মাছ বিক্রেতা
আমার পরিচয় মাছের গন্ধ
১
রাবেয়ার হাত থেকে মাছের গন্ধ যায় না। কোনোদিন যায় না।
সকালে কাঁচা মাছ ধরে। দুপুরে মাছ কাটে। বিকালে মাছ বিক্রি করে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়। লেবু ঘষে। ছাই ঘষে। গন্ধ যায় না। চামড়ার ভেতরে ঢুকে গেছে। নখের তলায়, আঙুলের ভাঁজে, হাতের রেখায়। মাছের আঁশ, মাছের রক্ত, মাছের তেল। তিন বছরের পুরনো গন্ধ।
তিন বছর আগে রাবেয়ার স্বামী আমিনুল ডুবে মারা গেছে। পদ্মার শাখানদীতে। জাল ফেলতে গিয়েছিল রাতে। নৌকা ফিরল, আমিনুল ফিরল না। তিনদিন খুঁজেছে গ্রামের লোক। নদী দেয়নি। চারদিনের দিন ভাটিতে পাওয়া গেল। শরীর ফুলে গিয়েছিল।
রাবেয়া তখন মুন্সিগঞ্জে ছিল। আমিনুলের গ্রামে। আমিনুল মাছ ধরত, রাবেয়া ঘর সামলাত। চার সন্তান। বড় মেয়ে সুমি, বারো। ছেলে সোহেল, দশ। ছোট মেয়ে লিমা, সাত। সবচেয়ে ছোট ছেলে জুয়েল, চার।
আমিনুলের মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ি বলল, "তোমার ভরণপোষণ আমাদের পক্ষে সম্ভব না।" রাবেয়া বুঝল। সে বোঝা। চার সন্তানসহ বোঝা।
ঢাকায় এল। খালার বাসায় উঠল দুই সপ্তাহ। তারপর খালাও ইশারায় বোঝাল, থাকা সম্ভব না। রাবেয়া একটা ঘর ভাড়া নিল। যাত্রাবাড়ীতে। দুই রুম। ভাড়া চার হাজার।
কী করবে? কী পারে? রান্না পারে। সেলাই পারে। মাছ চেনে, আমিনুলের সাথে থাকতে শিখেছে। বাজারে গেল। মাছ বিক্রি শুরু করল।
২
সকাল ছটায় রাবেয়া যাত্রাবাড়ী বাজারে যায়। পাইকারি মাছের আড়ত। ভোরে ট্রাক আসে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ থেকে। রুই, কাতলা, পাঙাশ, তেলাপিয়া, ইলিশ। বরফের বাক্সে মাছ। ঢাকনা খুললে ঠান্ডা বাষ্প ওঠে, মাছের কাঁচা গন্ধ ছড়ায়।
রাবেয়া দাম করে। রুই কেজি দুইশো। কাতলা একশো আশি। তেলাপিয়া একশো কুড়ি। ইলিশ? ইলিশ সিজনে ছয়শো, অফ-সিজনে হাজার। রাবেয়া ইলিশ কেনে না বেশি। দামি মাছে ঝুঁকি বেশি। বিক্রি না হলে সারাদিনের পুঁজি ডোবে।
তেলাপিয়া কেনে বেশি। সস্তা মাছ, চাহিদা বেশি। গরিব মানুষের মাছ। মোমেনার মতো সবজি বিক্রেতা, রিকশাওয়ালা, গার্মেন্টস কর্মী, দিনমজুর, তারা তেলাপিয়া কেনে।
আজ কিনেছে তেলাপিয়া পনেরো কেজি, রুই পাঁচ কেজি, পাঙাশ পাঁচ কেজি। মোট খরচ চার হাজার। সাথে বরফ কিনতে হবে। বরফ ছাড়া মাছ টেকে না।
বরফের দাম কেজি দশ টাকা। দশ কেজি বরফ লাগে। একশো টাকা। গ্রীষ্মে পনেরো কেজি লাগে, দেড়শো টাকা। কিছু কিছু দিন বরফের দাম মাছের চেয়ে বেশি পড়ে।
৩
বাজারের একটা কোণায় রাবেয়ার জায়গা। মাটিতে প্লাস্টিকের ট্রে। ট্রেতে বরফ, বরফের ওপর মাছ সাজানো। রুই আলাদা, তেলাপিয়া আলাদা, পাঙাশ আলাদা। মাছের চোখ চকচক করে বরফের ওপরে। তাজা মাছের চোখ স্বচ্ছ, পুরনো মাছের চোখ ঘোলা। রাবেয়া জানে। খদ্দেরও জানে।
গ্রীষ্ম। মে মাস। তাপমাত্রা ছত্রিশ ডিগ্রি। বরফ গলতে শুরু করে সকাল দশটায়। দুপুরের মধ্যে বরফ শেষ। মাছ গরম হয়। গন্ধ বের হয়। প্রথমে হালকা, তারপর তীব্র। দুপুর দুইটায় মাছের গন্ধে বাজারের সেই কোণায় দাঁড়ানো যায় না।
রাবেয়া দাঁড়ায়। বসে। গন্ধের ভেতরে। মাছি ভনভন করে। মাছের ওপরে মাছি বসে, তাড়ায়, আবার বসে। তাড়ানো আর বসা, এটাও একটা চক্র।
খদ্দের আসে। নাক কুঁচকায়। "মাছ তো গন্ধ করছে।"
"একটু আগে বরফ ছিল, ভাই। তাজাই আছে।"
খদ্দের তাকায়। সন্দেহের চোখে। ফিরে যায়। পাশের দোকানে যায়, যেখানে ফ্রিজার আছে। রাবেয়ার ফ্রিজার নেই। ফ্রিজার কিনতে হলে পঁচিশ হাজার টাকা লাগে। বিদ্যুতের বিল আলাদা। রাবেয়ার কাছে পঁচিশ হাজার নেই। আগামীকালের পুঁজি আছে কেবল।
৪
বিক্রি না হওয়া মাছ। এটাই সবচেয়ে বড় ভয়।
রুই কিনেছে পাঁচ কেজি। কেজি দুইশো। হাজার টাকার মাছ। বিক্রি হয়েছে তিন কেজি। বাকি দুই কেজি। দুপুর পেরিয়ে বিকাল। মাছের গন্ধ বাড়ছে। চোখ ঘোলা হয়ে গেছে। এই মাছ আর পূর্ণ দামে বিক্রি হবে না।
রাবেয়া দাম কমায়। কেজি দুইশো ছিল, একশো সত্তর বলে। একজন নেয়। একশো পঞ্চাশে আরেকজন। শেষ আধা কেজি, একশো বিশে দেয়। এই আধা কেজি রুইতে রাবেয়ার ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম পড়ল। লোকসান।
প্রতিদিন এই লোকসান। কিছুটা কম, কিছুটা বেশি। বরফ যত তাড়াতাড়ি গলে, লোকসান তত বেশি। গ্রীষ্ম মানে লোকসানের মৌসুম।
"পচা মাছের গন্ধ সারাদিন গায়ে লেগে থাকে। ঘরে গেলে বাচ্চারা নাক চেপে ধরে। আমার পরিচয় মাছের গন্ধ।"
রাবেয়া এটা বলে নিজের মনে। কারণ কাউকে বলে লাভ নেই। কে শুনবে? কে বুঝবে?
৫
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে রাবেয়া।
দরজা খোলে। জুয়েল দৌড়ে আসে। "মা!" তারপর কাছে এসে নাক কুঁচকায়। পিছিয়ে যায়।
রাবেয়া দেখে। কিছু বলে না। গোসল করতে যায়। বালতিতে পানি ভরে, গায়ে ঢালে। সাবান দিয়ে ঘষে। একবার, দুইবার, তিনবার। চুলে সাবান দেয়। মুখে সাবান দেয়। গন্ধ কমে, কিন্তু যায় না পুরোপুরি।
পরিষ্কার কাপড় পরে বের হয়। জুয়েল এবার কাছে আসে। কোলে ওঠে। "মা, তুমি এত রাত করো কেন?"
"বাজারে থাকি, বাবা।"
"কী করো বাজারে?"
"মাছ বেচি।"
জুয়েল চুপ করে থাকে। চার বছরের বাচ্চা। মাছ বেচা কী সে বোঝে না। সে শুধু বোঝে মা সকালে যায়, সন্ধ্যায় ফেরে, ফিরলে গন্ধ করে।
সুমি রান্না করে রেখেছে। ভাত, ডাল, বেগুন ভাজি। মাছ নেই। মাছ বিক্রেতার ঘরে মাছ নেই। কারণ বাজার থেকে মাছ আনলে সেটা বিক্রির পুঁজি থেকে কমে। রাবেয়া মাছ আনে মাঝে মাঝে, যেদিন বিক্রি ভালো হয়। কিন্তু বেশিরভাগ দিন ভালো হয় না।
৬
একদিন একটা মহিলা আসে। ভালো শাড়ি পরা। হাতে সোনার চুড়ি। পায়ে স্যান্ডেল, পরিষ্কার। কণ্ঠে কর্তৃত্ব।
"রুই আছে?"
"আছে, আপা।"
"কত?"
"কেজি আড়াইশো।"
"বেশি।"
"বাজারদর, আপা। পাইকারি দুইশো। আমার মার্জিন পঞ্চাশ টাকা।"
মহিলা মাছ তুলে দেখে। নাক কুঁচকায়। "এই মাছের সাইজ কত?"
"দুই কেজি হবে। দুইটা মিলিয়ে।"
"দুইশো ত্রিশে দেব।"
"আপা, আড়াইশোর কমে পারব না। পাইকারি দামই দুইশো।"
"দুইশো ত্রিশ। নিলে নেন।"
রাবেয়া ভাবে। কুড়ি টাকা কম। দুই কেজিতে চল্লিশ টাকা কম। চল্লিশ টাকায় জুয়েলের দুধ কেনা যায়। গুঁড়ো দুধ, ডানো। এক প্যাকেট চল্লিশ টাকা। জুয়েল সকালে দুধ খায়। দুধ না পেলে কাঁদে।
"আপা, বিশ টাকা কম দিলে আমার ছেলের দুধ কিনতে পারব না।"
মহিলা তাকায়। চোখে কোনো পরিবর্তন নেই। কোনো দোলাচল নেই।
"সেটা আমার সমস্যা না।"
রাবেয়া মাছ মেপে দেয়। দুইশো ত্রিশ টাকা নেয়। মহিলা চলে যায়।
রাবেয়া বসে থাকে। মাছের আঁশ তার হাতে লেগে আছে। রোদ মাথায় পড়ছে। পাশে একটা কাক এসে বসেছে, পড়ে থাকা মাছের নাড়ি খাচ্ছে।
"সেটা আমার সমস্যা না।"
বাক্যটা মাথায় ঘুরে। রাবেয়া জানে, সত্যিই মহিলার সমস্যা না। কুড়ি টাকা মহিলার জন্য কিছু না। মহিলার হাতে যে সোনার চুড়ি, তার দাম লাখ টাকা। কুড়ি টাকার জন্য সে দরাদরি করে অভ্যাসে, প্রয়োজনে না।
কিন্তু রাবেয়ার প্রয়োজনে।
৭
রাতে রাবেয়া শোয়। পাশে লিমা আর জুয়েল। সুমি আর সোহেল অন্য ঘরে।
চোখ বন্ধ করলে আমিনুলের মুখ ভাসে। আমিনুল হাসত বেশি। কথা বলত কম। নদীতে যাওয়ার আগে বলত, "দোয়া করো।" রাবেয়া দোয়া করত। প্রতিদিন। সেদিনও করেছিল।
দোয়া কাজ করেনি। অথবা করেছিল, কিন্তু অন্যভাবে। রাবেয়া জানে না।
সে জানে আমিনুল থাকলে সে বাজারে বসে থাকত না। মাছের গন্ধ তার গায়ে লাগত না। বাচ্চারা নাক চেপে ধরত না। সে ঘরে থাকত, রান্না করত, বাচ্চাদের দেখত। আমিনুল মাছ ধরত, বিক্রি করত, সংসার চালাত।
কিন্তু নদী সেই জীবন নিয়ে গেছে। রাবেয়াকে দিয়ে গেছে মাছের গন্ধ, বরফ গলার হিসাব, আর "সেটা আমার সমস্যা না" শোনার অভ্যাস।
৮
শীতকালে একটু সুবিধা। বরফ কম লাগে। মাছ বেশিক্ষণ টাকে। গন্ধ কম হয়। বিক্রিও একটু ভালো। শীতে মানুষ মাছ-ভাত বেশি খায়।
কিন্তু শীতকালে অন্য সমস্যা। ঠান্ডা পানিতে মাছ ধোয়। হাত ফাটে। আঙুল ফাটে। রক্ত বের হয়। মাছের আঁশ ফাটা চামড়ায় ঢুকে জ্বালা করে। রাবেয়া ভ্যাসলিন মাখে রাতে। সকালে আবার পানিতে হাত ডোবায়। ভ্যাসলিন ধুয়ে যায়। হাত আবার ফাটে।
বারো মাসই কিছু না কিছু সমস্যা। গ্রীষ্ম মানে পচা মাছ। বর্ষা মানে ভেজা বাজার, পিচ্ছিল মাটি, পা হড়কে পড়া। শরৎ মানে মাছের সাপ্লাই কমে, পাইকারি দাম বাড়ে। শীত মানে ফাটা হাত। কোনো মৌসুমে স্বস্তি নেই।
রাবেয়ার শরীর এই বারো মাসের চক্র মনে রাখে। হাড়ে মনে রাখে।
৯
সোহেল একদিন বলে, "মা, বড় হয়ে আমি তোমাকে কাজ করতে দেব না।"
রাবেয়া হাসে। হাসিটা ক্লান্ত।
সোহেল দশ বছর। ক্লাস ফাইভে পড়ে। ভালো ছাত্র। রাবেয়া তার পড়ার খরচ জোগায়। স্কুলের বেতন, খাতা, কলম, পরীক্ষার ফি। মাসে সাতশো-আটশো টাকা। এই টাকা রাবেয়া আলাদা রাখে। বিক্রির টাকা থেকে প্রথমে সোহেলের পড়ার খরচ, তারপর ভাড়া, তারপর খাবার। নিজের জন্য কিছু থাকে না।
সুমি স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। ক্লাস সেভেনের পর। রাবেয়া বলেছিল, "পড়।" সুমি বলেছিল, "মা, তুমি একা পারবে না। আমি রান্না করি, বাচ্চাদের দেখি।" রাবেয়া কিছু বলতে পারেনি। সুমির কথা সত্যি। রাবেয়া একা পারে না।
তাই সুমি ঘরে থাকে। রান্না করে, ঘর ঝাড়ু দেয়, জুয়েলকে দেখে, লিমাকে স্কুলে পাঠায়। বারো বছরের মেয়ে সংসার চালায়। রাবেয়ার বুকে এটা একটা কাঁটা হয়ে বসে আছে। সুমির পড়ার কথা ছিল। সুমি পড়ত ভালো।
কিন্তু পচা মাছের গন্ধ আর সোনার চুড়ি পরা মহিলার দরাদরি, এসবের মাঝে সুমির পড়া হারিয়ে গেছে।
১০
বিকালে বাজার গুটানোর সময়।
রাবেয়া বাকি মাছ গুছিয়ে রাখে। যা বিক্রি হয়নি, নিয়ে যায় বাড়িতে। আজ রান্না করবে। ছেলেমেয়েরা মাছ খাবে। মাছ বিক্রেতার ঘরে মাছ থাকে যেদিন মাছ বিক্রি হয় না।
প্লাস্টিকের ট্রে ধোয়। বরফ গলা পানি ফেলে দেয়। মাছের আঁশ তুলে ডাস্টবিনে ফেলে। জায়গা পরিষ্কার করে। আগামীকাল আবার একই জায়গায় বসবে।
হাত ধোয়। সাবান নেই। বাজারের কলে পানি দিয়ে ধোয়। গন্ধ যায় না। রাবেয়া হাত শুকায় শাড়ির আঁচলে।
বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় হাঁটে। পাশ দিয়ে মানুষ যায়। কেউ কেউ নাক কুঁচকায়। রাবেয়া জানে কেন। সে গন্ধ করে। মাছের গন্ধ। পচা বরফের গন্ধ। ঘামের গন্ধ। সারাদিনের খাটুনির গন্ধ।
এই গন্ধ তার ইউনিফর্ম। এই গন্ধ তার পরিচয়পত্র। শহর তাকে এই গন্ধে চেনে। বাচ্চারা এই গন্ধে চেনে। সে নিজেকে এই গন্ধে চেনে।
ঘরে ঢুকে জুয়েলকে কোলে নেয়। জুয়েল এবার নাক চেপে ধরে না। অভ্যাস হয়ে গেছে হয়তো। অথবা ক্ষুধা পেয়েছে, মায়ের গন্ধের চেয়ে মায়ের কোল বেশি দরকার।
রাবেয়া জুয়েলকে ধরে রাখে। চুলে হাত বোলায়। হাতে মাছের গন্ধ। জুয়েলের চুলে মাছের গন্ধ লাগে।
কিছু যায় আসে না।