পেইন্টার
আমার বন্ধুর জীবনের দাম ৫০ হাজার। সেই ফ্ল্যাটের দাম দেড় কোটি।
১
আমজাদ বারোতলা বিল্ডিংয়ের বাইরের দেয়ালে ঝুলে আছে। নিচে রাস্তা। রাস্তায় গাড়ি চলছে, রিকশা চলছে, মানুষ হাঁটছে। কেউ ওপরে তাকায় না। তাকালেও দেখবে একটা ক্ষুদ্র মানুষ বাঁশের ভারা থেকে ঝুলে দেয়ালে রঙ করছে। তাকিয়ে দেখার মতো কিছু না।
আমজাদের বয়স বিয়াল্লিশ। বিশ বছর ধরে রঙ করে। ঢাকা শহরের পাঁচশোর বেশি বিল্ডিংয়ে তার হাতের রঙ আছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, বসুন্ধরা। নতুন বিল্ডিং, পুরনো বিল্ডিং, সরকারি ভবন, প্রাইভেট টাওয়ার। সব।
ছশো টাকা দিনে।
আজ যে বিল্ডিংটায় কাজ করছে সেটা গুলশানে। বারোতলা রেসিডেন্সিয়াল টাওয়ার। প্রতিটা ফ্ল্যাটের দাম দেড় কোটি থেকে দুই কোটি। আমজাদ দশম তলার জানালার পাশে ঝুলে আছে। ভেতরে একটা পরিবার থাকে। সকালে পর্দা সরিয়ে একটা মেয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। আমজাদকে দেখে চমকে পর্দা টেনে দিয়েছে। যেন ভূত দেখেছে।
আমজাদ ভূত না। মানুষ। কিন্তু দশতলার জানালায় ঝুলন্ত একটা মানুষ দেখতে ভূতের মতোই।
২
বাঁশের ভারা। এটাই আমজাদের সিঁড়ি, চেয়ার, নিরাপত্তা বেষ্টনী। চারটা বাঁশ খাড়া, দুটো বাঁশ আড়াআড়ি, দড়ি দিয়ে বাঁধা। এর ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করে। হার্নেস নেই। সেফটি বেল্ট নেই। লাইফলাইন নেই। হেলমেট আছে, কিন্তু পরে না কেউ। গরমে মাথা সেদ্ধ হয়।
বাতাস দোলায় ভারাকে। আমজাদের পায়ের নিচে বাঁশ কাঁপে। একশো ফুট ওপরে। নিচে কংক্রিট। একটা ভুল পদক্ষেপ, একটা দড়ির গিঁট খুলে গেলে, একটা পচা বাঁশ ভেঙে গেলে। মৃত্যু।
আমজাদ ভাবে না এসব। ভাবলে কাজ হয় না। যে মুহূর্তে ভয় আসে, সে হাত থেকে ব্রাশ ফেলে দেবে। ব্রাশ ফেললে ফ্ল্যাটের মালিক টাকা কাটবে। টাকা কাটলে বাচ্চাদের খাবার কমবে।
তাই সে ভাবে না। ব্রাশ ধরে। রঙ মাখে। দেয়ালে চালায়। ওপর থেকে নিচে। সমান স্ট্রোকে। বিশ বছরের অভ্যাসে হাত কাঁপে না।
৩
রঙটা সাদা। ওয়েদারকোট। বাইরের দেয়ালের জন্য। প্যাকেটে লেখা আছে নামকরা ব্র্যান্ডের নাম। কিন্তু আমজাদ জানে ভেতরে কী আছে। লেড। সীসা।
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে সীসাযুক্ত পেইন্ট নিষিদ্ধ। আমেরিকায় ১৯৭৮ সালে নিষিদ্ধ হয়েছে। ইউরোপে আরো আগে। বাংলাদেশে আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। বাজারের পেইন্টে সীসার পরিমাণ মাঝে মাঝে অনুমোদিত মাত্রার দশগুণ, বিশগুণ।
আমজাদ এসব জানে না। সে জানে পেইন্টের গন্ধ মাথা ঘোরায়। দিন শেষে মাথায় ব্যথা হয়। হাত কাঁপে মাঝে মাঝে, বিশেষ করে সকালে। পেটে ব্যথা হয়। এগুলো সীসা বিষক্রিয়ার লক্ষণ। কিন্তু আমজাদ ভাবে ক্লান্তি। বয়সের ধকল। ভাবে, মানুষ তো বুড়ো হয়।
সে বুড়ো হচ্ছে না। সে বিষ খাচ্ছে। প্রতিদিন একটু একটু। শ্বাসে, চামড়ায়, নখে।
পেইন্টের রঙ সুন্দর। পেইন্টারের জীবন না।
৪
তিনজন বন্ধু মারা গেছে আমজাদের। কাজ করতে করতে। পড়ে।
প্রথমজন হাসান। ২০১৫ সালে। মিরপুরে একটা আটতলা বিল্ডিং। পঞ্চম তলা থেকে পড়েছিল। বাঁশ ভেঙেছিল। বাঁশটা পচা ছিল, ভেতরে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, বাইরে থেকে বোঝা যায়নি। হাসানের ওজনে ভেঙে গেল। সে পড়ল। পাঁচতলা থেকে।
মারা গেল। তাৎক্ষণিক।
কোম্পানি পরিবারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিল। হাসানের বউ তিনটা বাচ্চা নিয়ে গ্রামে চলে গেল।
দ্বিতীয়জন জব্বার। ২০১৮ সালে। ছয়তলা থেকে। দড়ি খুলে গিয়েছিল। কোম্পানি এক লাখ দিল। কারণ জব্বার দশ বছরের পুরনো কর্মী ছিল।
তৃতীয়জন কালাম। গত বছর। উত্তরায়। নয়তলা। রঙ করছিল, হঠাৎ মাথা ঘুরে গেল। পেইন্টের ধোঁয়া। গরম। পানিশূন্যতা। মাথা ঘুরে ভারসাম্য হারাল। পড়ল।
কালামের পরিবার পঞ্চাশ হাজার পেল।
কালামের মেয়ে ফাতেমা ক্লাস ফাইভে পড়ত। বাবা মারা যাওয়ার পর স্কুল ছেড়ে দিল। মা গার্মেন্টসে ঢুকল। ফাতেমা বাড়িতে ছোট ভাইকে দেখে। রান্না করে। আট বছরের মেয়ে রান্না করে।
আমজাদ শেষবার কালামের বাড়ি গিয়েছিল গত ঈদে। ফাতেমা দরজা খুলল। আমজাদকে দেখে বলল, "চাচা, আসেন।" সে চা বানিয়ে আনল। আট বছরের মেয়ে চা বানায়, অতিথি আপ্যায়ন করে।
আমজাদ চা খেতে পারল না। গলায় আটকে গেল কিছু একটা। চায়ের স্বাদ না, অন্য কিছু।
আমজাদ হিসাব করে। হাসান পঞ্চম তলা থেকে পড়ে পঞ্চাশ হাজার। জব্বার ছয়তলা থেকে পড়ে এক লাখ। কালাম নয়তলা থেকে পড়ে পঞ্চাশ হাজার। উচ্চতার সাথে ক্ষতিপূরণের কোনো সম্পর্ক নেই। জীবনের দামও নেই।
৫
কালাম যে ফ্ল্যাটের বাইরে রঙ করতে গিয়ে পড়েছিল, সেই ফ্ল্যাটটা বিক্রি হয়েছে দেড় কোটি টাকায়।
আমজাদ এটা জানে। সে হিসাব করেছে।
তার বন্ধুর জীবনের দাম পঞ্চাশ হাজার। সেই ফ্ল্যাটের দাম দেড় কোটি।
ফ্ল্যাটের দাম তার বন্ধুর জীবনের তিনশো গুণ। মানে তিনশো জন পেইন্টার মারা গেলে একটা ফ্ল্যাটের দাম হয়।
এই হিসাব আমজাদ কাউকে বলে না। কী লাভ বলে? কে শুনবে? ফ্ল্যাটের মালিক? সে জানেই না কে রঙ করেছে। ডেভেলপার? ডেভেলপারের কাছে পঞ্চাশ হাজার একটা লাইন আইটেম, অ্যাকাউন্টস খাতায়, "বিবিধ খরচ" এর নিচে।
৬
আমজাদের শরীরে পেইন্টের দাগ স্থায়ী। হাতে, বাহুতে, মুখে। ছোট ছোট সাদা-ক্রিম-ধূসর দাগ। থিনার দিয়ে মুছলেও কিছু থেকে যায়। ত্বকের ভাঁজে ঢুকে যায়।
তার নখ ভঙ্গুর। সহজে ভাঙে। এটা সীসার প্রভাব, কিন্তু সে জানে না। সে ভাবে বয়সের কারণে।
রাতে ঘুম আসে না মাঝে মাঝে। পেটে অস্বস্তি। কোষ্ঠকাঠিন্য। মাঝে মাঝে হাত-পায়ে ঝিনঝিন করে। এগুলো সব সীসা বিষক্রিয়ার ক্লাসিক লক্ষণ। কিন্তু আমজাদ ফার্মেসি থেকে গ্যাসের ওষুধ কেনে। পাঁচ টাকার ট্যাবলেট।
তার ছেলে রাসেল, বয়স বারো। রাসেল মাঝে মাঝে বাবার কাজে সাহায্য করতে আসে। পেইন্টের বালতি বহন করে, ব্রাশ ধোয়, থিনার মেশায়। বাচ্চাদের শরীরে সীসা আরো দ্রুত ঢোকে। মস্তিষ্কের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইকিউ কমে। রাসেল স্কুলে পড়ে, কিন্তু পড়া মনে থাকে না।
আমজাদ বলে, "ছেলেটা মনোযোগ দেয় না।" সে জানে না ছেলেটার মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৭
সকালে ভারায় ওঠে। দুপুরে নামে খেতে। পরোটা, ডাল। রাস্তার পাশের হোটেলে। পঁচিশ টাকা। তারপর আবার ওঠে। বিকাল পাঁচটায় নামে।
প্রতিদিন একই ছন্দ। একই উচ্চতা। একই ভয়, যেটা সে অনুভব করে না কারণ অনুভব করলে কাজ করা যায় না।
নিচে রাস্তায় মানুষ চলে। তারা উপর দিকে তাকায় না। আমজাদ নিচে তাকায়। মানুষগুলো পিঁপড়ার মতো। ছোট, ব্যস্ত, নিজের পথে। কেউ জানে না একশো ফুট ওপরে একটা মানুষ তাদের মাথার ওপর ঝুলে আছে। একটা ভুলে সে পড়বে। পড়লে নিচের কারো ওপর পড়তে পারে।
দুটো জীবন একটা পচা বাঁশের ওপর নির্ভর করছে।
৮
বিল্ডিংটা শেষ হলে রঙ চকচক করবে। সাদা, পরিষ্কার, ঝকঝকে। বিজ্ঞাপনে ছবি উঠবে। "লাক্সারি লিভিং ইন গুলশান।" কেউ জিজ্ঞেস করবে না কে রঙ করেছে। কোন শর্তে রঙ করেছে। কতজন এই বিল্ডিংয়ের রঙ করতে গিয়ে মরতে পারত।
আমজাদ পরের বিল্ডিংয়ে যাবে। আবার ভারায় উঠবে। আবার ব্রাশ ধরবে। আবার রঙ মাখবে।
সে বিশ বছরে পাঁচশোর বেশি বিল্ডিং রঙ করেছে। একটাতেও সে থাকে না। সে থাকে ভাড়া ঘরে। একতলা। টিনের ছাদ। দেয়ালে রঙ নেই। কালচে সিমেন্টের দেয়াল।
পেইন্টার নিজের ঘরে রঙ করে না। সময় নেই। টাকা নেই। ইচ্ছাও নেই। দিনভর রঙ করে যে ক্লান্তি আসে, তারপর নিজের দেয়ালের দিকে তাকানোর শক্তি থাকে না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। হাতে পেইন্টের গন্ধ। কাপড়ে পেইন্টের দাগ। চোখে ক্লান্তি।
স্ত্রী বলে, "গোসল করো।"
আমজাদ গোসল করে। পানিতে পেইন্ট ভাসে। নালায় যায়। শহরের নর্দমায় মেশে।
রাতে শুয়ে ছাদের দিকে তাকায়। টিনের ছাদ। নিচু। হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায়। দিনভর সে একশো ফুট ওপরে থাকে। রাতে ছয় ফুট নিচে শোয়।
চোখ বন্ধ করে। পরের বিল্ডিংয়ের কথা ভাবে। কত তলা? কোন দিকে রোদ পড়বে? বাঁশ কেমন পাবে?
ভয়ের কথা ভাবে না। ভয় ভাবলে ঘুম আসবে না। ঘুম না এলে কাল সকালে ভারায় উঠতে পারবে না। ভারায় না উঠলে ছশো টাকা নেই।
আমজাদ ঘুমায়।
৯
শুক্রবার। ছুটির দিন। আমজাদ বাড়িতে। রাসেল স্কুলে যায়নি, ছুটি। স্ত্রী রেহানা কাপড় ধুচ্ছে। আমজাদ উঠোনে বসে চা খাচ্ছে।
পাশের বাড়ির লোক টিভিতে খবর দেখছে। আওয়াজ আসছে। কোনো ফ্যাক্টরি ভবন ধসে পড়েছে কোথাও। শ্রমিক মারা গেছে। চ্যানেলে বিশেষজ্ঞ বলছে, "বিল্ডিং কোড মানা হয় না।" আরেকজন বলছে, "শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।"
আমজাদ শোনে। হাসে না। রাগও করে না। এই কথা সে বিশ বছর ধরে শুনছে। টিভিতে বলে। পত্রিকায় লেখে। সেমিনার হয়। তারপর সব আগের মতো।
হাসান পড়ে মারা গেলে পত্রিকায় একটা ছোট খবর হয়েছিল। দুই লাইন। ভেতরের পাতায়। "মিরপুরে পেইন্টার পড়ে নিহত।" নাম ছিল না। বয়স ছিল না। পরিবারের কথা ছিল না। শুধু "পেইন্টার।"
পেইন্টারের কোনো নাম নেই। পেইন্টারের কোনো মুখ নেই। পেইন্টারের একটাই পরিচয়: সে রঙ করে। পড়ে যায়। মারা যায়। আরেকজন আসে।
আমজাদ চা শেষ করে। রাসেলের দিকে তাকায়। ছেলেটা ফোনে কিছু দেখছে। আমজাদ ভাবে, রাসেল বড় হলে কী করবে? পেইন্টার হবে না, এটা সে চায়। কিন্তু কী হবে? গার্মেন্টসে? রিকশায়? দোকানে?
রাসেলকে পড়ানোর সামর্থ্য তার কতদূর? ক্লাস এইট? টেন? তারপর?
আমজাদ জানে না। সে শুধু জানে সোমবার আবার ভারায় উঠবে। আবার ব্রাশ ধরবে। আবার একশো ফুট ওপরে ঝুলবে। আবার সীসাযুক্ত রঙ শ্বাসে নেবে।
দেয়াল সুন্দর হবে। বিল্ডিং ঝকঝক করবে। ক্রেতা আসবে। দাম শুনবে। "দেড় কোটি? ভালো লোকেশন। দেখতে সুন্দর। রঙটা কী চমৎকার।"
রঙটা চমৎকার। রঙটা আমজাদের।
সে কখনো শুনবে না এই প্রশংসা। সে তখন অন্য বিল্ডিংয়ে, অন্য ভারায়, অন্য উচ্চতায়। একই ব্রাশ হাতে। একই ভয় বুকে, যেটা সে অনুভব করতে দেয় না নিজেকে।
ভোর হলে ওঠে। আবার যায়। আবার ওঠে। আবার ঝোলে। বাতাসে দুলতে থাকে, একশো ফুট ওপরে, পঞ্চাশ হাজার টাকা দামের জীবন নিয়ে, দেড় কোটি টাকার দেয়ালে রঙ দিতে।