সিকিউরিটি গার্ড
দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। এখন ধনীদের গাড়ি পাহারা দিই
১
রাত বারোটা। গুলশানের একটা আঠারো তলা টাওয়ার। নাম "গ্রিন প্যারাডাইস।" বিল্ডিংয়ের সামনে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে আফজাল।
ইউনিফর্ম: ধূসর শার্ট, কালো প্যান্ট, কাঁধে এপলেট। বুকে নেমপ্লেট। লেখা: "আফজাল হোসেন, সিকিউরিটি।" নেমপ্লেটের পিন ভাঙা, সেফটিপিন দিয়ে আটকানো। জুতো কালো, পুরনো, গোড়ালি ক্ষয়ে গেছে। বেল্টে একটা টর্চ। টর্চের ব্যাটারি দুর্বল, আলো হলুদ।
আফজাল বয়স বায়ান্ন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছে ছয় বছর আগে। হাবিলদার ছিল। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে। তেইশ বছর চাকরি। পার্বত্য চট্টগ্রামে পোস্টিং ছিল তিন বার। একবার গুলি লেগেছিল বাঁ পায়ে। এখনো হাঁটলে একটু খোঁড়ায়। বেশিক্ষণ দাঁড়ালে ব্যথা করে।
পেনশন পায় মাসে সাত হাজার টাকা। সিকিউরিটির চাকরিতে পায় দশ হাজার। মোট সতেরো হাজার। ঢাকায় একটা ঘর ভাড়া করে থাকে, টিনের চাল, মিরপুরের ভেতরে। ভাড়া পাঁচ হাজার। বাকি বারো হাজারে বউ, দুই ছেলে, মা।
রাত বারোটায় আফজাল বসে আছে। বিল্ডিংয়ের লবিতে মার্বেল মেঝে। ঝাড়বাতি। কৃত্রিম ফুলের টব। এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ। আফজালের চেয়ার লবির বাইরে, গেটের পাশে। ভেতরে বসার অনুমতি নেই। ভেতরে এসি আছে। বাইরে মশা আছে।
২
এই বিল্ডিংয়ে বত্রিশটা ফ্ল্যাট। প্রতিটার দাম দুই থেকে পাঁচ কোটি। মোট বিল্ডিংয়ের দাম কত? আফজাল একদিন হিসাব করেছিল। বত্রিশ গুণ গড়ে তিন কোটি। ছিয়ানব্বই কোটি। প্রায় একশো কোটি টাকার সম্পত্তি।
আফজাল এই একশো কোটি টাকার সম্পত্তি পাহারা দেয়। মাসে দশ হাজার টাকায়।
বিল্ডিংয়ের বাসিন্দাদের নাম আফজাল সব জানে। 2A: চৌধুরী সাহেব, গার্মেন্টস মালিক। 3B: ডক্টর আলম, হার্ট স্পেশালিস্ট। 5C: মিসেস রহমান, স্বামী সিঙ্গাপুরে থাকে, একা থাকে, রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খায়। 7B: ফারুক সাহেব, ব্যবসায়ী, প্রতি শুক্রবার রাতে মদ খেয়ে ফেরে, লিফটে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়, পায়ে জুতো থাকে না কখনো কখনো। 12A: একটা মেয়ে, নাম জানে না, রাত দুইটায় মাঝে মাঝে কান্নার আওয়াজ আসে জানালা দিয়ে। 4C: নবদম্পতি, প্রতি রাতে ঝগড়া, থালাবাটি ভাঙার শব্দ, তারপর নীরবতা।
আফজাল সব শোনে। সব দেখে। কিন্তু কিছু বলে না। সিকিউরিটি গার্ডের কাজ দেখা, শোনা, আর চুপ থাকা। কথা বলা তার কাজ না। কথা বললে চাকরি যায়।
বাসিন্দারা আফজালের নাম জানে না। তারা বলে "গার্ড।" "গার্ড, গেট খোলো।" "গার্ড, পার্সেল রাখো।" "গার্ড, গাড়ি ঢোকাও।" আফজাল একটা পদ। একটা মানুষ না।
৩
রাত একটা। লবি ফাঁকা। রাস্তাও ফাঁকা। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। গুলশানের কুকুরগুলো মোটা, ভালো খায়, বাসিন্দাদের ফেলা খাবার পায়। আফজালের চেয়ে ভালো খায়।
আফজাল টর্চ জ্বালায়। বিল্ডিংয়ের চারপাশে একবার হেঁটে আসে। এটা রুটিন। প্রতি ঘণ্টায় একবার রাউন্ড। পেছনের গেট চেক। পার্কিং চেক। ছাদের দরজা চেক। ফায়ার এক্সিট চেক। সব ঠিক আছে। সবসময় ঠিক থাকে। কিছু হয় না কোনোদিন। কিন্তু রাউন্ড দিতে হয়। কারণ ম্যানেজার বলেছে দিতে হয়।
পার্কিংয়ে গাড়ি গোনে আফজাল। বত্রিশটা ফ্ল্যাট, গাড়ি আটচল্লিশটা। কোনো ফ্ল্যাটে দুইটা, তিনটা। প্রতিটা গাড়ির দাম কত? আফজাল জানে না সব গাড়ির দাম। কিন্তু 2A-এর চৌধুরী সাহেবের সাদা ল্যান্ড ক্রুজারটা জানে। এক কোটি বিশ লাখ। ড্রাইভার বলেছিল একদিন। গর্ব করে বলেছিল, যেন গাড়ি তার।
এক কোটি বিশ লাখ। আফজালের দশ হাজার টাকা বেতনে এই গাড়ি কিনতে কত মাস লাগবে? আফজাল হিসাব করে। বারো হাজার মাস। এক হাজার বছর।
আফজাল গাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। টর্চের আলো পড়ে গাড়ির চকচকে বডিতে। আফজালের ছায়া পড়ে গাড়ির ওপর। ছায়াটা বিকৃত, লম্বা, চ্যাপ্টা। গাড়ির বডি এত মসৃণ যে ছায়াও পরিষ্কার দেখা যায়।
৪
রাত দুইটা। ঘুম আসছে। কিন্তু ঘুমানো যাবে না। ম্যানেজার মাঝে মাঝে CCTV চেক করে। গার্ড ঘুমালে জরিমানা। প্রথমবার পাঁচশো টাকা কাটে। দ্বিতীয়বার এক হাজার। তৃতীয়বার চাকরি শেষ।
আফজাল চা বানায়। গেটের পাশে একটা ইলেকট্রিক কেটলি। কেটলিটা তার নিজের কেনা। কোম্পানি দেয়নি। চা-পাতাও নিজের। দুধ নেই। চিনি আছে, একটু বেশি দেয়। মিষ্টি চা ঘুম তাড়ায়।
চা খেতে খেতে আফজাল ভাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা ভাবে। রাতের পাহারার কথা ভাবে। সেখানেও রাতে জেগে থাকতে হতো। কিন্তু সেখানে রাইফেল ছিল হাতে। সেখানে ইউনিফর্মের মর্যাদা ছিল। সেখানে "হাবিলদার আফজাল" বলে ডাকত সবাই। এখানে "গার্ড।"
সেনাবাহিনীতে শীতের রাতে বান্দরবানের পাহাড়ে পাহারা দিতো। কুয়াশা এত ঘন যে দশ ফুট দূরেও দেখা যেত না। হাতে রাইফেল, কানে সতর্কতা, চোখে অন্ধকার। সেই অন্ধকার আর এই অন্ধকার এক না। সেই অন্ধকারে দেশ ছিল। এই অন্ধকারে পার্কিং আছে।
দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। এখন ধনীদের গাড়ি পাহারা দিই।
৫
রাত তিনটা। একটা ইঁদুর লবির ভেতর দিয়ে দৌড়ে গেল। মার্বেল মেঝেতে তার নখের শব্দ হলো। খটখট। ইঁদুরটা ডাস্টবিনের দিকে গেল। ডাস্টবিনে আজকের পার্টির বাকি খাবার আছে। 3B-এর ডক্টর আলমের মেয়ের জন্মদিন ছিল। কেক, বিরিয়ানি, চিকেন ফ্রাই। বাকি খাবার ডাস্টবিনে। ইঁদুর ভোজ করবে।
আফজাল ইঁদুরটা দেখে। তাড়ায় না। ইঁদুরটাও এই বিল্ডিংয়ে থাকে। ইঁদুরটাও কারো কাছে দৃশ্যমান না। আফজাল আর ইঁদুর, রাত তিনটায়, দুজনেই এই বিল্ডিংয়ের সাক্ষী। বাকি সবাই ঘুমিয়ে।
আফজাল এই বিল্ডিংয়ের রাতের জীবন জানে। অন্য কেউ জানে না। দিনের জীবন সবাই দেখে। রাতের জীবন শুধু গার্ড দেখে।
7B-এর ফারুক সাহেব আজ রাত একটায় ফিরেছে। পা টলমল। ড্রাইভার ধরে নামিয়েছে গাড়ি থেকে। আফজাল লিফটের বোতাম টিপে দিয়েছে। ফারুক সাহেব আফজালের দিকে তাকায়নি। কথা বলেনি। কিন্তু আফজাল টের পেয়েছে মদের গন্ধ, আর চোখের জলের দাগ। ফারুক সাহেবও কাঁদে। ধনীরাও কাঁদে। পার্থক্য হলো, ধনীরা এসি ঘরে কাঁদে। গরিবরা রাস্তায়।
12A থেকে আবার কান্নার আওয়াজ। ক্ষীণ। দেয়াল ভেদ করে আসে না, জানালা দিয়ে আসে। আফজাল শোনে। কে কাঁদে? কেন কাঁদে? জানে না। জানার দরকার নেই। জানলেও কিছু করতে পারবে না। গার্ড কিছু করতে পারে না। গার্ড শুধু দাঁড়ায়।
৬
ভোর পাঁচটা। আজান হলো। আফজাল গেটের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে। জায়নামাজ নেই। একটা পুরনো তোয়ালে বিছিয়ে দেয় মেঝেতে। নামাজে কী চায়? কিছু চায় না। অভ্যাস। সেনাবাহিনীতে ফজরের নামাজ বাধ্যতামূলক ছিল। এখনো পড়ে। শরীর মনে রাখে।
ছটায় শিফট বদল। দিনের গার্ড আসবে। মতিন। মতিনের বয়স পঁচিশ। গ্রাম থেকে এসেছে। আফজাল মতিনকে বলে, "কিছু হয়নি।" মতিন বলে, "জি ভাই।" এটুকুই হ্যান্ডওভার।
আফজাল হাঁটতে শুরু করে। বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত আধা কিলোমিটার। তারপর বাস, মিরপুর পর্যন্ত। ভাড়া চল্লিশ টাকা। দিনে আশি। মাসে আড়াই হাজার। বেতনের এক-চতুর্থাংশ যায় যাতায়াতে।
সকালের আলো পড়ছে রাস্তায়। গুলশানের রাস্তা পরিষ্কার। ফুটপাত টাইলস বসানো। গাছ ছাঁটা। ড্রেন ঢাকা। এখান থেকে মিরপুরে গেলে মনে হয় অন্য দেশ। মিরপুরে ড্রেন খোলা, রাস্তা ভাঙা, ফুটপাত দখল।
আফজাল দুই দেশে থাকে। রাতে গুলশানে, দিনে মিরপুরে। রাতে সে একশো কোটি টাকার পাহারাদার। দিনে সে পাঁচ হাজার টাকার ঘরের ভাড়াটে।
৭
বাসায় ফিরে আফজাল ভাত খায়। বউ রুবিনা বাড়ি ফেরে। রুবিনা রাতে ঘুমায়, আফজাল রাতে কাজ করে। তারা একই ঘরে থাকে, কিন্তু একই সময়ে জাগে না। আফজাল ফিরলে রুবিনা উঠেছে, ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। আফজাল খেয়ে শুয়ে পড়ে। বিকালে ওঠে। তখন রুবিনা রান্না করছে। সন্ধ্যায় আফজাল আবার বের হয়।
বিয়ের পর থেকে এই রুটিন। কতদিন একসাথে বসে খেয়েছে? আফজাল গুনতে পারে না। মাসে দুই-তিনদিন ছুটি পায়। সেদিন একসাথে খায়। বাকি দিন ভাতের প্লেট টেবিলে ঢাকা থাকে, আফজাল একা খায়।
বড় ছেলে ফাহিম, মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট ছেলে তানিম, ক্লাস সেভেনে। তানিম জিজ্ঞেস করে, "বাবা, তুমি আর্মিতে ছিলে?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে এখন গার্ড কেন?"
আফজাল উত্তর দেয় না। কী বলবে? পেনশন সাত হাজার, চারজনের সংসার, ঢাকায় থাকতে হয় ছেলেদের স্কুলের জন্য, সাত হাজারে চলে না, তাই গার্ডের চাকরি। এটা বলা সহজ। কিন্তু বললে ছেলের চোখে কী দেখবে? করুণা? লজ্জা? রাগ?
আফজাল বলে, "ঘুমাও।"
৮
একরাতে একটা ঘটনা ঘটল।
রাত আড়াইটা। পার্কিং থেকে একটা শব্দ পেল আফজাল। ধাতব শব্দ। গাড়ির দরজা খোলার শব্দ না। অন্য কিছু। আফজাল টর্চ নিয়ে গেল।
দুজন ছেলে। বয়স কুড়ি-বাইশ। একজন 2A-এর ল্যান্ড ক্রুজারের পাশে দাঁড়িয়ে। হাতে কিছু একটা। স্ক্রু ড্রাইভার।
"কী করছ?" আফজালের গলা। সেনাবাহিনীর গলা। তেইশ বছরের অভ্যাস। আদেশের গলা। প্রশ্নের না, আদেশের।
ছেলে দুটো ভয় পেল। দৌড়ালো। দেয়াল টপকে চলে গেল।
আফজাল দেখল ল্যান্ড ক্রুজারের সাইড মিররে আঁচড়। বাকি কিছু হয়নি। তাড়াতাড়ি ধরেছে।
সকালে ম্যানেজারকে বলল। ম্যানেজার চৌধুরী সাহেবকে বলল। চৌধুরী সাহেব নামলেন পার্কিংয়ে। গাড়ি দেখলেন। আঁচড় দেখলেন। মুখ লাল হলো।
"গার্ড ঘুমিয়ে ছিল নাকি?"
ম্যানেজার বলল, "না স্যার, গার্ডই ধরেছে।"
চৌধুরী সাহেব আফজালের দিকে তাকালেন। প্রথমবার তাকালেন। ছয় বছরে প্রথমবার। তারপর বললেন, "CCTV আপগ্রেড করো। আর গার্ড বদলাও। বুড়ো গার্ড দিয়ে হবে না। যুবক চাই।"
আফজাল দাঁড়িয়ে শুনল। কিছু বলল না। কী বলবে? সে চোর তাড়িয়েছে। কিন্তু সে বুড়ো। চোর তাড়ানোর চেয়ে বুড়ো হওয়াটা বড় অপরাধ।
৯
চাকরি গেল না শেষ পর্যন্ত। ম্যানেজার বলল, "আপাতত থাক। কিন্তু নতুন গার্ড খুঁজছি।"
আপাতত। এই শব্দটা আফজালের জীবনে আগেও এসেছে। সেনাবাহিনীতে যখন পায়ে গুলি লাগল, ডাক্তার বলেছিল, "আপাতত বিশ্রাম।" আপাতত বিশ্রাম মানে আর ফ্রন্টলাইনে যাওয়া হলো না। ডেস্কে বসিয়ে দিল। ডেস্কে বসে বসে অবসর হলো।
আপাতত মানে ধীরে ধীরে শেষ।
আফজাল সেরাতে ডিউটিতে গেল। যথারীতি বসল প্লাস্টিকের চেয়ারে। যথারীতি চা বানাল। যথারীতি রাউন্ড দিল। 7B-এর ফারুক সাহেব আজ সিরিয়াস মুখে ফিরল, মদের গন্ধ নেই। 12A থেকে কান্নার আওয়াজ নেই আজ। 4C-তে ঝগড়া নেই।
শান্ত রাত। শুধু ইঁদুর আছে। ইঁদুর সবসময় আছে।
আফজাল ভাবে, সেনাবাহিনীতে তার একটা সার্ভিস রেকর্ড আছে। তেইশ বছরের। সেখানে লেখা আছে সে কোথায় পোস্টিং ছিল, কী কী অপারেশনে গেছে, কবে গুলি লেগেছে, কবে পদোন্নতি পেয়েছে। সেই কাগজ কোথাও আছে। একটা ফাইলে। একটা আলমারিতে। ক্যান্টনমেন্টের কোনো অফিসে।
এখানে তার রেকর্ড কী? লগবুকে প্রতি ঘণ্টায় একটা সই। "রাউন্ড ওকে।" ব্যস। এটাই তার ছয় বছরের ইতিহাস। প্রতি ঘণ্টায় "ওকে।"
১০
ভোরে আজানের সময় আফজাল দাঁড়িয়ে থাকে গেটের সামনে। পূর্ব দিকে আকাশ লাল হচ্ছে। গুলশানের আকাশ ঢাকার অন্য জায়গার চেয়ে বেশি দেখা যায়। বিল্ডিং কম না, কিন্তু রাস্তা চওড়া। আকাশের একটা ফালি দেখা যায়।
বিল্ডিংয়ের জানালায় জানালায় আলো জ্বলতে শুরু করে। ফজরের নামাজ পড়ে কেউ কেউ। বেশিরভাগ ঘুমায়। আলো জ্বলে বাথরুমের। তারপর নেভে। তারপর আবার ঘুম।
আফজাল জানে কোন ফ্ল্যাটে কটায় আলো জ্বলে। জানে কে আগে ওঠে, কে দেরিতে। জানে কোন ফ্ল্যাটের কাজের মেয়ে কটায় আসে। জানে কোন ফ্ল্যাটে রান্নার গন্ধ কটায় শুরু হয়। জানে সব।
কিন্তু আমি কেউ না। আমি সব জানি। প্রতিটা ফ্ল্যাটের ভেতরের কথা জানি। কে মদ খায়, কে কাঁদে, কে ঝগড়া করে, কে রাতে বের হয়, কে রাতে ফেরে, কার গাড়িতে কার গন্ধ লেগে আসে। সব জানি। কিন্তু আমি কেউ না। আমার নাম কেউ জানে না। আমি গার্ড। একটা চেয়ার, একটা টর্চ, একটা ভাঙা নেমপ্লেট।
মতিন এলো। "ভাই, কিছু হয়নি?"
"না।"
আফজাল উঠল। চেয়ার রেখে গেল। তোয়ালে ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল। কেটলি রাখল যথাস্থানে। টর্চ রাখল বেল্টে।
হাঁটতে শুরু করল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে। বাঁ পায়ে ব্যথা। পুরনো ক্ষত। দেশের জন্য পাওয়া ক্ষত।
রাস্তায় একটা ল্যান্ড ক্রুজার চলে গেল। সাদা। 2A-এর চৌধুরী সাহেবের। পেছনের সিটে চৌধুরী সাহেব ফোনে কথা বলছেন। গাড়ি আফজালের পাশ দিয়ে গেল। চৌধুরী সাহেব দেখলেন না। দেখার কথাও না। গার্ড তো শুধু রাতে দরকার। দিনে গার্ডের অস্তিত্ব নেই।
আফজাল হাঁটে। ছায়া পড়ে তার সামনে। লম্বা ছায়া। সকালের ছায়া সবসময় লম্বা হয়। আফজালের ছায়া বিশ ফুট লম্বা। আফজাল নিজে পাঁচ ফুট সাত। কিন্তু ছায়া বিশ ফুট।
ছায়ার কোনো পদবি নেই। ছায়ার কোনো বেতন নেই। ছায়া শুধু হাঁটে। আফজালও।