ফেরিওয়ালা

আমি চোর না। আমি বিক্রেতা। কিন্তু দেশে গরিবের বেচাকেনা চুরির সমান

পর্ব ৪৩ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

শফিকের দোকান তার ঘাড়ে।

একটা কাপড়ের ব্যাগ। ভেতরে চিরুনি, আয়না, চুলের ক্লিপ, রাবার ব্যান্ড, নেইলকাটার, ছোট কাঁচি, আর কিছু প্লাস্টিকের খেলনা। মোট পুঁজি দুই হাজার টাকার মাল। এটা নিয়ে সে ট্রেনে চড়ে।

কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর। দিনে চারবার। প্রতিবার কুড়িটা কোচ হাঁটে। মানে দিনে আশিটা কোচ। প্রতিটা কোচ প্রায় ষাট ফুট লম্বা। আশি গুণন ষাট, চার হাজার আটশো ফুট। প্রায় দেড় কিলোমিটার। দাঁড়িয়ে, মাঝে মাঝে কুঁজো হয়ে, যাত্রীদের পা এড়িয়ে, ব্যাগ পেরিয়ে, বাচ্চাদের সামলে।

শফিকের বয়স পঞ্চাশ। শরীরে বিশ কেজি কম আছে যা থাকা উচিত। হাড়গুলো দেখা যায়। কনুই, কাঁধ, গালের হাড়। চামড়া শুকনো, যেন কাঠের ওপর কাগজ মুড়েছে। কিন্তু পা দুটো শক্ত। পঞ্চাশ বছরের পা, কিন্তু হাঁটতে পারে যেকোনো তরুণের চেয়ে বেশি।

সকাল আটটায় বের হয়। ব্যাগ কাঁধে। কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়া ঢুকে যায়। কীভাবে ঢোকে সেটা বিশ বছরের অভিজ্ঞতা। কোন গেটে কোন সময় কম পাহারা, শফিক জানে। কখনো দশ টাকা দেয় গেটের লোককে। কখনো দেয় না, শুধু হাঁটে, যেন যাত্রী।

ট্রেন ছাড়ল।

শফিক প্রথম কোচে ঢুকল। যাত্রীরা বসে আছে। জানালায় হাওয়া আসছে। কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ ফোন দেখছে, কেউ পাশের জনের সাথে কথা বলছে।

"মাদাম! চিরুনি নেবেন? মাত্র বিশ টাকা!"

শফিকের গলা। উঁচু, পরিষ্কার, অভ্যস্ত। এই গলায় বিশ বছর ধরে একই কথা বলেছে। শুরুতে লজ্জা ছিল। এখন লজ্জা মরে গেছে। লজ্জা একটা বিলাসিতা যেটা শফিক রাখতে পারেনি।

"চিরুনি! আয়না! চুলের ক্লিপ! সব বিশ টাকা! দুইটা নিলে ত্রিশ!"

একজন মেয়ে তাকাল। কলেজের মেয়ে হবে। "একটা ক্লিপ দেন।"

বিশ টাকা। শফিকের লাভ আট টাকা। ক্লিপ বারো টাকায় কেনে, বিশ টাকায় বেচে।

পরের কোচ। "ভাই! নেইলকাটার! ত্রিশ টাকা! স্টিলের! ভাঙবে না!"

কেউ কেনে না। শফিক পরের কোচে যায়।

"মাদাম! চিরুনি!"

একজন বুড়ো মহিলা বলল, "কত?"

"বিশ টাকা।"

"পনেরো দেব।"

"মাদাম, কুড়ি টাকার চিরুনি। আমি বারো টাকায় কিনি। পনেরোতে দিলে তিন টাকা লাভ। তিন টাকায় কী হয়?"

মহিলা পনেরো টাকা দিল। শফিক দিল। তিন টাকা লাভ। তিন টাকায় কিছু হয় না। কিন্তু তিন টাকা শূন্যের চেয়ে বেশি।

তৃতীয় কোচে পুলিশ।

দুইজন। কনস্টেবল। তারা যাত্রী না, ডিউটিতে আছে। ট্রেনে ফেরিওয়ালাদের ধরার ডিউটি।

শফিক দেখল। দূর থেকে। ইউনিফর্মের রঙ চেনে। কতবার দেখেছে।

সে ঘুরে গেল। পেছনের কোচে। দ্রুত পা চালাল। পুলিশ দেখলে দৌড়ানো যায় না, সন্দেহ হয়। দ্রুত হাঁটতে হয়। স্বাভাবিক মুখে। যেন যাত্রী। যেন কোচ বদলাচ্ছে।

পুলিশ দেখেনি। এবার।

শফিক অন্য কোচে গিয়ে আবার শুরু করল। "চিরুনি! আয়না!"

পুলিশের সাথে শফিকের সম্পর্ক বিশ বছর পুরনো। ধরেছে কতবার। বলেছে, "লাইসেন্স আছে?" লাইসেন্স নেই। ট্রেনে ফেরি করার কোনো লাইসেন্স হয় না। শফিক জানে, পুলিশও জানে। কিন্তু প্রশ্নটা আসল প্রশ্ন না। আসল প্রশ্ন: "কত দেবে?"

একশো টাকা। দুইশো টাকা। কখনো ব্যাগ থেকে দুই-তিনটা জিনিস নিয়ে যায়। শফিক দেয়। কিছু বলে না। দিতে হয়, এটা ব্যবসার খরচ।

কিন্তু আজ ধরা পড়লে? আজ টাকা নেই পকেটে। সকালে মালপত্র কিনতে সব খরচ হয়ে গেছে। পুলিশকে দেওয়ার মতো পঞ্চাশ টাকাও নেই।

শফিক সাবধানে হাঁটে।

দুপুর। দ্বিতীয় ট্রিপ শেষ।

শফিক কমলাপুরে নামল। প্ল্যাটফর্মের বাইরে একটা চায়ের দোকান। দুই টাকার বিস্কুট, পাঁচ টাকার চা। এটা তার দুপুরের খাবার। সাত টাকা।

পাশে আরেকজন ফেরিওয়ালা বসে আছে। সেলিম। সেলিম বাদাম বেচে। ছোট ছোট প্যাকেটে। দশ টাকা প্যাকেট।

"কেমন হলো?" সেলিম জিজ্ঞেস করল।

"তিনশো।"

"আমার দুইশো।"

দুজনে চুপ করে চা খেল। কী বলবে? তিনশো টাকায় কী হয়, দুইশো টাকায় কী হয়, দুজনেই জানে।

সেলিম বলল, "শুনেছ? রেলওয়ে নতুন নিয়ম করবে। ফেরিওয়ালা ঢুকতে পারবে না ট্রেনে। ক্যামেরা বসাবে।"

শফিক হাসল। "এই শুনি দশ বছর ধরে। কিছু হবে না। ক্যামেরা বসালেও কাজ করবে না। এদেশে ক্যামেরা বসানো হয়, কিন্তু কেউ দেখে না।"

সেলিম বলল, "কিন্তু যদি সত্যিই হয়?"

শফিক চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিল। "সত্যি হলে অন্য কিছু করব। রাস্তায় দাঁড়াব। বাসে উঠব। কোথাও না কোথাও বেচব। মাল আমার কাঁধে, পথ আমার পায়ের নিচে। দোকান ভাঙে, কিন্তু কাঁধ ভাঙে না।"

এটা সাহস না। এটা বিকল্পহীনতা। শফিক জানে এটা। কিন্তু বিকল্পহীনতাকে সাহস বলতে ভালো লাগে।

তৃতীয় ট্রিপ। বিকেল।

ট্রেন ভিড়। অফিস ফেরত যাত্রী। ক্লান্ত মুখ। শফিকের দিকে কেউ তাকায় না। সবাই ফোনে। কানে ইয়ারফোন। চোখে ক্লান্তি।

"চিরুনি! আয়না!"

কেউ কেনে না। পুরো কোচ পেরিয়ে গেল, শূন্য বিক্রি।

পরের কোচে একটা বাচ্চা কাঁদছে। মায়ের কোলে। শফিক ব্যাগ থেকে একটা প্লাস্টিকের বাঁশি বের করল। বাচ্চাটার সামনে দোলাল। বাচ্চা কান্না থামাল। হাত বাড়াল।

মা বলল, "কত?"

"দশ টাকা।"

মা দশ টাকা দিল। বাচ্চা বাঁশি নিয়ে খুশি হলো।

লাভ: পাঁচ টাকা।

শফিক পরের কোচে গেল। একজন মধ্যবয়সী লোক বলল, "ওই ভাই, একটা নেইলকাটার দেখাও তো।"

শফিক দেখাল। লোকটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল। নখ কাটল একটা। মাথা নাড়ল। "না, ধার নেই।"

ফেরত দিল। কিনল না।

শফিক ব্যাগে রাখল। কিছু বলল না। কী বলবে? "ধার আছে" বলে মিথ্যা বলবে? ত্রিশ টাকার নেইলকাটারে ধার কতটুকু থাকবে?

পরের কোচ। "চিরুনি! মাত্র বিশ টাকা!"

একটা ছেলে বলল, "এই যুগে কে চিরুনি কেনে ট্রেনে?"

তার বন্ধু হাসল। শফিক হাসল না। পরের কোচে চলে গেল।

পঞ্চাশ বছর বয়সে পুলিশের হাত থেকে দৌড়ানো।

এটা ভাবলে কেমন লাগে? শফিক জানে না। ভাবে না। ভাবার সময় নেই। দৌড়ানোর সময় ভাবা যায় না, আর দৌড়ানোর পরে ভাবার শক্তি থাকে না।

আজ চতুর্থ ট্রিপে ধরা পড়ল।

একজন কনস্টেবল। পেছন থেকে কাঁধে হাত দিল। "এই, দাঁড়া।"

শফিক দাঁড়াল। ঘোরার চেষ্টা করল না। দৌড়ানোর চেষ্টা করল না। ট্রেন চলছে, কোথায় দৌড়াবে?

"লাইসেন্স আছে?"

"লাইসেন্স হয় না, স্যার। আপনি জানেন।"

কনস্টেবল শফিকের ব্যাগ দেখল। চিরুনি, আয়না, ক্লিপ। দশ-বারোটা জিনিস।

"কত আছে তোর কাছে?"

শফিক পকেট থেকে টাকা বের করল। তিনশো আশি টাকা। সারাদিনের বিক্রি।

কনস্টেবল একশো টাকা নিল। বাকি ফেরত দিল।

"আর দেখলে ধরব। যা।"

শফিক চলে গেল। একশো টাকা কম। সারাদিনের আয় এখন দুইশো আশি। কাঁচামালের দাম বাদ দিলে লাভ? একশো পঞ্চাশ। হয়তো একশো আশি।

আমি চোর না। আমি বিক্রেতা। কিন্তু দেশে গরিবের বেচাকেনা চুরির সমান।

শফিক এটা ভাবে। বলে না কাউকে। কাকে বলবে? কনস্টেবলকে? সে হাসবে। যাত্রীদের? তারা ফোন থেকে চোখ তুলবে না। সেলিমকে? সেলিম জানে। বলার দরকার নেই।

রাতে শফিক বাসায় ফিরে।

বাসা বলতে বস্তির একটা ঘর। আট ফুট বাই আট ফুট। টিনের চাল, বাঁশের বেড়া। বউ আয়েশা একটা গার্মেন্টসে কাজ করে। মেয়ে তাসলিমা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলে রাকিব ষষ্ঠ শ্রেণিতে।

আয়েশা রান্না করে রেখেছে। ভাত, একটু ডাল, পেঁয়াজ ভাজা।

শফিক খায়। তাসলিমা পাশে বসে পড়ছে। খাতায় ইংরেজি লিখছে। শফিক দেখে। তাসলিমার হাতের লেখা সুন্দর। সোজা, পরিষ্কার। শফিকের হাতের লেখা খারাপ। সে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। তারপর বাবা মারা গেল, সংসার চালাতে হলো। বারো বছর বয়সে চায়ের দোকানে কাজ শুরু করেছিল। তারপর রিকশা চালিয়েছে। তারপর ভ্যান চালিয়েছে। তারপর এই ফেরি।

তাসলিমা পড়বে। কত দূর পড়বে শফিক জানে না। কিন্তু যতদূর পারে পড়াবে।

রাকিব বলল, "বাবা, আমিও বড় হয়ে ট্রেনে জিনিস বেচব।"

শফিক বলল, "তুই পড়বি। ট্রেনে জিনিস বেচবি না।"

"কেন? তুমি তো বেচো।"

"আমি বেচি কারণ আর কিছু পারি না। তুই পারবি।"

রাকিব চুপ হয়ে গেল।

শফিক ভাত খেতে খেতে ভাবল, পঞ্চাশ বছর বয়সে তার পুঁজি কত? দুই হাজার টাকার মাল। একটা কাপড়ের ব্যাগ। একটা পুরনো চপ্পল, যেটা ট্রেনে হাঁটতে হাঁটতে ক্ষয়ে গেছে। আর দুটো পা, যেগুলো এখনো চলে।

বিশ বছরে কী জমেছে? কিছু না। পরিবারকে খাইয়েছে, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়েছে, ভাড়া দিয়েছে, ওষুধ কিনেছে। টাকা ঢুকেছে, টাকা বেরিয়ে গেছে। কিছু থাকেনি।

শফিক শোয়। চোখ বন্ধ করে। পায়ে ব্যথা। হাঁটুতে ব্যথা। কোমরে ব্যথা। কাল সকালে আবার কমলাপুর। আবার ব্যাগ কাঁধে। আবার কুড়িটা কোচ। আবার "চিরুনি! আয়না!"

আর কত বছর?

শফিক জানে না। পা যতদিন চলে ততদিন।