ভ্যানচালক

আমার শরীর আমার পুঁজি। এই পুঁজি ফুরিয়ে গেলে আমি দেউলিয়া।

পর্ব ২৮ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

নূর হোসেনের শরীর একটা মেশিন।

পা দুটো পিস্টন। পিঠটা ক্রেন। হাত দুটো স্টিয়ারিং। বুকের ভেতরে ইঞ্জিন, যেটা ভাত আর পানিতে চলে। ডিজেলে না, পেট্রোলে না। ভাতে।

নূর হোসেন ভ্যান চালায়। মানুষে টানা ভ্যান। তিন চাকার কাঠের প্ল্যাটফর্ম, সামনে একটা চাকা, পেছনে দুটো। হ্যান্ডেল ধরে টানতে হয়। পেডেল নেই। গিয়ার নেই। ব্রেক নেই। শুধু মানুষের শরীর।

ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে সবজি বোঝাই করে শ্যামবাজার পর্যন্ত টানে। দূরত্ব দুই কিলোমিটার। ভ্যানের ওপর পাঁচশো কেজি সবজি। আলু, পটল, বেগুন, ঝিঙে, করলা। বস্তায় ভরা। বস্তার ওপর বস্তা। ভ্যান নুয়ে পড়ে ওজনে। চাকা মাটিতে দেবে যায়।

নূর হোসেন টানে। খালি পায়ে। রাস্তার পিচ গরম দুপুরে। শীতে ভেজা। বর্ষায় পিচ্ছিল। পা পিছলে গেলে পাঁচশো কেজি সবজি তার ওপর পড়বে।

একবার পড়েছিল। তিন বছর আগে। কোমর মচকে গিয়েছিল। দুই সপ্তাহ শুয়ে ছিল। কোনো আয় নেই। বউ অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালিয়েছিল।

প্রতি ট্রিপে দুইশো টাকা। দিনে চার ট্রিপ। মোট আটশো টাকা।

সকাল ছয়টায় কারওয়ান বাজারে পৌঁছায়। পাইকাররা তখন সবজি নামাচ্ছে ট্রাক থেকে। নূর হোসেন দাঁড়িয়ে থাকে, ভ্যান নিয়ে। পাইকার ডাকে, "ভ্যান! শ্যামবাজার।" নূর হোসেন ভ্যান ঘুরিয়ে আনে। বস্তা তোলা হয়। একটা, দুটো, তিনটা, চারটা, পাঁচটা। প্রতিটা একশো কেজি। পাঁচশো কেজি।

নূর হোসেন টানা শুরু করে। প্রথম একশো মিটার সবচেয়ে কঠিন। স্থির ভর থেকে গতি তৈরি করতে হয়। পায়ের তলায় পিচ, পিঠে দড়ি, হাতে হ্যান্ডেল। পুরো শরীর সামনে ঝুঁকে, মাটির সাথে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে। দেখলে মনে হয় মানুষটা পড়ে যাবে। কিন্তু পড়ে না। পড়লে সবজি পড়বে।

গতি উঠলে একটু সহজ হয়। চাকা গড়ায়। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় সমতল বলে কিছু নেই। গর্ত আছে, স্পিড ব্রেকার আছে, ট্র্যাফিক আছে। প্রতিটা গর্তে চাকা আটকায়। আটকালে আবার সেই প্রথম ধাক্কা দিতে হয়। পুরো শরীর দিয়ে।

নূর হোসেনের বয়স পঁয়তাল্লিশ। দেখতে ষাটের মতো। চুল পাকা। গাল ভাঙা। চোখের নিচে কালি। পিঠ বাঁকা, স্থায়ীভাবে, যেন একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। পিঠ সোজা হতে ভুলে গেছে।

পায়ের ডিম লোহার মতো শক্ত। এটাই তার সম্পদ। পায়ের ডিমে সে পাঁচশো কেজি বহন করে।

বীমা নেই। পেনশন নেই। ছুটি নেই।

রোদে কাজ। বৃষ্টিতে কাজ। জ্বরে কাজ। পেটে ব্যথায় কাজ। কাজ না করলে আয় নেই। আয় না থাকলে ভাত নেই।

নূর হোসেনের বউ ফিরোজা। দুই ছেলে। বড় ছেলে সোহেল, আঠারো, রিকশা চালায়। ছোট ছেলে জুয়েল, চৌদ্দ, মাদ্রাসায় পড়ে। মাদ্রাসায় খাওয়া ফ্রি, তাই মাদ্রাসায় দিয়েছে। পড়ার খরচ বাঁচে, খাওয়ার খরচ বাঁচে।

ফিরোজা বলে, "তুমি আর কত দিন ভ্যান টানবা?"

নূর হোসেন বলে, "শরীর যত দিন চলে।"

আমার শরীর আমার পুঁজি। এই পুঁজি ফুরিয়ে গেলে আমি দেউলিয়া।

এটা সে একদিন ফিরোজাকে বলেছিল। ফিরোজা কিছু বলেনি। সে জানে এটা সত্য। নূর হোসেনের কোনো জমি নেই। কোনো দোকান নেই। কোনো সঞ্চয় নেই। শুধু শরীর আছে। শরীর দিয়ে সে টানে। শরীরই তার ব্যাংক ব্যালেন্স।

সকালে নূর হোসেন খায় পাঁচটা রুটি, একটা ডিম, এক গ্লাস চা।

এটা জ্বালানি। গাড়িতে তেল দেওয়ার মতো। পাঁচটা রুটি না খেলে দুপুর পর্যন্ত টানতে পারবে না। ডিমটা জরুরি, প্রোটিন, পেশি টিকিয়ে রাখে। চা ক্যাফেইন, ঘুম তাড়ায়।

দুপুরে এক প্লেট ভাত। রাস্তার ধারে, দশ টাকার ভাত। ডাল, একটু সবজি, মরিচ। তেলে ভেজা ভাত। পেটে গেলে ভারী লাগে, কিন্তু শক্তি আসে।

বিকালে আরেক গ্লাস চা। বিস্কুট দুটো।

রাতে ভাত। ফিরোজার রান্না। ডাল আর শাক। মাঝে মাঝে মাছ, ছোট মাছ, মলা-ঢেলা, বাজারে সস্তা।

নূর হোসেনের শরীর এই খাবারকে শক্তিতে রূপান্তর করে। শক্তি দিয়ে সে পাঁচশো কেজি টানে। পাঁচশো কেজি টেনে সে আটশো টাকা কামায়। আটশো টাকায় সে এই খাবার কেনে।

চক্র। শরীর থেকে শ্রম। শ্রম থেকে টাকা। টাকা থেকে খাবার। খাবার থেকে শরীর। আবার শ্রম। চক্র ভাঙার কোনো জায়গা নেই।

একদিন মহাখালীর কাছে একটা ট্রাক নূর হোসেনের ভ্যানের ওপর দিয়ে চলে গেল।

নূর হোসেন ভ্যান টানছিল। রাস্তার বাম ধারে। ট্রাক পেছন থেকে এল। ড্রাইভার হর্ন দিল। নূর হোসেন সরার চেষ্টা করল। পাঁচশো কেজি সবজিসহ ভ্যান দ্রুত সরানো যায় না। ট্রাক ভ্যানের পেছনের চাকায় ধাক্কা দিল।

ভ্যান উলটে গেল।

সবজি ছড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। আলুর বস্তা ফেটে গেল। আলু গড়িয়ে গেল এদিক-ওদিক। বেগুন থেতলে গেল ট্রাকের চাকায়। পটলের ঝুড়ি ভেঙে গেল।

ট্রাক থামল না। চলে গেল।

নূর হোসেন রাস্তায় পড়ে ছিল। হাঁটুতে ছড়ে গেছে। কনুইয়ে রক্ত। কিন্তু হাড় ভাঙেনি। সে উঠে বসল। চারপাশে তাকাল।

সবজি ছড়ানো। রাস্তায়। ড্রেনের পাশে। ফুটপাতে।

নূর হোসেন উঠে দাঁড়াল। এক এক করে সবজি কুড়াতে শুরু করল। আলু তুলল। পটল তুলল। ঝিঙে তুলল। যেগুলো থেতলে গেছে সেগুলোও তুলল।

কেউ সাহায্য করতে এল না। রাস্তার লোকজন দাঁড়িয়ে দেখল। কেউ ভিডিও করল ফোনে। কেউ এগিয়ে এল না।

নূর হোসেন একা কুড়াল। আধা ঘণ্টা লাগল।

ভ্যানের একটা চাকা বেঁকে গেছে।

নূর হোসেন চাকা সোজা করার চেষ্টা করল। পারল না। রাস্তার পাশে একটা মিস্ত্রির দোকানে নিয়ে গেল। মিস্ত্রি বলল, "তিনশো টাকা।" নূর হোসেনের পকেটে একশো পঞ্চাশ। বাকি দেবে বলে চাকা ঠিক করাল।

সবজি আবার তুলল ভ্যানে। কিন্তু অনেকগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আলু থেতলানো। বেগুন পিষ্ট। পটল ফাটা।

পাইকার বলবে এগুলো নেওয়া যাবে না।

নূর হোসেন ভ্যান টেনে শ্যামবাজার গেল। পাইকার দেখল। "এগুলো কী অবস্থা? অর্ধেক নষ্ট।"

"ট্রাক চাপা দিয়েছে।"

"সেটা তোমার সমস্যা। আমি ভালো মাল চাই।"

নূর হোসেন ভালো সবজিগুলো আলাদা করল। পাইকার সেগুলোর দাম দিল। থেতলানো সবজি পড়ে রইল।

নূর হোসেন থেতলানো সবজি নিয়ে রাস্তার ধারে বসল।

ফুটপাতে। একটা পলিথিনের ওপর। থেতলানো আলু, ফাটা বেগুন, চ্যাপ্টা পটল। সে হাঁক দিল, "আলু! সস্তা আলু! বেগুন! কম দামে!"

একজন মহিলা এল। দেখল। "এগুলো কী অবস্থা?"

"একটু মাড়া গেছে। ভেতরে ঠিক আছে। অর্ধেক দামে দেব।"

মহিলা কিনলেন কিছু। আরেকজন এল। আরেকজন।

থেতলানো সবজি বিক্রি হলো। পুরো দামের অর্ধেকে। নূর হোসেন হিসাব করল। ভালো সবজির পুরো দাম আর থেতলানোর অর্ধেক দাম মিলিয়ে মোট যা পেল, তাতে পাইকারকে দিয়ে তার হাতে বাকি রইল একশো দশ টাকা।

একটা ট্রিপে সে পায় দুইশো। আজ পেল একশো দশ। তার থেকে মিস্ত্রির বাকি একশো পঞ্চাশ দিতে হবে।

মাইনাস চল্লিশ টাকা।

নূর হোসেন বিকালে আরো দুটো ট্রিপ করল।

কোমরে ব্যথা। হাঁটুতে ক্ষত, শুকোয়নি, ঘষা লাগছে। কনুইয়ের রক্ত জমে কালো হয়ে গেছে। কিন্তু সে টানল। পাঁচশো কেজি। দুই কিলোমিটার। দুবার।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল। ফিরোজা দেখল হাঁটুর ক্ষত। "কী হয়েছে?"

"কিছু না। ভ্যান উলটেছিল।"

ফিরোজা পানি গরম করে ক্ষতস্থান ধুয়ে দিল। ব্যান্ডেজ নেই। পুরোনো কাপড়ের টুকরো বেঁধে দিল।

নূর হোসেন ভাত খেল। ডাল দিয়ে। শাক দিয়ে। তারপর মাদুরে শুয়ে পড়ল। পাখা ঘোরে। শরীর ব্যথায় কাঁপে।

সে চোখ বন্ধ করল। আগামীকাল সকাল ছয়টায় কারওয়ান বাজারে যেতে হবে। পাইকার ডাকবে। বস্তা উঠবে। পাঁচশো কেজি। আবার টানতে হবে।

ট্রাকের কথা মনে পড়ল। ড্রাইভার থামেনি। নম্বর প্লেট দেখেনি। দেখলেও কী হতো? পুলিশে গেলে পুলিশ কী করবে? ভ্যানচালকের পক্ষে কে দাঁড়ায়?

সোহেল এসে বলল, "বাবা, আমার রিকশার টায়ার ফেটে গেছে। পাঁচশো টাকা লাগবে।"

নূর হোসেন চোখ খুলল। ছাদের দিকে তাকাল। ছাদে টিনের ফুটো দিয়ে একটুকরো আকাশ দেখা যায়।

"আগামীকাল দেব।"

আগামীকাল মানে আরো একটা ট্রিপ বেশি। পাঁচশো কেজি আরেকবার। শরীর থেকে আরেকটু ক্ষয়।

নূর হোসেন জানে প্রতিটা ট্রিপ তার শরীর থেকে কিছু কেড়ে নেয়। পেশি ক্ষয় হয়। হাড় ক্ষয় হয়। জোড়া ক্ষয় হয়। প্রতিদিন একটু একটু করে।

একদিন শরীর বলবে, আর না।

সেদিন নূর হোসেন দেউলিয়া। তার ব্যাংক ফাঁকা। তার পুঁজি শেষ।

কিন্তু সেদিন আসেনি এখনো। আজকে এসেছে। আজকে শরীর চলে। আজকে টানা যায়।

নূর হোসেন ঘুমায়। ভোরে উঠবে। ভাত খাবে। ভ্যান ধরবে। টানবে।

শরীর চলে যতক্ষণ।