রাস্তার খাবার বিক্রেতা

ওরা হাসে আমার ফুচকা খেয়ে। আমি হাসি না। কারণ হাসির সময় নেই

পর্ব ৪১ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আমেনার সাম্রাজ্য চার ফুট বাই দুই ফুট।

কাঠের ঠেলাগাড়ি। একটা বড় বাটিতে তেঁতুলের জল। একটা বাটিতে মুড়ি-পেঁয়াজ-কাঁচা মরিচের মিশ্রণ। একটা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে ফুচকার খোল, গোল, ফাঁপা, ভাজা। একটা গামলায় সেদ্ধ ছোলা-আলু। আর একটা টিনের কৌটায় তেল, যেটার ঢাকনা হারিয়ে গেছে তিন বছর আগে।

এই তার দুনিয়া। বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটা।

আমেনার বয়স বত্রিশ। দেখতে পঁয়তাল্লিশের মতো লাগে। রোদে পুড়েছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে, ধোঁয়ায় চোখ জ্বলেছে। হাতের তালুতে তেলের দাগ, যেটা সাবান দিয়ে ঘষলেও যায় না। নখ ছোট করে কাটা, কারণ লম্বা নখে ফুচকার খোলে ছোলা ভরা যায় না। চুল বেঁধেছে শক্ত করে, মাথায় কালো স্কার্ফ, কপালে ঘামের রেখা।

স্বামী মারা গেছে চার বছর আগে। বাসের চাপায়। ক্ষতিপূরণ পায়নি। মামলা করার টাকা ছিল না। মামলা করলেও কিছু হতো না, এটা আমেনা জানে। সে মামলা করেনি।

দুটো ছেলেমেয়ে। রিনা, দশ বছর। সবুজ, সাত বছর। রিনা স্কুলে যায়। সবুজও যায়। দুজনেই সরকারি স্কুলে। বই ফ্রি। কিন্তু খাতা ফ্রি না। কলম ফ্রি না। জুতা ফ্রি না।

আমেনা প্রতিদিন বিকেল চারটায় উঠোনে বসে ফুচকার প্রস্তুতি নেয়। ময়দা মাখে। গোল গোল বেলে কড়াইয়ে ভাজে। তেলের দাম বেড়েছে। গত বছর লিটার একশো ষাট ছিল। এখন একশো পঁচানব্বই। প্রতিদিন এক লিটার লাগে।

বিকেল পাঁচটায় আমেনা ঠেলাগাড়ি নিয়ে বের হয়।

কলেজের মোড়ে তার জায়গা। পাকা ফুটপাতের এক কোণে। ডান পাশে সিমেন্টের দেয়াল, বাঁ পাশে নর্দমা। জায়গাটা ভালো, কারণ কলেজ থেকে মেয়েরা বের হয়ে এদিক দিয়ে যায়। ছেলেরাও আসে, কিন্তু মেয়েদের ভিড় বেশি।

জায়গাটা ভালো বলেই সমস্যা।

এই জায়গার জন্য আমেনা প্রতি সপ্তাহে দুইশো টাকা দেয়। বাবুল নামে একটা ছেলে আসে প্রতি শনিবার। বাবুলের বয়স কুড়ি-বাইশ হবে। গলায় সোনার চেইন, হাতে ব্র্যান্ডের ঘড়ি, চোখে রোদচশমা। বাবুল নিজে মাস্তান না। মাস্তানের ছেলে। পাড়ার রাজু ভাইয়ের ছেলে। রাজু ভাই ওয়ার্ড কাউন্সিলরের লোক।

দুইশো টাকা না দিলে কী হবে আমেনা জানে। গত বছর পাশের চটপটিওয়ালা দেয়নি। তার ঠেলাগাড়ি উলটে দিয়েছিল রাতে। গাড়ি ভেঙেছে, চটপটির বাটি ভেঙেছে, লোকটা পরদিন থেকে আর আসেনি। কোথায় গেছে কেউ জানে না। জিজ্ঞেসও করে না।

আমেনা দেয়। প্রতি সপ্তাহে। মাসে আটশো। তার মাসিক আয় পনেরো হাজারের মতো। আটশো চাঁদা। ফুটপাত দখলের জন্য চাঁদা, যে ফুটপাত সরকারের।

এটা ট্যাক্স। কিন্তু সরকারকে দেয় না। মাস্তানকে দেয়।

সন্ধ্যা ছটা। ভিড় শুরু হয়েছে।

"আপা, পাঁচটা ফুচকা দেন।"

কলেজের মেয়েরা। তিনজন। সালোয়ার-কামিজ পরা। ব্যাগ কাঁধে। হাতে ফোন। একজনের কানে ইয়ারফোন ঝুলছে।

আমেনা ফুচকার খোল নেয়। বুড়ো আঙুলে চাপ দিয়ে একটু ভাঙে। ভেতরে ছোলা-আলু ভরে। তেঁতুলের জলে ডুবিয়ে বাটিতে সাজায়। পাঁচটা। তিনবার। পনেরোটা ফুচকা।

"কত?" "তিশ টাকা।"

একজন দশ টাকার তিনটা নোট দিল।

মেয়েরা ফুচকা খায়। চোখ বন্ধ করে। মুখে টক-ঝাল-মিষ্টির বিস্ফোরণ। একজন বলে, "আহা, কী স্বাদ!" আরেকজন হাসে, হাসতে হাসতে তেঁতুলের জল ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়ে, সে টিস্যু দিয়ে মোছে।

আমেনা দেখে। মেয়েগুলোর বয়স তার মেয়ে রিনার চেয়ে দশ-বারো বছর বেশি। কলেজে পড়ে। বই পড়ে। ইংরেজি বলে। ফোনে ছবি তোলে। তিশ টাকার ফুচকা কিনতে পারে, হেসে হেসে খেতে পারে, টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে পারে।

রিনা কি কোনোদিন কলেজে যাবে?

আমেনা এই প্রশ্ন করে না নিজেকে। প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে হয়। উত্তর দিলে ভাবতে হয়। ভাবলে হাত কাঁপে। হাত কাঁপলে ফুচকা পড়ে যায়।

সে পরের খদ্দেরের দিকে তাকায়।

রাত আটটা। ভিড় কমেছে।

আমেনা হিসাব করে। আজকের বিক্রি কত হলো। ষাটটা প্লেট হয়েছে। প্রতি প্লেটে পাঁচটা ফুচকা, দশ টাকা প্লেট। ছয়শো টাকা। কিন্তু কিছু মানুষ ছয়টা-সাতটা করে নিয়েছে, বেশি দাম দিয়েছে। মোট হয়তো সাতশো-সাড়ে সাতশো।

খরচ? ময়দা: আশি টাকা। তেল: একশো পঁচানব্বই টাকা। ছোলা: পঞ্চাশ টাকা। আলু: ত্রিশ টাকা। তেঁতুল: বিশ টাকা। মশলা: পঁচিশ টাকা। মোট কাঁচামাল: চারশো টাকা।

লাভ: তিনশো-সাড়ে তিনশো।

এই দিয়ে দুই সন্তান খাওয়ানো। ঘর ভাড়া দেওয়া। স্কুলের খরচ চালানো। ওষুধ কেনা। সবুজের গত মাসে জ্বর হয়েছিল, ডাক্তারের ফি তিনশো, ওষুধ পাঁচশো। দুই দিনের লাভ চলে গেছে।

তিনশো টাকায় একটা পরিবার চলে। শহরের লোকে বিশ্বাস করবে না। তিনশো টাকায় তারা একবেলা কফি খায়।

আমেনা কফি কী সেটা জানে। খায়নি কোনোদিন। খাওয়ার ইচ্ছাও নেই। ইচ্ছা রাখার সময় নেই।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পৌরসভার গাড়ি এল।

একটা পিকআপ ভ্যান। পেছনে দুইজন লোক। সামনে একজন অফিসার। তারা ফুটপাতের দোকানগুলো তুলে দিতে এসেছে। "অভিযান"। প্রতি মাসে দুই-তিনবার হয়। টিভিতে খবর হয়: "ফুটপাত দখলমুক্ত করল পৌরসভা।" ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়, অফিসার কথা বলেন, "নাগরিকদের চলাচলের সুবিধার্থে..."

আমেনা ঠেলাগাড়ি টেনে নিয়ে গলিতে ঢুকল। দ্রুত। অভিজ্ঞতা আছে। কতবার করেছে। ঠেলাগাড়ি ভারী, তেঁতুলের জলের বাটি কাত হয়ে গেল, খানিকটা চলকে পড়ল রাস্তায়। আমেনা পরোয়া করল না। গাড়ি বাঁচানো দরকার। তেঁতুলের জল আবার বানানো যায়।

পৌরসভার লোকেরা পাশের মুড়িওয়ালার ঠেলা ধরল। মুড়িওয়ালা বুড়ো, দৌড়াতে পারেনি। তারা ঠেলাগাড়ি তুলে ভ্যানে দিল। মুড়িওয়ালা দাঁড়িয়ে দেখল। কিছু বলল না। কী বলবে? কাকে বলবে?

পনেরো মিনিট পর ভ্যান চলে গেল।

আমেনা গলি থেকে ঠেলাগাড়ি বের করে আবার জায়গায় গেল। তেঁতুলের জল কম আছে। আজকের বাকি সময় এই দিয়ে চালাতে হবে।

মুড়িওয়ালা পরদিন থানায় গেল। ঠেলাগাড়ি ফেরত পেতে পাঁচশো টাকা দিল। অনানুষ্ঠানিক। রসিদ নেই।

আমেনা এসব দেখেছে এত বার যে এখন আর কিছু মনে হয় না। ভয়ও না। রাগও না। শুধু হিসাব করে: কত সময় নষ্ট হলো, কত বিক্রি কমল।

বর্ষাকাল এল।

বৃষ্টি মানে খদ্দের নেই। কে বৃষ্টিতে ভিজে ফুচকা খাবে? ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া যায় না, দুই হাত লাগে। একটা ছাতায়, একটা বাটিতে। কিন্তু তেঁতুলের জল ঢালবে কীভাবে?

আমেনা বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে থাকে। আয় শূন্য। কিন্তু খরচ শূন্য না। ভাড়া দিতে হয়। চাল কিনতে হয়। বাচ্চাদের খাওয়াতে হয়।

টানা তিন দিন বৃষ্টি হলে আমেনা পাড়ার একটা মেয়ের বাসায় কাজ করে। থালাবাসন ধোয়া। কাপড় কাচা। ঘর মোছা। দিনে দুইশো টাকা। এটা বিকল্প, মূল পেশা না। মূল পেশা ফুচকা।

আর গরমকাল? গরমে অন্য সমস্যা। তেঁতুলের জল দ্রুত নষ্ট হয়। সকালে বানালে বিকেলে টক গন্ধ ওঠে। খদ্দের বলে, "আপা, জলটা কি পুরনো?" আমেনাকে দুপুরে বানাতে হয়, ঠিক বের হওয়ার আগে। তাতে সময় বেশি লাগে। আর তেলে ভাজা ফুচকা গরমে নরম হয়ে যায়। কুড়মুড়ে থাকে না। খদ্দের বলে, "আপা, ফুচকা তো মচমচে না।"

আমেনা বলে, "নতুন ভেজে দিচ্ছি।" আবার কড়াইয়ে তেল গরম করে। ধোঁয়া ওঠে। ঘামে ভেজে। আরো তেল খরচ হয়। লাভ কমে।

শীতকাল ভালো। ফুচকার সেরা সময়। তেঁতুলের জল ঠান্ডায় টাটকা থাকে। খোল মচমচে থাকে। খদ্দের বাড়ে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আমেনা দিনে পাঁচশো-ছয়শো টাকা লাভ করে। এই দুই মাসের সঞ্চয় দিয়ে বাকি বছর চলে।

দুই মাসের ওপর দশ মাস দাঁড়িয়ে আছে। এই হিসাব।

রাত সাড়ে নটা।

খদ্দের আর আসবে না। আমেনা গোছগাছ শুরু করে। বাটিগুলো পুরনো পলিথিনে ঢাকে। বাকি ফুচকার খোল আলাদা রাখে, কাল সকালে বাচ্চাদের নাস্তা হবে। তেঁতুলের জল? যা বেঁচে গেছে ফেলে দেবে। কাল নতুন বানাবে।

ঠেলাগাড়ি টেনে বাসায় ফেরে। পনেরো মিনিটের রাস্তা। অন্ধকার গলি। রাস্তার বাতি তিনটার মধ্যে একটা জ্বলে। বাকি দুটো ভাঙা, কবে থেকে কেউ জানে না। আমেনা অন্ধকারে হাঁটে। ভয় পায়। কিন্তু ভয় পেলেও হাঁটতে হয়। ঠেলাগাড়ি বাসায় না আনলে চুরি যাবে। একবার যায়নি। রেখে গেছিল রাস্তায়। সকালে গিয়ে দেখে চাকা নেই। কে নিয়েছে জানে না। চাকা কিনতে পাঁচশো টাকা লেগেছিল।

বাসায় পৌঁছে ঠেলাগাড়ি ঘরের সামনে রাখে। তালা দেয়। তালা পুরনো, কেউ চাইলে ভাঙতে পারে। কিন্তু আর কী করবে?

রিনা আর সবুজ ঘুমিয়ে গেছে। একটা ঘর। মেঝেতে চাটাই। দুটো বালিশ, একটা কাঁথা। পাশে একটা ছোট টেবিল, তার ওপর রিনার বই আর একটা কেরোসিনের বাতি। বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু মিটারের বিল বাঁচাতে সন্ধ্যার পর কেরোসিন জ্বালায় মাঝে মাঝে।

আমেনা বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকায়। ঘুমন্ত মুখ। নিশ্চিন্ত মুখ। তারা জানে না মা কতটুকু আয় করে। জানে না মা মাস্তানকে চাঁদা দেয়। জানে না পৌরসভা মাকে তাড়ায়। জানে না বৃষ্টির দিনে মায়ের আয় শূন্য।

ভালোই। জানার দরকার নেই এখন।

শুক্রবার রাতে একটা ঘটনা ঘটল।

একদল ছেলে এল। চার-পাঁচজন। কলেজের ছেলে হবে, কিন্তু মুখ দেখে মনে হয় না পড়াশোনা করে। নেশার গন্ধ। চোখ লাল।

"আপা, দশটা ফুচকা দেন। ফ্রি।"

আমেনা বলল, "ফ্রি দিই না।"

"দেন না? দেখি তো।" একজন বাটির দিকে হাত বাড়াল। আমেনা বাটি সরিয়ে নিল।

"বলেছি তো, ফ্রি দিই না। কিনতে চাইলে কেনেন।"

ছেলেগুলো হাসল। এমন হাসি যেটাতে মজা নেই, হুমকি আছে। একজন ঠেলাগাড়িতে লাথি মারল। গাড়ি কাঁপল। তেঁতুলের জলের বাটি থেকে জল ছলকে পড়ল।

পাশের চা-দোকানের মালিক চেঁচিয়ে বলল, "এই, কী করো? মহিলার দোকান।"

ছেলেগুলো থামল। চা-দোকানি বুড়ো, কিন্তু গলা জোরালো। পাড়ায় চেনে। ছেলেগুলো গালি দিতে দিতে চলে গেল।

আমেনা ঠেলাগাড়ি সোজা করল। তেঁতুলের জল মুছল। হাত কাঁপছিল। সে হাত চেপে ধরল। কাঁপুনি থামাল। পরের খদ্দেরকে ফুচকা দিল।

রাতে বাসায় ফিরে কাঁদল। এটা সে কাউকে বলবে না। কাকে বলবে? রিনাকে? সবুজকে? তারা বাচ্চা। পুলিশকে? পুলিশ কী করবে? কোন অভিযোগ? কে লাথি মেরেছে? নাম জানে না, চেহারা মনে নেই।

আমেনা চোখ মুছে ভাত বসাল। কাল আবার যেতে হবে।

কলেজের মেয়েরা আসে প্রতিদিন।

একই মেয়েরা। আমেনা তাদের চেনে। যে মেয়েটা সবসময় ছয়টা ফুচকা নেয়, তার নাম তানিয়া। তানিয়া মাঝে মাঝে বলে, "আপা, আপনার ফুচকা সেরা। আমি দশটা দোকানে খেয়েছি, কোথাও এত ভালো না।"

আমেনা হাসে। পাতলা হাসি। ঠোঁটের কোণে।

তানিয়া আজ বলল, "আপা, আপনার ছেলেমেয়ে আছে?"

"দুইটা।"

"তারা কী করে?"

"পড়ে।"

"কোথায় পড়ে?"

"স্কুলে।"

তানিয়া আর জিজ্ঞেস করেনি। সে বুঝতে পারে আমেনা বেশি কথা বলতে চায় না। তানিয়া তিশ টাকা দিয়ে চলে গেল। তার বান্ধবীরা হাসতে হাসতে রাস্তা পার হলো। তাদের হাসির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ট্রাফিকের আওয়াজে।

আমেনা তাদের পিছন ফিরে দেখল না। পরের খদ্দেরের ফুচকা সাজাতে লাগল।

ওরা হাসে আমার ফুচকা খেয়ে। আমি হাসি না। কারণ হাসির সময় নেই।

এটা আমেনা কাউকে বলেনি। বলবেও না। কারণ এটা অভিযোগ না। এটা বিবরণ। আমেনার জীবনের বিবরণ। হাসির সময় নেই, কান্নার সময় নেই, ভাবার সময় নেই। শুধু ফুচকা বানানোর সময় আছে।

১০

রমজান মাস।

ইফতারের সময় ফুচকার চাহিদা বাড়ে। আমেনা ডবল তৈরি করে। কাঁচামাল দ্বিগুণ কেনে। বিকেল চারটা থেকে শুরু করে। ইফতারের ঠিক আগে, বিকেল পৌনে ছটা থেকে সোয়া ছটা, পনেরো-বিশ মিনিটে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। মানুষ তাড়াহুড়ো করে। "তাড়াতাড়ি দেন আপা, আজান হয়ে যাবে।"

আমেনা দ্রুত হাত চালায়। খোল ভাঙা, ছোলা ভরা, জল ডোবানো, বাটিতে দেওয়া। একজন, দুইজন, তিনজন, চারজন। লাইন। ঘাম। হাত থামে না।

রমজানে আমেনা রোজা রাখে। সারাদিন না খেয়ে বিকেলে ফুচকা বানায়। ক্ষুধার্ত পেটে। তেঁতুলের জলের গন্ধ নাকে ঢোকে। খোলের মচমচে আওয়াজ কানে আসে। মানুষ তার সামনে খায়। সে দেখে।

ইফতারের পর আমেনা বাসায় গিয়ে খায়। ভাত, ডাল, একটু সবজি। ফুচকা খায় না। নিজের ফুচকা নিজে খায় না। কখনো খায় না। কেন খায় না সে নিজেও জানে না। হয়তো সারাদিন ফুচকা দেখতে দেখতে আর খেতে ইচ্ছা করে না। হয়তো ফুচকা তার কাছে খাবার না, পণ্য। পণ্য খাওয়া যায় না।

রমজানে আয় বাড়ে। দিনে পাঁচশো-ছয়শো লাভ। ত্রিশ দিনে পনেরো-আঠারো হাজার। ঈদের জামাকাপড়ের টাকা এখান থেকেই আসে।

রিনা বলে, "আম্মা, ঈদে নতুন জামা পাব?"

"পাবি।"

সবুজ বলে, "আমি জুতা চাই।"

"পাবি।"

আমেনা পাবে কিছু? নিজের জন্য? একটা শাড়ি? একটা চুড়ি?

আমেনা কেনে না নিজের জন্য। শেষ কবে কিনেছিল মনে নেই। স্বামী বেঁচে থাকতে হয়তো। স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের জন্য কেনা বন্ধ। কেনার ইচ্ছাও বন্ধ।

ঠেলাগাড়ি তার সাম্রাজ্য। চার ফুট বাই দুই ফুট। এর বাইরে আমেনার কিছু নেই। এর ভেতরে সবকিছু আছে।