সবজি বিক্রেতা
সবজির দাম রোজ বদলায়। আমার কষ্টের দাম বদলায় না
১
রাত তিনটায় মোমেনার ঘুম ভাঙে। অ্যালার্ম না। শরীরের ঘড়ি। পাঁচ বছর ধরে একই সময়ে ওঠে। শরীর মনে রাখে। মস্তিষ্ক ভুলে গেলেও হাড় ভোলে না।
অন্ধকারে উঠে বসে। পাশে ছোট মেয়ে তানিয়া ঘুমাচ্ছে। বড় মেয়ে জরিনা ও ছোট ছেলে বাবলু মশারির ভেতর। ঘরে আরেকটা খাট নেই। মেঝেতে কাঁথা পেতে ঘুমায় বড় ছেলে রাসেল। রাসেলের বয়স চৌদ্দ। সে স্কুলে যায়। সকালে উঠবে। মোমেনা তাকে জাগায় না।
পানি দিয়ে মুখ ধোয়। আঁচল দিয়ে মোছে। শাড়ি পাল্টায় না। গতকালের শাড়িই পরে থাকে। সবজি বাজারে নতুন শাড়ি পরে যাওয়ার কোনো মানে নেই।
চারটায় বাড়ি থেকে বের হয়। টর্চ জ্বালে না। অন্ধকার চেনা। রাস্তার প্রতিটা গর্ত চেনা। পাঁচ মিনিট হেঁটে মেইন রোডে আসে। একটা টেম্পো দাঁড়িয়ে থাকে। আরো চার-পাঁচজন মহিলা উঠেছে। সবাই সবজি বিক্রেতা। কেউ কথা বলে না। ঘুমের ভেতরে জেগে আছে।
২
কাওরান বাজার। ঢাকার সবচেয়ে বড় পাইকারি সবজি বাজার।
ভোর পাঁচটায় বাজার জমে। ট্রাকে ট্রাকে সবজি আসছে। বগুড়া থেকে ফুলকপি, রাজশাহী থেকে আলু, যশোর থেকে শিম, রংপুর থেকে মুলা। ট্রাকের পেছন খুললে ধোঁয়া ওঠে, ভেজা মাটির গন্ধ আসে।
মোমেনা ঢোকে ভেতরে। পায়ের নিচে পচা পাতা। পানি। কাদা। স্যান্ডেল পরে, কিন্তু স্যান্ডেল ভিজে যায় মিনিটে।
আড়তদারের কাছে যায়। দাম জিজ্ঞেস করে।
"টমেটো কত?"
"কেজি ত্রিশ।"
"বিশে দেবে?"
"পঁচিশ। কম না।"
মোমেনা হিসাব করে মাথায়। পঁচিশে কিনলে খুচরায় চল্লিশে বিক্রি করতে হবে। পনেরো টাকা মার্জিন। পরিবহন খরচ বাদ দিলে দশ। কেজি প্রতি দশ টাকা। বিশ কেজি কিনলে দুইশো টাকা লাভ। এই দুইশো টাকার জন্য সে রাত তিনটায় উঠেছে।
কেনে। টমেটো বিশ কেজি। বেগুন পনেরো কেজি। পটল দশ কেজি। শাক পাঁচ আঁটি। মোট খরচ এক হাজার আটশো।
এই টাকা সে গতকালের বিক্রির থেকে রেখেছিল। প্রতিদিন চক্র। বিক্রি করে, পুঁজি রাখে, পাইকারি কেনে, আবার বিক্রি করে। চক্র ভাঙলে সব শেষ।
৩
মোমেনার হাত সবুজ।
শাক বাছতে বাছতে রঙ ধরেছে। পালং শাকের রস, লাল শাকের রস, কলমি শাকের আঁশ। নখের ভেতরে সবুজ। চামড়ার ভাঁজে সবুজ। সাবান দিয়ে ঘষলেও যায় না। পাঁচ বছর ধরে এই রঙ তার হাতের অংশ হয়ে গেছে।
স্বামী ছিল মজিদ। নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ডুবে মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। নৌকা উল্টে গিয়েছিল। সাঁতার জানত, কিন্তু জাল পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল। লাশ পাওয়া গেছে দুইদিন পর। ফুলে গিয়েছিল। মোমেনা চিনতে পারেনি প্রথমে।
মজিদ সবজি ব্যবসা করত। মোমেনা তার সাথে যেত মাঝে মাঝে। দেখত। শিখত। কিন্তু কখনো ভাবেনি যে একদিন একাই করতে হবে।
মজিদের মৃত্যুর পর দুই মাস মোমেনা কিছু করেনি। আত্মীয়রা সাহায্য করেছে। তারপর আত্মীয়দের সাহায্য কমে গেছে। তখন মোমেনা কাওরান বাজারে গেল। মজিদের পরিচিত আড়তদারের কাছে। বলল, "আমাকে মাল দেন।"
আড়তদার মোমেনার দিকে তাকাল। একটা মহিলা, একা, সবজি ব্যবসা করবে। অবাক হলো না। এই বাজারে অনেক মহিলা আছে। সবার গল্প প্রায় একই।
৪
দুপুর দুইটায় মোমেনা বসে তার নিজের বাজারে। মোহাম্মদপুরের একটা গলির মোড়ে। মাটিতে প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে সবজি সাজায়। টমেটো এক পাশে, বেগুন আরেক পাশে, পটল মাঝখানে। শাকের আঁটি ঝুলিয়ে রাখে বাঁশের আড়ায়।
গ্রীষ্মকাল। এপ্রিল মাস। রোদ তেতে উঠেছে। টিনের চালার নিচে বসে, কিন্তু তাতে কিছু হয় না। গরম বাতাস এদিক-ওদিক ঘোরে। ঘাম গড়ায় কপাল থেকে চোয়ালে, চোয়াল থেকে গলায়, গলা থেকে বুকে। শাড়ির আঁচল দিয়ে মোছে। আবার ঝরে।
টমেটো পচতে শুরু করেছে। সকালে লাল ছিল, এখন কালচে দাগ পড়ছে। চামড়া নরম হয়ে যাচ্ছে। আঙুলে চাপ দিলে ভেতরে ঢুকে যায়। পচা টমেটো কেউ কিনবে না।
বিশ কেজি টমেটো কিনেছিল। দুপুর পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে বারো কেজি। বাকি আট কেজি। এর মধ্যে তিন কেজি পচে গেছে। ফেলে দিতে হবে। তিন কেজি, কেজি পঁচিশ টাকা, পঁচাত্তর টাকা জলে গেল।
রেফ্রিজারেটর নেই। বরফ কেনার সামর্থ্য নেই প্রতিদিন। কিনলেও গ্রীষ্মে দুপুরের আগেই গলে যায়। বরফের দাম কখনো কখনো সবজির চেয়ে বেশি।
৫
একটা মহিলা আসে। মধ্যবিত্ত। হাতে ব্যাগ। চোখে সানগ্লাস।
টমেটো তুলে দেখে। "এগুলো তো নরম হয়ে গেছে।"
"একটু আগে ভালো ছিল, আপা। রোদে এমন হয়।"
"কেজি কত?"
"চল্লিশ।"
"চল্লিশ? দোকানে পঁয়ত্রিশে পাচ্ছি।"
মোমেনা বলে, "আপা, দোকানে ফ্রিজ আছে। আমার নাই। আমার টমেটো সকালে কাওরান বাজার থেকে আনা। ফ্রেশ।"
"ফ্রেশ তো দেখাচ্ছে না।"
মোমেনা চুপ থাকে। কী বলবে? রোদ তার শত্রু, কিন্তু রোদের কোনো দোষ নেই। সবজি পচে, এটাই প্রকৃতি। প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়তে হলে ফ্রিজ লাগে। ফ্রিজ কিনতে হলে টাকা লাগে। টাকা আসে বিক্রি থেকে। বিক্রি হয় না পচা সবজির।
মহিলা পঁয়ত্রিশে কিনল দুই কেজি। পাঁচ টাকা কম দিল প্রতি কেজিতে। দশ টাকা মোমেনার লাভ থেকে গেল মহিলার পার্সে।
"সবজির দাম রোজ বদলায়। আমার কষ্টের দাম বদলায় না।"
৬
বিকাল পাঁচটায় বাজার শেষ। যা বিক্রি হওয়ার হয়েছে। বাকি সবজি। পচা টমেটো ফেলে দেয় নালায়। নরম বেগুন কমদামে বিক্রি করে একটা চায়ের দোকানে। পটল অল্প বাকি, নিয়ে যায় বাড়িতে। নিজে রান্না করবে।
হিসাব।
কেনা: এক হাজার আটশো। বিক্রি: দুই হাজার একশো। পরিবহন: একশো পঞ্চাশ। বাজারের টোল: পঞ্চাশ। লাভ: একশো টাকা।
একশো টাকা। সকাল তিনটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত। চৌদ্দ ঘণ্টা। ঘণ্টায় সাত টাকা।
কিছু কিছু দিন লাভ তিনশো হয়। কিছু কিছু দিন লোকসান হয়। গড়ে মাসে চার-পাঁচ হাজার। চার সন্তান, একটা ঘর, ভাড়া তিন হাজার। বাকি দুই হাজারে খাওয়া, ছেলের স্কুল, মেয়েদের জামাকাপড়।
অঙ্ক মেলে না। কোনোদিন মেলে না। মোমেনা অঙ্ক জানে না। কিন্তু বোঝে।
৭
বাড়ি ফিরে মোমেনা চুলায় আগুন দেয়। বাকি পটল দিয়ে ভাত রান্না করবে। তেল কম। কম তেলে রান্না করতে হয়। পেঁয়াজ কুচি, রসুন, হলুদ, একটু লবণ। সবজি বিক্রেতার ঘরে সবজির অভাব নেই, কিন্তু মাছ-মাংসের অভাব আছে।
রাসেল বলে, "মা, মাংস খাব।"
মোমেনা বলে, "শুক্রবারে।"
প্রতি শুক্রবার সে আধা কেজি মুরগি কেনে। দুইশো টাকা। চার সন্তান আর সে, পাঁচজনে আধা কেজি। প্রত্যেকে দুই টুকরো। মোমেনা নিজে ঝোল খায়, মাংস দেয় বাচ্চাদের।
রাতে বাচ্চারা ঘুমায়। মোমেনা বসে থাকে। গায়ে সবজি বাজারের গন্ধ লেগে আছে। পচা টমেটো, ভেজা মাটি, ঘাম। গোসল করলেও যায় না পুরোপুরি। চামড়ায় ঢুকে গেছে।
তানিয়া ঘুমের মধ্যে কাছে এসে মুখ গুঁজে দেয় মোমেনার কোলে। তারপর নাক কুঁচকায়। সরে যায়।
মোমেনা দেখে। কিছু বলে না।
৮
বৃষ্টির দিনে সবচেয়ে কষ্ট।
বৃষ্টিতে বাজারে কেউ আসে না। সবজি ভিজে যায়। প্লাস্টিকের চাদর দিয়ে ঢাকে, কিন্তু বাতাসে উড়ে যায়। মোমেনা ভিজে বসে থাকে। শাড়ি ভেজা, চুল ভেজা, হাড়ে ঠান্ডা ঢোকে। বিক্রি শূন্য। কিন্তু বাড়ি যেতে পারে না। বাড়ি গেলে আগামীকালের পুঁজি নেই।
একদিন বৃষ্টিতে বসে ছিল। একটা লোক এল। ছাতা ধরা। ভালো জামাকাপড়। বেগুন কিনবে।
"কেজি কত?"
"ত্রিশ।"
"পঁচিশ দেব।"
মোমেনা তাকাল লোকটার দিকে। তার ছাতার দাম হয়তো পাঁচশো টাকা। তার জুতোর দাম হয়তো দুই হাজার। আর সে পাঁচ টাকা কম দিতে চায় এক কেজি বেগুনে।
মোমেনা রাজি হলো। পাঁচ টাকা। লোকটার জন্য কিছু না। মোমেনার জন্য? মোমেনার জন্যও কিছু না। কিন্তু দিনে দশজন পাঁচ টাকা করে কমালে পঞ্চাশ টাকা। মাসে দেড় হাজার। দেড় হাজার টাকায় তানিয়ার জন্য একজোড়া জুতো কেনা যায়। তানিয়া ছেঁড়া স্যান্ডেলে স্কুলে যায়।
কিন্তু এই হিসাব কে করে? মোমেনা। শুধু মোমেনা।
৯
মজিদ বেঁচে থাকলে কী হতো?
মোমেনা মাঝে মাঝে ভাবে। মজিদ ব্যবসা ভালো বুঝত। পাইকারি বাজারে দাম কষতে পারত মোমেনার চেয়ে ভালো। মালের গুণ বুঝত। কোন সবজি একদিন টিকবে, কোনটা দুইদিন, সেটা চোখ দিয়ে ধরতে পারত। আর শক্তি ছিল। পঞ্চাশ কেজি বস্তা কাঁধে তুলতে পারত। মোমেনা পারে না। সে বিশ কেজি বহন করে, বাকি টাকা দিয়ে ভ্যানে আনে।
কিন্তু মজিদ নেই। নদী তাকে নিয়ে গেছে। নদী ফেরত দেয় না।
মোমেনা মজিদের কথা ভাবে না প্রতিদিন। ভাবার সময় নেই। ভোর তিনটায় ঘুম ভাঙে, রাত দশটায় ঘুমায়। মাঝখানের উনিশ ঘণ্টা সবজি, সন্তান, রান্না, ধোয়া, বাজার, হিসাব। মজিদের জন্য সময় নেই।
শুধু কখনো কখনো, রাতে, বাচ্চারা ঘুমানোর পর, মোমেনা ঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে। দেওয়ালে মজিদের একটা ছবি ছিল। ফ্রেম ভেঙে গেছে। ছবি ম্লান হয়ে গেছে। মুখ ঠিক দেখা যায় না।
মোমেনা ভাবে, মজিদের মুখ কেমন ছিল?
মনে পড়ে না পুরোপুরি। পাঁচ বছর অনেক সময়। স্মৃতি ক্ষয় হয়। হাড়ের ক্লান্তি স্মৃতি ভোলায়।
১০
পরের দিন ভোর তিনটায় আবার ঘুম ভাঙে।
মোমেনা ওঠে। মুখ ধোয়। শাড়ি ঠিক করে। বের হয়। অন্ধকার রাস্তা। টেম্পো। কাওরান বাজার। পচা পাতায় পা। আড়তদারের সামনে দাঁড়ায়।
"টমেটো কত?"
"পঁয়ত্রিশ।"
গতকাল ত্রিশ ছিল। আজ পাঁচ টাকা বেড়েছে। কেন? মোমেনা জানে না। আড়তদারও জানে না হয়তো। বগুড়ায় বৃষ্টি হয়েছে। অথবা ট্রাকের ডিজেলের দাম বেড়েছে। অথবা কিছুই হয়নি, শুধু দাম বেড়েছে।
মোমেনা কেনে। বহন করে। টেম্পোয় ওঠে। বাজারে বসে। রোদে পোড়ে। সবজি সাজায়। খদ্দের আসে। দাম কমায়। মোমেনা ছেড়ে দেয়।
চক্র।
প্রতিদিন একই চক্র। চক্রের ভেতরে মোমেনা ঘোরে। চাকার সাথে। থামার উপায় নেই। থামলে চাকা ভেঙে পড়বে। চার সন্তান মাটিতে পড়বে।
মোমেনা ঘোরে।