গৃহকর্মী
একই বাড়ি, দুটো পৃথিবী
১
শিউলি ব্যাগ ধরে আছে।
তিনটা ব্যাগ। নীল, লাল, সবুজ। তিনটা বাচ্চার তিনটা স্কুলব্যাগ। বাচ্চাগুলো সিঁড়ি দিয়ে নামছে। শিউলি দরজায় দাঁড়িয়ে ব্যাগ ধরে আছে। বাচ্চারা নেমে এলে ব্যাগ দেবে। বাচ্চারা গাড়িতে উঠবে। ড্রাইভার স্কুলে নিয়ে যাবে।
বাচ্চাগুলোর বয়স এগারো, নয়, সাত। শিউলির বয়স বারো।
একই বয়স। দুটো পৃথিবী।
গুলশানের বাড়ি। চার তলা। চারটা বেডরুম। দুটো গাড়ি। একটা বাগান। বাগানে একটা দোলনা। দোলনায় বাচ্চারা খেলে। শিউলি দোলনায় বসে না। শিউলি দোলনার নিচের ঘাস কাটে।
স্যার অফিসে যান। ম্যাডাম পার্লারে যান। বাচ্চারা স্কুলে যায়। শিউলি কোথাও যায় না। শিউলি থাকে।
সকাল পাঁচটায় ওঠে। ঘর ঝাড়ু দেয়। মোছে। রান্নাঘর পরিষ্কার করে। চা বানায়। স্যারের চা। ম্যাডামের চা। বাচ্চাদের দুধ গরম করে। নাস্তা বানায়। পরোটা, ডিম, সবজি। বাচ্চাদের খাওয়ায়। স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে দেয়। জুতা পালিশ করে। ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করে।
তারপর বাসন ধোয়া। কাপড় ধোয়া। মেশিনে কাপড় দেওয়া। মেশিন থেকে বের করে শুকাতে দেওয়া। ঘর গোছানো। বিছানা গোছানো। বাথরুম পরিষ্কার করা।
দুপুরে রান্না। ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি। ম্যাডাম বলে কী রান্না করতে হবে। শিউলি করে। শিউলি রান্না শিখেছে এই বাড়িতে এসে। গ্রামে সে রান্না জানত না। গ্রামে সে খেলত।
বিকেলে বাচ্চারা স্কুল থেকে ফেরে। নাস্তা দেয় শিউলি। বাচ্চারা টিভি দেখে। শিউলি ইস্ত্রি করে।
রাতে আবার রান্না। খাওয়া শেষে বাসন ধোয়া। রান্নাঘর পরিষ্কার করা। রাত এগারোটায় শেষ হয়।
২
শিউলি ঘুমায় ডাইনিং টেবিলের নিচে।
একটা পাতলা তোশক। একটা বালিশ। একটা কাঁথা। ডাইনিং টেবিলটা বড়, আট চেয়ারের। নিচে জায়গা আছে। শিউলির শরীর ছোট, ঢুকে যায়। কিন্তু পা সোজা করতে পারে না। গুটিশুটি হয়ে ঘুমায়।
রাতে যদি কারো পানি লাগে, ম্যাডাম ডাকে। "শিউলি, পানি দে।" শিউলি ওঠে। পানি দেয়। আবার শোয়।
রাতে যদি বাচ্চা কাঁদে, শিউলি ওঠে। বাচ্চাকে চুপ করায়। ছোট মেয়েটা, সাত বছরের তিশা, মাঝে মাঝে রাতে ভয় পায়। ম্যাডাম বলেছে, "শিউলি, তিশার পাশে শুয়ে থাকবি।" শিউলি তিশার পাশে শোয়। তিশা শিউলিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। তিশার শরীর নরম, পরিষ্কার, সাবানের গন্ধ। শিউলির শরীর শক্ত, রান্নাঘরের ধোঁয়ার গন্ধ।
তিশা ঘুমিয়ে গেলে শিউলি সরে আসে। ডাইনিং টেবিলের নিচে।
শিউলির একটা ঘর নেই এই বাড়িতে। বাড়িতে চারটা বেডরুম, দুটো বাথরুম, একটা ড্রয়িংরুম, একটা ডাইনিংরুম, একটা রান্নাঘর, একটা স্টোররুম। শিউলির জায়গা টেবিলের নিচে। টেবিলের নিচে না থাকলে রান্নাঘরের মেঝেতে। মেঝে ঠান্ডা। শীতকালে কাঁপে।
ম্যাডাম বলে, "আমরা ওকে আশ্রয় দিয়েছি।"
আশ্রয়। ডাইনিং টেবিলের নিচে আশ্রয়।
ম্যাডামের বান্ধবীরা আসে মাঝে মাঝে। চা খায়। গল্প করে। শিউলি চা-নাস্তা দেয়। একদিন একজন বান্ধবী বললেন, "তোমার মেয়েটা কত ভালো।" ম্যাডাম বললেন, "ও আমার মেয়ে না, ও কাজের মেয়ে।" বান্ধবী বললেন, "ও, আচ্ছা।" এরপর শিউলি অদৃশ্য হয়ে গেল। আগে মেয়ে ছিল, এখন "কাজের মেয়ে।" দুটো শব্দ: "কাজের" আর "মেয়ে।" মেয়ে হওয়ার আগে কাজ।
৩
শিউলি ভোলা থেকে এসেছে। মা আমেনা। বাবা নেই। ঘূর্ণিঝড়ে মারা গেছে। তিন বছর আগে। শিউলির বয়স তখন নয়।
বাবা মারা যাওয়ার পর আমেনা দিশেহারা। দুটো বাচ্চা। শিউলি আর ছোট ভাই রবিউল। খাওয়ানোর উপায় নেই। আমেনা অন্যের বাড়িতে কাজ করত। দিনে পঞ্চাশ টাকা। দুই বাচ্চা খাওয়ানো যায় না।
পাড়ার একজন বলল, "ঢাকায় পাঠা। ভালো বাড়িতে রাখবে। খাবে, থাকবে, মাসে টাকাও পাবে।"
আমেনা শিউলিকে ঢাকায় পাঠাল। দুই হাজার টাকা মাসে। খাবার আর থাকা ফ্রি। আমেনা প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা পায়। এটা দিয়ে রবিউলকে খাওয়ায়, স্কুলে পাঠায়।
শিউলি দুই বছর ধরে এই বাড়িতে। দুই বছরে একবার বাড়ি গেছে। ঈদে। তিন দিনের জন্য। আমেনা কেঁদেছিল। শিউলি কাঁদেনি। শিউলি ভুলে গেছে কান্না। অথবা শিখেছে লুকাতে।
ম্যাডাম শিউলিকে মারে না। সেটা সত্য। আগের বাড়িতে যেখানে ছিল, সেখানে মারত। হাতা দিয়ে। ঝাড়ু দিয়ে। এই বাড়িতে মারে না। চিৎকার করে। "এভাবে না, ওভাবে কর।" "এটা ঠিক হয়নি।" "আবার কর।"
শিউলি আবার করে। চুপচাপ।
শিউলি একটা জিনিস শিখেছে এই বাড়িতে। চুপ থাকা। গ্রামে শিউলি চুপ ছিল না। গ্রামে সে দৌড়াত, চিৎকার করত, গাছে উঠত, পুকুরে ঝাঁপ দিত। এই বাড়িতে শিউলি চুপ। এই বাড়িতে শিউলি হাঁটে, দৌড়ায় না। কথা বলে, চিৎকার করে না। গাছ নেই ওঠার। পুকুর নেই ঝাঁপ দেওয়ার।
বাগানে একটা আমগাছ আছে। শিউলি গাছটার দিকে তাকায়। ওঠার ইচ্ছে হয়। কিন্তু ওঠে না। ম্যাডাম দেখলে বলবে, "পাগল হয়েছিস? গাছে উঠছিস কেন?"
শিউলি পাগল না। শিউলি বারো বছরের মেয়ে। বারো বছরের মেয়েরা গাছে ওঠে। বারো বছরের মেয়েরা খেলে। বারো বছরের মেয়েরা স্কুলে যায়। বারো বছরের মেয়েরা বান্ধবীদের সাথে হাসে।
শিউলি রান্না করে, ঘর মোছে, বাসন ধোয়, কাপড় ইস্ত্রি করে।
বারো বছর। একই বয়স। দুটো পৃথিবী। একটায় শৈশব আছে। আরেকটায় শৈশব চুরি হয়ে গেছে।
৪
বিকেলে বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরেছে। বড় ছেলে তানভীর, এগারো বছর, টিভি দেখছে। মেজো মেয়ে নিশাত, নয়, ট্যাবলেটে গেম খেলছে। ছোট তিশা রঙ করছে।
শিউলি তানভীরের ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করছে। খোলেনি। আজও খায়নি। রোজই ফেরত আসে। শিউলি টিফিন বক্স ধুয়ে রাখবে। কালকে আবার ভরবে।
তানভীরের বইগুলো টেবিলে রাখল। ইংরেজি বই। অঙ্কের বই। বিজ্ঞানের বই। শিউলি বইয়ের মলাট দেখল। রঙিন ছবি। একটা বইয়ে সৌরজগতের ছবি। গ্রহগুলো গোল, রঙিন, সুন্দর। শিউলি ছবিটা দেখল। কী লেখা আছে পড়তে পারল না। শিউলি বাংলা পড়তে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে। ইংরেজি পড়তে পারে না।
তিশা এসে বলল, "শিউলি, তুই কী দেখছিস?"
"কিছু না।"
"ওটা সোলার সিস্টেম। আমাদের সূর্য আর গ্রহ। এটা পৃথিবী। এটা মঙ্গল। এটা বৃহস্পতি।"
তিশা শিউলিকে শেখাচ্ছে। তিশার বয়স সাত। শিউলির বয়স বারো। সাত বছরের মেয়ে বারো বছরের মেয়েকে শেখাচ্ছে কোনটা পৃথিবী।
শিউলি শুনল। মাথা নাড়ল। তারপর বলল, "তিশা, নাস্তা খাবে?"
তিশা বলল, "হুম। চকলেট কেক বানাও।"
শিউলি রান্নাঘরে গেল।
৫
রাতে স্যার ফিরলেন। ম্যাডাম বললেন, "শিউলির মায়ের ফোন এসেছিল। ওর ভাই অসুস্থ।"
স্যার বললেন, "কী হয়েছে?"
"জ্বর। ডাক্তার দেখাতে হবে। টাকা চায়।"
স্যার কিছু বললেন না। খেতে বসলেন।
শিউলি পরিবেশন করছে। ভাত, ইলিশ মাছের ঝোল, আলু ভর্তা, ডাল, শাক। শিউলি রান্না করেছে। শিউলি পরিবেশন করছে। শিউলি খাবে পরে। বাসন ধোয়ার পরে। রান্নাঘরে বসে। আলাদা থালায়। বাচ্চাদের বাসি ভাত থাকলে সেটা। না থাকলে নতুন ভাত। ডাল। মাঝে মাঝে মাছের কাঁটা। মাংসের হাড়।
স্যার খাওয়া শেষ করে বললেন, "শিউলি, তোর মা-কে বলবি পরের মাসে টাকা পাঠাবো। এই মাসে পাঠানো হয়ে গেছে।"
শিউলি বলল, "জি স্যার।"
পরের মাস। রবিউলের জ্বর পরের মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কি না, সেটা কেউ ভাবল না।
শিউলি বাসন ধুতে ধুতে মায়ের কথা ভাবল। মায়ের মুখটা ঝাপসা হয়ে আসছে। দুই বছরে একবার দেখেছে। তিন দিনের জন্য। মায়ের হাতের ভাত খেয়েছে। মা কেঁদেছে। শিউলি কাঁদেনি।
রবিউলের কথা ভাবল। ছোট ভাই। কত বড় হয়েছে জানে না। ছবি নেই। শিউলির ফোন নেই। ম্যাডামের ফোন আছে। ম্যাডাম মাঝে মাঝে মায়ের সাথে কথা বলতে দেয়। দুই মিনিট। "আম্মা, ভালো আছি। রবিউল কেমন? ভালো? আচ্ছা, রাখি।" দুই মিনিটে কী বলা যায়? কিছু বলা যায় না। শুধু "ভালো আছি" বলা যায়। ভালো না থাকলেও।
ম্যাডাম বলেন, "শিউলি তো আমাদের পরিবারের মতো।"
পরিবারের মতো। পরিবার না। "মতো।" পরিবারের সদস্যরা টেবিলে খায়। শিউলি রান্নাঘরে। পরিবারের সদস্যরা বিছানায় ঘুমায়। শিউলি টেবিলের নিচে। পরিবারের সদস্যদের নাম ডাকে। শিউলিকে "এই" বলে ডাকে। "এই, পানি দে।" "এই, জুতা দে।" "এই, বাসন ধো।"
"মতো" আর "সত্যি" এর মধ্যে একটা সমুদ্র আছে।
৬
রাত সাড়ে এগারোটা। সবাই ঘুমিয়ে গেছে। শিউলি রান্নাঘর মুছছে। মেঝে মুছছে হাঁটু গেড়ে বসে। ন্যাকড়া দিয়ে। কোমর ব্যথা করে। হাত ব্যথা করে। বারো বছরের শরীরে কোমর ব্যথা হওয়ার কথা না। কিন্তু হয়। প্রতিদিন হাঁটু গেড়ে মেঝে মুছলে হয়।
রান্নাঘর শেষ। বাথরুম বাকি। বাথরুম মুছে, টয়লেট পরিষ্কার করে, সব শেষ করে শিউলি ডাইনিং রুমে গেল। টেবিলের নিচে তোশক বিছাল। শুয়ে পড়ল।
ড্রয়িংরুমে একটা ঘড়ি টিকটিক করছে। বড় ঘড়ি। সুন্দর। শিউলি ঘড়ি দেখতে পারে, সময় বলতে পারে। এটুকু শিখেছে।
রাত বারোটা।
কাল সকাল পাঁচটায় উঠতে হবে। পাঁচ ঘণ্টা ঘুম। কখনো কম। রাতে ডাক পড়লে কম।
শিউলি চোখ বন্ধ করল। ঘুম আসছে না। পেটে একটু ক্ষুধা আছে। রাতে ভাত খেয়েছে, কিন্তু কম। বেশি খেলে ম্যাডাম বলে, "এত খাস কেন? শরীর দেখ কত মোটা হয়ে যাচ্ছে।" শিউলি মোটা না। শিউলি হাড্ডিসার। কিন্তু ম্যাডামের চোখে গরিবের খাওয়া সবসময় "বেশি।"
টেবিলের ওপরে কাচের ফুলদানি। ফুলদানিতে প্লাস্টিকের ফুল। শিউলি প্রতিদিন ফুলদানি মোছে। ফুল ধুলোমুক্ত রাখে। প্লাস্টিকের ফুল। আসল ফুলের দরকার নেই এই বাড়িতে। আসল কিছুর দরকার নেই।
শিউলি। শিউলি ফুলের নাম। রাতে ফোটে। সকালে ঝরে যায়। গন্ধ থাকে। ফুলটাকে কেউ দেখে না। শুধু গন্ধ পায়।
কাল সকালে আবার পাঁচটায় উঠবে। আবার ঝাড়ু। আবার মোছা। আবার চা। আবার নাস্তা। আবার ব্যাগ। আবার জুতা। আবার রান্না। আবার বাসন। আবার ইস্ত্রি। আবার রাত। আবার টেবিলের নিচে।
পরশু আবার। তার পরের দিন আবার। পরের মাস আবার। পরের বছর আবার। শিউলি তেরো হবে। চৌদ্দ হবে। পনেরো হবে। তারপর ম্যাডাম বলবে, "শিউলি বড় হয়ে গেছে। আর রাখা যাবে না।" তখন আরেকটা বাড়ি। আরেকটা টেবিলের নিচে। আরেকটা ম্যাডাম। অথবা বিয়ে। কোনো গরিব ছেলের সাথে। তখন নিজের ঘর হবে। নিজের টেবিল হবে। কিন্তু জীবন একই থাকবে। রান্না, ঝাড়ু, মোছা, বাসন। শুধু ম্যাডামের বদলে স্বামী। আদেশদাতা বদলাবে, আদেশ বদলাবে না।
ওরা ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায়। আমি ওদের ব্যাগ বহন করি। একই বাড়ি, দুটো পৃথিবী।