পত্রিকা বিক্রেতা
দয়া বেচাকেনার চেয়ে খারাপ
১
সোলায়মানের ঘড়িতে এলার্ম বাজে রাত তিনটায়।
ঘড়িটা পুরনো। ক্যাসিও। ত্রিশ বছর আগে কিনেছিল। তখন দামটা মনে ছিল, এখন নেই। ঘড়ির কাচে আঁচড় পড়েছে, কিন্তু চলে এখনো। সোলায়মানের মতো।
তিনটায় ওঠে। মুখ ধোয়। চা বানায় নিজে। চিনি ছাড়া, দুধ ছাড়া। শুধু লিকার। গরম কালো পানি। এতে ঘুম ভাঙে।
সাড়ে তিনটায় সাইকেল বের করে। সাইকেলটা হিরো কোম্পানির। কবে কিনেছিল মনে নেই। কিন্তু ফ্রেম এখনো মজবুত। টায়ার বদলেছে অনেকবার। চেইন বদলেছে। ব্রেক বদলেছে। সাইকেলের মূল শরীর ছাড়া সব বদলে গেছে। তবু সাইকেল সেই সাইকেলই।
চারটায় প্রেসে পৌঁছায়। প্রেস মানে দৈনিক পত্রিকার ছাপাখানা। শহরের পশ্চিমে। রাস্তা খালি তখন। শুধু কুকুর জেগে থাকে। আর সোলায়মান।
প্রেসের গেটে আরো চার-পাঁচজন দাঁড়িয়ে থাকে। সবাই পত্রিকা বিক্রেতা। সবাই বুড়ো। তরুণরা এই কাজ করে না আর। কেন করবে? কে কাগজের পত্রিকা কেনে এখন?
২
কাগজের বান্ডিল আসে পৌনে পাঁচটায়।
সোলায়মান গোনে। আগে দুইশো কপি নিত। এখন চল্লিশ। দুইশো থেকে চল্লিশ। একটা সংখ্যা, কিন্তু এর ভেতরে বিশ বছরের পতন আছে।
দুই হাজার সালে সোলায়মানের রুটে দুইশোটা বাড়ি ছিল। প্রতিদিন সকালে পত্রিকা পৌঁছে দিত। গেটের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ফেলে দিত। কিছু বাড়িতে বারান্দায়। কিছু বাড়িতে দারোয়ানের হাতে।
তারপর ইন্টারনেট এল। ফোন এল। অনলাইন পত্রিকা এল।
একটা একটা করে খদ্দের কমল। প্রথম তরুণরা বন্ধ করল। তারপর মধ্যবয়সীরা। এখন শুধু বুড়োরা বাকি আছে। যাদের চোখে ফোনের স্ক্রিনের ছোট লেখা পড়ার ক্ষমতা নেই। যাদের অভ্যাস সকালে চায়ের সাথে কাগজ ধরা, ভাঁজ করা, পাতা উল্টানো। এরা কিনে।
চল্লিশ কপি। চল্লিশটা বাড়ি।
সোলায়মান বান্ডিল সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে বাঁধে। দড়ি দিয়ে শক্ত করে। প্যাডেল মারে।
৩
রুট পঞ্চাশ বছরের পুরনো।
সোলায়মানের বাবা শুরু করেছিল এই রুট। তারপর সোলায়মান ধরেছে। তখন সে পনেরো বছরের ছেলে। বাবার সাথে যেত। বাবা মারা গেলে একা চালাল।
রুটের প্রতিটা বাড়ি সে চেনে। কোন বাড়ির গেট কোন দিকে খোলে, কোন বাড়িতে কুকুর আছে, কোন বাড়ির বুড়ো সকালে বারান্দায় বসে থাকে।
আশরাফ সাহেবের বাড়ি। রিটায়ার্ড জজ। আশরাফ সাহেব প্রতি সকালে ঠিক পৌনে ছটায় বারান্দায় আসেন। চেয়ারে বসেন। সোলায়মান পত্রিকা দেয়, আশরাফ সাহেব মাথা নাড়েন। কোনো কথা হয় না। ত্রিশ বছর ধরে এই নিয়ম।
গত মাসে আশরাফ সাহেবের ছেলে বলল, "সোলায়মান ভাই, বাবা আর পত্রিকা পড়েন না। চোখে দেখেন না। আমরা অনলাইনে পড়ি। বন্ধ করে দেন।"
সোলায়মান বলল, "ঠিক আছে।"
চল্লিশ থেকে ঊনচল্লিশ।
কিন্তু পরদিন সকালে সোলায়মান সেই বাড়ির সামনে দিয়ে গেল। অভ্যাসে পা চলে গেল। সে থামল না, কিন্তু দেখল, আশরাফ সাহেব বারান্দায় বসে আছেন। আগের মতো। চেয়ারে। হাত ফাঁকা। কিছু পড়ছেন না। শুধু বসে আছেন।
সোলায়মান সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। পেছনে ফিরে তাকাল না।
৪
পত্রিকা বিক্রেতার আয় কত?
প্রতিটা পত্রিকায় কমিশন পাঁচ টাকা। চল্লিশ কপিতে দুইশো টাকা। মাসে ছয় হাজার।
তিরিশ বছর আগে দুইশো কপিতে কমিশন ছিল দেড় টাকা। তিনশো টাকা দিনে। মাসে নয় হাজার। তখনকার নয় হাজারের মূল্য এখনকার ত্রিশ হাজারের বেশি।
এখন ছয় হাজার টাকা। এই দিয়ে কী চলে?
ভাড়া: তিন হাজার। বাকি তিন হাজারে খাওয়া, কাপড়, ওষুধ।
সোলায়মানের স্ত্রী মারা গেছে সাত বছর আগে। ছেলে একটা, ঢাকায় থাকে, রিকশা চালায়। ছেলে মাঝে মাঝে টাকা পাঠায়। দুই-তিন হাজার। সবসময় না।
সোলায়মান একা থাকে। একটা ঘর। একটা চৌকি। একটা মশারি। একটা রেডিও, যেটা এখন আর কাজ করে না কিন্তু ফেলতে পারে না। স্ত্রীর সাথে শুনত একসময়। একটা আলমারি, তাতে দুই সেট কাপড়, একটা লুঙ্গি, একটা পাঞ্জাবি, একটা টুপি।
সকালে পত্রিকা দিয়ে আসে। বাকি সারাদিন কী করে? বসে থাকে। রান্না করে। নামাজ পড়ে। ঘুমায়। আবার রাত তিনটায় ওঠে।
৫
কিছু খদ্দের পত্রিকা পড়ে না। সোলায়মান জানে।
শামসুল হক সাহেব। পেনশনভোগী। তার চোখের সমস্যা, বড় অক্ষরও পড়তে কষ্ট। কিন্তু প্রতি মাসে নিয়মিত পত্রিকার দাম দেন।
সোলায়মান একদিন জিজ্ঞেস করল, "হক সাহেব, আপনি তো পড়তে পারেন না। কেন কেনেন?"
শামসুল হক একটু চুপ করে থেকে বলল, "পত্রিকা না কিনলে তুমি আসবা না সকালে। তাহলে সকালে কার মুখ দেখব?"
সোলায়মান কিছু বলতে পারল না। চলে গেল।
সেদিন থেকে সোলায়মান বুঝল, কিছু খদ্দের পত্রিকা কেনে না। তারা সোলায়মানকে কেনে। তার সকালের আসাটা কেনে। একটা মানুষ প্রতিদিন আসবে, গেটে পত্রিকা রাখবে, মুহূর্তের জন্য দেখা হবে, এটুকু কেনে।
দয়া।
দয়া বেচাকেনার চেয়ে খারাপ।
এটা সোলায়মান জানে। দয়ায় পত্রিকা কেনা মানে সোলায়মান একটা পণ্য না, সোলায়মান একটা দানের বিষয়। তার শ্রমের দাম নেই, তার আসার দাম আছে। মানে সে একজন শ্রমিক না, সে একজন ভিখারি যে পত্রিকা দিয়ে ভিক্ষা নেয়।
সোলায়মান এটা মেনে নেয়। কারণ দয়া না পেলে চল্লিশ কপি ত্রিশ হয়ে যাবে। তারপর কুড়ি। তারপর দশ। তারপর শূন্য।
৬
বৃষ্টির দিন।
পত্রিকা ভেজানো যাবে না। ভিজলে কালি ছড়িয়ে যায়। পড়া যায় না। খদ্দের বলবে, "এটা কী দিলে? পড়া যায় না তো।"
সোলায়মান বৃষ্টির দিনে পলিথিন দিয়ে বান্ডিল মোড়ায়। নিজে ভেজে, পত্রিকা ভেজায় না। সাইকেলের ক্যারিয়ারে পলিথিন বাঁধে। প্রতিটা বাড়িতে পত্রিকা দেওয়ার আগে পলিথিন খোলে, একটা কপি বের করে, গেটের ভেতরে ছুঁড়ে দেয়, আবার পলিথিন বন্ধ করে।
বৃষ্টিতে সাইকেল চালানো কঠিন। রাস্তা পিচ্ছিল। সোলায়মানের চোখে পানি ঢোকে। চশমা ভেজা। কিছু দেখা যায় না ঠিকমতো।
একবার পড়ে গেছিল। তিন বছর আগে। সাইকেল স্লিপ করেছিল ম্যানহোলের ঢাকনায়। কনুই ছিঁড়ে গেছিল। পত্রিকা ছড়িয়ে গেছিল রাস্তায়। বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছিল আটটা কপি। আটটা কপির দাম সোলায়মানের পকেট থেকে গেছে।
সেদিনও বাকি বত্রিশটা কপি সে পৌঁছে দিয়েছিল। কনুই থেকে রক্ত ঝরছিল। সে থামেনি। পত্রিকা পৌঁছাতে হবে সকাল ছটার মধ্যে। এটা নিয়ম। পঞ্চাশ বছরের নিয়ম। বাবার আমল থেকে।
৭
একটা কথা সোলায়মান প্রায়ই ভাবে।
পত্রিকা কি শেষ হয়ে যাবে?
সে দেখেছে, প্রতি বছর খদ্দের কমে। দুইশো থেকে একশো আশি। একশো আশি থেকে একশো পঞ্চাশ। তারপর একশো। তারপর আশি। তারপর ষাট। এখন চল্লিশ।
পাঁচ বছর পরে কত থাকবে? বিশ? দশ?
দশটা পত্রিকা দেওয়ার জন্য কি সকাল চারটায় উঠে প্রেসে যাওয়া লাভজনক? দশটা কপিতে কমিশন পঞ্চাশ টাকা। সাইকেলের চেইনের তেলের দামও এর চেয়ে বেশি।
কিন্তু সোলায়মান যাবে। দশটা কপি হলেও যাবে। পাঁচটা হলেও যাবে। কারণ এটা তার কাজ। এটা ছাড়া সে কী? একটা বুড়ো লোক যে সকালে উঠে কিছু করার নেই।
কাজ মানুষকে বাঁচায়। টাকার জন্য না। অর্থের জন্য না। কাজ বাঁচায় কারণ কাজ একটা কারণ দেয় সকালে ওঠার।
সোলায়মানের সকালে ওঠার কারণ চল্লিশটা বাড়ি। এই চল্লিশটা বাড়ির সামনে দিয়ে সাইকেল চালানো, পত্রিকা ফেলে দেওয়া, পরের বাড়িতে যাওয়া। এটুকু।
৮
আজ সকালে একটা নতুন বাড়ি থেকে ডাক এল।
একটা তরুণ ছেলে। বাইশ-তেইশ বছর হবে। গেটে দাঁড়িয়ে।
"ভাই, আমি পত্রিকা নেব। প্রতিদিন।"
সোলায়মান থামল। অবাক হলো। তরুণ ছেলে পত্রিকা নেবে?
"অনলাইনে পড়েন না?"
"পড়ি। কিন্তু কাগজে পড়তে চাই। স্ক্রিন থেকে বিরতি দরকার।"
সোলায়মান একটা কপি দিল। ছেলেটা টাকা দিল।
ঊনচল্লিশ থেকে চল্লিশ। আবার চল্লিশ।
সোলায়মান সাইকেল চালাল। একটু হালকা লাগল। কেন হালকা লাগল সে নিজেও জানে না। একটা খদ্দের বেশি, পাঁচ টাকা বেশি কমিশন, এতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু হালকা লাগল।
হয়তো এই কারণে: ছেলেটা দয়ায় কেনেনি। ছেলেটা পড়তে চায়। ছেলেটার কাছে সোলায়মান একজন দানের বিষয় না, একজন পত্রিকাওয়ালা। শ্রমিক। যে পত্রিকা আনে, পৌঁছায়।
শ্রমের মর্যাদা। ছোট শব্দ। কিন্তু সোলায়মানের কাছে বড়।
৯
সন্ধ্যায় সোলায়মান ঘরে বসে আছে।
রেডিওটা টেবিলে। কাজ করে না, কিন্তু রেখে দিয়েছে। কখনো কখনো হাত দিয়ে ধরে। ডায়াল ঘোরায়। কিছু বাজে না।
আগামীকাল সকাল তিনটায় এলার্ম বাজবে। সোলায়মান উঠবে। চা বানাবে। সাইকেল বের করবে। প্রেসে যাবে। চল্লিশটা কপি নেবে। চল্লিশটা বাড়িতে পৌঁছে দেবে।
পরশুও। তার পরের দিনও। তার পরেও।
কতদিন?
যতদিন পা প্যাডেল মারতে পারে। যতদিন চোখ রাস্তা দেখে। যতদিন চল্লিশটা বাড়ি চল্লিশটাই থাকে।
যেদিন শেষ বাড়িটাও বলবে, "সোলায়মান ভাই, আমরা অনলাইনে পড়ি এখন," সেদিন সোলায়মান সাইকেল রেখে দেবে। ঘরে বসবে। রেডিও ধরবে। ডায়াল ঘোরাবে। কিছু বাজবে না।
কিন্তু সেটা আজ না। আজ চল্লিশটা বাড়ি আছে। আজ চল্লিশটা পত্রিকা আছে। আজ সোলায়মানের কাজ আছে।
এটুকুই তার।