নৌকার মাঝি

নৌকা ডুবলে আমিও ডুবি

পর্ব ৩২ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

পানি।

চারদিকে পানি। আকাশে পানি। মাটিতে পানি। মাটির নিচে পানি। সুনামগঞ্জের হাওরে মাটি বলে কিছু নেই। আছে পানির নিচে কাদা, কাদার নিচে আরো কাদা। শুকনো মৌসুমে মাটি দেখা যায়। বর্ষায় সব ডুবে যায়। গ্রাম ডুবে যায়। রাস্তা ডুবে যায়। স্কুল ডুবে যায়। মানুষ ডোবে না। মানুষ ভাসে। এখানকার মানুষ ভাসতে শিখেছে হাজার বছর আগে।

আকবর মাঝি। বয়স পঁয়তাল্লিশ। দেখতে ষাট। হাওরের মানুষ সবাই নিজের বয়সের চেয়ে বুড়ো দেখায়। রোদ, বাতাস, পানি, এই তিনটা মিলে চামড়া পুড়িয়ে দেয়। আকবরের মুখে বলিরেখা নদীর মানচিত্রের মতো। হাত দুটো কালো। নখ ভাঙা। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। বর্ষায় স্যান্ডেল পরে না। খালি পায়ে নৌকায় দাঁড়ায়।

নৌকাটা আকবরের দাদার। তার আগে দাদার বাবার। কাঠের নৌকা। শালকাঠ। এখন শালকাঠ পাওয়া যায় না। যেখানে পচে যায়, ফাইবারগ্লাস দিয়ে জোড়া লাগায়। যেখানে ফুটো হয়, আলকাতরা আর ছেঁড়া কাপড় দিয়ে বন্ধ করে। পঞ্চাশবার প্যাচ দেওয়া হয়েছে। নৌকার আসল কাঠ আর কতটুকু আছে, আকবর জানে না। হয়তো অর্ধেক প্যাচ, অর্ধেক কাঠ। হয়তো পুরোটাই প্যাচ।

নৌকা ডুবলে আমিও ডুবি। আমরা একসাথে ভাসি, একসাথে ডুবি।

বর্ষাকাল। আষাঢ়। হাওরে পানি বারো ফুট। গ্রামগুলো দ্বীপের মতো ভাসছে। একটা গ্রাম থেকে আরেকটা গ্রামে যেতে নৌকা ছাড়া উপায় নেই। ব্রিজ নেই। রাস্তা পানির নিচে। বাস নেই, রিকশা নেই, অটো নেই। শুধু নৌকা।

আকবর ভাড়ায় মানুষ পারাপার করে। দশ টাকা এক জন। এপার থেকে ওপার। ওপার থেকে এপার। সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। বর্ষায় দিনে একশো জন পার করে। একশো জন, দশ টাকা, এক হাজার টাকা। বৈঠা বায়, ঘাট থেকে ঘাটে, ঘাট থেকে ঘাটে।

শুকনো মৌসুমে পানি নেই। নৌকা কাদায় বসে থাকে। আকবরও বসে থাকে। কাজ নেই। আয় নেই। ছয় মাস বর্ষায় যা কামাই হয়, তা দিয়ে বারো মাস চলে। চলে না। টানলে চলে।

হাওরের অর্থনীতি বাইনারি। বন্যা, না খরা। পানি, না মাটি। আয়, না অনাহার। মাঝখানে কিছু নেই।

আকবরের বউ রেহানা। তিন ছেলে। বড় ছেলে ঢাকায়, গার্মেন্টসে। মেজো ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট ছেলে দশ বছর, স্কুলে যায়। স্কুল পানির ওপরে। বর্ষায় স্কুলের মেঝেতে হাঁটু পানি থাকে। বাচ্চারা পানিতে বসে পড়ে। মাস্টার পানিতে দাঁড়িয়ে পড়ায়। ব্ল্যাকবোর্ড ভেজা। চক লেখে না। মাস্টার মুখে বলে, বাচ্চারা কানে শোনে। এটাই শিক্ষা ব্যবস্থা। হাওরের শিক্ষা ব্যবস্থা।

রাত দুইটা। ঝড় হচ্ছে।

আকবর ঘুমাচ্ছিল। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ছে। বাতাসে চাল কাঁপছে। ছোট ছেলে পাশে ঘুমাচ্ছে। রেহানা উঠে বসেছে। ঝড়ে রেহানা ঘুমাতে পারে না। রেহানার বাবা ঝড়ে মারা গিয়েছিল। নৌকা ডুবে। তেইশ বছর আগে।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

আকবর উঠল। দরজা খুলল। একজন লোক দাঁড়িয়ে। ভেজা। কাঁপছে। লোকটাকে আকবর চেনে। পাশের গ্রামের হাসান। হাসানের বউ অন্তঃসত্ত্বা। নয় মাস।

"ভাই, আমার বউরে হাসপাতালে নিতে হবে।"

হাসপাতাল ওপারে। তাহিরপুর। নৌকায় দেড় ঘণ্টার পথ। ঝড়ে দুই ঘণ্টা লাগবে। হয়তো তিন।

আকবর বাইরে তাকাল। অন্ধকার। বাতাস। বৃষ্টি। হাওরের পানিতে ঢেউ উঠছে। নৌকা ঘাটে দোল খাচ্ছে।

"এই ঝড়ে?"

হাসান কিছু বলল না। হাসানের চোখই বলে দিল।

রেহানা পেছন থেকে বলল, "যেও না।"

আকবর গামছা দিয়ে মাথা বাঁধল। লুঙ্গি গুটিয়ে পরল। একটা টর্চ নিল। ব্যাটারি কম।

হাসানের ঘরে তার বউ নুরজাহান মেঝেতে শুয়ে আছে। মুখ ঘামে ভেজা। দাঁতে দাঁত চেপে ধরা। পেট বড়। ব্যথা আসছে ঘন ঘন।

আকবর দেখল। বুঝল। সময় নেই।

নৌকায় তোলা হলো নুরজাহানকে। নৌকার তলায় একটা চাটাই। তার ওপর একটা কাঁথা। নুরজাহান শুয়ে পড়ল। হাসান তার মাথার কাছে বসল। আকবর বৈঠা ধরল।

না গেলে দুইটা প্রাণ যায়। গেলে তিনটা যেতে পারে।

আকবর বৈঠা ফেলল পানিতে। নৌকা এগিয়ে গেল। ঝড়ের মধ্যে। অন্ধকারের মধ্যে। হাওরের বুকে।

বাতাস নৌকাকে ডানে ঠেলছে। আকবর বাঁয়ে বৈঠা দিচ্ছে। ঢেউ আসছে। নৌকায় পানি ঢুকছে। হাসান একটা বালতি দিয়ে পানি সেঁচছে। নুরজাহান চিৎকার করছে। ব্যথার চিৎকার। ঝড়ের শব্দে ডুবে যাচ্ছে।

টর্চের আলো কমে আসছে। আকবর তারা দেখে পথ চেনে। আজ আকাশে তারা নেই। মেঘ আছে। বৃষ্টি আছে। আকবর হাওর চেনে। কোথায় পানি গভীর, কোথায় অগভীর, কোথায় ডুবো গাছের গুঁড়ি আছে, সব মুখস্থ। শরীরে মুখস্থ। চোখ বন্ধ করেও সে তাহিরপুর যেতে পারবে।

কিন্তু ঝড় চোখ বন্ধ করে না। ঝড় নিয়ম মানে না।

একটা ঢেউ এলো। বড়। নৌকা পাশে কাত হলো। নুরজাহান গড়িয়ে গেল। হাসান তাকে ধরল। আকবর শরীরের ওজন উল্টো দিকে দিল। নৌকা সামলে গেল।

আরেকটা ঢেউ। নৌকায় পানি ঢুকল। হাঁটুসমান।

আকবর চিৎকার করল, "পানি সেঁচ! দ্রুত!"

হাসান সেঁচতে লাগল। আকবর বৈঠা চালাতে লাগল। দুটো হাত, একটা বৈঠা, বাইশ টন পানির বিরুদ্ধে।

নৌকার একটা প্যাচ খুলে গেল। বাঁ দিকে। পানি ঢুকছে সরু ধারায়। আকবর পায়ের তালু দিয়ে চেপে ধরল। পা আর বৈঠা। এইভাবে।

এক ঘণ্টা। দেড় ঘণ্টা। দুই ঘণ্টা।

নুরজাহানের চিৎকার থামছে না। ব্যথা আসছে মিনিটে মিনিটে। হাসান কাঁদছে। আকবর কাঁদছে না। কাঁদার সময় নেই। বৈঠা চালাতে হবে।

দুই ঘণ্টা পনেরো মিনিটে তাহিরপুরের ঘাট দেখা গেল। একটা আলো। হাসপাতালের আলো।

আকবর শেষ শক্তি দিয়ে বৈঠা চালাল। নৌকা ঘাটে লাগল। হাসান নুরজাহানকে তুলে নিল। দৌড়াল। হাসপাতালের দিকে।

আকবর নৌকায় বসে রইল। হাত দুটো কাঁপছে। বৈঠায় যেখানে হাত ছিল, সেখানে চামড়া উঠে গেছে। রক্ত বের হচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে।

নৌকার তলায় ছয় ইঞ্চি পানি। প্যাচটা আবার বসাতে হবে। কাল। আজ না।

ভোরে বৃষ্টি থামল। আকবর হাসপাতালের বারান্দায় বসে ছিল। হাসান বেরিয়ে এলো। মুখে হাসি।

"ছেলে হইছে।"

আকবর মাথা নাড়ল।

"ভাই, আপনি না আসলে..."

আকবর হাত তুলে থামাল। "যা, বউ দেখ।"

হাসান ভেতরে গেল। আকবর উঠল। ঘাটে গেল। নৌকায় বসল। বৈঠা তুলল। রক্ত জমে কালো হয়ে গেছে হাতে। ব্যথা। বৈঠা ধরলেই ব্যথা। ধরতেই হবে। ফিরে যেতে হবে। রেহানা অপেক্ষা করছে। ছোট ছেলে স্কুলে যাবে।

ফেরার পথে হাওর শান্ত। ঝড় নেই। পানি স্থির। সূর্য উঠছে। সোনালি আলো পানিতে পড়ে ঝিকমিক করছে। সুন্দর। হাওরবাসী "সুন্দর" শব্দটা ব্যবহার করে না। তারা বলে "আজ রোদ আছে।" রোদ মানে কাজ হবে। কাজ মানে ভাত হবে। এটাই সৌন্দর্য।

আকবর বৈঠা চালাচ্ছে। হাত থেকে রক্ত পানিতে পড়ছে। পানি লাল হচ্ছে না। হাওরের পানি এত বিশাল, একজন মাঝির রক্ত তাতে কিছুই না।

ঘাটে ফিরে আকবর নৌকা বাঁধল। উপরে উঠল। রেহানা দরজায় দাঁড়িয়ে।

"বেঁচে আছ?"

"আছি।"

রেহানা কিছু বলল না। ভেতরে গেল। চা বসাল। রেহানা রাতে ঘুমায়নি। দরজার কাছে বসে ছিল। অন্ধকারে। ঝড়ের শব্দ শুনেছে। প্রতিটা ঢেউয়ের আওয়াজে বুক কেঁপেছে। রেহানার বাবা এভাবেই গিয়েছিল। ঝড়ে। নৌকায়। ফেরেনি।

আকবর চা খেতে খেতে বলল, "নৌকায় একটা প্যাচ খুলে গেছে।"

"ঠিক করবে?"

"আজই। দুপুরে।"

রেহানা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। "তোমার হাত দেখো।"

আকবর হাতের দিকে তাকাল। চামড়া ছিলে গেছে। রক্ত জমে কালো। ডান হাতের তালুতে একটা ফোস্কা ফেটে গেছে।

"কিছু না।"

"কিছু না! হাতে তো চামড়া নেই।"

"চামড়া আবার হবে। নৌকা না থাকলে হবে না।"

রেহানা ওষুধ আনল। হলুদ আর নারকেল তেল মেশানো। হাওরের ওষুধ। ডাক্তার দূরে। ওষুধের দোকান আরো দূরে। এই হলুদ-তেলই ওষুধ। রেহানা আকবরের হাতে লাগিয়ে দিল। আকবর চুপ করে বসে রইল।

ছোট ছেলে জেগে উঠেছে। "আব্বা, স্কুলে নিয়ে যাও।"

"যা, তৈরি হ।"

আকবর উঠল। ঘাটে নামল। নৌকায় উঠল। ছেলেকে তুলল। স্কুলঘাটে নামিয়ে দিল। আসার পথে প্রথম যাত্রী পেল। একজন বৃদ্ধ। ওপারে যাবে। বাজারে। দশ টাকা।

আকবর বৈঠা ধরল। হাতে ব্যথা। হলুদ-তেল শুকিয়ে যায়নি এখনো। ধরতেই হবে।

আজ আবার একশো যাত্রী। একশো বার বৈঠা। একশো বার এপার, একশো বার ওপার। এক হাজার টাকা। কাল আবার। পরশু আবার। যতদিন বর্ষা থাকে। বর্ষা শেষ হলে পানি নেমে যাবে। নৌকা কাদায় বসবে। আকবরও বসবে। তখন আবার অন্য হিসেব।

নৌকা ভাসল।