মোয়াজ্জিন

ফজরের আজানে আমি আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জাগে না। এটাই আমার মাহাত্ম্য।

পর্ব ২৭ · ৬ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আলাউদ্দিনের দিন শুরু হয় রাত চারটায়। শহর ঘুমায়। রাস্তা ফাঁকা। কুকুর ডাকে দূরে। অন্ধকার ঘন।

আলাউদ্দিন ওঠেন। গামছা দিয়ে মুখ মোছেন। ওযু করেন। চটি পায়ে মসজিদে যান। মসজিদ পাশের গলিতে, দুই মিনিটের পথ। সিঁড়ি ভেঙে মিনারে ওঠেন। আগে মিনারে উঠতেন, এখন ওঠেন না। মাইক নিচেই আছে, ইমামের ঘরের পাশে। বোতাম টিপলেই লাউডস্পিকার চালু হয়।

আলাউদ্দিন বোতাম টেপেন। গলা খাকারি দেন। তারপর শুরু করেন।

আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার।

পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এই গলায় আজান দিচ্ছেন। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে। একটা পাড়ার মসজিদে। বেতন চার হাজার টাকা।

পঁচিশ বছর বয়সে আলাউদ্দিনের গলা ছিল অন্যরকম।

তখন তিনি তরুণ। গলা পরিষ্কার, স্বচ্ছ, একটা তারের মতো টান। ফজরের আজান দিলে পুরো মহল্লা শুনতে পেত। মানুষ বলত, আলাউদ্দিনের আজান শুনলে ঘুম ভাঙে ঠিকই, কিন্তু রাগ হয় না। আজানটা এত মিষ্টি যে মানুষ বিরক্ত হওয়ার বদলে শুনতে থাকে।

মসজিদের পুরোনো ইমাম, মরহুম তাহের সাহেব, বলতেন, "আলাউদ্দিন, তোমার গলায় আল্লাহ নূর দিয়েছেন।"

আলাউদ্দিন লজ্জা পেতেন। তিনি গলা নিয়ে কখনো গর্ব করতেন না। গলা তার ছিল, এটুকুই।

এখন ষাট বছর। গলা বদলে গেছে। ভাটার টান পড়েছে। উচ্চ সুরে গেলে ফেটে যায়। লম্বা টানে দম ফুরায়। কাশি আসে মাঝে মাঝে, শুকনো কাশি, বুকের ভেতরে কিছু একটা বাজে।

ডাক্তার বলেছেন ভোকাল কর্ড ক্ষয় হচ্ছে। বয়সের কারণে। ধুলোর কারণে। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে দিনে পাঁচবার চেঁচানোর কারণে। ডাক্তার বললেন, "বিশ্রাম দেন গলাকে।" আলাউদ্দিন ভাবলেন, গলাকে বিশ্রাম দিলে সংসার চলবে কে?

লাউডস্পিকার আছে। এটা আলাউদ্দিনের সুবিধাও, অসুবিধাও।

সুবিধা: গলার জোর কম লাগে। মাইক ধরে স্বাভাবিক স্বরে বললেই চলে। আগে মিনারে উঠে চার দিকে মুখ ঘুরিয়ে আজান দিতে হতো। এখন বসেও দেওয়া যায়।

অসুবিধা: লাউডস্পিকার গলার তফাত বোঝায় না। যেকোনো গলা একই শোনায় মাইকে। আলাউদ্দিনের গলার সেই তারের টান, সেই মিষ্টতা, মাইক সেটা ধরে না। মাইক ধরে শব্দ, সুর না।

তবে আসল সমস্যা লাউডস্পিকার না।

আসল সমস্যা ফোন।

মোবাইল ফোনে আজানের অ্যাপ আছে।

আলাউদ্দিন দেখেছেন। তার নিজের ফোনে নেই, তার ফোন বোতামওয়ালা, স্মার্টফোন কেনার টাকা নেই। কিন্তু মসজিদের মুসল্লিদের ফোনে আছে। সময় হলে ফোন বেজে ওঠে। মক্কার হারাম শরিফের আজান। মদিনার আজান। বিখ্যাত মুয়াজ্জিনদের গলা। পরিষ্কার, স্টুডিও রেকর্ডিং।

আলাউদ্দিন একদিন শুনলেন এক মুসল্লির ফোনে আজান বাজছে। আসরের সময়। ফোন থেকে যে গলা আসছে সেটা শুনে আলাউদ্দিনের মনে হলো নিজের গলা নিকৃষ্ট।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কার আজান?"

মুসল্লি বললেন, "অ্যাপ থেকে। শেখ আলি মোল্লার। মক্কার মুয়াজ্জিন।"

আলাউদ্দিন চুপ ছিলেন।

সেই রাতে ইশার আজান দিতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠল। কাঁপুনিটা ঠান্ডার জন্য না। ভেতরে কিছু একটা নড়ে গেছে।

আমার গলার দরকার নেই। ফোনে আজান হয়।

কিন্তু ফজরের আজান আলাদা।

রাত চারটা তিরিশ। শহর মরা। কোনো গাড়ি নেই রাস্তায়। কোনো দোকান খোলা নেই। কোনো মানুষ হাঁটছে না। আকাশে তারা, না চাঁদ, কিছু একটা ম্লান আলো দেয়, হয়তো দূরে কোনো ল্যাম্পপোস্ট।

আলাউদ্দিন মাইকের সামনে বসেন।

গলা খাকারি দেন। চোখ বন্ধ করেন।

আল্লাহু আকবার।

গলাটা ভাঙা। সুরটা আগের মতো নেই। কিন্তু এই সময়ে কে শুনছে? কেউ না। শহর ঘুমায়। পাখিও ঘুমায়। বাতাসও থেমে আছে যেন।

আলাউদ্দিনের গলা ছড়িয়ে পড়ে লাউডস্পিকার দিয়ে। ফাঁকা রাস্তায়। ফাঁকা বাড়িতে। ফাঁকা আকাশে।

এই তিন মিনিট তার।

কোনো অ্যাপ এই সময়ে আজান দেয় না। অ্যাপ দেয়, কিন্তু ফোন সাইলেন্টে থাকে। মানুষ ফজরের অ্যালার্ম বন্ধ করে ঘুমায়। শুধু আলাউদ্দিন জেগে থাকেন।

ফজরের আজানে আমি আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জাগে না। এটাই আমার মাহাত্ম্য।

আলাউদ্দিনের বউ মরিয়ম অসুস্থ।

ডায়াবেটিস। চোখে কম দেখেন। পায়ে ব্যথা। ইনসুলিন লাগে, প্রতিদিন। একটা ইনসুলিনের ভায়াল সাতশো টাকা। মাসে দুটো লাগে। চৌদ্দশো টাকা। আলাউদ্দিনের বেতন চার হাজার। ইনসুলিনের পর বাকি থাকে ছাব্বিশশো।

ছাব্বিশশো টাকায় দুজনের সংসার।

ছেলে ঢাকায় থাকে। গার্মেন্টসে কাজ করে। মাসে দুই হাজার পাঠায়। মেয়ে বিয়ের পর সিলেটে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু আসে না। মেয়ে নিজেই চায়, কিন্তু আলাউদ্দিন নেন না। "মেয়ের কাছে টাকা নেওয়া ঠিক না।"

ছেলের দুই হাজার মিলিয়ে ছয় হাজার। এতে দুজনের ভাত, ওষুধ, মসজিদের বিদ্যুৎ বিল যেটুকু নিজে দেন সেটা। বাকি কিছু থাকে না।

আলাউদ্দিন কখনো কাউকে টাকা ধার চাননি। পঁয়ত্রিশ বছরে একবারও না।

একদিন কমিটি বলল মসজিদে ডিজিটাল আজান সিস্টেম বসাবে।

টাইমার সেট করা থাকবে। সময় হলে নিজে থেকে আজান বাজবে। রেকর্ডেড। পরিষ্কার গলা। কোনো ভুল হবে না। কোনো কাশি নেই। কোনো গলা ভাঙা নেই।

আলাউদ্দিন শুনলেন।

"তাহলে আমার কী হবে?"

কমিটির সেক্রেটারি বললেন, "আপনি থাকবেন, হুজুর। মসজিদ পরিষ্কার, ওযুর পানির ব্যবস্থা, এসব দেখবেন। আজানটা মেশিনে হবে। আপনার গলায় কষ্ট হয়, আমরা জানি।"

আলাউদ্দিন কিছু বললেন না। ওযুর পানির ব্যবস্থা। মসজিদ পরিষ্কার। এটা তার কাজ হবে। মোয়াজ্জিন থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

সেই রাতে আলাউদ্দিন ইশার আজান দিলেন। গলায় একটু বেশি জোর দিলেন। গলা ফেটে গেল শেষের দিকে। কাশি এল। থামলেন। আবার শুরু করলেন।

মুসল্লিরা আসতে শুরু করলেন। কেউ কিছু বললেন না। আজান তো হলো। কার গলায় হলো, কেউ ভাবল না।

মেশিন এল না শেষ পর্যন্ত। বাজেটে কুলায়নি। অন্য কাজে খরচ হয়ে গেছে।

আলাউদ্দিন রয়ে গেলেন।

তিনি জানেন এটা সাময়িক। আগামী বছর, কিংবা তার পরের বছর, মেশিন আসবে। অথবা তার গলা একদিন একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। দুটোর যেটা আগে হবে, সেটাই শেষ।

আলাউদ্দিন তবু ভোরে ওঠেন। তবু ওযু করেন। তবু মসজিদে যান।

রাত চারটা তিরিশ। অন্ধকার। নিঃশব্দ। আলাউদ্দিন মাইকের সামনে বসেন। চোখ বন্ধ করেন। নিঃশ্বাস নেন গভীর।

আল্লাহু আকবার।

গলা ভাঙা। সুর কাঁপে। দম কম।

কিন্তু আজান হয়।

কেউ শোনে না। কেউ উঠে আসে না। ফোনের অ্যালার্ম বাজে, মানুষ বন্ধ করে পাশ ফেরে।

আলাউদ্দিন জানেন কেউ শুনছে না।

তবু তিনি দেন। কারণ ফজরের আজান দেওয়ার জন্য কেউ শোনার দরকার নেই। দেওয়ার দরকার আছে।

পঁয়ত্রিশ বছর। পাঁচ ওয়াক্ত। দিনে পাঁচবার। বছরে ১,৮২৫ বার। পঁয়ত্রিশ বছরে ৬৩,৮৭৫ বার আজান দিয়েছেন আলাউদ্দিন।

কারো হিসাবে নেই। আলাউদ্দিনের নিজেরও নেই।

শুধু ভোরের অন্ধকারে একটা ভাঙা গলা ছড়িয়ে পড়ে। মিনারের ওপর থেকে না, লাউডস্পিকার থেকে। কিন্তু শব্দটা একই।

আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম।

নামাজ ঘুমের চেয়ে উত্তম।

আলাউদ্দিন জানেন। তিনি প্রতিদিন ঘুম ছেড়ে প্রমাণ করেন।