষ করেছিলেন। কওমি মাদ্রাসায়। বাবা ছিলেন রিকশাচালক। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে আলেম হোক। আলেম হয়েছেন। ইমাম হয়েছেন।

বাবা মারা গেছেন দশ বছর আগে। রিকশা চালাতে চালাতে হার্ট অ্যাটাক। রাস্তায়। আকরাম জানাযা পড়িয়েছিলেন নিজে। নিজের বাবার। সেদিন গলা ভেঙেছিল।

আকরাম কখনো ভাবেন, বাবা বেঁচে থাকলে কী বলতেন? ছেলে আলেম হয়েছে, কিন্তু আট হাজার টাকায় সংসার চালায়। বাবা কি গর্ব করতেন, না কষ্ট পেতেন?

শুক্রবার জুমার পর কমিটির মিটিং।

আকরাম বসেন এক কোণায়। কমিটির সদস্যরা কথা বলেন। মসজিদের টাইলস বদলাতে হবে। মাইকের সিস্টেম আপগ্রেড করতে হবে। ওয়াশরুম মেরামত করতে হবে। বাজেট পাশ হয়। দুই লাখ, তিন লাখ, পাঁচ লাখ।

আকরাম বলেন, "আমার বেতন নিয়ে একটু কথা বলতে চাই।"

সবাই চুপ।

"আট হাজার টাকায় পরিবার চলে না। বাচ্চাদের স্কুলের খরচ, বাড়িভাড়া দিতে হয় না বটে, কিন্তু খাওয়া, কাপড়, ওষুধ..."

হাজি মনসুর আলী বলেন, "হুজুর, আমরা বুঝি। কিন্তু মসজিদের ফান্ডে টান পড়ছে। মুসল্লিদের দান কমেছে। আমরা চেষ্টা করছি।"

আকরাম জানেন এটা সত্য না। মসজিদের ফান্ডে লাখ লাখ টাকা আসে। শুধু আকরামের বেতনের জায়গায় কোনো বরাদ্দ নেই। টাইলসের জন্য আছে। মাইকের জন্য আছে। ইমামের জন্য নেই।

মিটিং শেষ হয়। আকরাম আসরের নামাজের প্রস্তুতি নেন।

আকরামের একটা অভ্যাস আছে।

প্রতিদিন মাগরিব আর ইশার মাঝে তিনি মসজিদের বারান্দায় বসেন। সামনে রাস্তা। রিকশা যায়। সিএনজি যায়। মানুষ হাঁটে। দোকানে বাতি জ্বলে। চায়ের দোকানে ভিড়। আকরাম দেখেন।

তিনি দেখেন হাজি সাহেবের গাড়ি যায়। কালো গাড়ি, কাচে অন্ধকার। ড্রাইভার চালায়। হাজি সাহেব পেছনে বসে ফোনে কথা বলেন।

আকরাম ভাবেন, এই লোকটা নামাজে আমার পেছনে দাঁড়ায়। জুমায় আমার খুতবা শোনে। ঈদে আমার তাকবির শোনে। মারা গেলে আমি জানাযা পড়াব। কিন্তু জীবনে? জীবনে আমি তার পেছনে।

তারা নামাজে আমার পেছনে দাঁড়ায়। জীবনে আমি তাদের পেছনে।

আকরাম উঠে পড়েন। ওযু করেন। ইশার আজান হয়। তিনি মেহরাবে দাঁড়ান। আল্লাহু আকবার।

তার পেছনে কাতারে দাঁড়ায় হাজি সাহেব। জামাল উদ্দিন। শফিকুল ইসলাম। নুরুল হক।

এই কয়েক মিনিট তারা তার পেছনে। তারপর নামাজ শেষ হয়। তারা চলে যায়। আকরাম থাকেন।

রাবেয়া ডাকেন, "খাবার তৈরি।"

আকরাম যান। ডাল-ভাত খান। সুমাইয়াকে কোলে নেন। ইয়াসিনের পড়া দেখেন। হাসিনা বলে, "বাবা, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।"

আকরাম হাসেন। হাসিটা ক্লান্ত। তিনি জানেন আট হাজার টাকায় ডাক্তার হওয়া যায় না।

রাত এগারোটায় শোন। ভোর সাড়ে তিনটায় উঠবেন। আবার ওযু। আবার ফজর। আবার আল্লাহু আকবার।

এই চক্র ভাঙবে না। আকরাম জানেন।