বাস হেল্পার

বাস থেকে নামলে আমি কেউ না। বাসেই আমার পরিচয়।

পর্ব ৩০ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রনির গলা তার হাতিয়ার।

"গুলিস্তান! গুলিস্তান! গুলিস্তান!"

সে চেঁচায়। বাসের দরজায় ঝুলে। একহাতে দরজার রড ধরে, অন্য হাত ফাঁকা, সেই হাত দিয়ে ইশারা করে, এদিকে আসেন, উঠেন, জায়গা আছে। শরীরটা বাসের বাইরে, পা স্টেপে, বাতাসে চুল ওড়ে।

রনির বয়স চৌদ্দ।

ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছিল। মিরপুরের একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। তারপর ছেড়ে দিয়েছে। বাবা মারা গেছে দুই বছর আগে, রিকশা দুর্ঘটনায়। মা রহিমা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। মাসে তিন হাজার পায়। তিন হাজারে রনি, তার ছোট বোন রুবি, আর রহিমা, তিনজনের সংসার চলে না।

রনির মামা বাবুল বাসের ড্রাইভার। গাবতলী-গুলিস্তান রুট। মামা বলল, "আয়, আমার সাথে।" রনি এল। হেল্পার হলো।

বেতন দুইশো টাকা। দিনে। প্লাস টিপস। টিপস মানে ভাড়ার খুচরো। যাত্রী পঁচিশ টাকা দিল, ভাড়া বাইশ, তিন টাকা রনির। এভাবে দিনে পঞ্চাশ-ষাট টাকা টিপস জমে। মোট আড়াইশো-আটষট্টি।

মাসে সাত-আট হাজার। চৌদ্দ বছর বয়সে।

বারো ঘণ্টা ডিউটি।

সকাল সাতটা থেকে রাত সাতটা। কখনো আটটা। কখনো নটা। ড্রাইভার মামা বাবুল যতক্ষণ চালায়, রনি ততক্ষণ থাকে।

সকালে গাবতলী থেকে ছাড়ে বাস। কল্যাণপুর, মিরপুর রোড, ফার্মগেট, শাহবাগ, গুলিস্তান। ফেরে আবার। দিনে ছয় ট্রিপ, সাত ট্রিপ।

রনির কাজ: ভাড়া সংগ্রহ। দরজায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ডাকা। যাত্রী তোলা। যাত্রী নামানো। ভিড়ের সময় যাত্রী ঠেলে ভেতরে ঢোকানো। খুচরো দেওয়া। বাসের ছাদে মালপত্র তোলা। ঝগড়া মেটানো। মহিলা সিট খালি করানো।

সবচেয়ে কঠিন সময় সকাল আটটা থেকে নটা আর বিকাল পাঁচটা থেকে সাতটা। রাশ আওয়ার। বাসে জায়গা নেই, তবু মানুষ ওঠে। রনি দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, "একটু ভেতরে যান, ভাই।" মানুষ সরে না। রনি পিঠে ধাক্কা দেয়। কেউ বলে, "বেয়াদব ছেলে।" রনি চুপ থাকে।

চৌদ্দ বছরের ছেলে। ত্রিশ-চল্লিশ বছরের পুরুষদের ধাক্কা দেয়। তারা রাগ করে। কিন্তু উঠতে চায়। দ্বন্দ্ব: রাগও আছে, বাসেও উঠতে হবে। রনি এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়ায়।

রনি কলেজের মেয়েদের দেখে।

শাহবাগ স্টপে উঠে অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, ইডেন কলেজের। ব্যাকপ্যাক পিঠে। বই আছে ভেতরে, খাতা আছে, পেনসিল বক্স আছে। রনি জানে না ঠিক কী আছে। সে শুধু দেখে ব্যাকপ্যাকগুলো ভারী।

মেয়েরা সিটে বসে। কেউ বই পড়ে। কেউ ফোনে থাকে। কেউ বান্ধবীর সাথে কথা বলে। হাসে। কথা বলার ভঙ্গি আলাদা। শব্দ আলাদা। "অ্যাসাইনমেন্ট", "সেমিস্টার", "ক্রেডিট", রনি এসব শব্দ শোনে কিন্তু বোঝে না।

একদিন একটা মেয়ের ব্যাকপ্যাক থেকে একটা বই পড়ে গেল। রনি তুলে দিল। বইয়ের নাম দেখল, ইংরেজিতে লেখা, পড়তে পারল না। মেয়েটা বলল, "থ্যাংকস।"

রনি মাথা নাড়ল।

সে ভাবল, এই বইয়ের ভেতরে কী আছে? কী লেখা আছে এত পৃষ্ঠা জুড়ে? কী শিখলে মানুষ কলেজে যায়? কী পড়লে ব্যাকপ্যাকে বই রেখে বাসে চড়ে, বাসে দাঁড়িয়ে পড়ে, নেমে যায় নিজের জায়গায়?

রনি দরজায় দাঁড়িয়ে পরের স্টপের নাম চেঁচায়। "পল্টন! পল্টন! পল্টন!"

একদিন এক যাত্রী জিজ্ঞেস করল।

বয়স্ক মানুষ। চশমা পরা। সম্ভবত শিক্ষক, রনির মনে হলো। মানুষটা রনির দিকে তাকিয়ে বলল, "পড়িস না কেন?"

রনি থামল। ভাড়ার টাকা গুনছিল। থেমে গেল।

"পড়লে খাবো কে দেবে?"

মানুষটা চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বলল, "তোর বাবা কী করে?"

"বাবা নাই।"

"মা?"

"ঝিয়ের কাজ করে।"

মানুষটা পকেট থেকে একশো টাকা বের করে রনির হাতে দিল। বলল, "রাখ।"

রনি নিল। একশো টাকা। সে জানে এটা দয়া। দয়া খারাপ জিনিস না, কিন্তু দয়ায় স্কুলে যাওয়া যায় না। দয়া একবার আসে। স্কুল রোজ।

মানুষটা নেমে গেল। রনি একশো টাকা পকেটে রাখল। সন্ধ্যায় মাকে দেবে।

গত বছর রনির কপালে একটা দাগ হয়েছে।

একটা গাড়ির সাইড মিরর বাসের দরজায় লাগল। রনি দরজায় ঝুলে ছিল। মিরর রনির কপালে আঘাত করল। রক্ত বের হলো। রনি দরজা ছাড়ল না। ছাড়লে পড়ে যেত। সে এক হাতে রড ধরে রইল, অন্য হাতে কপাল চেপে ধরল।

বাস থামল না। মামা বাবুল পেছনে তাকাল, দেখল রক্ত, বলল, "ধর শক্ত করে।" বাস থামানোর জায়গা নেই। ট্র্যাফিকের মধ্যে থামালে পেছনের বাস ধাক্কা দেবে।

পরের স্টপে থামল। একজন যাত্রী টিস্যু দিল। রনি চেপে ধরল। রক্ত থামল। কপালে কাটা দাগ। হাসপাতাল যায়নি। সেলাই হয়নি। দাগটা এমনি শুকিয়ে গেল। কিন্তু একটা দাগ রয়ে গেল। আধ ইঞ্চি। কপালের ডান পাশে। চুলের নিচে লুকানো থাকে, কিন্তু ঘাম মুছলে দেখা যায়।

রনি এখন দরজায় ঝোলার সময় মাথা ভেতরে রাখে। শরীর বাইরে, মাথা ভেতরে। এটা সে শিখেছে। দাগ থেকে শিখেছে।

মামা বাবুল রনিকে ভালোবাসে।

নিজের ভাগ্নে। বোনের ছেলে। বোনের স্বামী মারা গেছে, ছেলে এতিম। বাবুলের নিজেরও সংসার আছে, বউ আছে, দুই ছেলে আছে। তবু রনিকে সাথে রাখে। দুপুরে নিজের খাবার ভাগ করে খায়। রুটি দুটো হলে একটা রনিকে দেয়।

কিন্তু ভালোবাসায় সংসার চলে না। বাবুল নিজেই ড্রাইভার। বেতন বারো হাজার। মালিকের বাস। বাবুলের হিসাব কবিরের মতোই। মালিকের বাস, সরকারের রাস্তা, যাত্রী আল্লাহর।

বাবুল মাঝে মাঝে বলে, "রনি, তোকে একটা কাজ ধরাতে হবে। গ্যারেজে, না হলে কোনো দোকানে। সারাজীবন বাসে ঝুলবি?"

রনি বলে, "মামা, এখানেই ভালো আছি।"

ভালো না। রনি জানে ভালো না। কিন্তু পরিচিত। বাস পরিচিত। রুট পরিচিত। দরজার রড পরিচিত। হাঁকডাক পরিচিত। গুলিস্তান-গাবতলী-গুলিস্তান, এই চক্র পরিচিত।

বাস থেকে নামলে আমি কেউ না। বাসেই আমার পরিচয়।

রনির ছোট বোন রুবি ক্লাস টুতে পড়ে।

রহিমা রুবিকে স্কুলে পাঠায়। রনির স্কুল বন্ধ, কিন্তু রুবির না। রহিমা বলে, "একটা সন্তান তো পড়ুক।"

রুবি সন্ধ্যায় পড়তে বসে। মোমবাতিতে। বাসায় বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু লোডশেডিং হয়। রুবি হাতের লেখা অনুশীলন করে। বাংলা অক্ষর, ক খ গ ঘ। রনি পাশে বসে দেখে।

সে পড়তে পারে। ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছে। বাংলা পড়তে পারে, লিখতে পারে। ইংরেজি একটু একটু। অঙ্ক পারে, যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ, ভাড়ার হিসাব করতে করতে অঙ্ক আরো ভালো হয়েছে। কিন্তু ক্লাস সেভেনের বই সে কোনোদিন খোলেনি।

রুবি বলে, "ভাইয়া, এই অঙ্কটা শেখাও।"

রনি দেখে। সহজ অঙ্ক। দুই অঙ্কের যোগ। রনি মুখে মুখে উত্তর বলে দেয়।

রুবি বলে, "ভাইয়া তো অনেক জানে।"

রনি হাসে। ক্লাস সিক্সের ছেলে ক্লাস টুর অঙ্ক পারে, এটা জানা না। কিন্তু রুবির চোখে সে জ্ঞানী। এটুকুই তার।

রাত সাতটায় বাস গাবতলী ডিপোতে ঢোকে।

রনি নামে। সারাদিনের ধুলো শরীরে। গলা ভাঙা চেঁচানিতে। পায়ে ব্যথা, সারাদিন দাঁড়িয়ে ছিল। হাতের তালুতে রডের ছাপ।

মামা বাবুল বলে, "যা, বাড়ি যা। খেয়ে ঘুমা।"

রনি হাঁটে। গাবতলী থেকে তাদের ভাড়া বাসা দশ মিনিটের পথ। গলি দিয়ে। ড্রেনের পাশে। মশার গুনগুন। কুকুরের ডাক। কোথাও টেলিভিশন বাজছে, কোনো সিরিয়ালের ডায়ালগ।

রনি ঘরে ঢোকে। মা ভাত রেখেছে। ডাল আছে। আলু ভর্তা। রনি হাত ধোয়। খায়। রুবি ঘুমিয়ে গেছে। মা বসে আছে, রনির খাওয়া দেখছে।

রনি জামার পকেট থেকে টাকা বের করে। গুনে। দুইশো বাষট্টি টাকা। মায়ের হাতে দেয়। রহিমা নেয়। গুনে না। ছেলের ওপর বিশ্বাস।

রনি মাদুরে শোয়। পাখা ঘোরে। চোখ বন্ধ করে। কানে এখনো বাজে, গুলিস্তান গুলিস্তান গুলিস্তান। সারাদিনের হাঁকডাক মাথার ভেতরে ঘোরে, ঘুমের মধ্যেও।

সে ভাবে কলেজের মেয়েদের কথা। ব্যাকপ্যাকের কথা। বইয়ের কথা। সে ভাবে সেই চশমা-পরা মানুষটার কথা। "পড়িস না কেন?"

পড়লে খাবো কে দেবে?

এই প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই। মানুষটার কাছেও ছিল না। সে একশো টাকা দিয়েছিল। একশো টাকায় একদিনের খাবার হয়। একদিনের।

রনি ঘুমায়। ভোরে উঠবে। মুখ ধোবে। চা খাবে। গাবতলী ডিপোতে যাবে। বাসে উঠবে। দরজায় ঝুলবে।

"গুলিস্তান! গুলিস্তান! গুলিস্তান!"

চৌদ্দ বছরের গলায় পুরো শহর কাঁপে না। কিন্তু শহর শোনে। শহর ওঠে এই গলায়। শহর চলে এই গলায়।

রনি জানে না তাকে ছাড়া শহর চলবে কি না। সে শুধু জানে তাকে ছাড়া তার সংসার চলবে না।

কপালে দাগ। গলায় আওয়াজ। পকেটে খুচরো।

এই নিয়ে রনি।