হোটেল বয়
রাগ করার অধিকার আমার নেই। রাগ করলে চাকরি যায়। চাকরি গেলে ভাত যায়
১
সাগরের পায়ে শিরা ফুলে উঠেছে।
বাদামি রঙের, আঁকাবাঁকা, চামড়ার নিচে দিয়ে সাপের মতো এগিয়ে যাচ্ছে গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। ডাক্তার দেখায়নি। ডাক্তার দেখানোর সময় নেই। টাকাও নেই। সকাল দশটায় দাঁড়ায়, রাত বারোটায় বসে। চোদ্দ ঘণ্টা। দুই পা।
মিরপুরের একটা রেস্তোরাঁ। নামটা বড় বড় অক্ষরে লেখা, নিয়ন বাতি জ্বলে রাতে। "রয়্যাল ডাইনিং।" রয়্যাল কিছু নেই। টিনের ছাদ। প্লাস্টিকের চেয়ার। টেবিলে ফর্মাইকা, কোনা ভাঙা। কিন্তু বিরিয়ানি ভালো হয়। মটন বিরিয়ানি তিনশো বিশ টাকা। চিকেন দুইশো আশি। খাসির রেজালা চারশো।
সাগর এখানে তিন বছর ধরে কাজ করে। বয়স বাইশ। নোয়াখালী থেকে এসেছে। বাবা রিকশা চালাতেন, এখন চালাতে পারেন না, হাঁটুতে ব্যথা। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। দুই বোন আছে, এক ভাই। সাগর বড়।
বেতন ছয় হাজার টাকা।
ছয় হাজার টাকায় ঢাকায় একটা মানুষের থাকা চলে না। খাওয়া চলে না। কিন্তু সাগর শুধু ছয় হাজারে চলে না। টিপসে চলে। ভালো দিন গেলে আটশো, হাজার টাকা টিপস আসে। খারাপ দিন গেলে দুইশো। মাসে গড়ে আট থেকে দশ হাজার। যদি ভাগ্য ভালো থাকে। যদি হাসি ঠিকমতো দেওয়া যায়। যদি কোনো কাস্টমার খুশি হয়ে একটু বেশি রেখে যায়।
হাসি বাধ্যতামূলক।
মালিক বলেছে, "কাস্টমার ঢুকলে হাসবি। বসার আগে চেয়ার টেনে দিবি। মেনু দিবি। অর্ডার নেওয়ার সময় মাথা নিচু করে দাঁড়াবি। কাস্টমার রাজা।"
সাগর হাসে। দাঁত দেখিয়ে। চোখ দিয়ে না।
২
"স্যার, কী দেব?"
এই বাক্যটা সাগর দিনে দুইশো বার বলে। হয়তো তার বেশি। গুনে দেখেনি। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও বলে। রুমমেট জসিম বলেছে, "তুই ঘুমের মধ্যে অর্ডার নিস।"
"স্যার" বলতে হয় সবাইকে। রিকশাওয়ালা এসে খেতে বসলেও স্যার। গার্মেন্টস সুপারভাইজার এসে বসলেও স্যার। বড় গাড়ি থেকে নেমে এসে বসলেও স্যার।
সাগর স্যার বলে। মাথা নোয়ায়। হাসে।
ভেতরে কী আছে সেটা কেউ জিজ্ঞেস করে না।
দুপুরে ভিড় থাকে। লাঞ্চ আওয়ারে অফিসের লোকজন আসে। দ্রুত অর্ডার দেয়, দ্রুত খায়, দ্রুত বেরিয়ে যায়। টিপস রাখে না অনেকে। হিসাব মিলিয়ে একদম ঠিক টাকা রেখে চলে যায়। সাগর টেবিল পরিষ্কার করে, প্লেট তুলে নেয়, ন্যাপকিনের ময়লা ফেলে। পরের কাস্টমার আসে। আবার হাসি। আবার "স্যার।"
রাতে অন্য রকম। রাতে মদ খেয়ে আসে কেউ কেউ। চোখ লাল, গলা উঁচু। মেনু দেখে না, চিৎকার করে অর্ডার দেয়। "বিরিয়ানি দে, জলদি।" সাগর মাথা নোয়ায়, যায় রান্নাঘরে। বিরিয়ানি আসতে পনেরো মিনিট লাগে। মাঝে কাস্টমার দুইবার ডাকে। "ওই, কোথায় গেলি?" সাগর বলে, "আসছে স্যার।" তৃতীয়বার টেবিলে চাপড় মারে। "কত সময় লাগবে? এত টাকা দিয়ে আসি, সার্ভিসের নাম নেই।"
সাগর দাঁড়িয়ে থাকে। চুপ।
৩
একদিন একটা ঘটনা ঘটল।
শুক্রবার রাত। রেস্তোরাঁ ভর্তি। সাগর ছয়টা টেবিল একা সামলাচ্ছে। অন্য একজন ওয়েটার, রফিক, আজ আসেনি। জ্বর। তার টেবিলগুলোও সাগরের ওপর পড়েছে।
তিন নম্বর টেবিলে দুজন বসেছে। বয়স্ক, মোটা, পাঞ্জাবি পরা। পান খাচ্ছে। মুখ লাল। বিরিয়ানি খেয়ে শেষ করেছে, এখন চা খাচ্ছে।
একজন পান চিবাতে চিবাতে থুতু ফেলল। মেঝেতে। লাল থুতু। পানের রস। টেবিলের পাশে, ঠিক সাগরের পায়ের কাছে।
সাগর দেখল। লোকটা সাগরের দিকে তাকাল। তাকানোটা এমন, যেন কিছুই হয়নি। যেন মেঝে থুতু ফেলার জায়গা। যেন সাগর মেঝের অংশ।
সাগর ন্যাপকিন আনল। হাঁটু গেড়ে বসল। মুছল। লাল দাগ। পানের গন্ধ। চুন আর সুপারির মিশ্রণ। মুছতে মুছতে সাগরের হাত লাল হলো।
লোকটা আরেকটু পান চিবাল। আবার থুতু ফেলল। একই জায়গায়।
সাগর আবার মুছল।
৪
আরেকদিন। মঙ্গলবার। দুপুর।
একটা পরিবার এসেছে। বাবা, মা, দুটো বাচ্চা। বাচ্চারা কোল্ড ড্রিংকস চাইল। সাগর আনল। ছোট বাচ্চাটা, বছর চার-পাঁচ হবে, গ্লাসটা উলটে ফেলল টেবিলে। কোক ছড়িয়ে গেল। বাবার প্যান্টে লাগল একটু। বাবা লাফিয়ে উঠল।
"এটা কী? গ্লাসটা এভাবে রাখিস? বাচ্চার হাতের কাছে? কোনো বুদ্ধি নেই?"
সাগর বলল, "স্যার, সরি। আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।"
লোকটা টেবিলে থাপ্পড় মারল। জোরে। চারপাশের সবাই তাকাল। "সরি বললেই হলো? প্যান্ট নষ্ট হলো আমার। কে দেবে দাম?"
সাগর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মালিক এসে পরিস্থিতি সামলাল। বিলে বিশ শতাংশ ছাড় দিল। লোকটা শান্ত হলো।
পরে মালিক সাগরকে বলল, "গ্লাস সামনে দিবি না। পাশে দিবি। বাচ্চার হাত থেকে দূরে। এত সিম্পল জিনিস বুঝিস না?"
সাগর মাথা নোয়াল। বলল, "জি ভাই।"
রাগ হলো। বুকের ভেতরে। গলার কাছে উঠে এল। কিন্তু সাগর গিলে ফেলল। রাগ গেলা যায়। অভ্যাস করলে সহজ হয়।
৫
রাগ করার অধিকার সাগরের নেই।
সে এটা বোঝে। গভীরভাবে বোঝে। রাগ একটা বিলাসিতা। যাদের বিকল্প আছে তারা রাগ করতে পারে। অফিসের লোক বসকে চিঠি দিয়ে চাকরি ছাড়তে পারে। গার্মেন্টসের মেয়ে পাশের ফ্যাক্টরিতে যেতে পারে। কিন্তু সাগর গেলে যাবে কোথায়? মিরপুরে আরো পঞ্চাশটা রেস্তোরাঁ আছে। প্রতিটাতে দশজন করে বয় লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কাজ নেই। কাজ চায়। যেকোনো কাজ।
রাগ করলে চাকরি যায়। চাকরি গেলে ভাত যায়। শুধু সাগরের ভাত না। নোয়াখালীতে বাবার ভাত। মায়ের ভাত। দুই বোনের ভাত।
সাগর প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা পাঠায়। বিকাশে। মাস শেষে বেতন ছয় হাজার, টিপস যা আসে, মোট চোদ্দ হাজারের মতো। পাঁচ হাজার বাড়িতে পাঠায়। বাকিতে চলে। ঢাকায়। মিরপুরের একটা মেসে থাকে। বারোজন একসাথে। একটা ঘরে চারটা বিছানা। মাসে দুই হাজার ভাড়া। বাকি টাকায় নিজের খাওয়া, ফোনের রিচার্জ, মাঝে মাঝে একটা গেঞ্জি বা লুঙ্গি।
সঞ্চয় শূন্য। প্রতি মাস শেষে শূন্য। প্রতি মাস শুরুতে শূন্য।
৬
রেস্তোরাঁর রান্নাঘর থেকে বিরিয়ানির গন্ধ আসে।
ঘি। মশলা। মাংস। চাল ভাপে ফুলছে। হাঁড়ির ঢাকনায় কয়লা জ্বলছে। দমে রান্না হচ্ছে। গন্ধটা এমন যে খিদা লাগে, ভরপেট থাকলেও।
সাগর এই গন্ধের মধ্যে চোদ্দ ঘণ্টা কাটায়। প্লেটে করে বিরিয়ানি নিয়ে যায় টেবিলে। ধোঁয়া ওঠা ভাত, তার ওপর মাংসের টুকরো, বাদামি পেঁয়াজ ছড়ানো, পাশে সালাদ আর রায়তা। কাস্টমার খায়। সাগর দাঁড়িয়ে দেখে।
এক প্লেট মটন বিরিয়ানি তিনশো বিশ টাকা। সাগরের এক দিনের টিপস, যদি ভালো দিন হয়।
সাগর বিরিয়ানি খায় না। খেতে পারে না। দামে কুলায় না। রান্নাঘর থেকে বয়দের খাবার আলাদা। ভাত, ডাল, সবজি। কখনো একটু মাছ। ভাতটা নরম, ডালটা পাতলা। মালিক বলে, "খাবার দিই তো। আলাদা রান্না হয়। কী চাস আর?"
সাগর কিছু বলে না। সে জানে বলার কিছু নেই।
কিন্তু রাতে, রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার পর, যখন সে টেবিল মোছে, চেয়ার গুছায়, মেঝে ঝাড়ু দেয়, তখন মাঝে মাঝে একটা প্লেটে অবশিষ্ট থাকে। কাস্টমার শেষ করেনি। ভাত পড়ে আছে। একটু মাংস। সাগর সেদিকে তাকায়। তারপর প্লেট তুলে নিয়ে যায় সিংকে।
সে এটাও খায় না। এটুকু আত্মসম্মান সে রেখেছে।
৭
মালিকের নাম আনোয়ার ভাই।
আনোয়ার ভাই মোটা মানুষ। গলায় সোনার চেইন। হাতে আংটি। পায়ে স্যান্ডেল, কিন্তু স্যান্ডেলটা চামড়ার, দামি। তিনটা রেস্তোরাঁ আছে তার। রয়্যাল ডাইনিং ছাড়াও ধানমন্ডিতে একটা, গুলশানে একটা। গুলশানেরটায় বিরিয়ানি পাঁচশো টাকা।
আনোয়ার ভাই পাজেরো চালায়। সিলভার রঙের। গাড়িটা রেস্তোরাঁর সামনে পার্ক করা থাকে। সাগর প্রতিদিন গাড়িটা দেখে। কখনো কখনো আনোয়ার ভাই বলে, "সাগর, গাড়িটা একটু মুছে দে।" সাগর গামছা দিয়ে গাড়ি মোছে। গাড়ির ভেতরে এসির ঠান্ডা বাতাসের গন্ধ পায়। চামড়ার সিটের গন্ধ।
আনোয়ার ভাই রাত নয়টায় চলে যায়। পাজেরোতে। সাগর তখনো দাঁড়িয়ে। আরো তিন ঘণ্টা বাকি। শেষ কাস্টমার বের হওয়া পর্যন্ত।
রাত বারোটায় রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়। সাগর তালা লাগায়। চাবি পকেটে রাখে। তারপর হাঁটে।
মেস দেড় কিলোমিটার দূরে। রিকশা নেয় না। দশ টাকাও বাঁচানো দরকার। রাস্তা ফাঁকা। কুকুর ডাকে। ল্যাম্পপোস্টের আলো পড়ে ভাঙা ফুটপাতে। সাগর হাঁটে। পা ব্যথা করে। শিরাগুলো টনটন করে। জুতো পায়ে দেয় না, প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে গেছে, তার দিয়ে বেঁধেছে।
মেসে পৌঁছায়। সবাই ঘুমাচ্ছে। সাগর জামা খোলে। পা ধোয়। শুয়ে পড়ে। ক্লান্তি এত গভীর যে ঘুম আসে সাথে সাথে।
স্বপ্নেও দাঁড়িয়ে থাকে। স্বপ্নেও "স্যার, কী দেব?" বলে।
৮
একটা জিনিস সাগর কাউকে বলে না।
সে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে। স্কুলে ভালো ছাত্র ছিল। গণিতে ভালো নম্বর পেত। বাংলায় রচনা লিখত, স্যার প্রশংসা করতেন। একবার উপজেলা পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছিল।
তারপর বাবা অসুস্থ হলেন। সংসারে টান পড়ল। সাগর স্কুল ছাড়ল। ঢাকায় এল।
প্রথমে একটা চায়ের দোকানে কাজ করত। তারপর একটা মুদি দোকানে। তারপর রেস্তোরাঁ। হোটেল বয়। ওয়েটার। যে নামেই ডাকো।
মাঝে মাঝে, রাতে, মেসের চৌকিতে শুয়ে, সে ভাবে: যদি পড়া চালিয়ে যেতে পারত? যদি এসএসসি দিতে পারত? যদি কলেজে যেতে পারত?
তারপর ভাবনা থামায়। এই ধরনের ভাবনা বিষ। এই ভাবনা ভাবলে পরদিন হাসি দিতে কষ্ট হয়। হাসি না দিলে টিপস কমে। টিপস কমলে বাড়িতে টাকা কমে।
তাই সাগর ভাবে না।
৯
আজ বুধবার। রাত এগারোটা।
একজন কাস্টমার বসে আছে। একা। বিরিয়ানি খাচ্ছে। ধীরে ধীরে। ফোনে কথা বলছে। হাসছে। বিরিয়ানির প্লেটে অর্ধেক পড়ে আছে।
সাগর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। লোকটা শেষ করলে টেবিল গুছিয়ে তালা লাগাবে। লোকটার তাড়া নেই। সে ফোনে বন্ধুর সাথে কথা বলছে, পরের সপ্তাহে কক্সবাজার যাওয়ার প্ল্যান করছে।
সাগর দাঁড়িয়ে শোনে। কক্সবাজার। সমুদ্র। সাগর নোয়াখালীর ছেলে, সমুদ্রের কাছাকাছি বড় হয়েছে, কিন্তু কক্সবাজার যায়নি কখনো। যাওয়ার কথা মনেও আসে না। কোন টাকায় যাবে? কোন ছুটিতে যাবে? ছুটি মাসে দুইদিন। সেই দুইদিনে কাপড় ধোয়, মেসের তোশক রোদে দেয়, ঘুমায়।
লোকটা শেষ করল। বিল দিল। টিপস রাখল পঞ্চাশ টাকা। চলে গেল।
সাগর পঞ্চাশ টাকা পকেটে রাখল। প্লেট তুলল। অর্ধেক বিরিয়ানি ফেলে দিল ডাস্টবিনে। টেবিল মুছল। চেয়ার উল্টে রাখল টেবিলের ওপর। মেঝে ঝাড়ু দিল। লাইট নেভাল। তালা লাগাল।
বাইরে বের হলো। রাতের বাতাস। শীত নেই, গরমও নেই। মার্চ মাস। আকাশে চাঁদ নেই। তারা আছে কিছু, ঢাকার আলোতে ঝাপসা।
সাগর হাঁটতে শুরু করল। পায়ের শিরায় যন্ত্রণা। পেশিতে ক্লান্তি। মেরুদণ্ডে ব্যথা। শরীর বলছে, থামো। সাগর থামে না। থামলে মেসে পৌঁছাবে না। মেসে না পৌঁছালে ঘুমাতে পারবে না। না ঘুমালে কাল দাঁড়াতে পারবে না। না দাঁড়ালে কাজ হবে না।
সবকিছু একটা শিকলের মতো। একটা জোড়া খুললে পুরোটা ভেঙে পড়ে।
১০
সাগর হাঁটে।
পাজেরো তাকে ওভারটেক করে যায়। সিলভার রঙের না, এটা সাদা। অন্য কারো। কিন্তু সাগরের মনে পড়ে আনোয়ার ভাইয়ের গাড়ি। সে ভাবে, আনোয়ার ভাই এখন বাসায়। এসি রুমে। বিছানায়। হয়তো ঘুমাচ্ছে। হয়তো টিভি দেখছে।
সাগর হাঁটে।
সে কোনোদিন আনোয়ার ভাইকে ঘৃণা করেনি। ঘৃণা করার শক্তি নেই তার। ঘৃণাও বিলাসিতা। রাগের মতো। ক্ষোভের মতো। এগুলো যাদের পেটে ভাত আছে, তাদের আবেগ। সাগরের আবেগ একটাই: আগামীকালও যেন কাজটা থাকে। এটুকুই।
মেসের গলিতে ঢুকল। নর্দমার গন্ধ। মশা। একটা বিড়াল ডাস্টবিন ঘাঁটছে। সাগর দরজা খুলল। ঘরে চারজন ঘুমাচ্ছে। সে নিজের চৌকিতে গেল। জামা খুলল। স্যান্ডেল খুলল। পা দুটো ছুঁয়ে দেখল। ফোলা। শিরা স্পষ্ট। গরম।
শুয়ে পড়ল।
সকাল দশটায় আবার দাঁড়াবে। আবার হাসবে। আবার "স্যার" বলবে। আবার বিরিয়ানির গন্ধ নেবে, খাবে না। আবার কেউ থুতু ফেলবে, সে মুছবে। আবার কেউ চিৎকার করবে, সে মাথা নোয়াবে।
রাগ করার অধিকার তার নেই। রাগ করলে চাকরি যায়। চাকরি গেলে ভাত যায়।
সাগর ঘুমায়। পা দুটো ব্যথায় টনটন করে। স্বপ্নে সে দাঁড়িয়ে আছে। একটা লম্বা লাইন। কাস্টমারের লাইন। শেষ নেই। প্রত্যেকের মুখে অর্ডার। প্রত্যেকের চোখে তাড়া। সাগর দৌড়াচ্ছে, কিন্তু লাইন ছোট হচ্ছে না।
ভোরে আজান হয়। সাগর জাগে না। ক্লান্তি তাকে ধরে রাখে বিছানায়, যেভাবে মাটি ধরে রাখে শেকড়কে।
আটটায় জাগে। মুখ ধোয়। চা বানায়। রুটি খায়। স্যান্ডেল পরে। বের হয়।
রয়্যাল ডাইনিংয়ের সামনে দাঁড়ায় দশটার আগে। তালা খোলে। চেয়ার নামায়। টেবিল মোছে। গ্লাস সাজায়। মেনু কার্ড রাখে।
দরজা খোলে।
প্রথম কাস্টমার ঢোকে। সাগর হাসে।
"স্যার, কী দেব?"