মুদি দোকানদার

আমি সবার দোকানদার। কিন্তু আমার কোনো দোকানদার নেই যে আমাকে বাকি দেবে

পর্ব ৪২ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

নজরুলের দোকানে তিনটা খাতা আছে।

একটা কালো মলাটের। সেটায় পাইকারের হিসাব। কী কিনেছে, কত দামে, কবে পেমেন্ট দিয়েছে। এটা পরিষ্কার খাতা। সব লেখা স্পষ্ট। তারিখ আছে, অঙ্ক মেলে।

দ্বিতীয়টা নীল মলাটের। সেটায় দৈনিক বিক্রির হিসাব। কত বিক্রি হলো, কত নগদ এল, কত খরচ গেল। এটাও মোটামুটি পরিষ্কার।

তৃতীয়টা লাল মলাটের। সেটা বাকির খাতা।

এই খাতাটা নজরুলের শত্রু। এই খাতা তাকে মারছে। ধীরে ধীরে। প্রতিদিন একটু একটু করে।

নজরুলের বয়স পঞ্চান্ন। পঁচিশ বছর ধরে এই দোকান চালায়। বাবার দোকান ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর নজরুল ধরেছে। তখন সে ত্রিশ বছরের যুবক। চুলে কালো ছিল। এখন সাদা। দাঁত ছিল বত্রিশটা, এখন ছাব্বিশটা। চোখে চশমা লাগেনি তখন, এখন চশমা ছাড়া দোকানের ওজনও পড়তে পারে না।

দোকানটা আট ফুট বাই দশ ফুটের। পাড়ার মোড়ে। ডান দিকের দেয়ালে তাক, তাকে চালের বস্তা, ডালের বস্তা, চিনি, নুন, হলুদ, মরিচ, তেল। বাঁ দিকে সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, ম্যাচ, মোমবাতি। সামনে কাঁচের বাক্সে বিস্কুট, চানাচুর, চকলেট। ওপরে ঝুলছে চিপসের প্যাকেট, নুডলসের প্যাকেট।

পাঁচ হাজার পণ্য। প্রতিটার দাম নজরুলের মুখস্থ।

সকাল সাতটা। দোকান খুলেছে।

প্রথম খদ্দের সাকিনা ভাবি। পাশের বাড়ির।

"নজরুল ভাই, এক কেজি চাল দেন। আর আধা কেজি ডাল। আর একটু তেল।"

নজরুল চাল মাপে। ডাল মাপে। তেল বোতলে ভরে।

"কত হলো?"

"একশো বিশ টাকা।"

সাকিনা ভাবি পার্সে হাত দিল। তারপর বলল, "আজ নগদ নেই। পরে দেব। স্বামী মাস শেষে মাইনে পায়, তখন।"

নজরুল লাল খাতা খুলল। সাকিনা ভাবির নামের পাশে লিখল: ১২০ টাকা। তারিখ। স্বাক্ষর নেই, স্বাক্ষর নেওয়া যায় না, প্রতিবেশী, অপমান হবে।

সাকিনা ভাবির আগের বাকি: এগারোশো টাকা। তিন মাসের। "পরে দেব" তিন মাস ধরে "পরে" আছে।

নজরুল কিছু বলে না। কী বলবে? "বাকি দেবো না?" তাহলে সাকিনা ভাবি অন্য দোকানে যাবে। সেখানেও বাকি নেবে। কিন্তু নজরুলের দোকানে আর আসবে না। নগদ বিক্রিও হারাবে নজরুল। কারণ সাকিনা ভাবি নগদেও কেনে, সবসময় বাকিতে কেনে না।

এটাই ফাঁদ। বাকি দিতে হয় নগদ ধরে রাখার জন্য।

দুপুরের মধ্যে বারোজন খদ্দের এসেছে। আটজন নগদে কিনেছে। চারজন বাকিতে।

বাকির মোট: তিনশো পঞ্চাশ টাকা।

নজরুল হিসাব করে। তার দৈনিক বিক্রি গড়ে ছয়-সাত হাজার টাকা। এর মধ্যে চল্লিশ শতাংশ বাকি। মানে দিনে আড়াই-তিন হাজার টাকা বাকিতে যায়। মাসে পঁচাত্তর-নব্বই হাজার টাকা।

এই বাকির কত ফেরত আসে?

ষাট শতাংশ। বাকি চল্লিশ শতাংশ কখনো আসে না।

মাসে ত্রিশ-ছত্রিশ হাজার টাকা ডুবে যায়। বছরে তিন লাখ ষাট হাজার থেকে চার লাখ ত্রিশ হাজার। পঁচিশ বছরে কত? নজরুল হিসাব করে না। করলে পাগল হয়ে যাবে।

মুদি দোকানে লাভের মার্জিন আট থেকে দশ শতাংশ। চালে পাঁচ শতাংশ। তেলে সাত শতাংশ। সাবান-শ্যাম্পুতে দশ-বারো শতাংশ। গড়ে আট শতাংশ ধরলে ছয় হাজার টাকার বিক্রিতে লাভ চারশো আশি টাকা। মাসে চৌদ্দ হাজার চারশো।

কিন্তু ডুবে যাওয়া বাকি বাদ দিলে? মাসে চৌদ্দ হাজার চারশো থেকে ত্রিশ হাজার বাদ দিলে মাইনাস পনেরো হাজার ছয়শো।

অর্থাৎ নজরুল লোকসানে দোকান চালায়?

না। পুরো ছবিটা এত সরল না। কিছু বাকি ফেরত আসে, দেরিতে হলেও। কিছু পণ্যে মার্জিন বেশি। রমজানে, পূজায়, ঈদে বিক্রি দ্বিগুণ হয়। সব মিলিয়ে নজরুল মাসে আট-দশ হাজার টাকা বাড়িতে দিতে পারে। কখনো বারো হাজার। কখনো পাঁচ হাজার।

পঁচিশ বছরে সে কোনো সঞ্চয় করতে পারেনি। একটা পাকা ঘর করতে পারেনি। ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুলে দিতে পারেনি।

"ভাই, পরে দেবো।"

এই বাক্যটা নজরুল দিনে গড়ে সাতবার শোনে। সপ্তাহে ঊনপঞ্চাশবার। মাসে দুইশো বার। বছরে আড়াই হাজার বার।

পঁচিশ বছরে প্রায় বাষট্টি হাজার বার।

প্রতিবার সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। লাল খাতায় লেখে। খাতা বন্ধ করে।

কিছু মানুষ সত্যিই দেয়। দেরিতে হলেও। এক মাস, দুই মাস, তিন মাস পর। তারা বলে, "নজরুল ভাই, মাফ করবেন, দেরি হয়ে গেছে।" নজরুল বলে, "কোনো সমস্যা নেই।" ভেতরে একটু স্বস্তি হয়।

কিছু মানুষ আংশিক দেয়। বারোশো টাকার বাকি থাকলে পাঁচশো দেয়। বলে, "বাকিটা পরে।" পরে আর আসে না। কিছুদিন অন্য দোকানে কেনে। তারপর মুখ দেখিয়ে আবার আসে, নতুন করে কেনে, নতুন বাকি করে।

কিছু মানুষ কখনো দেয় না। এলাকা ছেড়ে চলে যায়। বা এলাকায় থাকে, কিন্তু অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটে, নজরুলের দোকানের সামনে দিয়ে যায় না। নজরুল দেখে। দূর থেকে। লোকটা ঘুরে যাচ্ছে, অন্য গলি দিয়ে।

নজরুল তাকে থামায় না। ডাকে না। কী বলবে? "ওই যে, আমার সাতশো টাকা দেন?" রাস্তায়? সবার সামনে? সে এটা করতে পারে না। সে দোকানদার। দোকানদারের ইজ্জত আছে। ইজ্জত মানে চুপ করে থাকা।

নজরুলের ছেলে রাজীব ঢাকায় চাকরি করে। মাসে বিশ হাজার টাকা পায়। একটা গার্মেন্টস কোম্পানিতে অ্যাকাউন্টস সেকশনে। রাজীব মাঝে মাঝে ফোন করে।

"বাবা, দোকান কেমন?"

"ভালো।"

"লাভ হচ্ছে?"

"হচ্ছে।"

এর বেশি নজরুল বলে না। ছেলেকে কেন চিন্তায় ফেলবে? রাজীব শহরে আছে, নিজের জীবন চালাচ্ছে, সেটাই যথেষ্ট। বাবার দোকানের বাকির খাতার কথা জানার দরকার নেই।

রাজীব বলে, "বাবা, দোকান বন্ধ করে দেন। এত কষ্ট করেন কেন? আমি টাকা পাঠাব।"

নজরুল বলে, "দোকান বন্ধ করলে কী করব? ঘরে বসে থাকব?"

সত্যি কথা এটা না। সত্যি কথা হলো, নজরুল দোকান বন্ধ করতে পারে না কারণ দোকান বন্ধ করলে বাকির টাকা কোনোদিন পাবে না। যতদিন দোকান আছে ততদিন একটা আশা আছে যে কেউ হয়তো কোনোদিন বাকি মিটিয়ে দেবে। দোকান বন্ধ হলে কেউ আর মনেও করবে না।

দোকান বন্ধ করা মানে তিন লাখ টাকার বাকি মাফ করে দেওয়া। এটা নজরুলের পক্ষে সম্ভব না। টাকার জন্য না। নীতির জন্য। সে সবাইকে বিশ্বাস করেছে। বিশ্বাস ফেরত না পেলে সে কী নিয়ে বাকি জীবন কাটাবে?

বিকেল পাঁচটা। দোকানে বসে আছে নজরুল।

হালিম মিয়া এল। হালিম মিয়া রিটায়ার্ড স্কুলশিক্ষক। পেনশন পায়। ভদ্রলোক। কিন্তু পেনশন মাসের মাঝখানে শেষ হয়ে যায়।

"নজরুল, দুই কেজি চাল আর এক কেজি আলু দাও।"

নজরুল দিল।

"কত?"

"একশো সত্তর টাকা।"

হালিম মিয়া পকেটে হাত দিল। একশো টাকার একটা নোট বের করল। বাকি সত্তর টাকা নেই।

"সত্তর টাকা পরশু দেব। পেনশনের তারিখ পরশু।"

নজরুল লাল খাতা খুলল। লিখল। হালিম মিয়া চলে গেল।

নজরুল জানে হালিম মিয়া দেবে। হালিম মিয়া সবসময় দেয়। কিন্তু সবাই হালিম মিয়া না। সবাই হালিম মিয়া হলে নজরুলের দোকান চলত ভালোমতো।

হালিম মিয়ার পরে এল ফারুক। ফারুক রিকশাচালক। ফারুকের বাকি এখন তেরোশো টাকা। সাত মাসের। ফারুক বলল, "ভাই, একটু সরিষার তেল দেন। আর একটু চিনি।"

নজরুল তেল আর চিনি দিল। বাকির খাতায় আরো নব্বই টাকা যোগ হলো।

ফারুক কি দেবে? নজরুল জানে না। কিন্তু ফারুকের তিনটা বাচ্চা। তেল ছাড়া রান্না হয় না। চিনি ছাড়া বাচ্চারা চা খায় না।

নজরুল কি না বলতে পারে?

পারে। কিন্তু তার পরে কী হবে? ফারুকের বাচ্চারা তেল ছাড়া ভাত খাবে? নজরুল এই ভেবে "না" বলতে পারে না। সে দোকানদার, কিন্তু মানুষও।

এটাই তার সমস্যা। সে একই সাথে দোকানদার আর মানুষ। দুটো একসাথে হওয়া যায় না। দোকানদার বলে "না"। মানুষ বলে "দাও"। নজরুল "দাও" শোনে। লাল খাতায় লেখে।

রাত নটায় দোকান বন্ধ করে।

শাটার নামায়। তালা দেয়। পকেটে হাত দেয়। আজকের নগদ গোনে। তিন হাজার দুইশো টাকা। বিক্রি হয়েছে পাঁচ হাজার চারশো। বাকি গেছে দুই হাজার দুইশো। গতকালের বাকি থেকে ফেরত এসেছে শূন্য টাকা।

নজরুল বাসায় হাঁটে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা। পাড়ার গলি দিয়ে। তার বাড়ি টিনের। দুটো ঘর। উঠোনে একটা পেয়ারা গাছ। বউ কুলসুম রান্না করে রেখেছে। ভাত, ডাল, সবজি। মাঝে মাঝে মাছ।

কুলসুম জিজ্ঞেস করে, "আজ কেমন হলো?"

"মোটামুটি।"

মোটামুটি। এটা নজরুলের সবচেয়ে ব্যবহৃত শব্দ। কখনো "ভালো" বলে না, কারণ ভালো হয় না। কখনো "খারাপ" বলে না, কারণ বউকে চিন্তায় ফেলতে চায় না। "মোটামুটি" মানে কিছু আসেনি, কিছু গেছে, জীবন চলছে।

খেতে বসে। ভাত মুখে দেয়। চিবায়। গেলে। যান্ত্রিক। খাবারের স্বাদ পায় কিনা জানে না। বিশ বছর আগে পেত। এখন শুধু খায়। খিদা মেটায়।

খাওয়ার পর বারান্দায় বসে। একটা বিড়ি ধরায়। ধোঁয়া ছাড়ে। আকাশে তারা। মশা কামড়ায়। দূরে মসজিদের আজানের শেষ সুর ভেসে আসে।

নজরুল ভাবে। তিন লাখ টাকা বাকি আছে লোকজনের কাছে। তিন লাখ। এই টাকা দিয়ে সে কী করতে পারত? দোকানে স্টক বাড়াতে পারত। ফ্রিজ কিনতে পারত, তাহলে দুধ-দই-মাখন বেচতে পারত। একটা ছোট এক্সটেনশন করতে পারত দোকানে।

কিন্তু তিন লাখ টাকা পাড়ার লোকজনের পেটে। তারা খেয়ে ফেলেছে। চাল হয়ে, ডাল হয়ে, তেল হয়ে, সাবান হয়ে।

একটা কথা নজরুল কাউকে বলে না।

সে নিজেও বাকিতে কেনে। পাইকারের কাছ থেকে। পাইকার বাকি দেয়, কিন্তু সুদ নেয়। মাসে দুই শতাংশ। ছোট মনে হয়। কিন্তু বছরে চব্বিশ শতাংশ। নজরুল পাইকারকে দেরিতে দিলে সুদ বাড়ে। সময়মতো দিলে সুদ মাফ। কিন্তু সময়মতো দিতে গেলে নগদ লাগে। নগদ আসে খদ্দেরদের কাছ থেকে। খদ্দেররা বাকিতে কেনে।

এটা একটা চক্র। নজরুল খদ্দেরদের বাকি দেয়। খদ্দেররা দেয় না। নজরুল পাইকারকে দিতে পারে না। পাইকার সুদ নেয়। সুদ নজরুলের লাভ খায়।

নজরুল মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ওপরে পাইকার, নিচে খদ্দের। দুই দিক থেকে চাপ। পাইকার বলে, "পয়সা দাও।" খদ্দের বলে, "বাকি দাও।"

আমি সবার দোকানদার। কিন্তু আমার কোনো দোকানদার নেই যে আমাকে বাকি দেবে।

এটা নজরুল একদিন বউকে বলেছিল। রাতে। ভাত খেতে খেতে। কুলসুম কিছু বলেনি। কী বলবে? সে জানে এটা সত্য। কিন্তু সত্যের সমাধান সে দিতে পারে না। সে শুধু ভাত বাড়তে পারে।

শুক্রবার। দোকান বন্ধ। নজরুল জুমার নামাজ পড়ে এসে ঘরে বসে আছে।

লাল খাতা খুলেছে। নাম পড়ছে। কে কত বাকি। হিসাব মেলাচ্ছে।

সাকিনা ভাবি: এক হাজার দুইশো কুড়ি টাকা। তিন মাস। ফারুক: এক হাজার তিনশো নব্বই টাকা। সাত মাস। কমল: দুই হাজার একশো টাকা। পাঁচ মাস। আবুল: সাতশো টাকা। দুই মাস। শাহানা: নয়শো পঞ্চাশ টাকা। চার মাস।

তালিকা লম্বা। ছিয়াশিটা নাম। ছিয়াশিটা পরিবার। সবাই পাড়ার। সবাই চেনা। সবার ছেলেমেয়ে চেনা। কার ছেলে কোথায় পড়ে নজরুল জানে। কার বউ অসুস্থ নজরুল জানে। কার চাকরি গেছে নজরুল জানে।

এটাই সমস্যা। সে সবাইকে চেনে। চেনা মানুষকে "না" বলা যায় না।

শহরের বড় দোকানে কেন এই সমস্যা নেই? কারণ সেখানে নগদ ছাড়া জিনিস মেলে না। কারণ সেখানে দোকানদার আর খদ্দের চেনে না পরস্পরকে। অচেনা মানুষকে "না" বলা সহজ।

নজরুল পঁচিশ বছর ধরে "না" বলতে পারেনি।

পঁচিশ বছর ধরে লাল খাতায় নাম লিখেছে। কিছু নাম মুছে গেছে, টাকা পেয়ে। বেশিরভাগ নাম রয়ে গেছে। কিছু নাম আছে যাদের মানুষই আর পাড়ায় নেই।

নজরুল খাতা বন্ধ করে। বালিশের নিচে রাখে। চোখ বন্ধ করে।

দোকান কাল আবার খুলবে। সাত টায়। প্রথম খদ্দের আসবে। হয়তো সাকিনা ভাবি। হয়তো অন্য কেউ। "ভাই, পরে দেবো।" নজরুল মাথা নাড়বে। লাল খাতা খুলবে। লিখবে।

এটা তার পেশা না। এটা তার শাস্তি। চেনা মানুষদের ভেতরে ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার শাস্তি।