সিএনজি চালক
গাড়ি মালিকের। রাস্তা সরকারের। যাত্রী আল্লাহর। আমি কার?
১
কবিরের দিন শুরু হয় হিসাব দিয়ে।
সকালে গ্যারেজে যায়। মালিক ইউনুস মিয়ার কাছ থেকে সিএনজি নেয়। চাবি নেয়। ভাড়া দেয় পাঁচশো টাকা। প্রতিদিন। সাত দিন। মাসে পনেরো হাজার। আগে ভাড়া দিতে হয়, তারপর গাড়ি পায়।
ইউনুস মিয়ার বারোটা সিএনজি আছে। বারোটা চালক ভাড়া নেয়। প্রতিদিন ছয় হাজার টাকা ঘরে বসে কামান ইউনুস মিয়া। না চালান, না ঘামেন, না রাস্তায় যান।
কবির চালায়। ঘামে। রাস্তায় যায়।
একটা ভালো দিনে বারোশো টাকা ওঠে মিটারে। পাঁচশো ভাড়া বাদ। গ্যাস দুইশো। মোট খরচ সাতশো। বাকি পাঁচশো। কিন্তু ভালো দিন রোজ আসে না।
বৃষ্টির দিনে হাজার পনেরোশো ওঠে। যাত্রী বেশি, হাঁটতে চায় না। রোদের দিনেও ভালো। কিন্তু হরতালের দিন শূন্য। ট্র্যাফিক জ্যামের দিন মিটার চলে, গ্যাস পোড়ে, কিন্তু ভাড়া কম কারণ যাত্রী নামিয়ে দিয়ে পরেরটা নিতে পারে না।
কবিরের বউ শাহানা। দুই মেয়ে। বড় মেয়ে ক্লাস থ্রি, ছোট মেয়ে কেজিতে। মিরপুরে ভাড়া বাসায় থাকে। ভাড়া পাঁচ হাজার। মাসে কবিরের হাতে থাকে আট-নয় হাজার। বাড়িভাড়া বাদ দিলে তিন-চার হাজার। এতে চারজনের সংসার।
২
আগে কবির লম্বা রাস্তা নিত।
ফার্মগেট থেকে ধানমন্ডি যেতে যাত্রী বলে, "মিরপুর রোড ধরেন।" কবির ধরত এলিফ্যান্ট রোড। একটু ঘুরে যায়, দুই কিলোমিটার বেশি, মিটারে ত্রিশ-চল্লিশ টাকা বাড়ে।
এখন পারে না।
যাত্রীর ফোনে গুগল ম্যাপ। যাত্রী দেখে কোন রাস্তায় কত দূর। মিটারে কত উঠল, ম্যাপে কত দেখাচ্ছে, তুলনা করে। একটু বেশি গেলে বলে, "ভাই, ঘুরিয়ে নিচ্ছেন?"
কবির বলে, "না ভাই, ট্র্যাফিকের জন্য।"
যাত্রী বিশ্বাস করে না। রেটিং দেয় অ্যাপে। কম্প্লেইন করে। কবির নম্র হয়ে বলে, "ভাই, আমি ঘুরাইনি, সত্যি বলছি।"
জিপিএস সব জানে। কবির কিছু লুকাতে পারে না।
৩
মিটারে ঝামেলা।
কিছু সিএনজি চালক মিটার ম্যানিপুলেট করে। ভেতরে সার্কিটে কিছু একটা করে, মিটার দ্রুত ঘোরে। কবির করে না। ইউনুস মিয়া করতে মানা করেছে, ধরা পড়লে লাইসেন্স যাবে, গাড়ি যাবে।
কিন্তু যাত্রীরা সবাইকে এক চোখে দেখে। মিটার একটু বেশি দেখালেই বলে, "মিটারে গণ্ডগোল আছে। ঠিক করেন।"
একদিন এক যাত্রী মতিঝিল থেকে কমলাপুর গেল। মিটারে উঠল আশি টাকা। যাত্রী বলল, "এত? গুগলে দেখাচ্ছে তিন কিলোমিটার। আশি টাকা হয় না।"
কবির বলল, "ভাই, মিটার ঠিক আছে। ফ্ল্যাগ চার্জ চল্লিশ। বাকিটা দূরত্ব।"
যাত্রী পুলিশ ডাকল।
পুলিশ এল। মিটার দেখল। কবিরের কাগজ দেখল। ফিটনেস দেখল। রুট পারমিট দেখল। সব ঠিক আছে। মিটারেও গণ্ডগোল নেই।
তারপর পুলিশ বলল, "ভাই, একশো টাকা দেন।"
কবির দিল। পুলিশকে। যাত্রীকে পঞ্চাশ টাকা ছাড় দিল। মোট দেড়শো টাকা গেল। আশি টাকার ট্রিপে।
কবির গাড়ি স্টার্ট দিল। মিটার রিসেট করল। পরের যাত্রী খুঁজতে রাস্তায় নামল।
গাড়ি মালিকের। রাস্তা সরকারের। যাত্রী আল্লাহর। আমি কার?
৪
রাতের শিফট। কবির মাঝে মাঝে রাতে চালায়। দিনের চেয়ে বেশি ওঠে। কিন্তু ঝুঁকি বেশি।
রাত এগারোটার পর যাত্রীর ধরন বদলায়। মাতাল যাত্রী আসে। বার থেকে, পার্টি থেকে। গাড়িতে উঠে গন্ধ ছড়ায়, হুইস্কির গন্ধ, বিয়ারের গন্ধ। কথা বলে অসংলগ্ন। ঠিকানা বলতে পারে না।
একরাতে এক যাত্রী গাড়ির পেছনে বমি করল।
কবির শুনল শব্দ। গাড়ি থামাল। পেছনে তাকাল। সিটের ওপর, মেঝেতে, দরজার পাশে। গন্ধ এত তীব্র যে কবিরের নিজের গা গুলিয়ে উঠল।
যাত্রী বলল, "সরি ভাই, একটু অসুবিধা হয়ে গেছে।"
কবির যাত্রীকে নামাল। ভাড়া নিল। তারপর রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে পরিষ্কার করল। পানির বোতল দিয়ে ধুইল। কাপড় দিয়ে মুছল। গন্ধ গেল না। গন্ধ সিটের ফোমে ঢুকে গেছে। কাল সকালেও থাকবে। পরশুও থাকবে।
কবির জানালা খুলে চালাল। ঠান্ডা বাতাস ঢুকল। গন্ধ মিশে গেল বাতাসে।
এক্সট্রা চার্জ নেওয়ার উপায় নেই। কোনো নিয়মে নেই। গাড়িতে বমি করলে যাত্রী কিছু দিতে বাধ্য না। কবিরই পরিষ্কার করবে। কবিরই চালাবে। কবিরই সহ্য করবে।
৫
ট্র্যাফিক পুলিশের সাথে কবিরের সম্পর্ক একটা অলিখিত চুক্তি।
প্রতি সপ্তাহে একশো টাকা। ফার্মগেটের পয়েন্টে। কবির থামে, জানালা দিয়ে একশো টাকা দেয়। পুলিশ নেয়। কিছু বলে না।
এটা না দিলে কী হয়? ফিটনেস চেক হয়। রুট পারমিট চেক হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক হয়। সব ঠিক থাকলেও কিছু একটা বের করে। গ্যাস সিলিন্ডারের মেয়াদ, মিটারের ক্যালিব্রেশন, ফায়ার এক্সটিংগুইশার। কিছু না পেলে "অবৈধ পার্কিং" বলে চালান কাটে। চালান পাঁচশো টাকা। সপ্তাহে একশো দেওয়া সস্তা।
কবির দেয়। প্রতি সপ্তাহে। বত্রিশ সপ্তাহ ধরে দিচ্ছে। আগের চালকও দিত। আগের আগেরটাও। এটা সিস্টেম।
৬
গ্যাসের লাইন।
সিএনজি চালাতে গ্যাস লাগে। গ্যাস স্টেশনে লাইন। সকালে এক ঘণ্টা। বিকালে দেড় ঘণ্টা। এই সময়টা মরা। মিটার বন্ধ, ভাড়া নেই, গ্যাসের জন্য অপেক্ষা।
লাইনে দাঁড়িয়ে কবির ফোন দেখে। ফেসবুক দেখে। অন্য চালকদের সাথে কথা বলে। সবার একই কথা। ভাড়া কম। খরচ বেশি। যাত্রী বদমেজাজি। পুলিশ চাঁদা নেয়।
একজন বলল, "ভাই, রাইড শেয়ারিং অ্যাপ আসছে সিএনজির জন্যও। তখন দেখবেন, অ্যাপ কমিশন নেবে, মালিক ভাড়া নেবে, সরকার ট্যাক্স নেবে। আমরা কী পাব?"
কবির বলল, "যা পাই। যা পাচ্ছি।"
"তাও কমবে।"
কবির চুপ। সে জানে এটা সত্য।
৭
কবিরের বড় মেয়ে আয়েশা একদিন স্কুল থেকে এসে বলল, "বাবা, আমাদের ক্লাসে সবাই বলে তাদের বাবা কী করে। আমি কী বলব?"
কবির বলল, "বলবি বাবা গাড়ি চালায়।"
"কী গাড়ি?"
"সিএনজি।"
আয়েশা চুপ হয়ে গেল। স্কুলে তার বন্ধুদের বাবারা কেউ দোকানদার, কেউ চাকরিজীবী, কেউ ব্যবসায়ী। সিএনজি চালক বলতে আয়েশার লজ্জা লাগে। সে জানে এটা ভুল, লজ্জা পাওয়া উচিত না, কিন্তু আট বছরের বাচ্চা "উচিত" বোঝে না।
কবির আয়েশার মাথায় হাত রাখল। কিছু বলল না। তার হাতে স্টিয়ারিংয়ের ছাপ। হাতের তালুতে কালো দাগ, গ্রিজের। নখে ময়লা।
শাহানা রাতে বলল, "মেয়ে জিজ্ঞেস করেছে?"
"হুম।"
"কী বললে?"
"গাড়ি চালায়।"
শাহানা আর কিছু বলল না। সেও জানে, গাড়ি চালানো আর সিএনজি চালানো এক কথা না মানুষের চোখে। গাড়ি চালানো মানে প্রাইভেট কার। সিএনজি চালানো মানে ভাড়ায় খাটা।
৮
শুক্রবার কবিরের ছুটি।
সপ্তাহে একদিন। ইউনুস মিয়া একদিন ছুটি দেন, গাড়ির মেইনটেন্যান্সের জন্য, চালকের জন্য না। কবির সেদিন বাড়িতে থাকে। আয়েশার সাথে খেলে। ছোট মেয়ে রুমার সাথে সময় কাটায়। শাহানা একটু ভালো রান্না করে, মুরগির ঝোল।
বিকালে কবির ছাদে যায়। মিরপুরের ছাদ থেকে দেখা যায় অসংখ্য ছাদ। টিনের, কংক্রিটের, কারো ছাদে কাপড় শুকাচ্ছে, কারো ছাদে সবজি বাগান। দূরে ফ্লাইওভার। তার ওপর দিয়ে গাড়ি যায়। বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার। সিএনজিও যায়।
কবির দেখে। সেই সিএনজিতে অন্য কেউ বসে আছে। অন্য কোনো কবির। অন্য কারো মালিকের গাড়ি চালাচ্ছে। অন্য কারো রাস্তায়। অন্য কোনো যাত্রী নিয়ে।
কবির ভাবে, সে যদি গাড়ির মালিক হতে পারত? নিজের একটা সিএনজি? তাহলে প্রতিদিনের পাঁচশো টাকা ভাড়া বাঁচত। মাসে পনেরো হাজার। বছরে এক লাখ আশি হাজার।
একটা নতুন সিএনজির দাম সাত লাখ। পুরোনো পাঁচ লাখ। কবিরের সঞ্চয় শূন্য।
সে ছাদ থেকে নামে। শাহানা ডাকে, "চা খাবে?"
কবির চা খায়। চিনি ছাড়া, চিনি বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়, এটা কেউ বলেছে রাস্তায়। আসলে চিনি বাঁচানোর জন্য।
আগামীকাল শনিবার। সকাল সাতটায় গ্যারেজে যাবে। পাঁচশো টাকা দেবে। চাবি নেবে। মিটার চালু করবে। রাস্তায় নামবে।
গাড়ি মালিকের। রাস্তা সরকারের। যাত্রী আল্লাহর।
কবির শুধু চালায়।