মোবাইল রিচার্জ দোকানদার
এই দোকান আমার ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকের মতো নিরাপত্তা নেই
১
রুবেলের দোকান ছয় ফুট বাই পাঁচ ফুট।
একটা টেবিল। টেবিলের ওপর দুটো ফোন। একটা বিকাশের, একটা নগদের। পাশে একটা ছোট সাইনবোর্ড: "বিকাশ / নগদ / রকেট / রিচার্জ"। দেয়ালে বিকাশের গোলাপি পোস্টার, নগদের কমলা পোস্টার। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার, যেটায় রুবেল বসে। একটা ছোট ফ্যান, যেটা ঘুরলে টেবিলের কাগজপত্র উড়ে যায়, তাই ফ্যান বন্ধ রাখে গরমকালেও।
রুবেলের বয়স আটাশ। এইচএসসি পাস। চাকরি খুঁজেছিল দুই বছর। পায়নি। সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে সাতবার। প্রিলিমিনারি পাস করেছে দুইবার। লিখিত পাস করেছে একবার। ভাইভায় বাদ পড়েছে। কেন বাদ পড়েছে জানে না। কেউ বলে না কেন বাদ পড়ে।
তারপর এই দোকান। তিন বছর হলো।
পুঁজি কত লেগেছিল? বিকাশ এজেন্ট হতে দশ হাজার টাকা জমা দিতে হয়েছিল। নগদে পাঁচ হাজার। দোকানের জায়গা ভাড়া নিতে আরো দশ হাজার অ্যাডভান্স। টেবিল-চেয়ার-সাইনবোর্ড আরো তিন হাজার। মোট আটাশ হাজার। মামার কাছ থেকে ধার নিয়েছিল। দেড় বছরে শোধ দিয়েছে।
এখন রুবেলের ফ্লোট মানি, মানে দোকানে যে টাকা থাকে লেনদেনের জন্য, সেটা সত্তর-আশি হাজার। কখনো লাখ টাকাও থাকে।
২
সকাল আটটা থেকে রাত দশটা। চৌদ্দ ঘণ্টা।
প্রথম খদ্দের আসে সাড়ে আটটায়। সাধারণত ক্যাশ আউট। কেউ বিকাশ থেকে টাকা তুলতে আসে।
"ভাই, পাঁচ হাজার ক্যাশ আউট করেন।"
রুবেল ফোন নেয়। নম্বর চেক করে। পিন দেয়। ক্যাশ আউট হয়। পাঁচ হাজার টাকা গুনে দেয়।
কমিশন: ১.৮৫ শতাংশ। পাঁচ হাজারে বিরানব্বই টাকা পঞ্চাশ পয়সা। এর ভেতরে রুবেলের ভাগ: প্রায় ষাট টাকা। বাকিটা বিকাশের।
ষাট টাকা। পাঁচ মিনিটের কাজে ষাট টাকা। খারাপ না। কিন্তু দিনে কতবার এই পাঁচ হাজারের ক্যাশ আউট হয়? পাঁচ-ছয়বার। বাকি লেনদেন ছোট। একশো টাকার রিচার্জ, দুইশো টাকার সেন্ড মানি, পাঁচশো টাকার ক্যাশ আউট।
ছোট লেনদেনে কমিশন কত? একশো টাকার সেন্ড মানিতে রুবেল পায় দুই টাকা। দুই টাকা।
দিনে মোট কত লেনদেন? পঞ্চাশ-ষাটটা। মোট টার্নওভার পনেরো-কুড়ি হাজার। কমিশন তিনশো-সাড়ে তিনশো।
মাসে? নয়-সাড়ে নয় হাজার টাকা।
দোকান ভাড়া: তিন হাজার। বিদ্যুৎ: পাঁচশো। ফোনের চার্জ, ইন্টারনেট: তিনশো। মোট খরচ: তিন হাজার আটশো।
হাতে থাকে: পাঁচ-ছয় হাজার।
এই দিয়ে রুবেল চলে। বউ আছে। একটা মেয়ে, দেড় বছরের।
৩
রুবেলের দোকান পাড়ার এটিএম।
সবাই আসে। সবার দরকার। গার্মেন্টসের মেয়ে বেতন পেয়ে ক্যাশ আউট করতে আসে। রিকশাচালক ছেলেকে টাকা পাঠাতে আসে। বুড়ো মানুষ নাতির কাছ থেকে আসা টাকা তুলতে আসে। দোকানদার পাইকারকে পেমেন্ট করতে আসে।
রুবেল সবার টাকা ধরে। সবার পিন জানে না, কিন্তু সবার মুখ চেনে। কে কত টাকা তোলে, কে কত পাঠায়, কার কাছে কত আসে, রুবেল জানে। সে এটা কাউকে বলে না। বলার দরকার নেই। কিন্তু জানে।
এটা একটা ক্ষমতা। ছোট ক্ষমতা। কিন্তু ক্ষমতা।
পাড়ার কেউ জানে না রুবেল কত কমায়। তারা ভাবে বিকাশ এজেন্ট মানে অনেক টাকা। কত লেনদেন হয়! লাখ লাখ টাকা যায় আসে! রুবেল বড়লোক হবে নিশ্চয়ই।
রুবেল হাসে। ভেতরে। লাখ লাখ টাকা যায় আসে, ঠিক। কিন্তু সেটা অন্যের টাকা। রুবেলের ভাগ? দশমিক কিছু শতাংশ। একটা নদীর ওপর সেতু বানিয়ে টোল নেওয়ার মতো। নদীর পানি সেতুর না। টোল সেতুর। কিন্তু টোল কত? পানির ভাগের তুলনায় কিছুই না।
৪
গত বছর চৈত্র মাসে ডাকাতি হয়েছিল।
রাত সাড়ে নটা। দোকান বন্ধ করতে যাচ্ছিল রুবেল। দুইজন এল। মুখ ঢাকা। একজনের হাতে ছুরি।
"টাকা দে।"
রুবেল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল পকেটের টাকা। কিন্তু ওরা পকেটের টাকা চায়নি। ওরা ফ্লোট মানি চেয়েছিল। দোকানের ড্রয়ার খুলে দিতে বলেছিল।
ড্রয়ারে ছিল আশি হাজার টাকা। ফ্লোট।
রুবেল দিয়েছিল। কী করবে? ছুরির সামনে? জীবন আশি হাজার টাকার চেয়ে বেশি। কত বেশি সেটা জানে না, কিন্তু বেশি।
ডাকাতরা চলে গেল। রুবেল থানায় গেল।
"এফআইআর করেন।" পুলিশ বলল।
এফআইআর করল।
তারপর কী হলো? কিছু না। পুলিশ একবার এসেছিল দোকানে। জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। "চিনতে পারবেন?" "না, মুখ ঢাকা ছিল।" "কোনো সিসিটিভি আছে?" "না।"
ব্যস। ফাইল বন্ধ।
আশি হাজার টাকা। রুবেলের প্রায় এক বছরের সঞ্চয়। এক রাতে গেল।
ইনশিওরেন্স? নেই। বিকাশ এজেন্টের ফ্লোট মানির কোনো ইনশিওরেন্স নেই। ব্যাংকের টাকা চুরি হলে ব্যাংক দায়ী। বিকাশ এজেন্টের টাকা চুরি হলে এজেন্ট দায়ী। এজেন্ট মানে রুবেল। রুবেল দায়ী। রুবেলই ভুগবে।
৫
আশি হাজার টাকা কোথা থেকে আনল?
মামা আবার দিল। ত্রিশ হাজার। বউয়ের গয়না বিক্রি করল, বিশ হাজার। শ্বশুরের কাছ থেকে ধার, বিশ হাজার। বাকি দশ হাজার পাড়ার এক দোকানদারের কাছ থেকে।
রুবেলের বউ সুমি কাঁদল সেদিন। গয়না বিক্রি করতে গিয়ে। বিয়েতে পেয়েছিল। একটা সোনার চেইন, একটা আংটি। মোট ওজন দুই আনা। দামটা কত পেয়েছিল সুমি বলে না। বলতে চায় না। কারণ সোনার দোকানদার কম দিয়েছিল। জানত মেয়েটা বিপদে পড়ে বেচছে, তাই কম দিয়েছে।
রুবেল বলল, "আমি আবার কিনে দেব। ইনশাআল্লাহ।"
সুমি বলল, "দরকার নেই। মেয়েটাকে খাওয়ান, যথেষ্ট।"
রুবেল দোকানে ফিরে গেল। ফ্লোট ভরল। লেনদেন শুরু করল।
পরদিন থেকে দোকানে একটা জিনিস বদলেছে। রুবেল রাত নটার বদলে সাড়ে আটটায় দোকান বন্ধ করে। আধা ঘণ্টা আগে। আধা ঘণ্টার বিক্রি হারায়, কিন্তু আধা ঘণ্টার নিরাপত্তা পায়।
আর ড্রয়ারে সব টাকা রাখে না। অর্ধেক শরীরে রাখে। কোমরে একটা কাপড়ের থলি বেঁধেছে, ভেতরে টাকা। ডাকাত ড্রয়ার খুলবে, সব পাবে না।
এটা নিরাপত্তা ব্যবস্থা? না। এটা ভয়। ভয়ের আকৃতি পেয়েছে কাপড়ের থলি।
৬
রুবেলের দোকানে একটা অলিখিত নিয়ম আছে।
কোনো লেনদেনে ভুল হলে রুবেল দায়ী।
ভুল কীভাবে হয়? অনেকভাবে। খদ্দের ভুল নম্বরে টাকা পাঠায়। রুবেল পিন ভুল দিয়ে দেয়। সিস্টেম হ্যাং হয়, টাকা কেটে যায় কিন্তু যায় না। খদ্দের বলে, "আমি পাঁচ হাজার পাঠাতে বলেছিলাম, তুমি পঞ্চাশ হাজার পাঠিয়ে দিয়েছ।"
এসব হলে কী হয়? খদ্দের চেঁচায়। রুবেল হেল্পলাইনে ফোন করে। হেল্পলাইন বলে, "আমরা দেখছি।" দেখতে দেখতে তিন দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন। খদ্দের প্রতিদিন আসে। "ভাই, আমার টাকা কই?"
রুবেল নিজের পকেট থেকে দেয়। কারণ খদ্দের ধরে রাখা যায় না সাত দিন। খদ্দের চলে যাবে অন্য এজেন্টের কাছে। একটা খদ্দের হারানো মানে প্রতি মাসে কিছু কমিশন হারানো।
তিন বছরে রুবেল নিজের পকেট থেকে কত দিয়েছে সিস্টেম ত্রুটির জন্য? হিসাব করেনি। করতে চায় না। করলে আবার কাঁদতে হবে।
৭
রুবেলের শ্বশুর একদিন বলল, "তুমি এত খাটো, কিন্তু হাতে কিছু থাকে না। অন্য কিছু করো।"
রুবেল বলল, "কী করব?"
"চাকরি খোঁজো।"
"চাকরি কোথায়? সাত বার পরীক্ষা দিয়েছি। পাই না।"
শ্বশুর চুপ হয়ে গেলেন।
রুবেল জানে, এই দোকান তার সেরা বিকল্প। সবচেয়ে ভালো না, সবচেয়ে সেরা বিকল্প। এইচএসসি পাস ছেলের জন্য বিকল্প কম। রিকশা চালানো? শরীরে সেই শক্তি নেই। গার্মেন্টসে কাজ? মাসে আট হাজার, রুবেলের চেয়ে কম। দোকান চালানো? পুঁজি লাগবে লাখ টাকার বেশি। কোথা থেকে আসবে?
বিকাশ এজেন্ট। এটাই তার ভাগ্য। ভালো না, কিন্তু আছে।
এই দোকান আমার ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকের মতো নিরাপত্তা নেই।
এটা রুবেল মনে মনে বলে। ব্যাংকে গার্ড আছে, সিসিটিভি আছে, ভল্ট আছে, ইনশিওরেন্স আছে। রুবেলের দোকানে? একটা প্লাস্টিকের চেয়ার। একটা কাঠের ড্রয়ার। একটা তালা।
ব্যাংকের ম্যানেজার ল্যাপটপে কাজ করে, এসি ঘরে বসে। রুবেল ফ্যান ছাড়া বসে, দুটো ফোনে কাজ করে। দুজনেই টাকার ব্যবসা করে। কিন্তু একজনের বেতন পঞ্চাশ হাজার, আরেকজনের পাঁচ হাজার। একজনের টাকা চুরি হলে ব্যাংক দায়ী, আরেকজনের টাকা চুরি হলে সে নিজে দায়ী।
একই কাজ। ভিন্ন মূল্য। এটাই নিয়ম।
৮
রমজানে লেনদেন বাড়ে।
প্রবাসী ভাইবোনেরা টাকা পাঠায়। গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে গ্রামে টাকা যায় আসে। ঈদের আগে একটা জোয়ার আসে। রুবেলের দোকানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লাইন।
এক দিনে পঞ্চাশটা লেনদেন। ষাটটা। সত্তরটা। টার্নওভার লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
কিন্তু সমস্যা: ফ্লোট ফুরিয়ে যায়। অনেক মানুষ ক্যাশ আউট করতে আসে, কিন্তু ক্যাশ ইন করতে আসে কম। মানে রুবেলের কাছ থেকে নগদ টাকা বের হচ্ছে বেশি, ঢুকছে কম।
দুপুরের মধ্যে ক্যাশ শেষ।
"ভাই, দশ হাজার ক্যাশ আউট করেন।" "ভাই, এখন ক্যাশ নেই। বিকেলে আসেন।"
খদ্দের রাগ করে। "এটা কী ব্যবসা? টাকা নেই তো দোকান কেন খুলেছো?"
রুবেল কিছু বলে না। কী বলবে? যে তার ফ্লোট আশি হাজার, কিন্তু সকালে পঞ্চাশ হাজার বের হয়ে গেছে, বাকি ত্রিশ হাজার দিয়ে আর দেওয়া সম্ভব না? ব্যাংকে গেলে লাখ টাকা তোলা যায়। রুবেলের দোকানে এই ব্যবস্থা নেই।
বিকেলে যারা সেন্ড মানি করে বা ক্যাশ ইন করে, তাদের টাকা থেকে আবার ক্যাশ আউটের ব্যবস্থা হয়। চক্র চলে।
কিন্তু সকালের ক্ষুব্ধ খদ্দের কি বিকেলে আবার আসে? কিছু আসে। কিছু পাশের এজেন্টের কাছে চলে যায়। রুবেল হারায়।
৯
রাত সাড়ে আটটা। দোকান বন্ধ করার সময়।
রুবেল হিসাব করে। আজকের লেনদেন পয়তাল্লিশটা। মোট টার্নওভার সতেরো হাজার। কমিশন তিনশো দশ টাকা। দোকান ভাড়ার দৈনিক অংশ একশো টাকা বাদ দিলে দুইশো দশ টাকা।
দুইশো দশ টাকায় রুবেলের দিন শেষ।
সে ড্রয়ার থেকে টাকা বের করে। গোনে। কোমরের থলি থেকেও বের করে। গোনে। সব মেলায়। ভালো। আজ কোনো ভুল হয়নি। কোনো ঝামেলা হয়নি।
শাটার নামায়। তালা দেয়। দুটো তালা। চোরের ভয়ে। ডাকাতির পর থেকে দুটো তালা দেয়। দুটো তালায় কি ডাকাত থামে? থামে না। কিন্তু দুটো তালা একটার চেয়ে ভালো। মনের শান্তি। শান্তি না, মনের ভুলানো।
বাসায় হাঁটে। দশ মিনিটের রাস্তা। পাড়ার গলি। অন্ধকার। রুবেলের পকেটে আজকের কমিশনের টাকা আর কিছু ফ্লোট। বাকি ফ্লোট দোকানেই আছে। কাল সকালে লাগবে।
সুমি দরজা খোলে। মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। ভাত দেয়। রুবেল খায়।
সুমি জিজ্ঞেস করে না কেমন গেল। জানে উত্তর। "মোটামুটি।" সবসময় মোটামুটি। ভালোও না, খারাপও না। মোটামুটি মানে বেঁচে আছে, দোকান আছে, ডাকাত আসেনি আজ। এটুকু।
রুবেল মেয়ের মুখের দিকে তাকায়। ঘুমন্ত মুখ। নাক ছোট, ঠোঁট গোলাপি, চোখের পাতা বন্ধ। মেয়েটা বড় হবে। স্কুলে যাবে। বইখাতা লাগবে। জামা লাগবে। জুতা লাগবে। কোচিং লাগবে। সব লাগবে।
দুইশো দশ টাকা দিনে।
রুবেল হিসাব করে না আর। হিসাব করলে ঘুম আসে না। সে শোয়। চোখ বন্ধ করে। কাল সকাল আটটায় আবার শাটার তুলবে। আবার ফোন দুটো চালু করবে। আবার "ভাই, ক্যাশ আউট করেন" শুনবে।
এই দোকান তার ব্যাংক। লাখ টাকা যায় আসে তার হাত দিয়ে। কিন্তু তার হাতে থাকে দুইশো দশ টাকা। ব্যাংকের মতো নিরাপত্তা নেই। ব্যাংকের মতো সম্মান নেই। শুধু ব্যাংকের মতো ঝুঁকি আছে।
ঝুঁকি গরিবের জন্য বেশি। সবসময়।