ঝাড়ুদার
আমার হাত পরিষ্কার। তাদের মন না
১
পারুল সকাল চারটায় ওঠে। অন্ধকারে। ঘরে বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু বাল্ব জ্বালায় না। অভ্যাস। অন্ধকারে কাপড় পরে, অন্ধকারে চুল বাঁধে, অন্ধকারে দরজা খোলে। মেয়ে সুমি ঘুমায়। সুমিকে জাগাতে চায় না। সুমি পড়ে, সুমির ঘুম দরকার।
পারুল বয়স আটত্রিশ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ক্লিনার। মিউনিসিপ্যালিটির ভাষায় "সুইপার।" সবার ভাষায় "ঝাড়ুদার।" পারুলের ভাষায়, কিছু বলে না, নাম বলে না, পরিচয় বলে না। পারুল শুধু কাজ করে।
মাসে আট হাজার টাকা। ক্যাজুয়াল ওয়ার্কার। স্থায়ী পদ নেই। তের বছর ধরে কাজ করে, স্থায়ী হয়নি। স্থায়ী হলে বেতন বাড়ত, ছুটি পেত, পেনশন পেত। কিন্তু স্থায়ী পদ পেতে ঘুষ লাগে। পঁচিশ হাজার। পারুলের কাছে পঁচিশ হাজার নেই।
রাস্তায় নামে পারুল। হাতে ঝাড়ু। কোমরে বাঁধা একটা বস্তা। পায়ে রাবারের স্যান্ডেল। ইউনিফর্ম নেই। ইউনিফর্ম দেওয়ার কথা, দেয়নি। গত তের বছরে দুইবার দিয়েছে। বাকি সময় নিজের কাপড়। পুরনো শাড়ি, মাথায় কাপড় বেঁধে নেয়।
২
পারুলের এলাকা: আন্দরকিল্লা থেকে কাপাসগোলা পর্যন্ত। তিন কিলোমিটার। রাস্তা, ড্রেন, পাবলিক টয়লেট। প্রতিদিন সকাল পাঁচটা থেকে এগারোটা। ছয় ঘণ্টা। মাঝে বিশ্রাম নেই। পানি খায় রাস্তার টিউবওয়েল থেকে।
ড্রেন পরিষ্কার করা সবচেয়ে কঠিন। চট্টগ্রামের ড্রেন সরু, পুরনো, ভাঙা। ভেতরে প্লাস্টিক, পলিথিন, পচা খাবার, মরা ইঁদুর, কুকুরের মল, মানুষের মল। বর্ষায় পানি উপচে ওঠে। তখন ড্রেনে নামতে হয়। কোমর পানিতে। হাতে কোনো সুরক্ষা নেই। গ্লাভস দেওয়ার কথা, দেয়নি। মাস্ক দেওয়ার কথা, দেয়নি। বুট দেওয়ার কথা, দেয়নি।
পারুল খালি হাতে ড্রেন পরিষ্কার করে। আঙুলের নখ কালো হয়ে গেছে স্থায়ীভাবে। চামড়ায় ফাঙ্গাস হয়। পায়ের আঙুলের ফাঁকে চুলকায় সারাদিন। একবার টিটেনাস হয়েছিল, ড্রেনে মরচে ধরা পেরেক ফুটেছিল পায়ে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল সাতদিন। সেই সাতদিনের বেতন কাটা গেছে।
পাবলিক টয়লেট পরিষ্কার করে পারুল। পুরুষের টয়লেটও। মেঝেতে থুতু, প্যানে দাগ, দেয়ালে পানের পিক। গন্ধ। সেই গন্ধ চামড়ায় ঢুকে যায়। সাবান দিয়ে ঘষেও যায় না। পারুলের শরীর থেকে একটা গন্ধ বের হয় সবসময়। সে নিজে টের পায় না। অন্যরা পায়।
৩
দুপুর এগারোটায় কাজ শেষ। পারুল ফেরে অফিসে। মিউনিসিপ্যালিটির ওয়ার্ড অফিস। সেখানে হাজিরা দেয়। তারপর খায়।
খাওয়ার জায়গা আলাদা। অফিসের পেছনে একটা খোলা জায়গা। সিমেন্টের মেঝে, ওপরে টিনের ছাউনি। সেখানে পারুল আর অন্য তিনজন ক্লিনার বসে খায়। ভেতরে অফিস স্টাফরা খায়। ভেতরে টেবিল আছে, চেয়ার আছে, পাখা আছে। বাইরে কিছু নেই। শুধু সিমেন্টের মেঝে।
একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। টিনের ছাউনি ছোট, পানি আসছিল পাশ থেকে। পারুল ভেতরে গেল। একটা বেঞ্চে বসল। অফিসের পিয়ন দেখে বলল, "এখানে না। বাইরে।"
পারুল বলল, "বৃষ্টি হচ্ছে।"
পিয়ন বলল, "দাঁড়াও, থামলে বাইরে যাও।"
পারুল দাঁড়িয়ে রইল। বেঞ্চে বসল না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেল। ভাত, নুন, কাঁচা মরিচ। আলু ভর্তা আজ আছে। মেয়ে সুমি ভোরে বানিয়ে রেখেছিল।
অন্য ক্লিনাররা কিছু বলে না। তারাও জানে। তারাও বাইরে খায়। তারাও দলিত। তারাও "সুইপার।" এই শব্দটাই যথেষ্ট। এই শব্দটা শুনলেই মানুষ একটু সরে যায়। চোখ ফিরিয়ে নেয়। নাক কুঁচকায়।
ময়লা পরিষ্কার করি বলে আমি ময়লা। এটা কোনো যুক্তি না। কিন্তু যুক্তি দিয়ে ঘৃণা চলে না। ঘৃণা হাড়ে বসে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
৪
পারুলের স্বামী ছিল। ছিল, কারণ এখন নেই। ম্যানহোলে নেমেছিল। সিটি করপোরেশনের কাজে। ম্যানহোলে গ্যাস ছিল। মিথেন। ওপরে জানানো হয়নি। কোনো গ্যাস ডিটেক্টর ছিল না। কোনো সেফটি হারনেস ছিল না। কোনো অক্সিজেন মাস্ক ছিল না।
রতন নামল। দশ ফুট নিচে। তিন সেকেন্ড পর চিৎকার করল। পাঁচ সেকেন্ড পর চুপ হয়ে গেল।
ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন ক্লিনার। সে দড়ি ফেলল। রতন ধরল না। ধরতে পারল না। অজ্ঞান।
অ্যাম্বুলেন্স আসতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল। ততক্ষণে রতন মৃত।
ক্ষতিপূরণ পেয়েছিল পারুল। দুই লাখ টাকা। রতনের জীবনের দাম দুই লাখ। যেই ম্যানহোল পরিষ্কার করতে নেমেছিল, সেই ম্যানহোলের ওপরে এখন একটা লোহার ঢাকনা। ঢাকনায় লেখা: "চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।" রতনের নাম কোথাও লেখা নেই।
এর পর পারুল নিজে ক্লিনারের চাকরি নিল। একই অফিস। একই পদ। স্বামীর জায়গায়। কারণ সংসার চালাতে হবে। সুমি তখন তিন বছর। দুই লাখ টাকা কতদিন চলে? দুই বছর চলেছিল। তারপর শেষ।
৫
সুমি এখন ক্লাস এইটে। আন্দরকিল্লা গার্লস স্কুলে। ক্লাসে ফার্স্ট। প্রতিটা পরীক্ষায়। গণিতে সবচেয়ে ভালো। ইংরেজিতেও ভালো। বাংলায় সবচেয়ে ভালো। টিচাররা অবাক হয়। এত ভালো ছাত্রী কীভাবে এখানে?
বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন পারুল গেল স্কুলে। সুমি ফার্স্ট হয়েছে। ক্লাস টিচার রীনা ম্যাডাম ডাকলেন পারুলকে। বললেন, "আপনার মেয়ে অসাধারণ। এভাবে চালিয়ে যান। ওকে কলেজে পাঠাবেন।"
পারুল মাথা নাড়ল।
বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একটা অভিভাবক বলল। একজন মা। তার মেয়ে ক্লাসে তৃতীয় হয়েছে। মা বলল অন্য একজন মাকে, ফিসফিস করে, কিন্তু যথেষ্ট জোরে যে পারুল শুনতে পেল: "ঝাড়ুদারের মেয়ে? ফার্স্ট হলো কীভাবে?"
পারুল শুনল। পা থামল এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল। পেছনে ফিরে তাকাল না। কিছু বলল না। কী বলবে? ঝাড়ুদারের মেয়ে ফার্স্ট হতে পারে না? পারে। হয়েছে। কাগজে লেখা আছে। নম্বর লেখা আছে। কাগজ জাত মানে না। নম্বর জাত মানে না। কিন্তু মানুষ মানে।
সুমি জিজ্ঞেস করল, "মা, কী হয়েছে?"
"কিছু না।"
বাড়ি ফিরে পারুল হাত ধুলো। সেই সাবান দিয়ে যেটা দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করে। একই সাবান। আলাদা সাবান কেনার সামর্থ্য নেই। আলাদা সাবানের দরকারও নেই। সাবান সাবানই। ময়লা ময়লাই। হাত হাতই।
আমার হাত পরিষ্কার। তাদের মন না।
৬
পারুলের বাবাও ঝাড়ুদার ছিল। বাবার বাবাও। তিন প্রজন্ম। হয়তো তার আগেও। কেউ গোনেনি। কেউ রেকর্ড রাখেনি। ঝাড়ুদারের ইতিহাস কেউ লেখে না। ঝাড়ুদারের ইতিহাস ড্রেনে ভেসে যায়।
দলিত। শব্দটা পারুল জানে না ভালো করে। কিন্তু শব্দের মানে জানে শরীরে। মানে হলো: আলাদা কুয়ো, আলাদা ঘাট, আলাদা শ্মশান। গ্রামে থাকতে এটা ছিল। চট্টগ্রাম শহরে এসে কুয়ো নেই, ঘাট নেই, শ্মশান নেই। কিন্তু আলাদা আছে। আলাদা বেঞ্চ, আলাদা গ্লাস, আলাদা চোখ।
মিউনিসিপ্যালিটিতে চা খেতে গেলে পারুলের জন্য একটা আলাদা কাপ আছে। সবার কাপ সাদা। পারুলের কাপ ভাঙা, হাতল নেই। কেউ বলেনি এটা তোমার কাপ। কিন্তু সবাই জানে। পারুলও জানে।
একবার পারুল ভুল করে অন্য একটা কাপে চা ঢেলেছিল। পিয়ন এসে কাপটা নিয়ে ধুয়ে ফেলল। ব্লিচ দিয়ে। তারপর শুকাতে দিল রোদে।
ব্লিচ। পারুলের সাথে করমর্দন করলেও কি ব্লিচ লাগবে?
৭
রাতে পারুল সুমির পড়া দেখে। নিজে বেশি পড়েনি, ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত। কিন্তু সুমির খাতা দেখে, অক্ষর দেখে, নম্বর দেখে। বোঝে না সব। গণিত বোঝে না। ইংরেজি বোঝে না। কিন্তু দেখে।
সুমি বলে, "মা, আমি ডাক্তার হবো।"
পারুল হাসে না। কাঁদেও না। চুপ করে থাকে। ডাক্তার। ঝাড়ুদারের মেয়ে ডাক্তার। হয় নাকি? হয়তো হয়। হয়তো হয় না। কিন্তু চেষ্টা করতে নিষেধ করবে না পারুল। নিষেধ করার অধিকার তার নেই। সুমি যদি চায়, সুমি চেষ্টা করবে। পারুল শুধু ঝাড়ু দেবে। ড্রেন পরিষ্কার করবে। টয়লেট ধোবে। আট হাজার টাকা আনবে। সুমির বই কিনবে। টিউশন ফি দেবে। বাকিটা সুমির।
"হবে।" পারুল বলে। এক শব্দ। এর বেশি বলে না। কারণ বেশি বললে গলা কাঁপবে। গলা কাঁপলে চোখ ভিজবে। চোখ ভিজলে সুমি ভয় পাবে।
৮
পরদিন সকাল। চারটায় উঠে, অন্ধকারে কাপড় পরে, ঝাড়ু হাতে বের হয়। আন্দরকিল্লার রাস্তা। দোকানপাটের সামনে গত রাতের আবর্জনা। পানের পিক। সিগারেটের টুকরো। প্লাস্টিকের কাপ। ছেঁড়া পলিথিন। একটা কনডম। একটা ভাঙা বোতল।
পারুল ঝাড়ু দেয়। ঝাড়ু দিতে দিতে ভাবে না কিছু। ভাবলে কাজ হয় না। ভাবলে গন্ধ বেশি লাগে। ভাবলে ঘৃণা বেশি লাগে। নিজের প্রতি না, কাজের প্রতি না। অন্যদের ঘৃণা বেশি লাগে। তাই ভাবে না।
ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ। ঝরঝর। আসফাল্টের ওপর ঝাড়ুর শব্দ। এই শব্দ ভোরের প্রথম শব্দ। আজানের আগে। পাখির ডাকের আগে। গাড়ির শব্দের আগে। শহরের প্রথম শব্দ ঝাড়ুর। কিন্তু কেউ শোনে না। সবাই ঘুমায়। ঝাড়ুদার একা জেগে থাকে। শহর পরিষ্কার করে। তারপর শহর জাগে। পরিষ্কার শহর দেখে। ভাবে, এমনিতেই পরিষ্কার।
সাতটায় একটা দোকান খোলে। চায়ের দোকান। পারুল দাঁড়ায়। দোকানদার চা দেয়। কিন্তু কাগজের কাপে। কাচের কাপে না। কাচের কাপে দিলে ধুতে হবে, সেই কাপে অন্য কাস্টমার খাবে, তারা জানলে খাবে না।
পারুল কাগজের কাপে চা খায়। চায়ের দাম দশ টাকা। কাচের কাপে দশ টাকা। কাগজের কাপেও দশ টাকা। দাম একই। মর্যাদা আলাদা।
পারুল চা শেষ করে কাপ ফেলে দেয়। তারপর সেই কাপ আবার ঝাড়ু দিয়ে তুলে নেয়। নিজের ফেলা কাপ নিজে পরিষ্কার করে। এটা পারুলের জীবনের রূপক। সে নিজেই ফেলে, নিজেই তোলে। কেউ তোলে না তাকে।
৯
সুমি একদিন স্কুল থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, "মা, তুমি কী কাজ করো?"
পারুল বলল, "সরকারি কাজ।"
"কী কাজ?"
"পরিষ্কার রাখি।"
সুমি আর জিজ্ঞেস করল না। সে জানে। সে জানে মা ঝাড়ুদার। স্কুলে কেউ বলেছে। কে বলেছে জানে না। কিন্তু কেউ বলেছে। সুমি কান্না করেনি। সুমি বলেনি মাকে। সুমি শুধু পরীক্ষায় আরো ভালো করেছে। যেন নম্বর দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায় মায়ের পেশা। যেন মেধা দিয়ে মুছে দেওয়া যায় জাতের দাগ।
পারবে কি সুমি? পারুল জানে না। পারুল শুধু জানে সকাল চারটায় উঠতে হয়। ঝাড়ু হাতে নিতে হয়। ড্রেনে নামতে হয়। টয়লেট ধুতে হয়। আট হাজার টাকা আনতে হয়। সুমির বই কিনতে হয়।
বাকিটা সুমির। বাকিটা ঈশ্বরের। যদি ঈশ্বর থাকেন। যদি ঈশ্বর ঝাড়ুদারের দিকে তাকান।
পারুল জানে না ঈশ্বর তাকান কি না। কিন্তু পারুল জানে সুমি তাকায়। সুমি মায়ের দিকে তাকায়। সেই চোখে ঘৃণা নেই। সেই চোখে লজ্জা নেই। সেই চোখে ভালোবাসা আছে। আর ভালোবাসাই যথেষ্ট।
ভোর চারটা। পারুল ওঠে। ঝাড়ু হাতে নেয়। দরজা খোলে। অন্ধকার। শহর ঘুমায়। পারুল হাঁটে।
পেছনে সুমি ঘুমায়। সুমির বালিশের নিচে গণিতের খাতা। খাতায় সব উত্তর ঠিক। প্রতিটা উত্তর ঠিক। ঝাড়ুদারের মেয়ের প্রতিটা উত্তর ঠিক।
শুধু জীবনের উত্তর কেউ জানে না।