জাল বোনা

জেলে শুধু ওর পরিচয়, আমার কোনো পরিচয় নেই

পর্ব ৩৩ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সুফিয়ার হাতে জাল।

ভোর পাঁচটা। কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূল। ইনানী থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে একটা জেলেপল্লি। বাইশটা ঘর। টিন আর বাঁশের। ঘরগুলো সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে, যেন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে। জেলেপল্লি সবসময় অপেক্ষা করে। নৌকা ফিরবে কি ফিরবে না, মাছ আসবে কি আসবে না, ঝড় আসবে কি আসবে না।

সুফিয়া জাল সারাচ্ছে। ঘরের সামনে বসে। মাটিতে চাটাই বিছানো। জাল ছড়ানো চাটাইয়ের ওপর। একটা সুই, মোটা সুতা। সুফিয়ার আঙুলগুলো দ্রুত চলছে। ফুটো খুঁজছে, সুতা গাঁথছে, গিঁট দিচ্ছে। চোখ না তুলে।

একটা জাল সারাতে বিশ মিনিট। দশ টাকা। দিনে পঞ্চাশটা জাল সারায়। পাঁচশো টাকা। কিন্তু এটা "আয়" না। এটা "সাহায্য।" সুফিয়ার স্বামী আমিনুল বলে, "বউ একটু সাহায্য করে।" পাড়ার লোকে বলে, "আমিনুলের বউ জাল বুনে। ভালো বউ। সংসারে সাহায্য করে।"

সাহায্য। শব্দটা সুফিয়ার গায়ে লেগে আছে চামড়ার মতো। সে চাইলেও ছাড়াতে পারবে না।

আমিনুল সমুদ্রে আছে। বিশ দিন হলো গেছে। ট্রলারে। চট্টগ্রামের দিকে গভীর সমুদ্রে। মাসে বিশ দিন সমুদ্রে থাকে, দশ দিন ঘরে। ঘরে থাকলে ঘুমায়, খায়, জাল শুকায়, আবার যায়।

আমিনুল সমুদ্রে গেলে সুফিয়া একা।

একা মানে শুধু একা না। একা মানে সব। রান্না সুফিয়া। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো সুফিয়া। জাল সারানো সুফিয়া। শুটকি মাছ শুকানো সুফিয়া। শুটকি বিক্রি করা সুফিয়া। বাজার সুফিয়া। পানি আনা সুফিয়া। ঘর ঝাড়ু দেওয়া সুফিয়া। বাচ্চা অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া সুফিয়া। স্কুলের বেতন দেওয়া সুফিয়া। ঘরের টিন উড়ে গেলে লাগানো সুফিয়া।

আমিনুল মাছ ধরে।

সুফিয়া সংসার ধরে।

সমুদ্রে মাছ ধরে সে। ঘরে সংসার ধরি আমি। কিন্তু "জেলে" শুধু ওর পরিচয়।

সুফিয়ার কোনো পরিচয় নেই। ভোটার কার্ডে লেখা আছে "গৃহিণী।" মানে যে ঘরে থাকে। মানে যার কোনো কাজ নেই। মানে যে শুধু থাকে।

সুফিয়া সকাল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করে। সতেরো ঘণ্টা। কোনো ছুটি নেই। কোনো উৎসব নেই। ঈদের দিনেও রান্না করতে হয়। ঈদের দিনেও জাল সারাতে হয়। কারণ সমুদ্র ঈদ মানে না। মাছ ঈদ মানে না। ক্ষুধা ঈদ মানে না।

তিন বাচ্চা। বড় মেয়ে রুবি, চৌদ্দ। মেজো ছেলে সোহেল, এগারো। ছোট মেয়ে তানিয়া, সাত।

রুবি স্কুলে যায় না আর। গত বছর থেকে বন্ধ। কেন? দুটো কারণ। এক, স্কুলের পথে পাড়ার ছেলেরা টিটকারি দেয়। দুই, সুফিয়ার একার পক্ষে সব সামলানো সম্ভব না। রুবি এখন মায়ের সাথে জাল বোনে। শুটকি শুকায়। মাছ কাটে।

রুবির হাতেও এখন সুই আর সুতা। চৌদ্দ বছর বয়সে রুবি তার মায়ের জীবন শুরু করেছে। সুফিয়া জানে এটা ভুল। সুফিয়া জানে রুবির স্কুলে যাওয়া উচিত। কিন্তু সুফিয়া কোন হাত দিয়ে রুবিকে স্কুলে পাঠাবে? সে নিজেই দশটা হাতের কাজ দুটো হাতে করছে।

সোহেল স্কুলে যায়। সোহেল ছেলে। ছেলেদের স্কুলে পাঠাতে হয়। মেয়েদের? মেয়েরা তো মায়ের সাহায্য করবে।

সুফিয়া নিজে কোনোদিন স্কুলে যায়নি। নাম লিখতে পারে। টাকা গুনতে পারে। এর বেশি কিছু জানে না। এর বেশি কিছু জানার দরকার হয়নি। জাল বুনতে স্কুল লাগে না। শুটকি শুকাতে স্কুল লাগে না। সংসার চালাতে স্কুল লাগে না।

কিন্তু রুবিকে নিজের মতো দেখতে ভালো লাগে না।

রুবি কি সুফিয়া হবে? সুফিয়ার মতো জাল বুনবে? সুফিয়ার মতো একটা জেলের বউ হবে? সুফিয়ার মতো "গৃহিণী" লেখা থাকবে ভোটার কার্ডে?

সুফিয়া জাল বুনতে বুনতে ভাবে। ভাবনা শেষ হয় না। জালও শেষ হয় না।

রুবি মাঝে মাঝে বলে, "আম্মা, আমিও তো স্কুলে যেতে পারি। সকালে স্কুল শেষ করে দুপুরে তোমাকে সাহায্য করব।"

সুফিয়া চুপ থাকে। চুপ থাকাটাই উত্তর। না। পারবি না। স্কুল সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা। সকাল দশটায় সুফিয়া শুটকি মাচায় দিচ্ছে। সুফিয়ার সাহায্য ছাড়া কে দেবে? তানিয়া? সাত বছরের মেয়ে?

একদিন রুবি কাঁদল। চুপচাপ। সুফিয়ার সামনে না। পেছনে। সুফিয়া দেখেছে। কিছু বলেনি। কী বলবে? "কাঁদিস না?" কাঁদিস না বললে কান্না থামে না। "স্কুলে যা?" স্কুলে পাঠালে সংসার থামবে।

সুফিয়ার মা-ও জাল বুনত। সুফিয়ার নানিও। তিন প্রজন্মের নারী, তিন প্রজন্মের জাল, তিন প্রজন্মের অদৃশ্যতা। চতুর্থ প্রজন্ম রুবি। রুবিও কি জাল বুনবে? পঞ্চম প্রজন্ম রুবির মেয়ে? ষষ্ঠ? কোথায় থামবে এই জাল?

জাল থামে না। জাল ছিঁড়ে, আবার জোড়া লাগে। মাছ ধরার জাল এমনই। মানুষ ধরার জালও।

শুটকি মাছের গন্ধ।

জেলেপল্লিতে সবসময় শুটকির গন্ধ। মাছ ধরে এনে পরিষ্কার করে, লবণ মাখিয়ে, বাঁশের মাচায় রোদে শুকায়। এই কাজটা মেয়েদের। পুরুষরা মাছ ধরে আনে। মেয়েরা কাটে, পরিষ্কার করে, লবণ মাখায়, শুকায়, প্যাকেট করে, বিক্রি করে।

পুরুষ ধরে। নারী বাকি সব করে।

কিন্তু দাম? দাম পুরুষ পায়। ট্রলারে যারা যায়, তারা ভাগ পায়। মালিক পঞ্চাশ শতাংশ। বাকি পঞ্চাশ ড্রাইভার আর জাল টানার লোকদের মধ্যে ভাগ। আমিনুল মাসে আট-দশ হাজার পায়। এটা পরিবারের "আয়।"

সুফিয়ার শুটকি বিক্রি? মাসে তিন-চার হাজার। জাল মেরামত? মাসে পাঁচ-ছয় হাজার। মোট আট-দশ হাজার। আমিনুলের সমান। কিন্তু সুফিয়ার আয় কেউ গোনে না। সুফিয়ার আয় পরিবারের হিসেবে আসে না। সুফিয়ার আয় "সাহায্য।"

সরকারি জরিপে জেলে পরিবারের আয় জিজ্ঞেস করলে আমিনুল বলে, "আট-দশ হাজার।" সুফিয়ার কথা বলে না। সুফিয়ার আয় অদৃশ্য। সুফিয়ার শ্রম অদৃশ্য। সুফিয়া অদৃশ্য।

বিকেল। সমুদ্রে জোয়ার আসছে। ছোট তানিয়া সৈকতে খেলছে। রুবি শুটকি তুলছে মাচা থেকে। রোদ কমে গেছে, আর শুকাবে না আজ।

সুফিয়া বসে আছে ঘরের দাওয়ায়। হাতে জাল। আঙুলে ছোট ছোট কাটা। সুতার ঘর্ষণে চামড়া ছিলে গেছে। ডান হাতের তর্জনী বাঁকা, ছোটবেলা থেকে জাল বুনতে বুনতে বাঁকা হয়ে গেছে। আর সোজা হবে না।

পাশের ঘরের লায়লা এলো। লায়লাও জেলের বউ। লায়লার স্বামীও সমুদ্রে।

"খবর শুনছ? মনপুরায় একটা ট্রলার ডুবেছে।"

সুফিয়ার হাত থামল। "কোন ট্রলার?"

"জানি না। নামটা শুনিনি।"

সুফিয়া উঠল। পাড়ার মোড়ে একটা দোকান, সেখানে টিভি আছে। গেল। টিভিতে খবর দেখাচ্ছে। ট্রলার ডুবেছে। তিনজন নিখোঁজ। ট্রলারের নাম বলল। আমিনুলের ট্রলার না।

সুফিয়া ফিরে এলো। বসল। জাল তুলল। আবার সুই, আবার সুতা, আবার গিঁট।

এই অপেক্ষা প্রতিদিনের। আমিনুল যেদিন সমুদ্রে যায়, সেদিন থেকে ফেরার দিন পর্যন্ত সুফিয়ার বুকে একটা পাথর থাকে। ভারী পাথর। পাথরটা কখনো নামে না। আমিনুল ফিরলে হালকা হয়। আবার গেলে আবার ভারী হয়।

জেলের বউয়ের জীবন দুটো ভাগে ভাগ। স্বামী ঘরে, স্বামী সমুদ্রে। স্বামী ঘরে থাকলে কাজ আছে। স্বামী সমুদ্রে থাকলে কাজ আছে আর ভয় আছে।

কাজ সবসময় আছে। বিশ্রাম কোথাও নেই।

সুফিয়া একবার আমিনুলকে বলেছিল, "আমিও তো কাজ করি। আমার কাজের দাম কত?"

আমিনুল হেসেছিল। "তুমি তো ঘরে থাকো। ঘরে থাকলেও তো এই কাজ করতে। এটা তো কাজ না, এটা সংসার।"

সংসার। কাজ না। রান্না কাজ না। বাচ্চা পালা কাজ না। জাল বোনা কাজ না। শুটকি শুকানো কাজ না। বিক্রি কাজ না। সব "সংসার।" সংসারের কোনো মজুরি নেই। সংসারের কোনো ছুটি নেই। সংসারের কোনো অবসর নেই।

আমিনুল খারাপ মানুষ না। আমিনুল ভালো মানুষ। আমিনুল সুফিয়াকে মারে না। অনেক জেলে বউকে মারে। আমিনুল মারে না। আমিনুল সুফিয়াকে ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসা আর স্বীকৃতি আলাদা জিনিস। আমিনুল সুফিয়াকে ভালোবাসে, কিন্তু সুফিয়ার শ্রমকে দেখে না। দেখতে পারে না। কারণ দেখতে শেখেনি। আমিনুলের বাবাও দেখতে পারত না। তার আগেও কেউ পারত না।

অন্ধত্ব বংশানুক্রমিক।

রাত। তানিয়া ঘুমিয়ে গেছে। রুবি পাশে শুয়ে আছে, ঘুমায়নি। সোহেল বারান্দায় বসে আকাশ দেখছে।

সুফিয়া হারিকেনের আলোতে আরেকটা জাল ধরল। রাতেও বোনে। দিনের আলোয় ভালো দেখা যায়, কিন্তু দিনে অন্য কাজ থাকে। রান্না, ধোয়া, শুটকি। জাল বোনার একমাত্র নিরিবিলি সময় রাত।

হারিকেনের আলো কমে আসছে। কেরোসিন শেষ হয়ে আসছে। আরেকটু পরে অন্ধকার হবে। অন্ধকারে জাল বোনা যায় না। চোখে দেখতে হয়। ফুটো দেখতে হয়। অন্ধকারে ফুটো দেখা যায় না।

কিন্তু সুফিয়া পারে। আঙুল দিয়ে অনুভব করে কোথায় সুতা ছেঁড়া। আঙুলের ডগায় চোখ আছে তার। বিশ বছর ধরে জাল বুনছে। প্রথমে চোখে দেখত। এখন হাতে দেখে।

হারিকেন নিভল। অন্ধকার।

সুফিয়া জাল বুনছে। অন্ধকারে।

রুবি বলল, "আম্মা, ঘুমাও।"

"একটু পরে।"

সুই চলছে। সুতা চলছে। গিঁট পড়ছে। অন্ধকারে।

বাইরে কুকুর ডাকছে। জেলেপল্লিতে অনেক কুকুর। মাছের গন্ধে আসে। শুটকি চুরি করে। সুফিয়া লাঠি দিয়ে তাড়ায়। এটাও সুফিয়ার কাজ।

সোহেল ভেতর থেকে বলল, "আম্মা, কাল পরীক্ষা। বই কোথায়?"

"আলমারিতে দেখ।"

"পাইতেছি না।"

সুফিয়া উঠল। ঘরে গেল। বই খুঁজে দিল। সোহেলকে বসিয়ে দিল। মোমবাতি জ্বালাল। সোহেল পড়তে বসল। সুফিয়া ফিরে এলো। দাওয়ায়। জাল তুলল।

সোহেল পড়ছে। মোমবাতির আলোয়। সুফিয়া জাল বুনছে। অন্ধকারে। একজন পড়ছে যাতে জীবন বদলায়। আরেকজন বুনছে যাতে জীবন চলে। এই দুটোর মধ্যে একটা তফাৎ আছে যেটা কেউ দেখে না।

সমুদ্রের শব্দ আসছে। ঢেউ ভাঙছে তীরে। একটানা শব্দ। এই শব্দ শুনে সুফিয়া বড় হয়েছে। এই শব্দ শুনে সুফিয়া বুড়ো হচ্ছে। এই শব্দ একদিন সুফিয়ার কানে পৌঁছাবে না। সেদিন সুফিয়া থাকবে না। কিন্তু সমুদ্র থাকবে। জাল থাকবে। আরেকটা সুফিয়া বসে থাকবে, অন্ধকারে, জাল বুনবে।

কারণ মাছ ধরতে জাল লাগে। জাল বুনতে একটা নারী লাগে। নারীটাকে কেউ দেখে না।

জাল দেখে। মাছ দেখে। জেলে দেখে। নারীকে দেখে না।