পোশাক বিক্রেতা
আমার দোকানে দেখে, ফোনে কেনে
১
আফরোজার দোকানের নম্বর ২৩৭। নিউ মার্কেটের দোতলায়, বাঁ দিকের সরু গলিতে, তিন নম্বর সিঁড়ি দিয়ে উঠলে ডান পাশে।
এই নম্বর তার মুখস্থ। তিরিশ বছর ধরে। বাবা শামসুল হক এই দোকান খুলেছিলেন ১৯৯৪ সালে। তখন নিউ মার্কেট মানে ঢাকার হৃৎপিণ্ড। মানুষ আসত ট্রেন থেকে নেমে, বাস থেকে নেমে, রিকশায় চড়ে। কাপড় কিনতে হলে নিউ মার্কেট। বিকল্প ছিল না।
বাবা মারা গেলেন ২০১৫ সালে। হার্ট অ্যাটাক। দোকানে বসা অবস্থায়। মিহি সুতি কাপড় মাপছিলেন এক খদ্দেরকে। গজ ফিতা হাতে ধরা। বুকে ব্যথা হলো। বসে পড়লেন। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শেষ।
আফরোজা তখন ত্রিশ। বিয়ে হয়নি। হওয়ার কথাও ছিল না। বাবা বলতেন, "তোর বিয়ে দিলে দোকান কে দেখবে?" ভাই ঢাকার বাইরে চাকরি করে। ফিরবে না। আফরোজাই দোকান পেল।
২
দোকানটা আট ফুট চওড়া, বারো ফুট লম্বা। দেওয়ালে তাক, তাকে কাপড়ের থান গোছানো। শাড়ি, থ্রি-পিস, সালোয়ার কামিজের কাপড়, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি। প্রতিটা থান আফরোজা নিজের হাতে গুছিয়ে রাখে। রঙ অনুযায়ী, কাপড়ের ধরন অনুযায়ী। মসলিন এদিকে, জর্জেট ওদিকে, কটন আলাদা।
সকাল দশটায় দোকান খোলে। রাত নটায় বন্ধ করে। এগারো ঘণ্টা। প্রতিদিন। শুক্রবারও। ঈদের আগের সপ্তাহে চৌদ্দ ঘণ্টা।
ভাড়া মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা। দশ বছর আগে ছিল বিশ হাজার। পাঁচ বছর আগে ত্রিশ। এখন পঞ্চাশ। মালিক বলেন, "জায়গার দাম বেড়েছে।" আফরোজা বলতে চায়, "দাম বেড়েছে, খদ্দের কমেছে। এটা কোন গণিত?"
কিন্তু বলে না। বললে দোকান যাবে।
৩
পরিবর্তন এল ধীরে ধীরে। প্রথমে কেউ খেয়াল করেনি।
২০১৮ সালে একটা মেয়ে এল। শাড়ি দেখল। নীল জামদানি। আফরোজা বের করল, খুলল, রোদের আলোয় ধরল। সুতোর কাজ দেখাল। মেয়ে ছুঁয়ে দেখল। চোখ উজ্জ্বল হলো। তারপর ফোন বের করল। শাড়ির ছবি তুলল। বলল, "আপু, দাম কত?"
"তিন হাজার দুইশো।"
মেয়ে হাসল। "দারাজে আড়াই হাজারে পাচ্ছি।"
চলে গেল।
আফরোজা বুঝল না সেদিন। একটা খদ্দের গেল, আরেকটা আসবে। এই তো ব্যবসা। কিন্তু পরের সপ্তাহে আরো দুজন এল। একই কাণ্ড। দেখল, ছুঁল, ছবি তুলল, দাম শুনল, ফোনে কিছু একটা চেক করল, চলে গেল।
"আমার দোকানে দেখে, ফোনে কেনে।"
আফরোজা এই বাক্যটা প্রথমবার বলল ২০১৯ সালে। পাশের দোকানদার রহমত ভাইকে। রহমত ভাই বললেন, "সব জায়গায় একই অবস্থা।"
৪
সংখ্যা বলে।
২০১৭ সালে আফরোজার মাসিক বিক্রি ছিল দেড় লাখ টাকা। খরচ বাদে মুনাফা ত্রিশ-চল্লিশ হাজার। ভাড়া দিয়ে, পরিবহন দিয়ে, ফাইন দিয়ে হাতে থাকত পনেরো-বিশ হাজার। চলত।
২০২০ সালে কোভিড এল। দোকান বন্ধ। চার মাস আয় শূন্য। ভাড়া মাফ হলো না। বকেয়া জমল। আফরোজা মায়ের সোনার কানের দুল বিক্রি করল। মায়ের শেষ গয়না।
২০২১ সালে দোকান খুলল। কিন্তু খদ্দের ফিরল না। মানুষ কোভিডে অনলাইনে কেনা শিখে গেছে। দারাজ, ইভ্যালি, ফেসবুক পেজ। ঘরে বসে অর্ডার, ঘরে ডেলিভারি। দোকানে আসার দরকার কী?
২০২৪ সালে বিক্রি নামল মাসে নব্বই হাজারে। খরচ বাদে মুনাফা পনেরো হাজার। ভাড়া পঞ্চাশ হাজার। অঙ্ক মেলে না।
আফরোজা আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে। চাচা দিলেন বিশ হাজার। খালা দিলেন পনেরো। ফুফু দিলেন দশ। প্রতিটা ধারের সাথে একটা চাপা কথা আসে: "দোকান ছেড়ে দে। চাকরি খোঁজ।"
আফরোজার বয়স একচল্লিশ। বিএ পাস। কোনো চাকরি নেই। কোনো অভিজ্ঞতা নেই দোকানদারি ছাড়া। সে কী চাকরি খুঁজবে?
৫
শত্রুকে দেখা যায় না। এটাই সবচেয়ে কঠিন।
আফরোজার বাবার সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল পাশের দোকান। দাম কমিয়ে, মান বাড়িয়ে, হাসি দিয়ে খদ্দের রাখা যেত। শত্রু চেনা ছিল। মুখোমুখি ছিল।
এখন শত্রু একটা স্ক্রিন। একটা অ্যাপ। একটা ফেসবুক পেজ যেটা চালায় বাসায় বসে একটা ছেলে, যার দোকান ভাড়া নেই, কর্মচারী নেই, বিদ্যুৎ বিল নেই। সে ঢাকার বাইরে থেকে কাপড় কিনে, ফোনে ছবি তোলে, ফেসবুকে পোস্ট করে, ক্যাশ অন ডেলিভারি। তার খরচ আফরোজার অর্ধেক। তাই তার দাম আফরোজার চেয়ে কম।
আফরোজা জানে এটা। বুঝতে পারে। কিন্তু কী করবে? সে কি দোকান ছেড়ে ফেসবুকে কাপড় বিক্রি শুরু করবে? সে ফোনে ছবি তুলতে পারে না ঠিকভাবে। লাইটিং জানে না। ক্যাপশন লিখতে পারে না। সে জানে কাপড় চিনতে, কাপড় ভাঁজ করতে, খদ্দেরের চোখ দেখে বুঝতে কোন রঙ তার পছন্দ হবে। এই দক্ষতার এখন কোনো দাম নেই।
৬
একদিন একটা মেয়ে এল। তার বিয়ে। শাড়ি দেখবে।
আফরোজা উঠে দাঁড়াল। এক ঘণ্টা ধরে শাড়ি দেখাল। কাতান, বেনারসি, জামদানি, হাফ সিল্ক। একটা একটা করে খুলল, আলোয় ধরল, মেয়ের গায়ে ধরল। রঙ মেলাল। মেয়ের মা এসেছিল সাথে। দুজনে মিলে ঠিক করল একটা লাল বেনারসি। দাম সাত হাজার।
মেয়ে বলল, "আপু, একটু ভাবি। কাল আসব।"
আফরোজা জানে "কাল আসব" মানে কী।
পরের দিন মেয়ে আসেনি। আফরোজা ফোনে দেখল, একই শাড়ি দারাজে পাঁচ হাজার আটশো। রিভিউতে তিনটা তারা। মেয়ে সম্ভবত অর্ডার দিয়ে দিয়েছে।
আফরোজা শাড়িটা ভাঁজ করে আবার তাকে রাখল। হাত দিয়ে ইস্ত্রি করল। সোনালি জরি তার আঙুলে ঠেকল। সে চেনে এই কাপড়। জানে কোন মিলে তৈরি হয়েছে, কোন মাড় দেওয়া হয়েছে, ধোয়ার পর রঙ যাবে কি না। দারাজের রিভিউতে এসব লেখা থাকে না।
কিন্তু সেটা কে বোঝে?
৭
রাতে দোকান বন্ধ করে আফরোজা রিকশায় ওঠে। মিরপুরে ভাড়া থাকে। এক রুমের একটা ফ্ল্যাট। মা একা থাকেন সারাদিন। রাতে আফরোজা ফেরে।
মা জিজ্ঞেস করেন, "আজ কেমন হলো?"
আফরোজা বলে, "ভালো।"
প্রতিদিন একই উত্তর। ভালো মানে এক হাজার বিক্রি হয়েছে। ভালো মানে তিন হাজার বিক্রি হয়েছে। ভালো মানে কিছুই বিক্রি হয়নি। সব "ভালো।" মাকে চিন্তা দিতে চায় না।
মা বলেন, "তোর বাবা থাকলে কী করত?"
আফরোজা জানে বাবা থাকলেও একই অবস্থা হতো। বাবার যুগ শেষ। কাপড়ের থানে হাত রেখে খদ্দেরের চোখে চোখ রেখে বিক্রির যুগ শেষ। এখন স্ক্রিনে ছবি, নিচে দাম, পাশে "এখনই কিনুন" বোতাম। মানুষের হাতের ছোঁয়া লাগে না। লাগার দরকার নেই।
৮
পাশের দোকানগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে।
২৩৫ নম্বর বন্ধ হয়েছে গত মাসে। জামাল ভাই, পঁচিশ বছর ধরে ছিলেন। এখন ছেলের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। হিসাবরক্ষক। মাসে পনেরো হাজার। দোকানে শেষদিকে মাসে দশ হাজারও আসত না।
২৩৯ নম্বর বন্ধ হবে আগামী মাসে। করিম সাহেব, ষাট বছর বয়স, তিন ছেলে কেউ দোকানে আসতে চায় না। "এখানে ভবিষ্যৎ নাই।"
আফরোজা তাদের দেখে। খালি দোকান দেখে। শাটার বন্ধ, তালা ঝুলছে, ধুলো জমেছে সামনের কাচে। একটা একটা করে আলো নিভে যাচ্ছে এই করিডোরে।
সে ভাবে, তার দোকানের শাটারেও কি একদিন তালা ঝুলবে?
৯
আফরোজা একটা চেষ্টা করেছিল। ফেসবুক পেজ খুলেছিল। "আফরোজা'স ক্লথ হাউস।" ছবি তুলেছিল ফোনে। কাপড়ের ছবি। লাইটিং খারাপ, ব্যাকগ্রাউন্ড দোকানের তাক। দেখতে ভালো লাগে না। অন্য পেজগুলোতে স্টুডিও লাইটিং, মডেল, ফটোশপ। আফরোজার ছবিতে থানের ভাঁজ দেখা যায়, কিন্তু রঙ ঠিক আসে না।
দুই মাস চালাল। লাইক পেল তেইশটা। বিক্রি শূন্য।
পেজ বন্ধ করে দিল।
সে পারে না এটা। তার দক্ষতা অন্য জায়গায়। সে কাপড়ে হাত দিলে বুঝতে পারে সুতোর কাউন্ট কত। চোখ দিয়ে দেখলে বলতে পারে রঙটা ফাস্ট না ফেডেড। এগুলো স্ক্রিনে দেখানো যায় না। এগুলো ছোঁয়ার জিনিস। ঘ্রাণের জিনিস। নতুন কাপড়ের একটা গন্ধ থাকে, সেটা আফরোজার নাক চেনে। এই জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই ডিজিটাল বাজারে।
১০
ঈদের আগে খদ্দের আসে এখনো। একটু বেশি। কিছু মানুষ এখনো হাতে ধরে কাপড় কিনতে চায়। বয়স্ক মানুষ, যাদের ফোনে ইন্টারনেট নেই বা থাকলেও অনলাইনে কিনতে ভরসা পান না। তারা আসেন। ছোঁয়েন। দেখেন। কেনেন।
কিন্তু তারা কমে যাচ্ছে। প্রতিটা ঈদে কম। প্রতিটা বছরে কম।
আফরোজা হিসাব করে। ভাড়া পঞ্চাশ। বিদ্যুৎ দুই হাজার। পরিবহন তিন হাজার। মার্কেট ফি দেড় হাজার। মোট স্থির খরচ প্রায় সাতান্ন হাজার। বিক্রি না হলেও এই টাকা দিতে হবে।
"আমি যুদ্ধ করছি। প্রতিপক্ষ অদৃশ্য। একটা স্ক্রিন।"
আফরোজা এটা বলে নিজেকেই। কাউকে বলার কেউ নেই। মা বুঝবেন না। ভাই ফোনে বলে, "দোকান ছেড়ে দে।" আত্মীয়রা ধার দিতে দিতে ক্লান্ত।
১১
দুপুরে দোকানে বসে আফরোজা।
খদ্দের নেই। পাশের দোকানেও নেই। পুরো ফ্লোরে তিন-চারজন হাঁটছে। এককালে এই সময়ে গলিতে হাঁটার জায়গা থাকত না।
আফরোজা একটা শাড়ি বের করে। সাদা তাঁতের শাড়ি, পাড়ে লাল সুতোর কাজ। বাবা এটা কিনেছিলেন প্রথম দোকান খোলার দিন। বলেছিলেন, "এটা বিক্রির জন্য না। এটা দোকানের বরকত।" তিরিশ বছর ধরে এই শাড়ি তাকে রাখা। বিক্রি হয়নি। হবে না।
আফরোজা শাড়িটা কোলে রাখে। কাপড়ের গন্ধ শোঁকে। পুরনো সুতো, পুরনো মাড়, পুরনো সময়ের গন্ধ।
বাইরে রিকশার ঘণ্টা বাজছে। মার্কেটের পাবলিক অ্যাড্রেসে কিছু একটা ঘোষণা হচ্ছে। আফরোজা শোনে না। সে শাড়ির ভাঁজে মুখ রাখে।
দোকান বন্ধ করবে কি না, সেটা সে জানে না। বাবার দোকান। তিরিশ বছরের দোকান। এটা শুধু দোকান না। এটা তার ঠিকানা।
কিন্তু ঠিকানা রাখতেও পয়সা লাগে। পঞ্চাশ হাজার টাকা। প্রতি মাসে।
আফরোজা শাড়িটা ভাঁজ করে তাকে রাখে। উঠে দাঁড়ায়। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গলির দিকে তাকায়। কেউ আসছে কি না।
কেউ আসছে না।