লন্ড্রি কর্মী
শীটের দাম আমার তিন মাসের বেতন। শীটটা নরম। আমার হাত শক্ত
১
তাহেরের হাত দেখলে মনে হয় পঞ্চাশ বছরের বুড়ো মানুষের হাত। তাহেরের বয়স ছাব্বিশ।
আঙুলের চামড়া ফাটা। তালু সাদা, কিন্তু অসুস্থ সাদা, রক্তশূন্য সাদা। নখ পাতলা, ভঙ্গুর, কিনারা থেকে ভেঙে যায়। হাতের পিঠে ছোট ছোট লাল দাগ, কেমিক্যাল বার্নের চিহ্ন। কনুই পর্যন্ত চামড়া খসখসে, মাছের আঁশের মতো উঠে আসে। শীতকালে রক্ত পড়ে ফাটল থেকে।
তাহের কাজ করে গুলশানের একটা ফাইভ স্টার হোটেলের লন্ড্রিতে। হোটেলের নাম বলবে না। বললে চাকরি যাবে। হোটেল বলেছে, কর্মচারীরা হোটেলের নাম কোথাও বলবে না। হোটেলের ব্র্যান্ড। ব্র্যান্ডের সুরক্ষা।
বেসমেন্ট ওয়ানে লন্ড্রি। কোনো জানালা নেই। ফ্লুরোসেন্ট আলো, চব্বিশ ঘণ্টা জ্বলে। ছাদ নিচু, সাড়ে সাত ফুট। তাহের পাঁচ ফুট ছয়, ঠিক আছে। কিন্তু দমবন্ধ লাগে। বাতাস চলে না। এক্সহস্ট ফ্যান আছে, কিন্তু যথেষ্ট না। ভেতরে গরম। মেশিনের গরম, স্টিমের গরম, ড্রায়ারের গরম। তাপমাত্রা সবসময় চল্লিশ ডিগ্রির ওপরে। ঘাম শুকায় না। কাপড় ভিজে থাকে সারাদিন।
তাহের মাসে পায় পনেরো হাজার টাকা। ওভারটাইম আলাদা। ওভারটাইম প্রায় প্রতিদিন। ওভারটাইম দিয়ে মোট আঠারো হাজার।
২
হোটেলে তিনশো কক্ষ। প্রতিদিন গড়ে দুইশো কক্ষ ভরা থাকে। প্রতিটা কক্ষে দুটো বেডশীট, চারটা তোয়ালে, দুটো বাথরোব, দুটো বালিশের কভার। প্রতিদিন বদলাতে হয়। প্রতিদিন ধুতে হয়।
চারশো বেডশীট। আটশো তোয়ালে। চারশো বাথরোব। চারশো বালিশের কভার। প্রতিদিন।
শীটগুলো ইজিপশিয়ান কটন। থ্রেড কাউন্ট আটশো। একটা শীটের দাম পঞ্চাশ হাজার টাকা। তাহেরের তিন মাসের বেতন। তাহের এই শীট হাতে নেয়। নরম। মসৃণ। ত্বকে ছোঁয়ালে মনে হয় পানি। তাহের বাড়িতে যে চাদরে ঘুমায় সেটা সুতির, পুরনো, দড়ি দড়ি হয়ে গেছে, ধুলে ছোট হয়ে যায়। দুই জগতের দুই চাদর।
শীট ধোয়ার প্রক্রিয়া: প্রথমে প্রি-সোক, হালকা গরম পানিতে। তারপর মেশিনে ধোয়া, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিটারজেন্ট দিয়ে। তারপর ব্লিচ, হালকা, শীট সাদা রাখতে। তারপর সফটনার, শীট নরম রাখতে। তারপর ড্রায়ার। তারপর ইস্ত্রি। তারপর ভাঁজ। প্রতিটা ভাঁজ নির্দিষ্ট। হোটেলের স্ট্যান্ডার্ড আছে। ভাঁজ ভুল হলে সুপারভাইজার ফেরত দেয়।
তাহের প্রতিদিন চারশো শীট ধোয়, ইস্ত্রি করে, ভাঁজ করে। ভুল হয় না। ভুল করার সুযোগ নেই।
৩
কেমিক্যাল। ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড।
ডিটারজেন্ট: সোডিয়াম লরাইল সালফেট, সোডিয়াম কার্বনেট, এনজাইম। প্যাকেটে সতর্কতা লেখা: "চামড়ায় লাগলে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। চোখে গেলে ডাক্তার দেখান।" তাহের প্রতিদিন এটায় হাত ডোবায়। আট ঘণ্টা।
ব্লিচ: সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট। ঝাঁঝালো গন্ধ। নাকে ঢোকে, গলায় জ্বালা করে। দীর্ঘ সময় শ্বাস নিলে ফুসফুসের ক্ষতি হয়। তাহের প্রতিদিন আট ঘণ্টা এই গন্ধে থাকে।
সফটনার: কোয়াটারনারি অ্যামোনিয়াম কম্পাউন্ড। চামড়ায় অ্যালার্জি করে। তাহেরের হাতে র্যাশ ওঠে মাঝে মাঝে। লাল, চুলকানি, ফুলে যায়। তারপর চলে যায়। তারপর আবার আসে।
গ্লাভস আছে। হোটেল দিয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রাবার গ্লাভস। পুরু। শক্ত। গ্লাভস পরলে ফ্যাব্রিকের টেক্সচার বোঝা যায় না। ভাঁজ ঠিক হয় না। শীটে কোনো দাগ থাকলে ধরা পড়ে না। সুপারভাইজার বলে, "দাগ আছে, আবার ধোও।" আবার ধুতে আবার সময় লাগে। ওভারটাইম বাড়ে। ওভারটাইমের টাকা পায়, কিন্তু ঘরে ফিরতে দেরি হয়।
তাই তাহের গ্লাভস ছাড়া কাজ করে। হাত দিয়ে। চামড়া দিয়ে। শীটের দাম আমার তিন মাসের বেতন। শীটটা নরম। আমার হাত শক্ত।
৪
একদিন একটা অভিযোগ এলো।
রুম ১২০৭। ভিআইপি সুইট। রাতে একজন বিদেশি গেস্ট ছিলেন। সকালে চেক আউট করার আগে ফ্রন্ট ডেস্কে বললেন, "শীটে গন্ধ ছিল।"
গন্ধ। কী গন্ধ? গেস্ট স্পেসিফাই করেননি। শুধু বলেছেন, "গন্ধ।" হয়তো কেমিক্যালের গন্ধ। হয়তো ডিটারজেন্টের গন্ধ। হয়তো ব্লিচের গন্ধ। হয়তো আগের গেস্টের গন্ধ। হয়তো কোনো গন্ধই ছিল না, গেস্টের মনে হয়েছে।
কিন্তু গেস্ট বলেছেন, তাই সত্য। ফাইভ স্টার হোটেলে গেস্ট সবসময় সত্য বলেন। গেস্ট ভুল করেন না। গেস্ট ঈশ্বর।
ম্যানেজার নামলেন বেসমেন্টে। লন্ড্রিতে। তাহের কাজ করছিল, স্টিম প্রেসে শীট ইস্ত্রি করছিল। ঘামে ভেজা শার্ট। মুখে ক্লান্তি।
"তাহের, ১২০৭-এর শীটে গন্ধ ছিল। গেস্ট কমপ্লেইন করেছে।"
তাহের বলল, "স্যার, আমি তিনবার ধুয়েছিলাম। সফটনারও দিয়েছি।"
"তিনবার ধুয়েও গন্ধ থাকলে চারবার ধোও। পাঁচবার ধোও। গেস্ট কমপ্লেইন করলে তোমার দায়।"
তাহের বলল, "জি স্যার।"
ম্যানেজার চলে গেলেন। লিফটে উঠে গেলেন লবিতে। লবিতে মার্বেল মেঝে, ঝাড়বাতি, ফুলের গন্ধ। বেসমেন্টে কংক্রিট মেঝে, ফ্লুরোসেন্ট আলো, কেমিক্যালের গন্ধ।
সেই গেস্ট চেক আউটের সময় ওয়েটারকে দুই হাজার টাকা টিপ দিলেন। ওয়েটার হাসল। গেস্ট হাসলেন। তাহের পেল কী? একটা বকুনি।
আমি অদৃশ্য। পরিষ্কারের পেছনের মানুষ সবসময় অদৃশ্য।
৫
তাহের কুমিল্লার ছেলে। দেবিদ্বার উপজেলা। বাবা কৃষক। ভাই তিনজন। তাহের দ্বিতীয়। এসএসসি পাস করে ঢাকায় এসেছিল। চাকরি খুঁজেছিল অফিসে, দোকানে, ফ্যাক্টরিতে। পায়নি। একজন পরিচিত বলল, হোটেলে কাজ আছে। তাহের গেল।
ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করল, "কী কাজ করতে পারবে?"
তাহের বলল, "যেকোনো কাজ।"
"লন্ড্রি?"
"হ্যাঁ।"
"কেমিক্যাল সহ্য হবে?"
"হবে।"
হোটেলে যোগ দিল। প্রথম সপ্তাহে হাত জ্বলেছিল। আগুনের মতো। ডিটারজেন্ট আর ব্লিচ মিলে চামড়া পুড়িয়ে দিয়েছিল। রাতে ঘুমাতে পারেনি ব্যথায়। ঠান্ডা পানিতে হাত ভিজিয়ে রেখেছিল।
দ্বিতীয় সপ্তাহে একটু কম জ্বলল। তৃতীয় সপ্তাহে আরো কম। চামড়া অভ্যস্ত হচ্ছিল। মানে: চামড়া মরে যাচ্ছিল। জীবিত চামড়া ব্যথা পায়। মৃত চামড়া পায় না। তাহেরের হাতের চামড়া ধীরে ধীরে মরে গেল। এখন ব্যথা পায় না। কিন্তু হাতও আর আগের মতো নেই।
বাড়িতে ফোন করে মাসে একবার। মা জিজ্ঞেস করে, "খাচ্ছ ঠিকমতো?"
"হ্যাঁ।"
"শরীর ঠিক আছে?"
"হ্যাঁ।"
হাতের কথা বলে না। মা জানলে কাঁদবে। মা কাঁদলে তাহেরও কাঁদবে। কান্না দিয়ে চামড়া ফেরত আসে না।
৬
হোটেলে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। গেস্ট যখন সামনে আসে, লন্ড্রি কর্মীরা আড়ালে যাবে। করিডোরে গেস্ট দেখলে সরে যাবে। লিফটে গেস্ট থাকলে পরের লিফটে উঠবে। গেস্টের চোখে পড়বে না।
কারণ লন্ড্রি কর্মীদের চেহারা হোটেলের ইমেজের সাথে যায় না। ফাইভ স্টার হোটেল মানে সৌন্দর্য, মানে পরিচ্ছন্নতা, মানে বিলাসিতা। পরিচ্ছন্নতার পেছনের মানুষগুলো পরিচ্ছন্ন না। তাদের হাত ফাটা, চোখ ক্লান্ত, কাপড়ে কেমিক্যালের দাগ।
তাহের একবার ভুল করে সার্ভিস লিফটের বদলে গেস্ট লিফটে উঠেছিল। তাড়াহুড়ো ছিল, একগাদা তোয়ালে নিয়ে যাচ্ছিল দশ তলায়। লিফট খুলল, ভেতরে একজন গেস্ট। বিদেশি। তাহেরকে দেখে কিছু বলল না। কিন্তু নাক কুঁচকাল। হালকা। প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু তাহের দেখল।
কেমিক্যালের গন্ধ। তাহেরের শরীর থেকে আসে। সেই গন্ধ ডিটারজেন্টের, ব্লিচের, সফটনারের। যে গন্ধ দিয়ে শীট পরিষ্কার হয়, সেই গন্ধ তাহেরের শরীরে থাকে। শীটে থাকলে সমস্যা, গেস্ট কমপ্লেইন করে। তাহেরের শরীরে থাকলে সমস্যা নেই, কেউ কমপ্লেইন করে না। কারণ তাহের গেস্ট না। তাহের কেউ না।
৭
রাতে তাহের ফেরে। মিরপুরে মেসে থাকে। আটজন এক রুমে। চারটা বাঙ্ক বেড। তাহের ওপরেরটায় ঘুমায়। নিচের বেডে রাজু, গার্মেন্টসে কাজ করে। পাশের বেডে মামুন, রেস্তোরাঁয় কাজ করে। সামনের বেডে সবুজ, ড্রাইভার।
আটজন। আটটা শরীর। আটটা ঘাম। আটটা গন্ধ। তাহেরের গন্ধ কেমিক্যালের। রাজুর গন্ধ কাপড়ের রঙের। মামুনের গন্ধ তেল-মশলার। সবুজের গন্ধ পেট্রোলের।
রুমে একটা পাখা। সিলিং ফ্যান। ঘুরে। গরমে ঘুমাতে কষ্ট হয়। শীতে ঠিক থাকে।
তাহের শোয়ার আগে হাতে ক্রিম লাগায়। বোরোলিন। ছোট টিউব, ত্রিশ টাকার। এটুকুই চিকিৎসা। বোরোলিন দিলে ফাটা চামড়া একটু নরম হয়। সকালে আবার শক্ত। আবার ফাটা।
তাহের হাতের দিকে তাকায়। এই হাত দিয়ে ছোটবেলায় ঘুড়ি ওড়াত কুমিল্লায়। এই হাত দিয়ে নদীতে মাছ ধরত। এই হাত দিয়ে মায়ের পায়ে সালাম করত। এখন এই হাত দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকার শীট ধোয়। শীট নরম হয়। হাত শক্ত হয়।
ক্রিম শুকিয়ে যায়। তাহের চোখ বন্ধ করে। ঘুমায়। সকালে আবার বেসমেন্টে নামবে। আবার কেমিক্যাল। আবার স্টিম। আবার চারশো শীট। আবার অদৃশ্য।
শীট তো নরম হতেই হবে। কারোর হাত তো শক্ত হতেই হবে।