রান্নার বুয়া
যা রান্না করি তার স্বাদ জানি, খাওয়ার অনুমতি নেই
১
জোহরার হাঁটু বলছে আজ বৃষ্টি হবে।
ডাক্তার বলে আর্থ্রাইটিস। জোহরা বলে হাঁটুর ব্যথা। নাম যাই হোক, বৃষ্টির আগে হাঁটু ফুলে যায়, ব্যথা করে, সিঁড়ি ভাঙতে পারে না। জোহরা সিঁড়ি ভাঙে প্রতিদিন। চারটা বাড়ি। চারটা সিঁড়ি। দোতলা, তিনতলা, চারতলা, দোতলা। মোট বারোতলা। প্রতিদিন। ওঠা আর নামা মিলিয়ে চব্বিশতলা।
সকাল ছয়টা। প্রথম বাড়ি। ধানমন্ডি। রহমান সাহেবের বাড়ি। দোতলা। জোহরা সিঁড়ি ভাঙে। ডান হাঁটু, বাঁ হাঁটু, ডান হাঁটু, বাঁ হাঁটু। প্রতিটা ধাপে একটা করে ব্যথা। গুনতে পারে। আটটা ধাপ, আটটা ব্যথা।
রান্নাঘরে ঢুকল। কী রান্না করতে হবে জানে। রহমান সাহেবের বউ আগের রাতে ফোনে বলে দেয়। আজ: মুরগির রোস্ট, পোলাও, সবজি, ডাল, সালাদ। মেহমান আসবে। মেহমান আসলে রান্না বেশি। রান্না বেশি মানে সময় বেশি। সময় বেশি মানে পরের বাড়িতে দেরি। দেরি মানে বকুনি।
জোহরা চুলায় তেল দিল। পেঁয়াজ কাটতে শুরু করল। হাতের ছুরি পুরোনো। ধার নেই। পেঁয়াজ পিছলে যায়। জোহরার হাতে অনেক কাটা দাগ। ছুরির দাগ। পুরোনো। কালচে।
মুরগি কাটল। মশলা বাটল। শিলপাটায়। এই বাড়িতে ব্লেন্ডার আছে, কিন্তু রহমান সাহেবের বউ বলেছেন, "শিলপাটায় বাটা মশলায় স্বাদ বেশি।" শিলপাটায় বাটতে গেলে হাতে জোর লাগে। জোহরার হাতে আর জোর নেই। কিন্তু বাটে।
২
সাড়ে আটটায় প্রথম বাড়ি শেষ। রান্না টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে। রহমান সাহেবের বউ এসে দেখলেন। পোলাও-এর রঙ দেখলেন। মুরগির ঝোল চেখে দেখলেন।
"ঝোলে নুন কম।"
"দিচ্ছি ম্যাডাম।"
নুন দিল। আবার চাখলেন।
"হুম। যা।"
জোহরার পারিশ্রমিক এই বাড়িতে তিন হাজার টাকা। মাসে। দিনে একশো টাকা। আড়াই ঘণ্টার কাজ। ঘণ্টায় চল্লিশ টাকা।
দ্বিতীয় বাড়ি। মোহাম্মদপুর। তিনতলা। সিঁড়ি ভাঙে। হাঁটু কাঁদছে।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে জোহরা হিসেব করে। প্রথম বাড়ি থেকে দ্বিতীয় বাড়ি, বাসে পনেরো মিনিট। দ্বিতীয় থেকে তৃতীয়, রিকশায় দশ মিনিট। তৃতীয় থেকে চতুর্থ, হেঁটে বিশ মিনিট। যাতায়াতে দৈনিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট। বাস ভাড়া, রিকশা ভাড়া, মাসে প্রায় দেড় হাজার। বারো হাজারের মধ্যে দেড় হাজার শুধু কাজে যাওয়া-আসায়। বাকি সাড়ে দশ হাজার।
এই বাড়িতে ভাত, মাছ, ডাল, ভর্তা। সাধারণ রান্না। এক ঘণ্টায় শেষ। এই বাড়ির ম্যাডাম ভালো। চা দেয়। বিস্কুট দেয়। মাঝে মাঝে পুরোনো কাপড় দেয়। জোহরা কাপড়গুলো নিয়ে যায়। পরে। পুরোনো কাপড়েও জোহরার আপত্তি নেই। নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। গত তিন বছরে জোহরা নিজের জন্য একটাও নতুন কাপড় কেনেনি।
তৃতীয় বাড়ি। লালমাটিয়া। চারতলা। লিফট নেই। সিঁড়ি। জোহরা দ্বিতীয় তলায় থামল। দাঁড়াল। নিশ্বাস নিল। হাঁটু ধরল। তৃতীয় তলায় উঠল। আবার থামল। চতুর্থ তলায় পৌঁছাতে পাঁচ মিনিট লাগল।
এই বাড়ির মেনু: মটন বিরিয়ানি। কাচ্চি। মাংস ম্যারিনেট করতে হবে। দই, মশলা, পেঁয়াজ বেরেস্তা। ভাত আলাদা সেদ্ধ। তারপর স্তরে স্তরে সাজিয়ে দমে দিতে হবে। জোহরার কাচ্চি বিখ্যাত। এই পাড়ায় জোহরার কাচ্চির কথা সবাই জানে। "জোহরা বুয়ার হাতের কাচ্চি খেয়েছেন? অসাধারণ।"
অসাধারণ কাচ্চি। তিন হাজার টাকা মাসে।
জোহরা কাচ্চি রান্না করছে। ঘরে মাংসের গন্ধ। ঘি, জাফরান, এলাচ। জোহরার নাকে এই গন্ধ প্রতিদিন। জোহরার জিভে এই স্বাদ কোনোদিন না।
আমি যা রান্না করি, তার স্বাদ আমি জানি। কিন্তু খাওয়ার অনুমতি নেই।
খাওয়ার অনুমতি শব্দটা ভুল। কেউ নিষেধ করেনি সরাসরি। কিন্তু অলিখিত নিয়ম আছে। রান্নার বুয়া রান্না করবে, খাবে না। খেলে "ঠিক দেখায় না।" মেহমানদের সামনে "ঠিক দেখায় না।" বাড়ির লোক দেখলে "ঠিক দেখায় না।"
জোহরার ঘরে রান্না হয় ডাল-ভাত। মাঝে মাঝে ডিম। মাঝে মাঝে ছোট মাছ। মটন? মটনের কেজি আটশো টাকা। জোহরার এক মাসের আয় বারো হাজার। মটন কেনার সামর্থ্য নেই।
৩
চতুর্থ বাড়ি। আবার ধানমন্ডি। দোতলা। বিকেল দুইটা। জোহরার শেষ বাড়ি।
এই বাড়িতে ম্যাডাম তরুণী। ত্রিশ বছর। স্বামী ব্যবসায়ী। একটা বাচ্চা, তিন বছর।
জোহরা রান্নাঘরে ঢুকল। মেঝেতে বসতে গেল। হাঁটু ভাঁজ হলো না। ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল। পাশে একটা নিচু স্টুল ছিল। বসল।
ম্যাডাম দেখলেন।
"জোহরা, চেয়ারে বসে রান্না করলে ঠিক হয় না।"
জোহরা স্টুল থেকে উঠল। দাঁড়াল। হাঁটু চিৎকার করছে। জোহরা চিৎকার করছে না। দাঁড়িয়ে পেঁয়াজ কাটতে লাগল। দাঁড়িয়ে তরকারি নাড়তে লাগল। দাঁড়িয়ে ভাত ছাঁকতে লাগল।
দাঁড়ানো। বাংলাদেশের রান্নাঘর মেঝেতে বসে রান্নার জন্য তৈরি। নিচু চুলা। নিচু সিঙ্ক। নিচু তাক। কিন্তু জোহরা আর নিচু হতে পারে না। হাঁটু অনুমতি দেয় না। দাঁড়ালে কোমরে ব্যথা। বসলে হাঁটুতে ব্যথা। মাঝখানে কোনো অবস্থান নেই যেখানে ব্যথা নেই।
পনেরো বছর ধরে চারটা বাড়িতে রান্না করছে জোহরা। তার আগে নিজের বাড়িতে। মোট পঁচিশ বছর। প্রতিদিন মেঝেতে বসে। প্রতিদিন হাঁটু ভাঁজ করে। পঁচিশ বছরে হাঁটুর তরুণাস্থি শেষ। হাড়ে হাড়ে ঘষা লাগছে। ডাক্তার বলেছে, "হাঁটু বদলাতে হবে।" হাঁটু বদলানোর খরচ তিন লাখ টাকা। জোহরার দুই বছরের আয়।
৪
জোহরার স্বামী মজিদ রিকশা চালাত। পাঁচ বছর আগে স্ট্রোক হয়েছে। ডান দিক অবশ। হাঁটতে পারে না ঠিকমতো। কথা জড়িয়ে যায়। রিকশা চালানো বন্ধ। এখন ঘরে বসে থাকে। টিভি দেখে। মাঝে মাঝে পাড়ায় বসে। মাঝে মাঝে মসজিদে যায়।
জোহরা একা কামাই করে। বারো হাজার টাকা। চার বাড়ি, তিন হাজার করে। এটা দিয়ে ভাড়া পাঁচ হাজার। মজিদের ওষুধ দুই হাজার। বাকি পাঁচ হাজারে খাওয়া, কাপড়, গ্যাস, বিদ্যুৎ। মাসের শেষে শূন্য। মাঝে মাঝে মাইনাস।
দুই ছেলে। বড় ছেলে মিজানুর, রাজমিস্ত্রি। দেশে নেই, সৌদি আরবে। প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠায়। কখনো পাঁচ হাজার, কখনো তিন। কখনো পাঠায় না। সৌদিতে কাজ না থাকলে পাঠাতে পারে না।
ছোট ছেলে সাজু, অটো চালায়। নিজের সংসার আলাদা। সাজু মাঝে মাঝে আসে। চাল আনে। তেল আনে। এটুকুই।
জোহরার মেয়ে একটা ছিল। পারভীন। বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে থাকে। পারভীন মাঝে মাঝে ফোন করে। "আম্মা, কেমন আছ?" জোহরা বলে, "আছি।" আর কী বলবে?
৫
বিকেল তিনটা। চতুর্থ বাড়ির রান্না শেষ। জোহরা বেরোল। রাস্তায় হাঁটছে। ধানমন্ডি লেক রোড। পাশ দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। মানুষ যাচ্ছে। কেউ জোহরাকে দেখছে না। জোহরা অদৃশ্য। রান্নাঘরের বাইরে জোহরার কোনো অস্তিত্ব নেই।
বাসে উঠল। মিরপুরে যাবে। বাসে সিট নেই। দাঁড়িয়ে আছে। হাঁটু কাঁপছে। পাশের একজন তরুণ সিটে বসে ফোনে গেম খেলছে। জোহরার দিকে তাকায়নি। জোহরা দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়াতেও ব্যথা।
মিরপুরে নামল। বাসা। একটা ঘর। টিনের ছাদ। দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ। মজিদ বিছানায় বসে টিভি দেখছে। ক্রিকেট। বাংলাদেশ খেলছে।
"খাইছ?" জোহরা জিজ্ঞেস করল।
"না।"
রান্না করতে হবে। আবার। পঞ্চম রান্না। চার বাড়িতে চার বার, নিজের ঘরে পঞ্চম বার। কিন্তু এই রান্না আলাদা। এই রান্নায় মটন নেই, পোলাও নেই, বিরিয়ানি নেই। ডাল আছে। ভাত আছে। একটুকরো শুকনো মরিচ ভাজা। ব্যস।
জোহরা চুলায় ডাল বসাল। চাল ধুল। হাঁটু ভাঁজ করে মেঝেতে বসল। নিজের ঘরে কেউ বলে না "চেয়ারে বসলে ঠিক হয় না।" নিজের ঘরে জোহরা যেভাবে খুশি বসতে পারে। কিন্তু অভ্যাস। মেঝেতেই বসে।
ডাল ফুটছে। বুদবুদ উঠছে। জোহরা ডালে হলুদ দিল, নুন দিল, একটু তেল দিল। এটুকুই। চার বাড়িতে জোহরা পেঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরা, ধনে, গরম মশলা, দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, জাফরান দেয়। নিজের ঘরে হলুদ আর নুন।
একদিন লালমাটিয়ার ম্যাডাম বলেছিলেন, "জোহরা, তুমি তো রান্না শিখিয়ে দিতে পারো। ক্লাস করো। ইউটিউবে। বড় বড় শেফরা করে।"
জোহরা হেসেছিল। "ইউটিউব কী ম্যাডাম?"
"ভিডিও বানাবে। মানুষ দেখবে। তোমার বিরিয়ানির রেসিপি দাও। লাখ লাখ ভিউ হবে।"
জোহরা ভাবল। ভিডিও বানাবে কীভাবে? ফোন নেই। ইন্টারনেট নেই। ক্যামেরা নেই। যে হাত দিয়ে বিরিয়ানি বানায়, সেই হাত ক্যামেরা ধরবে কীভাবে? যে মুখ সারাদিন চুলার ধোঁয়ায় কালো হয়ে থাকে, সেই মুখ ক্যামেরায় দেখাবে কীভাবে?
জোহরা বলেছিল, "না ম্যাডাম, আমার দ্বারা হবে না।"
ম্যাডাম আর বলেননি। ম্যাডামরা এভাবেই বলে। হালকা। পরামর্শ। যেন জোহরার জীবন বদলানো একটা রেসিপি ভিডিওর ব্যাপার। যেন দারিদ্র্য একটা সমস্যা যেটা একটু উদ্যম নিলেই সমাধান হয়ে যায়। ম্যাডামরা বোঝে না, জোহরার হাঁটু ভাঙা। জোহরার সময় নেই। জোহরার শক্তি নেই। জোহরার কিছু নেই, শুধু দুটো হাত আছে আর চারটা রান্নাঘর আছে।
মজিদ খেতে বসল। ডাল-ভাত। চুপচাপ খাচ্ছে। জোহরাও বসল। একসাথে খাচ্ছে। নীরব। কথা বলার শক্তি নেই। সারাদিনের কথা সারাদিনে শেষ। রাতে কথা থাকে না।
৬
রাতে মজিদ খেয়ে শুয়ে পড়ল। জোহরা বাসন ধুল। পঞ্চমবার। মেঝে মুছল। চুলা পরিষ্কার করল।
তারপর বসল। চেয়ারে। একটা ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার। হাঁটু সোজা করে বসল। ব্যথা কমল একটু।
রাত নয়টা। কাল সকাল ছয়টায় আবার শুরু। প্রথম বাড়ি। সিঁড়ি। রান্না। দ্বিতীয় বাড়ি। সিঁড়ি। রান্না। তৃতীয় বাড়ি। সিঁড়ি। রান্না। চতুর্থ বাড়ি। সিঁড়ি। রান্না। নিজের ঘর। রান্না।
প্রতিদিন একই। গত পনেরো বছর একই। আগামী কত বছর একই থাকবে, জোহরা জানে না। হাঁটু যতদিন চলে। হাঁটু থামলে জোহরা থামবে। হাঁটু থামলে আয় থামবে। আয় থামলে মজিদের ওষুধ থামবে। ওষুধ থামলে মজিদ থামবে।
সব কিছু জোহরার হাঁটুর ওপর দাঁড়িয়ে।
জোহরা একবার মজিদকে বলেছিল, "আমার হাঁটু আর পারে না।"
মজিদ বলেছিল, "তাহলে কী করবে?"
"জানি না।"
"ছেলেদের বলো।"
মিজানুর সৌদিতে। ফোন করল। "আম্মা, আমি তো পাঠাই যা পারি। তুমি একটু কম বাড়িতে যাও। দুটো বাড়িতে কাজ করো।"
দুটো বাড়ি মানে ছয় হাজার। ছয় হাজারে সংসার চলবে না। মজিদের ওষুধই দুই হাজার।
সাজু বলল, "আম্মা, আমার সাথে চলো। আমার বউ দেখবে।"
সাজুর বউ সংসার সামলায়। সাজুর দুটো বাচ্চা। ছোট ঘর। জোহরা গেলে আরো সংকীর্ণ হবে। জোহরা বোঝা হবে। জোহরা কারো বোঝা হতে চায় না। জোহরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু পায়ে হাঁটু আছে। হাঁটু ভাঙা।
জোহরা হাঁটুতে হাত রাখল। গরম। ফোলা। ভেতরে কিছু একটা ক্ষয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন একটু একটু করে। তরুণাস্থি ক্ষয়ে যাচ্ছে। হাড় ক্ষয়ে যাচ্ছে। জোহরা ক্ষয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কাল সকালে উঠবে। ছয়টায়। প্রথম বাড়িতে যাবে। সিঁড়ি ভাঙবে। আটটা ধাপ। আটটা ব্যথা।
কারণ মটন বিরিয়ানি রান্না করতে হবে। পোলাও রান্না করতে হবে। রোস্ট রান্না করতে হবে। যেসব খাবারের স্বাদ জোহরা জানে, কিন্তু জোহরার জিভে কোনোদিন ওঠেনি।
রান্নাঘরে জোহরা শিল্পী। রান্নাঘরের বাইরে জোহরা কেউ না।