ওয়েল্ডার

জাহাজ বিলাতে যায়। আমার চোখ কোথাও যায় না।

পর্ব ৫২ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ফজলুর চোখ দুটো সবসময় লাল থাকে। রক্তজমাট লাল না। জ্বলা লাল। যেন ভেতর থেকে কেউ আগুন দিয়েছে। ঝালাইয়ের আর্ক থেকে যে আলো বের হয় সেটা সূর্যের চেয়ে তীব্র। সেই আলো সে বারো ঘণ্টা ধরে দেখে। প্রতিদিন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড শিপইয়ার্ডে।

ফজলুর বয়স চল্লিশ। ঝালাই করে বাইশ বছর। আঠারো বছর বয়সে প্রথম ঝালাইয়ের রড ধরেছিল। তখন চোখে কিছু হতো না। এখন চোখে পানি পড়ে। রাতে ঝাপসা দেখে। সকালে চোখ জ্বলে। মাঝে মাঝে আলোর ঝলক দেখে, যখন কোনো আলো নেই।

গগগলস আছে। বাজারে পাওয়া যায়। দাম তিনশো-পাঁচশো টাকা। কিন্তু ইয়ার্ডের ঠিকাদার দেয় না। বলে, "নিজে কিনে নাও।" ফজলু কিনতে পারে। কিন্তু গগগলস পরলে কাজ ধীর হয়। ধীর হলে টার্গেট মিস হয়। টার্গেট মিস হলে দিনমজুরি কাটে। ছশো টাকা দিনে। পঞ্চাশ টাকা কাটলেও টের পায়।

তাই ফজলু খালি চোখে ঝালাই করে। আর্কের আলো সরাসরি রেটিনায় পড়ে। এটাকে বলে আর্ক আই। ফটোকেরাটাইটিস। ফজলু এই শব্দগুলো জানে না। সে জানে চোখ পোড়ে।

শিপইয়ার্ডে সকাল ছটায় কাজ শুরু। সন্ধ্যা ছটায় শেষ। বারো ঘণ্টা। একঘণ্টা দুপুরের খাবারের বিরতি। বাকি এগারো ঘণ্টা ঝালাই।

জাহাজের স্টিলের প্লেট জোড়া দেওয়া ফজলুর কাজ। প্রতিটা প্লেট কয়েক টনের। ক্রেন দিয়ে তোলা হয়, জায়গামতো বসানো হয়, তারপর ফজলু ঝালাই করে জোড়া দেয়। একটা সীম ঝালাই করতে ঘণ্টাখানেক লাগে। দিনে আটটা-দশটা সীম।

ঝালাইয়ের সময় ধোঁয়া ওঠে। জিংক অক্সাইড, ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়ামের ধোঁয়া। ফজলু শ্বাস নেয়। মাস্ক নেই। ভেন্টিলেশন নেই। খোলা আকাশের নিচে কাজ হলে তবু বাতাস পায়। কিন্তু জাহাজের ভেতরে ঢুকে ঝালাই করলে ধোঁয়া জমে থাকে। চোখ জ্বলে। ফুসফুস জ্বলে। গলায় ঝাঁঝ ধরে।

ফজলু কাশে। কাশি থামে না মাঝে মাঝে। সহকর্মী আবদুল বলে, "ফজলু ভাই, ডাক্তার দেখান।" ফজলু বলে, "ডাক্তার দেখালে কী হবে? বলবে কাজ ছাড়তে। কাজ ছাড়লে খাব কী?"

গত মাসে চোখের ডাক্তারে গিয়েছিল। স্ত্রী জোর করেছিল। শরীফা বলল, "তুমি রাতে আমার মুখ দেখতে পাও না। যাও।"

ডাক্তার চোখ পরীক্ষা করলেন। যন্ত্র দিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, "ছানি পড়ছে। দুই চোখেই। বয়স কত আপনার?"

"চল্লিশ।"

ডাক্তার একটু চুপ করলেন। চল্লিশে ছানি অস্বাভাবিক। সত্তর-আশিতে হয় সাধারণত। কিন্তু তিনি জানেন ঝালাই শ্রমিকদের ত্রিশ-চল্লিশেই হয়। অতিবেগুনি রশ্মি লেন্সকে ক্ষয় করে। ধীরে ধীরে। প্রতিদিন একটু একটু।

"অপারেশন লাগবে। বিশ হাজার টাকা। একটা চোখ। দুটো চোখে চল্লিশ হাজার।"

ফজলু হিসাব করল। ছশো টাকা দিনে। মাসে আঠারো হাজার, যদি তিরিশ দিন কাজ পায়। বাড়িভাড়া তিন হাজার। খাওয়া ছয় হাজার। বাচ্চাদের স্কুল দুই হাজার। বাকি সাত হাজার। তার থেকে বাকি সব খরচ।

বিশ হাজার বাঁচাতে কত দিন লাগবে? তেত্রিশ দিন। যদি সে না খায়।

"পরে আসব।" ফজলু বলল।

ডাক্তার বুঝলেন। তিনি প্রতিদিন এই কথা শোনেন। "পরে" মানে কখনো না।

শিপইয়ার্ডে যে জাহাজ তৈরি হচ্ছে সেটা যাবে নরওয়ে। কার্গো ভেসেল। বারো হাজার ডেডওয়েট টনেজ। নরওয়েতে এই জাহাজ চলবে ইউরোপীয় মেরিটাইম সেফটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে। প্রতিটা ঝালাই পরীক্ষা হবে আল্ট্রাসনিক টেস্টিং দিয়ে। কোনো ক্র্যাক থাকলে রিজেক্ট।

জাহাজের ঝালাইয়ে ক্র্যাক চলবে না। কিন্তু ঝালাই যে করে, তার চোখে ছানি চলে। তার ফুসফুসে ধোঁয়া চলে। তার হাতে পোড়া দাগ চলে।

নরওয়ের বন্দরে এই জাহাজ ভিড়লে কেউ জানবে না ফজলু নামের একজন লোক বিনা গগগলসে ঝালাই করে এটা বানিয়েছে। ইউরোপীয় সেফটি ইন্সপেক্টর জাহাজের প্রতিটা সীম পরীক্ষা করবে। কিন্তু যে শ্রমিক সেই সীম বানাল, তার চোখ কেউ পরীক্ষা করবে না।

জাহাজ বিলাতে যায়। ফজলুর চোখ কোথাও যায় না।

চোখ দিয়ে ঝালাই দেখে ফজলু। ঝালাই তার চোখ খেয়ে ফেলছে।

এটা সে জানে। শরীফা জানে। বাচ্চারা জানে। ঠিকাদার জানে। ইয়ার্ডের মালিক জানে। সবাই জানে। কেউ কিছু করে না।

ফজলুর দোষ কি? সে গগগলস কিনতে পারে। তিনশো টাকা। কিন্তু গগগলস পরলে ঘাম জমে, ধোঁয়া জমে, দৃষ্টি আরো ঝাপসা হয়। কাজ ধীর হয়। ঠিকাদার বলে, "তোমার জায়গায় দশজন দাঁড়িয়ে আছে।"

ঠিকাদারের দোষ কি? সে মজুরি দেয়। কাজ দেয়। গগগলস দেওয়া তার দায়িত্ব না, আইনে তা বলা থাকলেও আইন আর ইয়ার্ডের মধ্যে কয়েক আলোকবর্ষের দূরত্ব।

মালিকের দোষ কি? মালিক ঢাকায় বসে। ইয়ার্ডের ম্যানেজমেন্ট ঠিকাদারের হাতে। মালিক জানে ঠিকাদার সেফটি দেয় না। মালিক চোখ বন্ধ করে রাখে। মালিকের চোখে ছানি পড়ে না।

সিস্টেমের দোষ? সিস্টেম কোনো মানুষ না। তাকে দোষ দিলে কেউ শোনে না।

ফজলুর সাথে কাজ করে আঠারোজন ওয়েল্ডার। তাদের মধ্যে বারোজনের চোখে সমস্যা আছে। তিনজনের ফুসফুসে। একজনের কানে। ঝালাইয়ের শব্দ ক্রমাগত শুনে শুনে কানের পর্দা দুর্বল হয়ে গেছে।

কোনো ইনস্যুরেন্স নেই। কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। কোনো ছুটি নেই। অসুস্থ হলে কাজে আসতে না পারলে সেদিনের মজুরি নেই। পাঁচদিন না এলে জায়গায় অন্য কেউ ঢুকে যায়।

ফজলু একবার পায়ে গরম ধাতুর টুকরো পড়ে পুড়ে গিয়েছিল। চামড়া উঠে গেছিল। তিনদিন কাজে আসতে পারেনি। চতুর্থ দিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসেছিল। পায়ে ব্যান্ডেজ, ভেতরে পুঁজ। কিন্তু ছশো টাকা দরকার। প্রতিদিন ছশো টাকা দরকার।

"তুমি পারবে?" ঠিকাদার জিজ্ঞেস করল।

"পারব।"

ফজলু পারল। যন্ত্রণায় দাঁত কামড়ে কাজ করল। ঘামে ব্যান্ডেজ ভিজে গেল। সন্ধ্যায় খুলে দেখল ব্যান্ডেজে রক্ত আর পুঁজ মিশে আছে।

এটা সাহস না। এটা বিকল্পহীনতা।

শরীফা রাতে ফজলুর চোখে পানি দেয়। পরিষ্কার পানি, তুলোয় ভিজিয়ে। ফজলু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। ঠান্ডা পানি চোখের জ্বলুনি কমায় একটু। কিন্তু আবার সকালে একই আগুন।

বড় ছেলে ইমন, বয়স চোদ্দ। সেও ইয়ার্ডে কাজ করতে চায়। ফজলু রাজি না।

"তুই পড়বি।"

"পড়ে কী হবে? তুমিও তো পড়নি।"

"আমি পড়িনি বলেই তোকে পড়তে বলছি।"

ইমন বোঝে না। সে দেখে বাবা প্রতিদিন ছশো টাকা আনে। স্কুল শেষ করলে কী হবে? গার্মেন্টসে যাবে? দশ-বারো হাজার মাসে? বাবা তো মাসে আঠারো পায়।

ফজলু ছেলেকে বোঝাতে পারে না যে আঠারো হাজারের বিনিময়ে সে চোখ দিচ্ছে। চোখের দাম কত? বিশ হাজার, ডাক্তার বলেছে। কিন্তু আসল দাম? আসল দাম কেউ জানে না। আসল দাম হিসাব করার কোনো সূত্র নেই।

ফজলু ঝালাই করে। স্পার্ক ওড়ে। কমলা-সাদা-নীল আলোর ঝর্ণা। সুন্দর দেখতে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় আতশবাজি। কিন্তু কাছ থেকে আলোটা চোখে ঢোকে, রেটিনা পোড়ায়, লেন্স ঘোলা করে।

প্রতিটা স্পার্ক একটু একটু অন্ধত্ব।

ফজলু জানে একদিন সে দেখতে পাবে না। পাঁচ বছর পর, দশ বছর পর, কখনো একদিন। সেদিন কী হবে? ইয়ার্ড তাকে রাখবে না। অন্ধ ওয়েল্ডারের কোনো মূল্য নেই। সে বাড়িতে বসে থাকবে। শরীফা অন্য কারো বাড়িতে কাজ করবে। ইমন ইয়ার্ডে আসবে। রড ধরবে। স্পার্ক দেখবে। তার চোখও পুড়বে।

এটা চক্র। ঝালাইয়ের চক্র। বাপ থেকে ছেলে, চোখ থেকে চোখ।

সন্ধ্যা হয়। ফজলু রড নামায়। মুখে পানি দেয়। চোখ ধোয়। লাল চোখে বাড়ি ফেরে।

রাস্তায় স্ট্রিটলাইট জ্বলে। আলোর চারপাশে হ্যালো দেখে ফজলু। এটা ছানির লক্ষণ। আলোর চারদিকে রংধনুর মতো বৃত্ত। সুন্দর। কিন্তু এই সৌন্দর্যের মানে হলো লেন্স নষ্ট হচ্ছে।

ফজলু হাঁটে। ঝাপসা পৃথিবীতে। তার বানানো জাহাজ পরিষ্কার সমুদ্রে ভাসবে। সে ঝাপসা ঘরে ঘুমাবে।

চোখ দিয়ে ঝালাই দেখি। ঝালাই চোখ খেয়ে ফেলছে।

একটাই সত্য। বদলানোর কেউ নেই।

ভোর পাঁচটায় ঘুম ভাঙে। অন্ধকার। শরীফা উঠে চুলায় আগুন দেয়। ভাত চাপায়। ফজলু উঠোনে গিয়ে মুখ ধোয়। টিউবওয়েলের পানি। ঠান্ডা। চোখে পানি দেয়। জ্বলুনি কমে একটু।

ছোট মেয়ে নীলা, বয়স আট, ঘুমাচ্ছে। ইমন উঠে গেছে, সেও মুখ ধুচ্ছে। ফজলু ছেলের দিকে তাকায়। ইমনের চোখ পরিষ্কার। সাদা। কোনো লাল নেই। কোনো হ্যালো নেই।

ফজলু চায় এই চোখ এমনই থাকুক।

সকালের ভাত খায়। ডাল, আলু ভাজি। শরীফা পানির বোতল ভরে দেয়। টিফিন বাক্সে পান্তা ভাত রাখে দুপুরের জন্য।

ফজলু বেরোয়। সাইকেলে। ইয়ার্ড তিন কিলোমিটার। পথে অন্য শ্রমিকদের সাথে দেখা হয়। রহমান, আবুল, কাসেম। সবার চোখ লাল। সবার ফুসফুসে ধোঁয়া। কেউ কথা বলে না পথে। ঘুমের ক্লান্তি এখনো শরীরে।

ইয়ার্ডে ঢুকলে লোহার গন্ধ আসে। পোড়া লোহা। ফজলু তার জায়গায় যায়। ওয়েল্ডিং রড ঢোকায় হোল্ডারে। মাস্ক পরে না। গগগলস পরে না। আর্ক জ্বলে। সাদা-নীল আলো ঝরে পড়ে।

আরেকটা দিন শুরু।

সন্ধ্যায় ছটায় আর্ক নেভে। ফজলু দাঁড়ায়। পিঠ সোজা করে। হাড় মটমট করে। সারাদিন ঝুঁকে কাজ, মেরুদণ্ডে চাপ। সে হাত ধোয়। মুখ ধোয়।

গেটের বাইরে নতুন জাহাজের হাল দেখা যায়। বিশাল। ইস্পাতের দানব। ফজলু এটার পেট ঝালাই করেছে। প্রতিটা সীমে তার হাতের স্থিরতা আছে, তার ঘামের লবণ আছে।

জাহাজ যাবে। সমুদ্র পাড়ি দেবে। ঝড়ে টিকবে। ঢেউয়ে ভাসবে। কারণ ফজলুর ঝালাই ধরে আছে।

কিন্তু ফজলুকে কে ধরে আছে?

সে সাইকেল চালায়। লাল চোখে। বাড়ি ফেরে। শরীফা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। নীলা দৌড়ে আসে। "বাবা!"

ফজলু মেয়েকে কোলে তোলে। মেয়ের মুখ একটু ঝাপসা দেখে। ডান চোখে বেশি ঝাপসা। বাম চোখে একটু কম।

সে চোখ বন্ধ করে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। চোখ বন্ধ করলে সব পরিষ্কার। অন্ধকারে কোনো ঝাপসা নেই।