ট্রাক ড্রাইভার

আমরা মরি না হত্যা করি, মাঝখানে কিছু নেই

পর্ব ৩১ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আজগরের চোখ জ্বলছে।

রাত তিনটা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। কুমিল্লার কাছাকাছি কোথাও। দশ চাকার ট্রাক। পেছনে বিশ টন রড। সামনে অন্ধকার। হেডলাইটের হলুদ আলো রাস্তায় পড়ছে, রাস্তা কাঁপছে। রাস্তা না, আজগরের হাত কাঁপছে। স্টিয়ারিং কাঁপছে। সবকিছু কাঁপছে।

চল্লিশ ঘণ্টা হলো ঘুমায়নি।

গতকাল সকালে ঢাকা থেকে রড তুলেছে। চট্টগ্রাম যাবে। সেখান থেকে আবার মাল নিয়ে ঢাকা ফিরবে। কোম্পানি বলেছে দুই দিনে দুই ট্রিপ। একটা ট্রিপে ভাড়া বারো হাজার। ড্রাইভারের ভাগ তিন হাজার। হেলপারের দেড় হাজার। বাকিটা মালিকের।

তিন হাজার টাকায় একজন মানুষ ঘুম ছাড়া দুইশো সত্তর কিলোমিটার ট্রাক চালায়।

আজগর ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকাল। বিড়ির প্যাকেটের পাশে দুটো ছোট গোলাপি বড়ি। ইয়াবা। মেথামফেটামিন। ঢাকার ড্রাইভাররা বলে "ট্যাবলেট।" চট্টগ্রামের ড্রাইভাররা বলে "পাগলা বড়ি।" নাম যাই হোক, কাজ একটাই। ঘুম তাড়ায়।

একটা বড়ি খেয়েছে সন্ধ্যায়। দ্বিতীয়টা এখন খাবে।

আজগর বড়িটা তুলে মুখে ফেলল। পানির বোতল থেকে এক চুমুক খেল। তেতো স্বাদ গলায় নামল। পনেরো মিনিট পর মাথার ভেতরে কিছু একটা ঘটবে। ঘুম পালাবে। চোখ খুলে যাবে। হৃদপিণ্ড দ্রুত চলবে। হাত আর কাঁপবে না।

কিন্তু এই পনেরো মিনিট বিপজ্জনক।

হেলপার জসিম পাশের সিটে ঘুমাচ্ছে। বিশ বছরের ছেলে। প্রথম ট্রিপ। আজগর তাকে ঘুমাতে দিয়েছে। "তুই ঘুমা। আমি পারুম।"

আজগর পারে। পনেরো বছর ধরে এই রাস্তায় ট্রাক চালাচ্ছে। চোখ বন্ধ করেও চালাতে পারবে। চোখ বন্ধ করে চালিয়েছেও। এক-দুই সেকেন্ডের জন্য চোখ বুজে গেছে, আবার খুলে গেছে। এটাকে ড্রাইভাররা বলে "মাইক্রোস্লিপ।" ডাক্তাররাও হয়তো তাই বলে। আজগর ডাক্তারের কাছে যায় না। ডাক্তার বলবে ঘুমাতে। আজগর ঘুমালে সংসার চলবে না।

রাস্তা সোজা। বাঁ দিকে ধানক্ষেত। ডান দিকে ধানক্ষেত। মাঝখানে আটাশি ফুট চওড়া পিচের রাস্তা। পিচ ভাঙা জায়গায় জায়গায়। গর্তে চাকা পড়লে ট্রাক লাফায়। পেছনে রড ঝনঝন করে।

সামনে একটা আলো দেখা গেল। মোটরসাইকেল। একজন চালাচ্ছে, পেছনে একজন বসে আছে। কোনো হেলমেট নেই। কোনো রিফ্লেক্টর নেই। মোটরসাইকেলটা রাস্তার মাঝখানে।

আজগরের চোখ ঝাপসা। মোটরসাইকেলটা একটা না দুইটা বুঝতে পারছে না। মাথায় বড়ি কাজ করেনি এখনো।

হর্ন বাজাল।

মোটরসাইকেলটা নড়ল না।

আবার হর্ন।

মোটরসাইকেল ধীরে ধীরে বাঁ দিকে সরল। আজগর ডান দিয়ে পার হলো। দশ চাকার ট্রাক পার হওয়ার সময় বাতাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেলটা কেঁপে উঠল। পেছনের লোকটা চমকে উঠল।

আজগর আয়নায় দেখল। মোটরসাইকেলটা টলছে। তারপর সামলে গেল।

এবার বাঁচল।

গত মাসে বাঁচেনি।

করিম। আজগরের সাথে একই কোম্পানিতে। করিম বউয়ের পেটে বাচ্চা রেখে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিল। রাত দুইটা। ফেনীর কাছে। করিম বাষট্টি ঘণ্টা ঘুমায়নি। তিনটা ইয়াবা খেয়েছিল। তৃতীয়টা আর কাজ করেনি। শরীর যখন ভেঙে পড়ে, কোনো বড়ি কাজ করে না।

একটা রিকশাভ্যান। রাস্তার পাশে। ভ্যানে একটা পরিবার। বাবা, মা, দুই বাচ্চা। কোথাও যাচ্ছিল। ভোরের আগে পৌঁছাতে চেয়েছিল। ভ্যানে কোনো আলো ছিল না।

করিমের চোখ বুজে গিয়েছিল তিন সেকেন্ডের জন্য।

তিন সেকেন্ডে দশ চাকার ট্রাক ষাট কিলোমিটার গতিতে পঞ্চাশ মিটার যায়।

চারজন। বাবা, মা, পাঁচ বছরের মেয়ে, দুই বছরের ছেলে।

করিম ট্রাক থেকে নেমে দৌড়ে পালিয়েছিল। সবাই পালায়। পালানো ছাড়া উপায় নেই। থাকলে গণপিটুনিতে মারা যাবে। পুলিশ এলে গ্রেপ্তার হবে। হত্যা মামলা হবে। সাত-আট বছর জেল হবে।

করিম দুই দিন পর ধরা পড়ল। ফেনী জেলে আছে।

করিমের বউ এখন একা। পেটে বাচ্চা। কোম্পানি বলেছে, "করিমের সাথে আমাদের সম্পর্ক নেই। সে ফ্রিল্যান্স ড্রাইভার ছিল।"

ফ্রিল্যান্স। শব্দটা শিখেছে কোম্পানি। সুবিধার জন্য সব ড্রাইভার ফ্রিল্যান্স। কোনো চুক্তি নেই। কোনো বীমা নেই। দুর্ঘটনায় কোম্পানির কোনো দায় নেই। ড্রাইভার ঘুমায়নি, সেটা ড্রাইভারের দোষ। ড্রাইভার ইয়াবা খেয়েছে, সেটা ড্রাইভারের দোষ। ড্রাইভারকে দুই দিনে দুই ট্রিপ করতে বলেছে, সেটা কারো দোষ না।

বড়ি কাজ করতে শুরু করেছে।

আজগরের মাথায় একটা শিরা টানটান হয়ে গেল। চোখ খুলে গেল। ঘুম পালাল। হৃদপিণ্ড দ্রুত চলছে। হাত আর কাঁপছে না। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরা আছে। রাস্তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

এই অনুভূতিটা আজগর চেনে। এটা জাগ্রত থাকা না। এটা একটা মিথ্যা জাগরণ। শরীর ঘুমাতে চাইছে, ওষুধ ঘুমাতে দিচ্ছে না। দুইটার মাঝখানে শরীর আটকে আছে। না ঘুম, না জাগরণ। একটা তৃতীয় অবস্থা। ড্রাইভারদের অবস্থা।

আজগরের বয়স আটচল্লিশ। দেখতে ষাট। চুল পাকা। দাঁত নেই সামনের তিনটা। পিঠ বাঁকা। কিডনিতে ব্যথা, সবসময়। চোখে ছানি পড়তে শুরু করেছে। ডাক্তার বলেছে অপারেশন করাতে হবে। আজগর বলেছে, "চোখ অপারেশন করলে তো চালাতে পারুম না দুই সপ্তাহ। দুই সপ্তাহ না চালালে পেটে ভাত জুটবে না।"

ডাক্তার কিছু বলেনি। ডাক্তার বোঝে এই অঙ্ক।

আজগরের তিন মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছে তিন বছর আগে। যৌতুক দিতে গিয়ে ধার করেছে দেড় লাখ। সুদে শোধ করছে এখনো। মেজো মেয়ে গার্মেন্টসে কাজ করে। ছোট মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বউ শেফালি ঘরে থাকে। শেফালির হাঁটুতে ব্যথা। দাঁড়াতে পারে না বেশিক্ষণ।

তিন হাজার টাকা প্রতি ট্রিপ। মাসে দশ ট্রিপ হলে ত্রিশ হাজার। হেলপারের খরচ, তেল, ইয়াবা, চা, পুলিশের ঘুষ বাদ দিলে হাতে থাকে কুড়ি। কুড়ি হাজার টাকায় ছয়জনের সংসার চলে। চলে না। টানলে চলে।

ভোর হচ্ছে। আকাশ ধূসর থেকে হালকা নীল হচ্ছে। ফেনী পার হয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম আর ঘণ্টা দুয়েক।

জসিম জেগে উঠল। চোখ কচলাচ্ছে। "ভাই, আমি একটু চালাই?"

"তোর লাইসেন্স আছে?"

জসিম চুপ। লাইসেন্স নেই। আজগরেরও নেই। এই রাস্তায় যে ট্রাকগুলো চলে, তার অর্ধেক ড্রাইভারের লাইসেন্স নেই। যাদের আছে, তাদের অর্ধেকের লাইসেন্স ভুয়া। পাঁচ হাজার টাকায় কেনা। কোনো পরীক্ষা নেই। কোনো প্রশিক্ষণ নেই।

আজগর ট্রাক চালাতে শিখেছে চৌদ্দ বছর বয়সে। হেলপার ছিল। পুরোনো ড্রাইভার বলেছিল, "ধর, চালা।" আজগর ধরেছিল। চালিয়েছিল। এটাই প্রশিক্ষণ।

"চা খাব?" জসিম জিজ্ঞেস করল।

রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকান। আজগর ট্রাক দাঁড় করাল। নামল। পা মাটিতে পড়তেই হাঁটু ভাঁজ হলো। শরীর ভারী। মাথা ঘুরছে। বড়ির প্রভাব কমে আসছে।

চায়ের দোকানে আরো তিনজন ড্রাইভার। একজনের চোখ লাল। আরেকজন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। তৃতীয়জন ফোনে কথা বলছে। "হ্যাঁ, পৌঁছে যামু। রাতের মধ্যে।"

সবার চোখে একই চেহারা। ঘুমহীনতার চেহারা। চামড়ার নিচে হাড় দেখা যায়। চোখের নিচে কালো। ঠোঁট শুকনো।

আজগর চা নিয়ে বসল। জসিম পাশে বসল।

"ভাই, করিম ভাইয়ের কথা শুনলাম। খারাপ হয়েছে।"

আজগর চায়ে চুমুক দিল। "খারাপ?"

"হ্যাঁ। চারজন মারা গেছে।"

আজগর কাপ নামিয়ে রাখল। "জসিম, এই রাস্তায় গত বছর কতজন মারা গেছে জানিস?"

জসিম মাথা নাড়ল।

"জানি না ভাই।"

"আমিও জানি না। কেউ জানে না। কেউ গোনে না।"

আজগর চা শেষ করল। উঠল। জসিমকে বলল, "চল।"

ট্রাকে উঠল। ইঞ্জিন চালু করল। ক্লাচ ছাড়ল। দশ চাকার ট্রাক ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

আজগরের চোখ আবার জ্বলতে শুরু করেছে।

চট্টগ্রাম পোর্টে রড নামানো হলো। দুপুর একটা। আজগর ছাব্বিশ ঘণ্টা আগে ঢাকা থেকে বেরিয়েছিল। এখন আবার মাল তুলতে হবে। সিমেন্ট। আশি বস্তা। বাইশ টন। আজ রাতের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছাতে হবে।

আজগর হেলপারকে বলল, "একটু ঘুমাই। দুই ঘণ্টা।"

ট্রাকের নিচে, পেছনের চাকার ছায়ায়, একটা চাটাই বিছিয়ে আজগর শুয়ে পড়ল। মাথার নিচে গামছা। চোখ বন্ধ করল।

ঘুম এলো না। বড়ি এখনো শরীরে আছে। হৃদপিণ্ড দ্রুত চলছে। চোখ বন্ধ, কিন্তু মাথার ভেতরে আলো। ঘুমের ওষুধ নেই। ঘুম আসার ওষুধ নেই। শুধু ঘুম তাড়ানোর ওষুধ আছে। কারণ কোম্পানির ঘুম তাড়ানো দরকার, আসানো না।

দেড় ঘণ্টা চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকল। ঘুম হলো না। উঠে বসল। মুখে পানি দিল। চোখে পানি দিল। গামছা দিয়ে মুখ মুছল।

জসিম এলো। "ভাই, মাল উঠেছে।"

আজগর ক্যাবে উঠল। ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকাল। গোলাপি বড়ি আর নেই। দুটোই খেয়ে ফেলেছে।

জসিমকে বলল, "পোর্টের কাছে কোথায় পাওয়া যায় জানিস?"

জসিম চুপ করে রইল। তারপর বলল, "হ্যাঁ ভাই।"

"দুটো আন।"

জসিম নামল। পনেরো মিনিট পর ফিরে এলো। হাতে দুটো গোলাপি বড়ি। একটা একশো টাকা। দুইশো টাকা। আজগরের দৈনিক মজুরি তিন হাজার। তার সাত শতাংশ ঘুম তাড়ানোর পেছনে যায়।

কোম্পানি জানে। পুলিশ জানে। প্রশাসন জানে। সবাই জানে। কেউ কিছু করে না। কারণ রড পৌঁছাতে হবে। সিমেন্ট পৌঁছাতে হবে। দেশ গড়তে হবে। দেশ গড়ার জন্য ট্রাক চলতে হবে। ট্রাক চলার জন্য ড্রাইভারকে জেগে থাকতে হবে। ড্রাইভার জেগে থাকার জন্য ইয়াবা খাবে।

আজগর বড়ি মুখে ফেলল। ইঞ্জিন চালু করল।

আরো দুইশো সত্তর কিলোমিটার বাকি। আরো একটা রাত বাকি। আরো কতগুলো মোটরসাইকেল, রিকশাভ্যান, হাঁটা মানুষ রাস্তায় থাকবে।

আজগর স্টিয়ারিং ধরল। হাত কাঁপছে না। এখনো না।

আমরা মরি না হত্যা করি। মাঝখানে কিছু নেই। ঘুম থাকলে মরি, ঘুম না থাকলে হত্যা করি।