টিনের ছাদ মিস্ত্রি
আমার পায়ের তলা দেখলে বুঝবেন আমি কতদিন ধরে পুড়ছি।
১
জাকিরের হাতে কাটা দাগ গোনা যায় না। ডান হাতের তালুতে তিনটা লম্বা দাগ, তর্জনীতে একটা গভীর খাঁজ, বাম হাতের পিঠে আড়াআড়ি একটা সাদা রেখা। বাহুতে, পায়ে, পায়ের পাতায়। সব টিনের কাটা।
টিন কাটে। নিঃশব্দে কাটে। হাত বোলাতে গেলে ধার লাগে, চামড়া ফেটে যায়, রক্ত বের হয়। রক্ত পড়ে টিনের ওপর, রোদে শুকিয়ে যায়।
জাকিরের বয়স পঁয়ত্রিশ। পনেরো বছর ধরে টিনের ছাদ বানায়, মেরামত করে, বদলায়। নোয়াখালীর কবিরহাট থেকে এসেছিল ঢাকায়। গ্রামে কাজ ছিল না। ঢাকায় বিল্ডিং ওঠে, কিন্তু গরিবের ঘরে টিনের ছাদ থাকে। গরিব কমে না, টিনের ছাদের কাজও কমে না।
চারশো টাকা দিনে। মৌসুম ভেদে কম-বেশি। বর্ষার আগে, মানে চৈত্র-বৈশাখে, কাজ বেশি। সবাই চায় বৃষ্টির আগে ছাদ ঠিক হোক। তখন জাকির চোদ্দ ঘণ্টা কাজ করে। সকাল ছটা থেকে রাত আটটা।
২
এপ্রিল মাস। বৈশাখ। আকাশে মেঘ নেই। রোদ খাড়া। তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি ছায়ায়। টিনের ছাদের ওপর? ষাট ডিগ্রি।
টিন তাপ শোষণ করে। ধরে রাখে। পুরো দিন জমাতে থাকে। সকালে গরম, দুপুরে তপ্ত, বিকালে জ্বলন্ত।
জাকির খালি পায়ে কাজ করে। জুতো পরলে ভারসাম্য থাকে না ঢালু ছাদে। পা পিছলে যায়। তাই খালি পা। ষাট ডিগ্রি টিনের ওপর খালি পা।
প্রথম পাঁচ বছর পায়ের তলা পুড়ত। ফোসকা পড়ত। চামড়া উঠে যেত। এখন পুড়ে না। চামড়া এত পুরু হয়ে গেছে যে পেরেক মাড়ালেও টের পায় না। আঙুলের তলায়, গোড়ালিতে, পায়ের পাতার ধারে। চামড়া চামড়া নেই। চামড়ার মতো দেখতে এক ধরনের আবরণ, পনেরো বছরের তাপ আর ঘর্ষণে তৈরি।
"আমার পায়ের তলা দেখলে বুঝবেন আমি কতদিন ধরে পুড়ছি।"
জাকির এটা বলে হেসে। হাসিতে কোনো কষ্ট নেই। কষ্ট এত পুরনো যে সেটাও চামড়ার মতো পুরু হয়ে গেছে।
৩
টিনের ছাদের কাজে কী লাগে? হাতুড়ি, কাটার, তারকাটার কাঁচি, পেরেক, ড্রিল। আর হাত। শক্ত হাত।
টিন ভারী। একটা শিট আট-দশ কেজি। সেটা মাথায় করে ছাদে তুলতে হয়। সিঁড়ি নেই বেশিরভাগ বাড়িতে। মই। বাঁশের মই। টিন মাথায়, এক হাতে মই ধরে, অন্য হাতে ভারসাম্য রেখে ওঠা।
একবার পড়েছিল জাকির। সাত বছর আগে। দোতলা বাড়ি। মই পিছলে গিয়েছিল। টিনসহ পড়ল মাটিতে। টিনের ধার পিঠ কেটে দিল। পিঠে এখনো দাগ আছে। লম্বা, সাদা, কুঁচকানো।
হাসপাতালে গেল। পাঁচটা সেলাই পড়ল। তিনদিন বিশ্রাম। চতুর্থ দিন কাজে ফিরল। পিঠে সেলাই, কিন্তু চারশো টাকা দরকার।
৪
টিটেনাস। এই শব্দটা জাকির শুনেছে কিন্তু ঠিক জানে না কী। টিকা আছে এর বিরুদ্ধে। জাকির কখনো টিকা নেয়নি।
মরচে পড়া টিন কাটতে গিয়ে হাতে-পায়ে ক্ষত হয়। মরচে পড়া ধাতুতে ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। সংক্রমণ হলে পেশি শক্ত হয়ে যায়। চোয়াল আটকে যায়। শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে।
জাকির এটা জানে না। সে জানে কেটে গেলে থুতু লাগাতে হয়। পুরনো কাপড়ের টুকরো বাঁধতে হয়। কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
তার সহকর্মী মতিন গত বছর হাতে কেটে জ্বর পেল। জ্বর বাড়ল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মুখ খুলতে পারে না। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলল, "টিটেনাস।" তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। মতিন বাঁচল, কিন্তু দুই সপ্তাহ আইসিইউতে ছিল। খরচ হলো পঁয়ত্রিশ হাজার।
টিকার দাম ছিল পঞ্চাশ টাকা।
৫
বর্ষা আসছে। জাকিরের ফোন বাজে সারাদিন। "ভাই, ছাদ দিয়ে পানি পড়ে।" "ভাই, একটু এসে দেখেন, টিন উড়ে গেছে।" "ভাই, পুরনো ছাদ বদলাতে হবে, বৃষ্টির আগে।"
জাকির সকালে একটা বাড়ি, দুপুরে আরেকটা, বিকালে তৃতীয়। দৌড়ায় সারাদিন। এই মৌসুমে আয় বাড়ে। দিনে ছশো-সাতশো। কিন্তু শরীরও ক্ষয় হয়।
টিনের ছাদ গরিবের আশ্রয়। কংক্রিটের সামর্থ্য নেই, ইটের পাকা ঘরের সাধ্য নেই, তাই টিন। পাতলা ঢেউ তোলা গ্যালভানাইজড টিন। বৃষ্টিতে শব্দ হয়। গরমে ওপর থেকে তাপ ঝরে। শীতে ঠান্ডা ভেতরে ঢোকে। কিন্তু মাথার ওপর কিছু একটা আছে, এটাই যথেষ্ট।
এই আশ্রয় বানায় জাকিরের মতো মিস্ত্রিরা। তারাও গরিব। টিনের ছাদ বানানো গরিবের কাজ। টিনের ছাদের নিচে থাকাও গরিবের।
চক্রটা সম্পূর্ণ। কেউ এই চক্রের বাইরে না।
জাকির একবার হিসাব করেছিল। ঢাকা শহরে কত টিনের ছাদ আছে? লাখ লাখ। প্রতিটা ছাদ কেউ না কেউ বানিয়েছে, ঠিক করেছে, বদলেছে। জাকিরের মতো কত মিস্ত্রি কাজ করে? হাজার হাজার। তাদের কোনো ইউনিয়ন নেই। কোনো সংগঠন নেই। কোনো দরকষাকষির ক্ষমতা নেই। কাজ আছে তো চারশো, নেই তো শূন্য।
"ভাই, দাম কমাও। তিনশোতে করে দাও।"
"তিনশোতে হবে না।"
"তাহলে অন্য মিস্ত্রি আনব।"
জাকির জানে অন্য মিস্ত্রি তিনশোতে রাজি হবে। ক্ষুধার কাছে দরকষাকষির কোনো জোর নেই। সে রাজি হয়। তিনশো। সারাদিন রোদে, টিনের ওপরে, কাটা হাতে।
৬
দুপুরে খায় রাস্তার পাশে। ভাত, ডাল, একটুকরো মাছ। তিরিশ টাকা। খাওয়ার পর একটু ছায়ায় বসে। পাঁচ মিনিট। তারপর আবার ছাদে।
ছাদে উঠলে ঢাকা শহর দেখা যায়। টিনের ছাদের সমুদ্র। ঢেউ তোলা রুপালি-ধূসর টিন, মরচে পড়া বাদামি টিন, নতুন চকচকে টিন, পুরনো ছেঁড়া টিন। মাইলের পর মাইল। উচ্চমধ্যবিত্তের কংক্রিটের বিল্ডিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে টিনের ঘরের বস্তি। ওপর থেকে দেখলে মনে হয় দুটো আলাদা শহর পাশাপাশি আছে।
জাকির দুটো শহরই চেনে। কংক্রিটের বিল্ডিংয়ে সে ঢুকতে পারে না, কিন্তু তাদের পাশের টিনের ঘরগুলো তার কর্মক্ষেত্র।
সে পেরেক ঠোকে। হাতুড়ির শব্দ। ঠক ঠক ঠক। পাড়ার সবাই জানে জাকির এসেছে। ছাদ ঠিক হচ্ছে। বৃষ্টির আগে মাথার ওপর আবার টিন থাকবে।
৭
রাতে জাকির নিজের ভাড়া ঘরে ফেরে। সেটাও টিনের ছাদ। নিজের ছাদ নিজে ঠিক করে। এটুকু সুবিধা আছে, মিস্ত্রি ভাড়া লাগে না।
শরীরে কাটা দাগ যন্ত্রণা করে রাতে। দিনে টের পায় না, কাজের ব্যস্ততায়, ঘামের জ্বলুনিতে। রাতে শান্ত হলে শরীর মনে করিয়ে দেয়।
স্ত্রী রহিমা বলে, "ডেটল লাগাও।"
জাকির হাসে। ডেটলের দাম ষাট টাকা। সে থুতু লাগায়। ফ্রি।
দুটো মেয়ে। বড় মেয়ে আমেনা, সাত বছর, ক্লাস টু। ছোট মেয়ে জান্নাত, চার বছর। জাকির চায় মেয়েরা পড়ুক। অন্তত অষ্টম শ্রেণি। তারপর যা হয়।
কিন্তু চারশো টাকা দিনে পরিবারের চারজনের খরচ চালিয়ে মেয়েদের পড়ানো কঠিন। স্কুলের বই ফ্রি, কিন্তু খাতা, কলম, জুতো, ইউনিফর্ম ফ্রি না। পরীক্ষার ফি ফ্রি না। প্রাইভেট টিউটর ফ্রি না, আর প্রাইভেট ছাড়া পাস করা কঠিন কারণ ক্লাসে শিক্ষক ঠিকমতো পড়ান না।
জাকির হিসাব করে। হিসাব মেলে না। কখনো মেলে না।
আমেনা স্কুল থেকে ফিরে বলে, "বাবা, আমাদের ক্লাসে সবার ব্যাগ আছে। আমার ব্যাগ ছেঁড়া।"
জাকির বলে, "পরের মাসে কিনে দেব।"
পরের মাস আসে। ব্যাগ কেনা হয় না। অন্য কিছু দরকার হয়। রহিমার ওষুধ, জান্নাতের জুতো, বাড়িভাড়া। ব্যাগ পিছিয়ে যায়। আমেনা ছেঁড়া ব্যাগে স্কুলে যায়। চুপ করে।
সে বাবাকে আর বলে না। সে বুঝে গেছে "পরের মাসে" মানে কী।
৮
বৈশাখের ঝড় আসে। কালবৈশাখী। বিকাল থেকে আকাশ কালো। বাতাস বাড়ে। তারপর ঝড়। বৃষ্টি। শিলাবৃষ্টি মাঝে মাঝে।
টিনের ছাদ উড়ে যায়। পুরনো ছাদ, মরচে পড়া পেরেক, দুর্বল বাতা। ঝড়ের বাতাস টিন ছিঁড়ে নেয়। উড়ন্ত টিন মানুষ কাটে। প্রতি বছর কালবৈশাখীতে উড়ন্ত টিনে মানুষ মারা যায়।
ঝড়ের পর জাকিরের ফোন বাজে অবিরাম। "ছাদ উড়ে গেছে।" "টিন বাঁকা হয়ে গেছে।" "পানি ঢুকছে ঘরে।"
জাকির যায়। কাদায় হাঁটে। ভেজা কাঠে মই লাগায়। ভেজা ছাদে ওঠে। পিচ্ছিল। বিপজ্জনক। কিন্তু মানুষের মাথার ওপর ছাদ দরকার। এখনই দরকার। আগামীকাল না।
সে পেরেক ঠোকে। ভেজা হাতুড়ি পিছলে যায়। আঙুলে লাগে। থেঁতলে যায়। সে গালি দেয়। তারপর আবার ঠোকে।
ঝড়ের পরের দিনগুলোতে কাজ বেশি, আয় বেশি। জাকিরের জন্য ঝড় একটা সুযোগ। অন্যের ক্ষতি তার রোজগার। এই সত্যটা সে ভাবলে অস্বস্তি লাগে। তাই ভাবে না।
৯
জাকিরের বাবাও টিনের কাজ করত। নোয়াখালীতে। ঘূর্ণিঝড়ের পর পুরো গ্রামের ছাদ বানাত। বাবা মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। ফুসফুসে সমস্যা। ধুলো, টিনের গুঁড়ো, সারাজীবন শ্বাসে নিয়েছে।
জাকিরও নেয়। টিন কাটলে মিহি ধাতুর গুঁড়ো উড়ে। চোখে ঢোকে, নাকে ঢোকে, ফুসফুসে যায়। মাস্ক? কে পরে মাস্ক এই গরমে, ছাদের ওপর, ষাট ডিগ্রি তাপমাত্রায়?
বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিল, "তুই এই কাজ ছেড়ে দে।"
জাকির বলেছিল, "তাহলে কী করব?"
বাবা উত্তর দিতে পারেনি। কারণ উত্তর নেই। টিনের ছাদ ছাড়া জাকির কিছু জানে না। টিনের ছাদই তার সার্টিফিকেট, তার ডিগ্রি, তার পরিচয়।
রোদ পড়ে। টিন তপ্ত হয়। জাকির খালি পায়ে দাঁড়ায়। হাতুড়ি চালায়। পেরেক ঢোকে কাঠে। টিন আটকে যায়। ছাদ হয়।
কারো মাথার ওপর ছায়া হয়। জাকিরের মাথার ওপর রোদ থাকে।
নিচে ঘরের মালিক দাঁড়িয়ে দেখছে। "ভাই, ওই কোণাটা একটু ভালো করে দেন। পানি পড়ে।" জাকির মাথা নাড়ে। সে জানে কোণায় পানি কেন পড়ে। টিনের জোড় ঠিকমতো ওভারল্যাপ হয়নি। আগের মিস্ত্রি কম পেরেক দিয়েছে। বাতাসে টিন একটু সরে গেছে। ফাঁক হয়েছে।
সে ঠিক করে। পুরনো পেরেক তুলে নতুন লাগায়। টিন টানটান করে বসায়। হাতুড়ির শব্দে পাখি উড়ে যায়।
সে মোছে ঘাম। কাটা হাতে লবণাক্ত ঘাম জ্বলে। জ্বালা সহ্য করে। পরের পেরেক ঠোকে।
ষাট ডিগ্রি। খালি পা। কাটা হাত। চারশো টাকা।
জীবন এভাবেই চলে।