ইট ভাটার শ্রমিক

আমরা ইট বানাই। ইট দিয়ে বাড়ি হয়। বাড়িতে আমরা থাকি না।

পর্ব ৫৫ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সখিনার হাত মাটির রঙ। লাল-বাদামি। কাদামাটি। সারাদিন কাদা ছানে, ছাঁচে ভরে, উলটে দেয়, শুকাতে দেয়। এই কাজ সে করে সকাল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। তার স্বামী জয়নাল পাশে কাজ করে। তাদের ছেলে রফিক, বয়স দশ, পাশে। মেয়ে সুমি, বয়স আট, পাশে।

চারজন মিলে দিনে আটশো ইট বানায়।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় ইট ভাটা। নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত মৌসুম। সাত মাস। বাকি পাঁচ মাস বৃষ্টিতে ভাটা বন্ধ। তখন সখিনার পরিবার গ্রামে ফিরে যায়। গ্রামে কাজ নেই। ধান নেই। জমি নেই। শুধু অপেক্ষা। পরের মৌসুমের অপেক্ষা।

পাঁচশো টাকা দিনে। চারজনের সম্মিলিত আয়। জনপ্রতি একশো পঁচিশ।

ঋণ। এই একটা শব্দে সখিনার জীবন আটকে আছে।

তিন বছর আগে জয়নালের বাবা অসুস্থ হলো। ক্যান্সার। ঢাকায় হাসপাতালে নিয়ে গেল। চিকিৎসা খরচ তিরিশ হাজার টাকা। জয়নালের কাছে তিরিশ হাজার কোথায়?

ভাটা মালিক হুসেইন সাহেব। তাঁর কাছে গেল। বলল, "দাদন দেন। পরের মৌসুমে কাজ করে শোধ দেব।"

হুসেইন সাহেব দিলেন। তিরিশ হাজার। সুদ পঞ্চাশ শতাংশ। বছরে।

প্রথম বছর শেষে ঋণ হলো পঁয়তাল্লিশ হাজার। সখিনা আর জয়নাল সাত মাসে কত কামাল? পাঁচশো টাকা দিনে, দুইশো দশ দিন। মোট এক লাখ পাঁচ হাজার। কিন্তু খরচ? মালিকের দোকান থেকে চাল কিনতে হয়, কেজি পঁয়ষট্টি টাকা, বাজারে পঞ্চাশ। তেল কিনতে হয়, দাম বেশি। দাদনের কিস্তি কাটা যায়। মাস শেষে হাতে আসে দুইশো টাকা। কখনো আসে না।

তিন বছরে ঋণ কমেছে? না। বেড়েছে। সুদের ওপর সুদ। এখন ঋণ বিয়াল্লিশ হাজার।

জয়নালের বাবা মারা গেছে দুই বছর আগে। ঋণ বেঁচে আছে।

ভাটায় কাজের ছন্দ একটাই। মাটি খোঁড়া। পানি মেশানো। ছানা। ছাঁচে ভরা। উলটে দেওয়া। শুকানো। ভাটায় পোড়ানো।

সখিনা ছাঁচের কাজ করে। কাঠের ছাঁচ। চার ইটের ছাঁচ। কাদামাটি ভরে, উপরটা সমান করে হাত দিয়ে, তারপর উলটে দেয়। কাঁচা ইট পড়ে মাটিতে। সারি সারি। হাজার হাজার।

একটা ইট বানাতে ত্রিশ সেকেন্ড। আটশো ইটে চার শত মিনিট। সাড়ে ছয় ঘণ্টা শুধু ছাঁচের কাজে। বাকি সময় মাটি ছানা, পানি আনা, শুকনো ইট সরানো।

সখিনার কোমর ব্যথা করে। সারাদিন ঝুঁকে কাজ। হাঁটু ব্যথা করে। মাটিতে বসে কাজ। কাঁধ ব্যথা করে। ভারী মাটি বহন।

ডাক্তার? ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় নেই। টাকা নেই। ভাটা থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি? আছে, কিন্তু একদিন না গেলে একদিনের মজুরি কাটা। মজুরি কাটলে ঋণ আরো বাড়ে।

বাচ্চারা কাজ করে। রফিক দশ বছর। সুমি আট।

রফিক শুকনো ইট বহন করে। মাথায় করে ভাটার কাছে নিয়ে যায়, যেখানে পোড়ানো হবে। প্রতিটা ইট আড়াই কেজি। মাথায় চারটা করে নেয়। দশ কেজি। দশ বছরের ছেলের মাথায়।

সুমি কাদামাটি ছানতে সাহায্য করে। খালি পায়ে কাদায় দাঁড়িয়ে মাড়ায়। পা দিয়ে মাটি মাখায়। পানি, মাটি, খড় মেশায়। তার পা কাদায় ডোবে, হাঁটু পর্যন্ত। টানতে গেলে শক্তি লাগে। আট বছরের মেয়ের শক্তি কতটুকু?

সুমির হাত কাঁচা। মাটিতে ক্ষার আছে। ক্ষার চামড়া খায়। আঙুলের ডগায়, তালুতে, কবজিতে চামড়া ফেটে যায়। রক্ত বের হয়। কাদামাটিতে রক্ত মেশে। ইটে রক্ত মেশে।

স্কুল? সুমি কখনো স্কুলে যায়নি। রফিক দুই বছর গিয়েছিল, গ্রামে। ক্লাস ওয়ান আর টু। তারপর ভাটায় আসতে হলো। ভাটার কাছে স্কুল নেই। থাকলেও যাওয়ার সময় নেই।

সখিনা বলে, "স্কুল কোথায়?"

এটা প্রশ্ন না। এটা উত্তর। স্কুল নেই। প্রশ্নও নেই।

ভাটায় একশো বিশজন শ্রমিক। তাদের মধ্যে তিরিশজনের বেশি শিশু। সবাই ঋণে আটকা।

সিস্টেমটা সরল। মালিক দাদন দেয়। শ্রমিক কাজ করে শোধ দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সুদের হার এত বেশি, এবং মালিকের দোকান থেকে জিনিস কিনতে বাধ্য হওয়ায় দাম এত বেশি, যে ঋণ কখনো শেষ হয় না। প্রতি মৌসুম শেষে ঋণ আরো একটু বাড়ে।

এটা বন্ধক শ্রম। আইনে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এ স্পষ্ট লেখা: বন্ধক শ্রম অবৈধ। শিশুশ্রম অবৈধ। ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।

আইন আছে। ভাটা আছে। দুটো পাশাপাশি থাকে। কেউ কাউকে চেনে না।

পরিদর্শক আসে বছরে একবার। আসার আগে মালিক জানতে পারে। সেদিন শিশুদের লুকিয়ে রাখা হয়। পরিদর্শক আসে, দেখে, যায়। "সব ঠিক আছে।" রিপোর্ট লেখে। ফাইলে ঢোকে। ফাইল থাকে।

পরিদর্শক চলে গেলে শিশুরা আবার আসে। ছাঁচের পাশে। কাদায়। ইটের ধুলোয়।

ভাটার ধোঁয়া কখনো থামে না। কয়লা পোড়ে। ইট পোড়ে। চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া ওঠে। আশপাশের জমিতে ছাই পড়ে। ফসল কম হয়। গাছ মরে। বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইডের গন্ধ।

সখিনার ছোট মেয়ে সুমির কাশি আছে। সারা বছর। ভাটার মৌসুমে বেশি। গ্রামে গেলে একটু কমে। আবার এলে শুরু।

ডাক্তার দেখায়নি। ডাক্তার দেখালে কী বলবে? বলবে এই পরিবেশে থাকা যাবে না। থাকা যাবে না মানে কাজ করা যাবে না। কাজ না করলে ঋণ কীভাবে শোধ হবে?

ঋণ শোধ হবে না। সখিনা এটা জানে। জয়নাল জানে। তারা জানে এই ঋণ তাদের জীবনে শেষ হবে না। রফিক বড় হলে ঋণ তার কাঁধে যাবে। সুমি বড় হলে তাকে বিয়ে দিতে হবে, তার জন্য আরো ঋণ লাগবে।

ঋণ বংশগত। রোগের মতো। বাবা থেকে ছেলে, মা থেকে মেয়ে।

সন্ধ্যায় কাজ শেষে সখিনা রান্না করে। ভাটার পাশেই ঝুপড়ি। বাঁশ আর পলিথিনের তাঁবু। ভেতরে মাটির চুলা। চাল, ডাল, পেঁয়াজ। মালিকের দোকান থেকে কেনা। দাম বাজারের চেয়ে বেশি। কিন্তু ভাটা থেকে বাজারে যেতে তিন কিলোমিটার হাঁটতে হয়। হাঁটার সময় নেই। শক্তি নেই।

রান্নার পর চারজন খায়। ভাত, ডাল। মাঝে মাঝে সবজি। মাংস? মাংস কখনো না।

রফিক বলে, "মা, কাল কি ছুটি?"

"ছুটি নেই।"

"কবে ছুটি?"

"বৃষ্টি হলে।"

বৃষ্টি মানে মৌসুম শেষ। মৌসুম শেষ মানে গ্রামে ফেরা। গ্রামে ফেরা মানে কাজ নেই, আয় নেই, জমানো সামান্য টাকায় পাঁচ মাস টেকা। টিকে থাকা। বেঁচে থাকা। পরের নভেম্বরের অপেক্ষা।

রফিক চুপ হয়ে যায়। সে বোঝে ছুটির মানে একটা কষ্ট থেকে আরেকটা কষ্টে যাওয়া।

ভোর চারটায় আজান হয়। সখিনা ওঠে। নামাজ পড়ে। তারপর রান্না। ভাত সেদ্ধ করে। পান্তা রাখে দুপুরের জন্য। সকালে শুকনো মুড়ি আর গুড়।

পাঁচটায় ভাটায় যায়। অন্ধকার তখনো। শীতের সকালে কুয়াশা। গরমের সকালে ধুলো। সখিনা হাঁটে। জয়নাল হাঁটে। রফিক আর সুমি পেছনে।

চারটা ছায়া। মাটির পথে। ভাটার দিকে।

কাদামাটির গর্তে পানি ঢালে। মাটি ভেজায়। পা দিয়ে মাখে। হাত দিয়ে ছানে। ছাঁচে ভরে। উলটে দেয়।

একটা ইট। আরেকটা ইট। আরেকটা।

এই ইট দিয়ে বাড়ি হবে। ঢাকায়, চট্টগ্রামে, সিলেটে। কারো বাড়ি। কারো দোকান। কারো দেয়াল। সখিনার হাতের ছাপ প্রতিটা ইটে আছে। আঙুলের রেখা কাদায় মিশে ইটে পুড়ে স্থায়ী হয়ে গেছে।

কিন্তু সেই বাড়িতে সখিনা থাকবে না।

"আমরা ইট বানাই। ইট দিয়ে বাড়ি হয়। বাড়িতে আমরা থাকি না।"

সখিনা এটা বলে কাউকে না। নিজেকে বলে। মনে মনে। বলার কেউ নেই। শোনার কেউ নেই।

মে মাসের শেষ। মৌসুম শেষ হচ্ছে। বৃষ্টি আসছে।

হুসেইন সাহেব হিসাব করেন। খাতা খোলেন। জয়নালের নাম। ঋণ বিয়াল্লিশ হাজার। এই মৌসুমে কিস্তি দিয়েছে আঠারো হাজার। বাকি চব্বিশ হাজার। সুদ যোগে পরের মৌসুমে ছত্রিশ হাজার।

জয়নাল খাতার দিকে তাকায়। সংখ্যাগুলো দেখে। বোঝে না সব, কিন্তু বোঝে যে ঋণ কমেনি।

"পরের মৌসুমে আসবে তো?" হুসেইন সাহেব জিজ্ঞেস করেন।

"আসব।" জয়নাল বলে।

এই "আসব" একটা চুক্তি। একটা শৃঙ্খল। জয়নাল জানে না পাঁচ মাস পরে গ্রাম থেকে কীভাবে টিকে ফিরবে, কিন্তু ফিরবে। ঋণ টানবে তাকে। ঋণ চুম্বকের মতো। পালানো যায় না।

কেউ কেউ পালায়। রাতের অন্ধকারে। অন্য জেলায় গিয়ে অন্য ভাটায় কাজ নেয়। কিন্তু সেখানেও একই সিস্টেম। দাদন, সুদ, মালিকের দোকান, চড়া দাম। ভাটা বদলায়, শৃঙ্খল বদলায় না।

১০

গ্রামে ফেরার দিন। সখিনা ঝুপড়ি গোছায়। বলার মতো জিনিস কী আছে? কয়েকটা থালা, একটা হাঁড়ি, কাপড়ের পুঁটলি, একটা ছেঁড়া কাঁথা। এটুকুই।

রফিক জিজ্ঞেস করে, "মা, গ্রামে গিয়ে কী করব?"

"থাকবি।"

"কী খাব?"

সখিনা উত্তর দেয় না। সে জানে না কী খাবে। গত বছর পাট পচানোর কাজ পেয়েছিল কিছুদিন। তার আগের বছর অন্যের ক্ষেতে ধান কাটার কাজ। কিন্তু সব মিলিয়ে পাঁচ মাসে যা আয় হয় তাতে দুই মাস চলে। বাকি তিন মাস?

বাকি তিন মাস একবেলা খায়। কখনো একবেলাও না।

সুমি কাশে। কাশতে কাশতে ঝুপড়ির কোণে বসে আছে। চোখ বড় বড়। গাল ভাঙা। পেট একটু ফোলা। পুষ্টিহীনতার লক্ষণ।

সখিনা মেয়ের মাথায় হাত রাখে। কী বলবে? কী বলা যায়?

ভাটার চিমনি থেকে শেষ ধোঁয়াটুকু উঠছে। মৌসুম শেষ। ইট পুড়ে লাল হয়ে গেছে। ট্রাকে উঠবে। ঢাকায় যাবে। বাড়ি হবে। দেয়াল হবে। ছাদ হবে।

সখিনার পরিবার হাঁটে। ধুলোর রাস্তায়। চারটা ছায়া ছোট হতে হতে মিলিয়ে যায়।

পরের নভেম্বরে আবার আসবে। আবার মাটি ছানবে। আবার ইট বানাবে। আবার ঋণ বাড়বে।

আর সুমি জিজ্ঞেস করবে না স্কুলের কথা। সে বুঝে গেছে। আট বছরেই বুঝে গেছে।

স্কুল কোথায়?