তোকাই
ধনীদের আবর্জনা আমার সম্পদ
১
আব্দুল সকাল পাঁচটায় ওঠে। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের পাশে একটা বস্তি। টিনের চাল, পলিথিনের দেয়াল, মাটির মেঝে। ঘরে গন্ধ আছে। সবসময় আছে। আব্দুলের শরীরে গন্ধ, কাপড়ে গন্ধ, চুলে গন্ধ, নখে গন্ধ। এই গন্ধ ডাম্পের। পচা জৈব বর্জ্য, প্লাস্টিক পোড়ার ধোঁয়া, কেমিক্যাল, মেডিকেল ওয়েস্ট, সব মিলে একটা গন্ধ। আব্দুল এই গন্ধে জন্মেছে। এই গন্ধে বড় হয়েছে। এই গন্ধ তার স্বাভাবিক।
আব্দুল বয়স বত্রিশ। ডাম্পে কাজ করে পনেরো বছর ধরে। সতেরো বছর বয়সে শুরু। বাবা করত আগে। বাবা মারা গেছে। ফুসফুসের ক্যান্সার। ডাম্পের ধোঁয়া। ডাক্তার বলেনি ডাম্পের ধোঁয়ায় ক্যান্সার হয়েছে। ডাক্তারের কাছে যায়নি। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার টাকা ছিল না। বাবা কাশতে কাশতে রক্ত তুলেছে, তারপর একদিন কাশি থেমে গেছে। সব থেমে গেছে।
আব্দুলের বউ হাসিনা। দুই ছেলে। বড়টা সাত, ছোটটা চার। বড়টাও ডাম্পে যায় মাঝে মাঝে। ছোট জিনিস কুড়ায়। প্লাস্টিকের ক্যাপ, অ্যালুমিনিয়ামের টুকরো। আব্দুল চায় না ছেলে যাক। কিন্তু কিছু বলে না। কারণ নিজেও সতেরোতে শুরু করেছে। বাবাও চায়নি। বাবাও কিছু বলেনি।
২
পাঁচটায় বের হয়। পায়ে কিছু নেই। জুতো পরে না। জুতো পরলে ডাম্পের কেমিক্যালে জুতো নষ্ট হয়। একমাসে একজোড়া শেষ। প্রতিমাসে জুতো কেনার সামর্থ্য নেই। তাই খালি পায়ে।
পায়ের তলা শক্ত। এত শক্ত যে কাচের ওপর দিয়ে হাঁটলেও কাটে না। চামড়া পুরু হয়ে গেছে। কিন্তু কেমিক্যাল ঢোকে। চামড়ার ফাটল দিয়ে। পায়ে সাদা সাদা দাগ। ডাক্তার বলবে একজিমা। আব্দুল বলে ডাম্পের দাগ।
মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল। ঢাকা দক্ষিণের ময়লা আসে এখানে। দিনে দুই হাজার টন। পাহাড় হয়ে গেছে ময়লার। ত্রিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু। ওপর থেকে ঢাকা দেখা যায়। স্কাইলাইন। বিল্ডিং। মিনার। ডাম্পের পাহাড় থেকে শহর দেখতে সুন্দর। শহর থেকে ডাম্প দেখতে বীভৎস। দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার।
আব্দুল পাহাড়ে ওঠে। ময়লার পাহাড়ে পা দেবে যায়। নরম জায়গা আছে, শক্ত জায়গা আছে। অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝে কোথায় পা দিতে হবে। নতুন ময়লা এসেছে রাতে। ট্রাক ফেলে গেছে। তাজা ময়লা। তাজা সুযোগ।
৩
আব্দুল খোঁজে। দুই হাত দিয়ে ময়লা সরায়। প্লাস্টিকের বোতল আলাদা করে। PET বোতল কেজি বিশ টাকা। HDPE বোতল কেজি পনেরো। ক্যাপ আলাদা, ক্যাপ PP প্লাস্টিক, কেজি দশ টাকা। সব আলাদা আলাদা বস্তায় রাখে।
তামা পেলে ভালো। তামার তার। পুরনো ইলেকট্রিক তার থেকে বের করতে হয়। প্লাস্টিকের আবরণ ছাড়িয়ে ভেতরের তামা বের করে। তামা কেজি ছশো টাকা। কিন্তু তামা কম পাওয়া যায়। সারাদিনে আধা কেজি পেলে ভাগ্য ভালো।
অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান। কোকের ক্যান, সেভেন আপের ক্যান। কেজি ত্রিশ টাকা। ক্যান হালকা, অনেকগুলো লাগে এক কেজি হতে। পঁয়ত্রিশটা ক্যানে এক কেজি।
কাচের বোতল। পুরনো ওষুধের বোতল, সিরাপের বোতল। কেজি পাঁচ টাকা। কাচ সবচেয়ে কম দামের। ভারী, ভঙ্গুর, কম দাম। কিন্তু কাচও নেয় আব্দুল। পাঁচ টাকাও টাকা।
লোহা পেলে সবচেয়ে ভালো। পুরনো গ্রিল, তারকাঁটা, পেরেক, স্ক্রু। লোহা কেজি চল্লিশ টাকা। কিন্তু লোহা ভারী। ক্যারি করা কঠিন।
সারাদিনে আব্দুল কত কামায়? গড়ে তিনশো থেকে চারশো টাকা। ভালো দিনে পাঁচশো। খারাপ দিনে দেড়শো। মাসে আট-দশ হাজার। কোনো ছুটি নেই। বৃষ্টির দিনেও কাজ। অসুস্থ হলেও কাজ। কাজ না করলে খাবার নেই।
৪
আজ আব্দুলের ভাগ্য ভালো।
ময়লার স্তূপের ভেতর থেকে একটা ভাঙা মোবাইল পেল। স্ক্রিন ফাটা। চালু হয় না। কিন্তু ভেতরে পার্টস আছে। মাদারবোর্ড, ব্যাটারি, ক্যামেরা মডিউল। মোবাইলের ভাঙা ফোন ভাঙারি দোকানে বিক্রি হয় একশো টাকায়।
আরো ভেতরে গেল। একটা পুরনো ব্যাকপ্যাক পেল। ভেতরে কিছু কাপড়, একটা বই, একটা পানির বোতল। বোতলটা স্টিলের। ময়লা, কিন্তু ভালো আছে। ধুয়ে বিক্রি করলে পঞ্চাশ টাকা পাবে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি: একটা আংটি। সোনার না, সোনার হলে অন্য কথা ছিল। কিন্তু দেখতে সোনার মতো। হয়তো গোল্ড প্লেটেড। হয়তো পিতলের। আব্দুল পকেটে রাখল।
ভাঙারির কাছে গেল দুপুরে। সিরাজ ভাঙারি। মাতুয়াইলের সবচেয়ে বড় ভাঙারি দোকান। সব তোকাই সিরাজের কাছে বিক্রি করে। সিরাজ ওজন করে, দাম বলে, টাকা দেয়। দাম নিয়ে দরাদরি চলে না। সিরাজের দাম চূড়ান্ত। কারণ সিরাজ ছাড়া আর কেউ নেই। আছে, কিন্তু দূরে। দূরে যেতে রিকশা লাগে। রিকশার ভাড়ায় লাভ কমে যায়।
আজকের হিসাব: PET বোতল ছয় কেজি, একশো কুড়ি টাকা। অ্যালুমিনিয়াম ক্যান দুই কেজি, ষাট টাকা। তামার তার আধা কেজি, তিনশো টাকা। মোবাইল একশো। স্টিল বোতল পঞ্চাশ। মোট ছশো ত্রিশ টাকা।
আংটিটা দেখাল সিরাজকে। সিরাজ চোখে লাগাল লেন্স। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। "পিতল। পঞ্চাশ টাকা।"
আব্দুল জানে এটা পিতল না। ওজন বেশি। রং আলাদা। কিন্তু আব্দুল জুয়েলার না। আব্দুল তোকাই।
বিক্রি করল পঞ্চাশ টাকায়। সিরাজ পরে জুয়েলারের কাছে নেবে। যদি সোনার হয়, সিরাজ পাবে আট-দশ হাজার। আব্দুল পাবে পঞ্চাশ। এটাই ব্যবস্থা। যে কুড়ায় সে কম পায়। যে বসে থাকে সে বেশি পায়।
৫
দুপুরে আব্দুল ফেরে। পকেটে ছশো আশি টাকা। বাজারে যায়। চাল তিন কেজি, একশো আশি টাকা। আলু দুই কেজি, ষাট। পেঁয়াজ এক কেজি, চল্লিশ। তেল আধা লিটার, আশি। ডাল আধা কেজি, পঁয়ষট্টি। ডিম চারটা, ষাট। মোট চারশো পঁচাশি টাকা।
বাকি একশো পঁচানব্বই। এটা সঞ্চয় না। এটা আগামীকালের জন্য।
বাজার থেকে ফেরে। বাসে ওঠার চেষ্টা করে। বাস দাঁড়ায়। কন্ডাক্টর দেখে আব্দুলকে। আব্দুলের গায়ে ময়লা কাপড়, হাতে বস্তা, শরীর থেকে গন্ধ।
কন্ডাক্টর বলে, "না।"
"কেন?"
"গন্ধ। যাত্রীরা কমপ্লেইন করবে।"
আব্দুল নামে। পরের বাসে চেষ্টা করে। একই উত্তর। তৃতীয় বাসে চেষ্টা করে না। হাঁটে। পাঁচ কিলোমিটার। বাজারের ব্যাগ হাতে।
পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হাঁটতে আব্দুল ভাবে। আমি শহরের সবচেয়ে জরুরি মানুষ। আমি না থাকলে শহর ডুবে যায় ময়লায়। রাস্তায় প্লাস্টিক থাকত, ড্রেনে বোতল থাকত, ডাম্পে কেউ সর্ট করত না, রিসাইকেলিং হতো না। আমি ছাড়া শহর চলে না।
কিন্তু আমাকে বাসে উঠতে দেয় না।
৬
রাতে আব্দুল খায়। ভাত, ডাল, আলু ভর্তা। হাসিনা রেঁধেছে। ছেলে দুটো খায়। বড় ছেলে আমিন জিজ্ঞেস করে, "বাবা, কাল আমি যাবো?"
"না।"
"কেন?"
"পড়বে।"
আমিন পড়ে। মাদ্রাসায়। ফ্রি। মাদ্রাসায় খাওয়া ফ্রি, থাকা ফ্রি, পড়া ফ্রি। আব্দুল মাদ্রাসায় দিয়েছে কারণ স্কুলে খরচ আছে। মাদ্রাসায় নেই। আব্দুল চায় ছেলে পড়ুক। কিন্তু স্কুলে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। মাদ্রাসায় আরবি শেখে, বাংলা শেখে, গণিত শেখে একটু। ইংরেজি শেখে না। ইংরেজি ছাড়া চাকরি হয় না। চাকরি ছাড়া ডাম্প থেকে বেরোনো যায় না।
একটা চক্র। ডাম্প থেকে বের হতে চাকরি লাগে। চাকরি পেতে শিক্ষা লাগে। শিক্ষা পেতে টাকা লাগে। টাকা পেতে ডাম্পে যেতে হয়।
৭
আব্দুলের শরীরে ক্ষত আছে। বাঁ হাতের তালুতে একটা কাটা দাগ। ডাম্পে কাচ কেটেছিল। সেলাই হয়নি। নিজে কাপড় বেঁধেছিল। শুকিয়ে গেছে, কিন্তু দাগ আছে।
ডান হাঁটুতে একটা পোড়া দাগ। ডাম্পে আগুন লাগে মাঝে মাঝে। মিথেন গ্যাস জমে, কেউ সিগারেট ফেলে, আগুন ধরে। একবার আব্দুলের পায়ের কাছে আগুন লেগেছিল। পালাতে গিয়ে হাঁটু পুড়েছে। সেদিন কাজ বন্ধ হয়নি। পরদিন আবার গেছে।
পিঠে ব্যথা। ভারী বস্তা বওয়ার ব্যথা। কোমরে ব্যথা। সারাদিন ঝুঁকে থাকার ব্যথা। চোখে জ্বালা। ডাম্পের ধোঁয়ায়। কাশি আছে সকালে। বাবারও ছিল। বাবার কাশি শেষ পর্যন্ত রক্ত তুলেছিল।
আব্দুল জানে একদিন তারও কাশি থেকে রক্ত আসবে। জানে কিন্তু ভাবে না। ভাবলে কাজ হয় না।
শরীর হলো যন্ত্র। যন্ত্র চালাতে হয়। যন্ত্র বন্ধ হলে নতুন যন্ত্র আসে। আমিন আসবে। আব্দুল বন্ধ হলে আমিন চলবে। তিন প্রজন্ম ডাম্পে। হয়তো চার।
৮
একটা কথা আব্দুল কাউকে বলে না।
ডাম্পে মাঝে মাঝে সুন্দর জিনিস পায়। একবার একটা পুতুল পেয়েছিল। চীনামাটির। একটু ভাঙা, কিন্তু মুখটা অক্ষত। সুন্দর মুখ। হাসছে। আব্দুল পুতুলটা ধুয়ে বাড়িতে এনেছিল। ছোট ছেলেকে দিয়েছিল। ছেলে খুশি হয়েছিল।
ধনীদের আবর্জনা আমার সম্পদ। এটা শুধু টাকার কথা না। এটা জীবনের কথা। ধনীরা যা ফেলে দেয়, সেটা দিয়ে আব্দুল সংসার চালায়। ধনীদের পুরনো জামা আব্দুলের নতুন জামা। ধনীদের ভাঙা খেলনা আব্দুলের ছেলের খেলনা। ধনীদের বাসি খাবার মাঝে মাঝে আব্দুলের দুপুরের খাবার।
একটা সমান্তরাল অর্থনীতি। ওপরে যা পড়ে, নিচে তা ওঠে। মাধ্যাকর্ষণের উলটো। ময়লা ওপর থেকে পড়ে, মূল্য নিচ থেকে ওঠে। আব্দুল মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে কাজ করে। প্রতিদিন।
৯
সন্ধ্যায় আব্দুল বস্তির বাইরে বসে। আকাশ দেখে। ডাম্পের ওপরে আকাশ ধোঁয়াটে। তারা দেখা যায় না ভালো। কিন্তু চাঁদ দেখা যায়। চাঁদের আলোয় ডাম্পের পাহাড় দেখা যায়। রূপালি আলোয় ময়লার পাহাড় দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। যেন চাঁদের পৃষ্ঠ। যেন অন্য গ্রহ।
হাসিনা ডাকে, "শোবে না?"
আব্দুল বলে, "আসছি।"
কিন্তু আসে না এখনই। বসে থাকে। ভাবে। ভাবনা স্পষ্ট না। ভাবনায় শব্দ নেই। শুধু একটা অনুভূতি। ক্লান্তির না, দুঃখের না, রাগের না। একটা অভ্যস্ততা। জীবন এমনই। জীবন এমনই ছিল। জীবন এমনই থাকবে।
কাল সকাল পাঁচটায় উঠবে। খালি পায়ে ডাম্পে যাবে। ময়লার পাহাড়ে উঠবে। হাত দিয়ে ময়লা সরাবে। প্লাস্টিক আলাদা করবে। তামা খুঁজবে। অ্যালুমিনিয়াম খুঁজবে। সোনা পাওয়ার আশায় না, বেঁচে থাকার জন্য।
ডাম্পের গন্ধ বাতাসে ভাসে। আব্দুল নাকে টানে। গন্ধ পায় না। কারণ এই গন্ধ তার নিজের গন্ধ। নিজের গন্ধ নিজে পায় না।
শহর আব্দুলকে পায় না। আব্দুলের গন্ধ পায়। কিন্তু আব্দুলকে পায় না।