কসাই

ঈদে আমি রাজা। বাকি এগারো মাস আমি কসাই

পর্ব ৪৮ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ইসমাইলের ছুরি নয় ইঞ্চি। জার্মান স্টিলের। বাবার কাছ থেকে পাওয়া। বাবা কিনেছিলেন ১৯৮২ সালে, মিরপুরের এক দোকান থেকে, পাঁচশো টাকায়। তখন পাঁচশো টাকা অনেক। একটা ভালো ছুরি সারাজীবন চলে।

চল্লিশ বছরের পুরনো ছুরি। ব্লেডের ধার ক্ষয়ে গেছে বার বার, বার বার শান দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ব্লেড পাতলা হয়ে গেছে আগের চেয়ে। কাঠের হাতলে হাতের ঘামের দাগ। ইসমাইলের বাবার ঘাম, তারপর ইসমাইলের ঘাম। দুই প্রজন্মের ঘাম একই কাঠে মিশেছে।

ইসমাইল প্রতিদিন সকালে ছুরিতে শান দেয়। শানের পাথর ভিজিয়ে, ব্লেড বিশ ডিগ্রি কোণে ধরে, একদিকে টানে। শব্দ হয়, ধাতব, তীক্ষ্ণ। পাড়ার লোক শুনলে জানে ইসমাইল উঠেছে।

এই ছুরি দিয়ে সে প্রাণ নেয়। প্রতিদিন। গরু, খাসি, ভেড়া। একটা কাটায় গলার রগ, শ্বাসনালী, খাদ্যনালী আলাদা হয়ে যায়। রক্ত বের হয়। পশু শুয়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ড কাঁপে। তারপর স্থির।

হালাল। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

ইসমাইলের বাবা ছিলেন কসাই। বাবার বাবাও। পুরানো ঢাকার লালবাগে পরিবারটি তিন প্রজন্ম ধরে মাংস কাটে। পেশা বংশানুক্রমিক। বাংলাদেশে অনেক পেশা এরকম। জেলের ছেলে জেলে, কামারের ছেলে কামার, কসাইয়ের ছেলে কসাই।

ইসমাইল ক্লাস সেভেনে স্কুল ছেড়েছে। বাবা বললেন, "পড়ে কী হবে? আয় শেখ।" তেরো বছর বয়সে প্রথম ছুরি ধরল। প্রথমবার হাত কেঁপেছিল। পশুর চোখে তাকানো যায়নি। বাবা বললেন, "চোখে তাকাবি না। গলায় তাকা। গলাই তোর কাজের জায়গা।"

তেরো বছর বয়সে প্রথম কাটা। হাত কেঁপেছিল বলে কাটা পরিষ্কার হয়নি। পশু কষ্ট পেয়েছিল বেশি। বাবা রাগ করলেন। "কসাইয়ের হাত কাঁপলে পশুর কষ্ট বাড়ে। এটা গুনাহ। তোর হাত শক্ত করতে হবে।"

ইসমাইল হাত শক্ত করেছে। তিরিশ বছরে হাত একবারও কাঁপেনি। তার কাটা এখন সার্জিক্যাল। একটাই কাটায় কাজ শেষ। পশু কষ্ট পায় ন্যূনতম সময়। এটা দক্ষতা। এটা ইবাদত।

সকাল ছটায় ইসমাইল লালবাগের মাংসের বাজারে যায়। তার একটা স্টল আছে। কাঠের টেবিল, ওপরে টিনের চালা। টেবিলের ওপর মাংস কাটে। নিচে রক্ত গড়ায়, নালায় যায়।

গরুর শরীর সে চেনে মেডিকেল ছাত্রের চেয়ে ভালো। কোথায় কোন হাড়, কোন জোড়া, কোন পেশি, কোন চর্বির স্তর। রানের মাংস কোন দিকে কাটলে তন্তু ছিঁড়বে না। পাঁজরের মাংস কতটুকু হাড়সহ কাটলে ঝোলে স্বাদ বেশি হবে। কলিজা কিভাবে আলাদা করলে পিত্তথলি ফাটবে না।

এই জ্ঞান কোনো বইয়ে নেই। এটা হাতে-কলমে শেখা। তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা। হাজার হাজার পশু কেটে এই জ্ঞান তৈরি হয়েছে। ইসমাইলের আঙুলে আছে।

কিন্তু সমাজ এই জ্ঞানকে কী বলে? কিছু বলে না। কসাই মানে নিচু পেশা। রক্তমাখা হাত। অশিক্ষিত। মোটা মানুষ, বড় ছুরি, রক্তের গন্ধ। এই ছবি মানুষের মনে। ইসমাইল পাতলা, মাঝারি উচ্চতা, শান্ত চোখ। কিন্তু মানুষ ছবি বদলায় না।

ইসমাইলের ছেলে ফারুকের বয়স ষোলো। দশম শ্রেণিতে পড়ে।

ফারুক স্কুলে বলে না বাবা কী করে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, "ব্যবসা।" মিথ্যা বলে না, অর্ধেক সত্য বলে। মাংসের ব্যবসা তো ব্যবসাই। কিন্তু "কসাই" শব্দটা সে উচ্চারণ করে না।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলল, "বাবা, আমি কসাই হব না।"

ইসমাইল বলল, "কে বলেছে হতে?"

"আমি ডাক্তার হব।"

ইসমাইল কিছু বলল না। ডাক্তার। তার ছেলে ডাক্তার হবে। যে ছেলের বাবা পশু কাটে, সে মানুষ সারাবে। ইসমাইলের গলায় কিছু আটকাল। গর্ব না। দুঃখও না। একটা তিক্ত স্বাদ। তার পেশা এতটাই অপমানের যে তার নিজের ছেলেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

"পড়। ভালো করে পড়।"

ইসমাইল এটুকুই বলল। তারপর ছুরিতে শান দিতে বসল। শানের পাথরে ব্লেড ঘষতে ঘষতে ভাবল, ফারুক ডাক্তার হলে সেও ছুরি ধরবে। স্ক্যালপেল। পেট কাটবে, জোড়া লাগাবে। একই হাতের কাজ। শুধু সম্মান আলাদা। একই ব্লেড। একই কাটা। কিন্তু একটাতে সাদা কোট, আরেকটাতে রক্তমাখা লুঙ্গি।

বাজারে মাংস বিক্রি হয় দুই ধরনের। হাড়সহ আর হাড়ছাড়া। হাড়সহ সস্তা, হাড়ছাড়া দামি। গরিব লোক হাড়সহ কেনে। ঝোলে হাড়ের স্বাদ থাকে, মাংস কম হলেও চলে। ধনী লোক হাড়ছাড়া কেনে। বনলেস। ফিলেট। কাটতে বেশি সময় লাগে, দক্ষতা লাগে।

ইসমাইল দুটোই কাটে। ধনী খদ্দের আসলে যত্ন করে কাটে। সুন্দর টুকরো। সমান মাপ। চর্বি বাদ দেয়। গরিব খদ্দের আসলেও যত্ন করে কাটে। হাড়ের সাথে যতটুকু পারে মাংস রাখে।

"কসাই হলে কেমন কাটে সেটাই আসল। মাংসের দাম মাংসের। কাটার দাম কসাইয়ের।"

ইসমাইলের বাবা বলতেন এটা। ইসমাইল মনে রেখেছে।

কিন্তু কেউ কসাইয়ের দাম দেয় না। তারা মাংসের দাম দেয়। কেজিতে। ইসমাইলের তিরিশ বছরের দক্ষতা, তার বাবার চল্লিশ বছরের দক্ষতা, এসবের কোনো আলাদা মূল্য নেই।

ঈদুল আজহা। বছরের সবচেয়ে বড় দিন। ইসমাইলের জন্য।

ভোর চারটায় ওঠে। ফজরের নামাজ পড়ে। তারপর শুরু।

প্রথম গরু সকাল সাতটায়। এলাকার চেয়ারম্যানের বাড়িতে। বড় গরু, বিশ মণ। ইসমাইল দেখে, মাপে। কোথায় কাটবে ঠিক করে। দুইজন সাহায্যকারী সাথে। গরু শোয়ায়। পা বাঁধে। ইসমাইল কেবলামুখী করে। বিসমিল্লাহ বলে। এক কাটায়।

রক্ত বের হয়। লাল, গাঢ়, গরম। মাটিতে পড়ে। গরু কাঁপে। ত্রিশ সেকেন্ড। তারপর স্থির।

চামড়া ছাড়ায়। পেট খোলে। নাড়িভুঁড়ি আলাদা করে। মাংস কাটে। তিন ভাগ করে, যেমন খদ্দের চায়। পুরো প্রক্রিয়া দেড় ঘণ্টা। তারপর পরের বাড়ি।

একদিনে চল্লিশটা গরু। ভোর থেকে রাত। ছুরি চলে অবিরাম। হাতে রক্ত শুকায়, আবার ভেজে, আবার শুকায়। জামা লাল হয়ে যায়। মুখে রক্তের ছিটা পড়ে। চোখে ঘাম গড়ায়, হাত ব্যস্ত বলে মুছতে পারে না। চোখ জ্বলে।

রাতে হিসাব। চল্লিশটা গরু। প্রতি গরুতে এক হাজার টাকা। চল্লিশ হাজার। একদিনে।

এই চল্লিশ হাজার ইসমাইলের তিন মাসের আয়ের সমান।

"ঈদে আমি রাজা। বাকি এগারো মাস আমি কসাই। রাজা আর কসাই একই মানুষ। কিন্তু সমাজ দুটো আলাদা চোখে দেখে।"

সাধারণ দিনে ইসমাইলের আয় চারশো-পাঁচশো টাকা। মাসে বারো-পনেরো হাজার। পরিবারে চারজন। বউ, দুই ছেলে, ইসমাইল। লালবাগের একটা পুরনো বাড়ির দোতলায় ভাড়া থাকে। ভাড়া পাঁচ হাজার। বাকি সাত-দশ হাজারে সংসার।

ফারুকের কোচিং লাগে। মাসে তিন হাজার। ইসমাইল দেয়। নিজের খাবার থেকে কমায়। দুপুরে বাজারে বসে এক প্লেট ভাত খায়, বিশ টাকার। তরকারি বাজারের ফেলে দেওয়া মাংসের টুকরো দিয়ে রান্না করে দোকানের পেছনে। যে মাংস বিক্রি হয় না, হাড়ে লেগে থাকা সামান্য মাংস, চর্বি, সেটাই তার দুপুরের খাবার।

যে লোক সারাদিন মাংস কাটে, সে নিজে ভালো মাংস খায় না। এটা পেশার একটা রসিকতা। তিক্ত রসিকতা।

মানুষ কসাইকে ডাকে মাংস কিনতে। মাংস কাটতে। কিন্তু কসাইকে ঘরে ডাকে না অন্য কোনো কাজে। বিয়েতে দাওয়াত দেয় না সবসময়। মিলাদে ডাকলেও পেছনে বসায়।

ইসমাইল এটা জানে। তিরিশ বছর ধরে জানে। গায়ে রক্তের গন্ধ লেগে থাকে। সাবান দিয়ে ধুলেও মানুষ নাক কুঁচকায়। "কসাইয়ের গন্ধ।"

একবার মসজিদে নামাজে দাঁড়িয়েছিল। পাশের লোক সরে গেল একটু। ইসমাইল বুঝল। সে নিজেই কোণায় চলে গেল।

আল্লাহর ঘরে সবাই সমান। কিন্তু কাতারে দাঁড়ালে কসাইয়ের পাশে কেউ দাঁড়াতে চায় না।

ইসমাইল নামাজ পড়ে। আল্লাহর কাছে চায়, "আমার পেশাটা হালাল। আমি হালাল কাজ করি। তুমি জানো।" আল্লাহ জানেন। কিন্তু মানুষ?

কোরবানির দিনে একটা ঘটনা হয়।

একটা বাচ্চা, বছর সাতেকের, গরু কাটা দেখে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। বাবা বলল, "চুপ করো। এটা কোরবানি। আল্লাহর হুকুম।"

বাচ্চা চুপ করল না। ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে বলল, "উনি খারাপ লোক। গরুকে মেরে ফেলেছে।"

ইসমাইল কিছু বলল না। হাতে ছুরি। জামায় রক্ত। বাচ্চার চোখে সে খারাপ লোক।

রাতে বাড়ি ফিরে ইসমাইল গোসল করল। অনেকক্ষণ। সাবান দিয়ে তিনবার গা ঘষল। নখের ভেতর থেকে রক্ত বের করল। চুলে শ্যাম্পু দিল। পরিষ্কার জামা পরল। আয়নায় দেখল।

একই মুখ। একই চোখ। কিন্তু বাচ্চাটার চোখে সে যা ছিল, সেটা ধুয়ে যায় না। সেই চোখ মনে থাকে।

ইসমাইল জানে, সে পশু কাটে মানুষের খাওয়ার জন্য। মানুষ মাংস খায়। কেউ না কেউ কাটবে। সে কাটে। তাতে সে খারাপ লোক? যে খায় সে ভালো, যে কাটে সে খারাপ?

এই প্রশ্নের উত্তর সমাজের কাছে আছে। উত্তরটা ইসমাইলের পক্ষে না।

১০

সন্ধ্যায় ইসমাইল ছাদে বসে।

লালবাগের কেল্লা দেখা যায় দূরে। মোগল আমলের দেওয়াল। ইসমাইলের পরিবার কতদিন ধরে এই এলাকায় আছে? সে জানে না। তার দাদার আগে কে ছিল? কোনো ইতিহাস নেই। কসাইদের ইতিহাস কেউ লেখে না।

ফারুক ছাদে আসে। বাবার পাশে বসে।

"বাবা, তোমার কষ্ট হয়?"

"কীসের কষ্ট?"

"পশু কাটতে।"

ইসমাইল ভাবে। উত্তর কী? সত্যি বলবে? সত্যি হলো, প্রতিটা কাটায় একটা জীবন যায়। তিরিশ বছরে সে হাজার হাজার প্রাণ নিয়েছে। প্রতিটার আগে সে আল্লাহর নাম নেয়। প্রতিটার আগে সে নিয়ত করে, এটা হালাল। কিন্তু রাতে কখনো কখনো, পশুর চোখ মনে পড়ে। কাটার ঠিক আগের মুহূর্তে পশু কী বোঝে? সে কি জানে যে এটাই শেষ? ইসমাইল জানে না। কেউ জানে না।

"কষ্ট হয় না।"

ইসমাইল মিথ্যা বলে। ফারুকের জন্য। ফারুক যেন মনে না করে বাবা কষ্ট পায়। ফারুক যেন ডাক্তার হয়। ফারুকের ছুরি যেন বাঁচায়, মারে না।

রাতের হাওয়ায় লালবাগের কেল্লার দিক থেকে একটা শীতল বাতাস আসে। ইসমাইল চোখ বোজে। হাত দুটো হাঁটুতে রাখে। হাতে কোনো ছুরি নেই। হাত খালি। খালি হাতে সে একটা সাধারণ মানুষ। ছুরি ধরলেই সে কসাই।

ইসমাইল ছুরি রাখতে পারে না। ছুরি তার রুটি। ছুরি তার পরিচয়। ছুরি তার বংশের উত্তরাধিকার।

আগামীকাল সকালে সে আবার শান দেবে। ব্লেড বিশ ডিগ্রি কোণে ধরবে। শব্দ হবে, ধাতব, তীক্ষ্ণ। পাড়ার লোক জানবে, ইসমাইল উঠেছে।