অটো মেকানিক
ইঞ্জিনিয়াররা বই পড়ে। আমি ইঞ্জিন শুনি।
১
লিটনের হাত কালো। গ্রিজের কালো। তেলের কালো। এই কালো আর ওঠে না। সাবান দিয়ে ঘষলেও না, কেরোসিন দিয়ে মুছলেও না। নখের ফাঁকে, আঙুলের রেখায়, তালুর ভাঁজে ভাঁজে কালো জমে গেছে। দশ বছরের কালো।
লিটনের বয়স ছাব্বিশ। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটা বটগাছের নিচে তার গ্যারেজ। গ্যারেজ বলা ভুল। একটা গাছ, একটা টিনের চালা, কয়েকটা স্প্যানার, একটা জ্যাক, কিছু পুরনো যন্ত্রাংশ। সাইনবোর্ড নেই। লাইসেন্স নেই। ট্রেড লাইসেন্স নেই। কিছু নেই। শুধু হাত আছে, কান আছে।
কান দিয়ে সে ইঞ্জিন শোনে।
সিএনজি অটো এলে সে ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনে বলতে পারে সমস্যা কোথায়। মোটরসাইকেল হলে থ্রটল ঘোরানোর শব্দে বোঝে পিস্টন রিং ক্ষয়ে গেছে না কার্বুরেটর ময়লা। অটোরিকশার তিন চাকার যেকোনো একটা টলমল করলে সে বুঝে যায় বিয়ারিং খেয়ে ফেলেছে।
এই জ্ঞান কোনো বই থেকে আসেনি। ষোলো বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে পান-সিগারেটের দোকানে বসত। পাশের গ্যারেজে আলম মিস্ত্রি কাজ করত। লিটন তাকিয়ে দেখত। একদিন আলম মিস্ত্রি বলল, "দেখিস না, ধর। শিখবি।" লিটন ধরল। তারপর আর ছাড়েনি।
২
সকাল সাতটায় লিটন গাছের নিচে আসে। প্রথম কাজ: নিজের জন্য চা। রাস্তার পাশের দোকান থেকে আট টাকায়। চা খেতে খেতে যন্ত্রপাতি সাজায়। স্প্যানার সেট, প্লায়ার্স, স্ক্রু ড্রাইভার, একটা পুরনো মাল্টিমিটার যেটার ডিসপ্লে অর্ধেক মরে গেছে, একটা এয়ার পাম্প।
প্রথম কাস্টমার আসে আটটায়। সাধারণত সিএনজি অটো। রাতভর দৌড়েছে, সকালে গন্ডগোল দিচ্ছে। চালক ক্লান্ত, বিরক্ত। লিটন ইঞ্জিন চালু করতে বলে। শোনে। বন্ধ করতে বলে। হুড খোলে। হাত দিয়ে কিছু একটা ছোঁয়। তারপর বলে, "প্লাগ চেঞ্জ। দুইশো।"
পাঁচ মিনিটে কাজ হয়ে যায়।
দিনে দশ-বারোটা গাড়ি আসে। কখনো বেশি, কখনো কম। গড়ে পাঁচশো টাকা আয়। কোনোদিন আটশো, কোনোদিন তিনশো। রোদে, বৃষ্টিতে, শীতে। ছুটি নেই। ছুটি নিলে আয় নেই। আয় না হলে মায়ের ওষুধ নেই। মায়ের ডায়াবেটিস। প্রতিমাসে ইনসুলিনের পেছনে দুই হাজার টাকা যায়।
৩
লিটনের কোনো সার্টিফিকেট নেই।
পলিটেকনিকের ছেলেরা আসে মাঝে মাঝে। ডিপ্লোমা ইন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং। তারা থিওরি জানে। ফোর-স্ট্রোক সাইকেল, কম্প্রেশন রেশিও, ইগনিশন টাইমিং। কিন্তু একটা সিএনজি অটোর ইঞ্জিন থেকে অদ্ভুত আওয়াজ আসলে তারা তাকিয়ে থাকে।
লিটন শোনে। বলে, "ভালভ ক্লিয়ারেন্স। ০.০৫ বেশি আছে।"
সে মাপে না। যন্ত্র দিয়ে না। কান দিয়ে মাপে।
একবার এক পলিটেকনিকের ছেলে জিজ্ঞেস করল, "এটা কীভাবে বুঝলেন?"
লিটন বলল, "দশ হাজার ইঞ্জিন শুনলে তুমিও বুঝবে।"
ছেলেটা চুপ করে গেল। সে জানে দশ হাজার ইঞ্জিন শোনার ধৈর্য তার নেই। সে চাকরি খুঁজবে। অফিসে বসবে। এসি রুমে। লিটন গাছের নিচে থাকবে।
"ইঞ্জিনিয়াররা বই পড়ে। আমি ইঞ্জিন শুনি।" লিটন বলে এটা গর্ব করে না। সত্য বলে।
৪
একদিন বিকালে একটা গাড়ি থামল রাস্তায়। বিএমডব্লিউ। সাদা রঙ। কালিয়াকৈরের ধুলোমাখা রাস্তায় গাড়িটা দেখতে অন্য গ্রহের জিনিস মনে হচ্ছিল।
গাড়ি থেকে নামল একজন লোক। পোশাক দেখে বোঝা যায় টাকার অভাব নেই। মুখে আতঙ্ক। ফোনে কাউকে বলছে, "গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে কোনো সার্ভিস সেন্টার নেই। কালিয়াকৈর। হ্যাঁ, কালিয়াকৈর। টো ট্রাক? কখন আসবে? দুই ঘণ্টা?"
লিটন গাছের নিচ থেকে দেখছিল। এগিয়ে গেল।
"কী হয়েছে ভাই?"
লোকটা তাকাল। লিটনের গ্রিজমাখা হাত, ময়লা গেঞ্জি, চটি পায়ে। লোকটার চোখে অবিশ্বাস। এই ছেলে বিএমডব্লিউ ঠিক করবে?
"ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। স্টার্ট নিচ্ছে না।"
"দেখি?"
লোকটা দ্বিধায় পড়ল। তারপর ভাবল, টো ট্রাক আসতে দুই ঘণ্টা, এই ছেলে দেখুক, কী আর ক্ষতি হবে।
লিটন হুড খুলল। বিএমডব্লিউয়ের ইঞ্জিন বে। পরিষ্কার, সাজানো, প্লাস্টিক কভারে ঢাকা। লিটন এই গাড়ি আগে কখনো খোলেনি। কিন্তু ইঞ্জিন ইঞ্জিনই। জ্বালানি আসে, বাতাস আসে, স্পার্ক হয়, বিস্ফোরণ হয়, পিস্টন চলে। এই সূত্র সব ইঞ্জিনে এক।
সে কী করতে বলল, "একবার স্টার্ট দেন।"
লোকটা স্টার্ট দিল। ক্র্যাংকিং হচ্ছে, কিন্তু ইঞ্জিন ধরছে না। লিটন শুনল। ফুয়েল পাম্পের আওয়াজ নেই।
"ফুয়েল পাম্প রিলে।" লিটন বলল।
সে রিলে বক্স খুঁজে বের করল। একটা রিলে পরীক্ষা করল। জ্বলে গেছে। লিটন নিজের যন্ত্রপাতির বাক্স থেকে একটা জেনেরিক রিলে আনল। ফিটিং একটু আলাদা, কিন্তু কানেকশন এক। তার দিয়ে জুড়ে দিল।
"স্টার্ট দেন।"
ইঞ্জিন চালু হলো। বিএমডব্লিউয়ের ছয় সিলিন্ডার গুনগুন করে উঠল। বিশ মিনিট।
৫
লোকটা অবাক। ফোনে বলল, "টো ট্রাক ক্যান্সেল করো।"
"কত হলো?" লোকটা জিজ্ঞেস করল।
লিটন ভাবল। সিএনজির কাজ করলে এইটুকুতে দুইশো-তিনশো নিত। কিন্তু বিএমডব্লিউ। সে জানে না বিএমডব্লিউয়ের সার্ভিস সেন্টারে এই কাজের দাম কত। সে জানে না যে ঢাকার অথরাইজড সার্ভিসে এই একটা রিলে বদলাতে পনেরো-বিশ হাজার টাকা লাগত, ডায়াগনস্টিক ফি সহ।
"পাঁচশো দেন।"
লোকটা হাজার টাকার একটা নোট দিল। বলল, "বাকিটা রাখো।" তারপর গাড়িতে উঠে চলে গেল।
লিটন হাজার টাকার নোটটা দেখল। সে জানে না এই গাড়ির দাম কত। পরে রাতে ফোনে গুগল করে দেখল: এক কোটি টাকা।
গাড়ির দাম এক কোটি। মেরামতের দাম এক হাজার।
লিটন ভাবল, কিন্তু হিসাবটা অন্যভাবে। গাড়ি ছাড়া মালিকের কোনো মূল্য নেই সেই রাস্তায়, সেই মুহূর্তে। আর সে ছাড়া গাড়ির কোনো মূল্য নেই।
এক কোটি টাকার গাড়ি বিশ মিনিটের জন্য তার কাছে অসহায় ছিল।
৬
রাতে লিটন বাড়ি ফেরে। ভাড়া ঘর। দুটো রুম, টিনের ছাদ। মা ভাত রেখেছে। ডাল, আলুভর্তা, একটুকরো শুকনো মরিচ। লিটন হাত ধোয়। কালো আর ওঠে না, কিন্তু ধোয়ার ভান করে।
মা জিজ্ঞেস করে, "আজ কেমন হলো?"
"ভালো। এক হাজার পেয়েছি।"
"একটা গাড়ি থেকে?"
"হ্যাঁ। বিদেশি গাড়ি।"
মা আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। তার কাছে গাড়ি গাড়িই। বিদেশি কি দেশি, সব গাড়ি ভাঙে, তার ছেলে ঠিক করে। এটুকুই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
লিটন ভাত খায়। টিভিতে খবর চলছে। কোনো মন্ত্রী ফ্লাইওভারের উদ্বোধন করছে। ফিতা কাটছে। ক্যামেরা ফ্ল্যাশ।
ফ্লাইওভার বানিয়েছে শ্রমিকেরা। মেরামত করবে লিটনের মতো কেউ। উদ্বোধন করছে অন্য কেউ।
৭
লিটনের একটা স্বপ্ন আছে। নিজের দোকান। পাকা দোকান। সাইনবোর্ড লাগাবে: "লিটন অটো ওয়ার্কশপ।" একটা হাইড্রোলিক লিফট থাকবে, গাড়ি তুলে নিচে ঢুকে কাজ করা যাবে। একটা ভালো কম্প্রেসার। একটা ওবিডি স্ক্যানার, যেটা দিয়ে আধুনিক গাড়ির কম্পিউটার পড়া যায়।
এসবের জন্য কত লাগবে? তিন-চার লাখ। লিটনের সঞ্চয় বারো হাজার।
দিনে পাঁচশো আয়। মায়ের ওষুধ দুই হাজার মাসে। ভাড়া চার হাজার। খাওয়া-দাওয়া পাঁচ হাজার। যন্ত্রাংশ কিনতে হয়, ভাঙা টুল বদলাতে হয়। মাস শেষে কিছু থাকে, কখনো থাকে না।
তিন-চার লাখ জমাতে কত সময় লাগবে? লিটন হিসাব করতে পারে না। হিসাব করলে ভয় পায়।
সে হিসাব করে না। সে কাজ করে।
৮
বৃষ্টির দিনে কাজ কম। গাছের নিচে বসে থাকে। টিনের চালা থেকে পানি ঝরে। মাটি কাদা হয়ে যায়। যন্ত্রপাতি ভেজা। কাস্টমার আসে না।
এই দিনগুলোতে লিটন ফোনে ইউটিউব দেখে। অটোমোবাইল রিপেয়ার ভিডিও। বিদেশি ভিডিও। ইংরেজি বোঝে না, কিন্তু হাত দেখে। কোন টুল দিয়ে কী করছে, কোন পার্ট খুলছে, কীভাবে ফিটিং করছে। ভাষা না বুঝলেও কাজ বোঝে।
এভাবেই সে শিখেছে ইলেকট্রনিক ফুয়েল ইনজেকশন। এভাবেই শিখেছে সিডিআই ইগনিশন। কেউ শেখায়নি। কোনো ক্লাসরুম নেই। সার্টিফিকেট নেই।
জ্ঞান আছে। জ্ঞানের কোনো কাগজ নেই।
কাগজ ছাড়া জ্ঞানের দাম পাঁচশো টাকা দিনে। কাগজ থাকলে পনেরো হাজার মাসে, এসি রুমে, চেয়ারে বসে।
৯
গাছটা সরকারি জমিতে। যেকোনো দিন উচ্ছেদ হতে পারে। রাস্তা চওড়া করবে, ফুটপাত বানাবে, সাইনবোর্ড লাগাবে: "এখানে গাড়ি পার্কিং নিষেধ।" তখন লিটন কোথায় যাবে?
সে ভাবে না। ভাবলে কাজ হয় না।
সকালে উঠে গাছের নিচে আসে। স্প্যানার সাজায়। চা খায়। প্রথম গাড়ি আসে। সে শোনে। ইঞ্জিন কথা বলে। কোনো ইঞ্জিন ফিসফিস করে, কোনোটা চেঁচায়, কোনোটা কাশে, কোনোটা হাঁপায়।
লিটন সবগুলো বোঝে। এটা তার ভাষা। একমাত্র ভাষা যেটা তাকে কখনো ঠকায়নি।
মানুষ ঠকায়। কাস্টমার দাম কমাতে চায়। পুলিশ তোলা চায়। পাশের দোকানদার ঝগড়া করে। কিন্তু ইঞ্জিন মিথ্যা বলে না। যেখানে সমস্যা সেখানেই আওয়াজ হয়। লুকায় না। ঢাকে না।
লিটন গ্রিজমাখা হাত দিয়ে স্প্যানার তোলে। ঘোরায়। বোল্ট আলগা হয়। যন্ত্রের গভীরে ঢোকে সে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ারের বই পৌঁছায় না।
রোদ ওঠে। ঘাম ঝরে। গ্রিজ আর ঘাম মিশে যায়। লিটন কাজ করে। গাছের ছায়ায়, ধুলোর মধ্যে, সার্টিফিকেট ছাড়া।
ইঞ্জিন চলে। এটুকুই প্রমাণ।