পান-সিগারেট বিক্রেতা
আমি এই কোণার ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের বইয়ে আমার জায়গা নেই
১
মতিনের দোকান একটা টিনের বাক্স।
চার ফুট চওড়া, তিন ফুট গভীর, পাঁচ ফুট উঁচু। তিন দিকে টিন, সামনে খোলা। ভেতরে মতিন বসে। পা ভাঁজ করে। হাঁটু বুকের কাছে। এই বাক্সের ভেতরে সে চল্লিশ বছর ধরে বসে আছে।
মিরপুর দশ নম্বর। রোডের কোণায়। বাঁ দিকে একটা ফার্মেসি, ডান দিকে একটা চায়ের দোকান। পেছনে দেওয়াল। মতিন এই তিন জিনিসের মাঝখানে। ফার্মেসি, চায়ের দোকান, দেওয়াল। চল্লিশ বছর ধরে।
দোকানে কী আছে? সিগারেট। গোল্ড লিফ, ডার্বি, স্টার। খুচরা বিক্রি। প্যাকেট না, শলা। একটা একটা করে। পান। সাদা পান, মিঠা পান, জর্দা পান। চুন, খয়ের, সুপারি, জর্দা। ম্যাচ। লাইটার। গাম। চকলেট। ছোট ছোট জিনিস। ছোট ছোট লাভ।
একটা সিগারেটে লাভ দুই টাকা। একটা পানে লাভ পাঁচ-দশ টাকা। দিনে দুইশো-তিনশো টাকা লাভ। মাসে ছয়-নয় হাজার। এই টাকায় মতিন, তার বউ, তার এক ছেলে চলে।
২
মতিন এই কোণায় এসেছিল ১৯৮৪ সালে। বয়স তখন আঠারো। গ্রাম থেকে এসেছে। বরিশাল। বাবার জমি নেই, কাজ নেই। চাচার সাথে ঢাকায়। চাচা গার্মেন্টসে কাজ করতেন। মতিনকে বললেন, "কিছু একটা করো।"
কী করবে? পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। কোনো দক্ষতা নেই। টাকা নেই। মতিন রাস্তায় ঘুরত। একদিন এই কোণায় দাঁড়িয়ে দেখল, একটা ফাঁকা জায়গা। কেউ কিছু করে না এখানে।
পাঁচশো টাকা ধার করল চাচার কাছ থেকে। একটা কাঠের বাক্স বানাল। সিগারেট আর পান কিনল। বসে গেল।
প্রথম দিন বিক্রি হয়েছিল পঁচিশ টাকার। লাভ সাত টাকা। মতিন সেই সাত টাকা পকেটে রেখে ভাবল, এটাই শুরু।
চল্লিশ বছর হয়ে গেছে। কাঠের বাক্স এখন টিনের বাক্স। পুঁজি পাঁচশো থেকে বেড়ে দশ হাজার। কিন্তু জায়গা একই। কোণা একই। মতিন একই।
৩
এই কোণায় বসে মতিন সব দেখেছে।
১৯৮৬ সালে পাশের বাড়িতে একটা ছেলে জন্মেছিল। তার বাবা এসেছিল মতিনের দোকানে, দশটা পান কিনেছিল, পাড়ায় বিলি করেছিল। ছেলেটা বড় হলো। স্কুলে গেল। কলেজে গেল। একদিন মতিনের দোকান থেকে প্রথম সিগারেট কিনল। হাত কাঁপছিল। মতিন দেখল, কিছু বলল না। ছেলেটা এখন বিদেশে। মালয়েশিয়া। শ্রমিক।
১৯৯০ সালে এরশাদ পতন। রাস্তায় মিছিল। মতিনের দোকানের সামনে দিয়ে হাজার হাজার মানুষ গেছে। স্লোগান দিয়েছে। মতিন দোকান বন্ধ করেনি। বসে ছিল। মিছিলের লোক সিগারেট কিনেছে তার কাছ থেকে। বিপ্লবের আগে একটা শেষ টান।
১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪। প্রতিটা নির্বাচনে রাস্তায় উত্তেজনা। প্রতিটায় মতিনের দোকানে সিগারেটের বিক্রি বেড়েছে। মানুষ টেনশনে থাকলে বেশি সিগারেট খায়। এটা মতিনের পরিসংখ্যান। কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই ডেটা সংগ্রহ করে না।
৪
মতিন জানে কে কোন ব্র্যান্ড খায়।
রহিম ভাই, রিকশাওয়ালা, ডার্বি। দিনে আটটা। সকালে দুইটা, দুপুরে দুইটা, বিকালে দুইটা, রাতে দুইটা। বিশ বছর ধরে একই। একদিনও বদলায়নি।
করিম সাহেব, স্কুলের শিক্ষক, গোল্ড লিফ। কিন্তু লুকিয়ে কেনেন। স্কুলের দিকে তাকিয়ে দেখেন কেউ আসছে কি না। তারপর দ্রুত কেনেন, পকেটে রাখেন। মতিন জানে। কিছু বলে না।
নাজমা আপা, গার্মেন্টস কর্মী, পান খান। মিঠা পান। দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে আসেন। পান মুখে দিয়ে বলেন, "মতিন ভাই, জীবনে একটাই সুখ। এই পান।" মতিন হাসে। নাজমা আপার মুখ লাল হয়ে যায় পানের রসে। ঠোঁট লাল, দাঁত লাল। সে হাসে। মতিন হাসে।
এই মানুষগুলো মতিনের খদ্দের। এই মানুষগুলো মতিনের পরিচিত। সে তাদের অভ্যাস জানে, তাদের অভ্যাস বদলে যাওয়া জানে, তাদের সুখ-দুঃখ জানে। তারা সিগারেট কিনতে এসে কথা বলে। দুই মিনিট। তিন মিনিট। "বাচ্চা অসুস্থ।" "বউয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে।" "বেতন পাইনি।" "ছেলে পাস করেছে।"
মতিন শোনে। সবসময় শোনে। কিছু বলে না। মাথা নাড়ে। একটা সিগারেট বের করে দেয়। এটাই তার কাজ।
৫
কিছু জিনিস মতিন দেখেছে যা অন্য কেউ দেখেনি।
রাত দশটায় একটা ছেলে আর একটা মেয়ে দাঁড়াত এই কোণায়। ২০০৫ সাল। ছেলে সিগারেট কিনত, মেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। দুজনে কথা বলত ফিসফিস করে। মতিন বুঝত। প্রেম। ছেলেটা একদিন একটা আংটি দেখাল মতিনকে। "মতিন চাচা, কেমন?"
"সুন্দর।"
তারপর তারা আর আসেনি। বিয়ে হয়ে গেছে হয়তো। অথবা ভেঙে গেছে। মতিন জানে না। সে শুধু জানে দুটো মানুষ তার কোণায় দাঁড়িয়ে ভালোবাসা শুরু করেছিল।
আরেকটা ঘটনা। ২০১২ সাল। একটা লোক প্রতিদিন আসত। তিনটা সিগারেট কিনত। একটা খেত, দুইটা পকেটে রাখত। একদিন আসল, পাঁচটা কিনল। মতিন জিজ্ঞেস করল না কেন। পরদিন পাশের দোকানদার বলল, লোকটার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। তারপরের দিন লোকটা আসেনি। আর কোনোদিন আসেনি।
মতিন এই গল্পগুলো কাউকে বলে না। এগুলো তার কোণার গোপন। এই কোণা একটা ডায়েরি। মতিন সেই ডায়েরির একমাত্র পাঠক।
৬
"আমি এই কোণার ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের বইয়ে আমার জায়গা নেই।"
মতিন এটা বলে একদিন। চায়ের দোকানে বসে। পাশের দোকানদার রউফ চা দেয়। মতিন খায়। রউফ বলে, "ইতিহাস তো বড় লোকের জিনিস, মতিন ভাই। আমরা ইতিহাস না। আমরা ফুটনোট।"
মতিন হাসে। ফুটনোটও না। ফুটনোটে অন্তত নাম থাকে। মতিনের নাম কোথাও নেই। কোনো কাগজে না, কোনো রেকর্ডে না। সে এই কোণায় বসে আছে চল্লিশ বছর, কিন্তু তার অস্তিত্বের প্রমাণ শুধু এই টিনের বাক্স। বাক্স সরালে মতিন নেই।
ট্রেড লাইসেন্স আছে। পুরনো। নবায়ন করে প্রতি বছর। দুই হাজার টাকা। এটাই একমাত্র সরকারি কাগজ যেটা বলে মতিন এখানে আছে।
৭
মতিনের ছেলে রাজু। বয়স পঁচিশ। গার্মেন্টসে কাজ করে। মাসে চৌদ্দ হাজার। রাজু বলে, "বাবা, দোকান ছেড়ে দাও। বাড়িতে থাকো। আমি চালাব।"
মতিন বলে, "থাক।"
সে ছাড়তে পারে না। কোণা ছাড়তে পারে না। চল্লিশ বছর ধরে সে এখানে বসে আছে। শরীর এই বাক্সের আকার মনে রেখেছে। পা ভাঁজ করে বসতে অভ্যস্ত। সোজা হয়ে দাঁড়ালে হাঁটু ব্যথা করে। কোমর ব্যথা করে। কিন্তু বাক্সের ভেতরে বসলে ব্যথা নেই। শরীর মানিয়ে নিয়েছে।
সকাল সাতটায় আসে। রাত দশটায় যায়। পনেরো ঘণ্টা। প্রতিদিন। শুক্রবারও। ঈদেও। কারণ ঈদের দিনে সিগারেটের বিক্রি দ্বিগুণ। মানুষ আত্মীয়বাড়ি যায়, রাস্তায় সিগারেট কেনে। পানের বিক্রি তিনগুণ। ঈদে পান খাওয়া ঐতিহ্য।
মতিন ঈদে নতুন জামা পরে না। কারণ দোকানে পানের রস পড়ে জামায়। নতুন জামা নষ্ট হয়। সে পুরনো জামা পরে ঈদ কাটায়। দোকানে বসে।
৮
খবর এল ছয় মাস আগে। ফ্লাইওভার হবে।
মিরপুর দশ থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। এই রাস্তায়। এই কোণা দিয়ে। মতিনের দোকানের ওপর দিয়ে কংক্রিটের স্তম্ভ উঠবে।
সরকারি লোক এসেছিল। পরিমাপ করেছে। লাল চিহ্ন দিয়ে গেছে রাস্তায়। মতিনের বাক্সের পাশে একটা লাল দাগ। এই দাগের ভেতরে সব ভেঙে ফেলা হবে। ফার্মেসি ভাঙবে। চায়ের দোকান ভাঙবে। মতিনের টিনের বাক্স ভাঙবে।
ক্ষতিপূরণ? ফার্মেসির মালিক ক্ষতিপূরণ পাবে, তার লাইসেন্স আছে, কাগজপত্র আছে। চায়ের দোকান ভাড়া, মালিক পাবে। মতিন? মতিনের জমি নেই, দোকানের মালিকানা নেই, শুধু একটা টিনের বাক্স। টিনের বাক্সের ক্ষতিপূরণ কত? শূন্য।
চল্লিশ বছরের ক্ষতিপূরণ কত? মতিনের হিসাবে, চল্লিশ বছর ধরে সে এখানে বসে রাষ্ট্রের কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজে চলেছে, পরিবার চালিয়েছে, কারো কাছে হাত পাতেনি। এর কোনো মূল্য?
"শহর বাড়ে। আমরা সরি।"
৯
মতিন রাতে বাড়ি ফেরে। দুই রুমের ভাড়া বাসা। বউ রাবেয়া ভাত বেড়ে রাখে। মতিন খায়। চুপচাপ।
রাবেয়া বলে, "কবে ভাঙবে?"
"তিন মাস পর। হয়তো ছয় মাস। সরকারের কাজ। ঠিক নেই।"
"তারপর?"
মতিন চুপ। তারপর কী? অন্য কোণা খুঁজবে? মিরপুরে ফাঁকা কোণা আর কোথায়? সব কোণায় কেউ না কেউ বসে আছে। তার মতোই। টিনের বাক্স, সিগারেট, পান। প্রতিটা কোণায় একটা মতিন আছে।
নতুন জায়গায় গেলে খদ্দের নতুন করে তৈরি করতে হবে। চল্লিশ বছরের পরিচিতি শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। রহিম ভাই আসবে না। করিম সাহেব আসবে না। নাজমা আপা আসবে না। তারা অন্য কোণায় যাবে, অন্য মতিনের কাছ থেকে সিগারেট কিনবে।
মতিনের কোণা মানে শুধু একটা জায়গা না। এটা সম্পর্কের জাল। চল্লিশ বছরে বোনা। একটা ফ্লাইওভার সেই জাল ছিঁড়ে দেবে।
১০
শেষ দিন আসবে একদিন। মতিন জানে।
সেদিন সে টিনের বাক্স খুলবে। ভেতরের জিনিস গুছিয়ে নেবে। সিগারেটের শেষ কার্টন। পানের শেষ বাটা। চুনের কৌটা। সুপারির বয়াম। ম্যাচের বাক্স। ছোট ছোট জিনিস। চল্লিশ বছরের ছোট ছোট জিনিস।
বাক্সটা ভাঙবে। টিন আলাদা করবে। ভাঙারির কাছে বিক্রি করবে। হয়তো পাঁচশো টাকা পাবে। যে পাঁচশো টাকা দিয়ে শুরু করেছিল, সেই পাঁচশো টাকায় শেষ।
তারপর মতিন দাঁড়াবে সেই কোণায়। খালি কোণায়। বাক্স নেই, দোকান নেই, পান নেই, সিগারেট নেই। শুধু মতিন আর কংক্রিট মেশানোর শব্দ।
ফ্লাইওভারের পিলার উঠবে। ইট, সিমেন্ট, রড। কয়েক বছরে তৈরি হবে। গাড়ি চলবে ওপর দিয়ে। ঝকঝকে রাস্তা। নিচে যেখানে মতিন বসত, সেখানে পিলারের ছায়া পড়বে। ছায়ায় হয়তো আরেকটা টিনের বাক্স বসবে। আরেকটা মতিন। আরেকটা চল্লিশ বছরের শুরু।
অথবা বসবে না। ফ্লাইওভারের নিচে দোকান বসানো নিষেধ। পুলিশ তাড়াবে। নতুন নিয়ম। নতুন শহর। পুরনো মতিনদের জায়গা নেই।
১১
আজ বিকালে একটা ছেলে এল। কলেজ ছাত্র মনে হয়। ব্যাকপ্যাক কাঁধে। একটা সিগারেট কিনল। ধরাল। প্রথম টান দিয়ে কাশল। মতিন বুঝল, নতুন শিখছে।
ছেলে জিজ্ঞেস করল, "চাচা, কতদিন ধরে এখানে?"
"চল্লিশ বছর।"
"চল্লিশ বছর! একই জায়গায়?"
"একই জায়গায়।"
ছেলে অবাক হলো। চল্লিশ বছর। তার বয়সের দ্বিগুণ। সে ভাবতে পারে না চল্লিশ বছর একই কোণায় বসা কেমন। সে ভাবতে পারে না প্রতিদিন একই টিনের বাক্স খোলা কেমন, একই সিগারেট সাজানো কেমন, একই পান বানানো কেমন।
"বোর হন না?"
মতিন হাসল। বোর। শব্দটা তার কানে নতুন না। কিন্তু উত্তর দিতে জানে না। বোর হওয়ার সময় কোথায়? সকাল থেকে রাত। খদ্দের, হিসাব, মাল কেনা, মাল সাজানো, বৃষ্টিতে বাক্স ঢাকা, রোদে ঘাম মোছা। বোর হতে হলে ফাঁকা সময় লাগে। মতিনের ফাঁকা সময় নেই।
"না।"
ছেলে চলে গেল। সিগারেটের ধোঁয়া রেখে গেল বাতাসে।
মতিন বসে থাকে। সন্ধ্যা নামছে। রাস্তায় আলো জ্বলছে। দোকানের একটা ছোট বাল্ব জ্বালায়। হলুদ আলো। এই আলোয় পান সাজায়। সবুজ পাতায় সাদা চুন, লাল খয়ের, কুচি কুচি সুপারি। পানের ভেতরে একটা ছোট পৃথিবী। মতিন সেই পৃথিবী তৈরি করে, খদ্দেরের হাতে তুলে দেয়। খদ্দের মুখে পুরে চলে যায়।
মতিন পরের পান সাজায়।
কোণায় বসে।
একটা টিনের বাক্সে।
যতদিন কোণা আছে।