পাথর ভাঙা শ্রমিক

পাথর ভাঙি আমি। পাথর আমাকেও ভাঙছে

পর্ব ৫৬ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আছিয়ার হাতুড়ির ওজন সাড়ে তিন কেজি।

হাতলটা বাঁশের। ঘামে পিচ্ছিল হয়ে যায়। সে কাপড় জড়িয়ে ধরে। হাতুড়ি ওঠে, পড়ে। পাথর ভাঙে। আবার ওঠে, আবার পড়ে। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায়, পাহাড়ের পাদদেশে, যেখানে বোল্ডার আসে নদী থেকে, ট্রাকে করে, সেখানে আছিয়া বসে পাথর ভাঙে।

সকাল ছটা থেকে বিকাল পাঁচটা। এগারো ঘণ্টা। মাঝে দুপুরে আধঘণ্টা বিশ্রাম। পান্তা ভাত আর কাঁচা মরিচ। তারপর আবার হাতুড়ি।

বোল্ডার ভেঙে গ্রাভেল বানাতে হয়। রাস্তা বানানোর জন্য। বিল্ডিংয়ের ফাউন্ডেশনের জন্য। কংক্রিটের জন্য। যে শহরে আছিয়া কোনোদিন যায়নি, সেই শহরের ফ্লাইওভারের তলায় তার ভাঙা পাথর আছে।

দুশো টাকা। দিনে।

সিলেটের পাথর শিল্পে নারী শ্রমিকের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি। কারণ সহজ: মেয়েদের মজুরি কম। একই কাজ, একই ঘণ্টা, একই পাথর। পুরুষ পায় তিনশো। মেয়ে পায় দুশো। কখনো দেড়শো।

ঠিকাদার বলে, "মেয়েরা ধীরে কাজ করে।"

আছিয়া ধীরে কাজ করে না। সে ঘণ্টায় পাঁচ ঝুড়ি গ্রাভেল বানায়। পুরুষ শ্রমিক রশিদ বানায় চারটা। কিন্তু রশিদ পায় তিনশো, আছিয়া দুশো।

আছিয়া এ নিয়ে কিছু বলে না। সে জানে বললে কাজ যাবে। কাজ গেলে ভাত যাবে। ভাত গেলে মেয়ে রুবিনা না খেয়ে থাকবে। তাই সে চুপ করে পাথর ভাঙে।

ধুলো।

এই একটা শব্দ দিয়ে আছিয়ার পুরো দুনিয়া বোঝা যায়। পাথর ভাঙলে ধুলো ওঠে। সিলিকার ধুলো। চোখে কণা কণা ধুলো। নাকে ধুলো। মুখে ধুলো। ফুসফুসে ধুলো।

মাস্ক নেই। কোনো শ্রমিকের নেই। ঠিকাদার দেয় না। নিজে কিনতে গেলে একটা N95 মাস্কের দাম পঁচিশ টাকা। দুশো টাকার মজুরি থেকে পঁচিশ টাকা বাদ দিলে একশো পঁচাত্তর টাকা। সেটায় চাল, ডাল, তেল, লবণ হয় না।

তাই আছিয়া আঁচল দিয়ে নাক ঢাকে। কিন্তু আঁচল সিলিকা কণা আটকায় না। আঁচল শুধু বড় পাথরের টুকরো আটকায়, ধুলো গলে যায়। দশ বছর ধরে এই ধুলো আছিয়ার ফুসফুসে জমছে।

সিলিকোসিস।

রোগটার নাম আছিয়া জানে না। সে জানে কাশি হয়। শীতকালে বেশি। গরমেও থাকে। মাঝে মাঝে কাশির সাথে রক্ত আসে। লাল না, কালচে। সে থুতু ফেলে মাটিতে, হাত মোছে শাড়ির খুঁটে। কাজে ফেরে।

আছিয়ার স্বামী ছিল। করিম। সে-ও পাথর ভাঙত। দশ বছর আগে একটা বোল্ডার গড়িয়ে পড়ে তার পায়ের ওপর। হাড় ভাঙল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার টাকা ছিল না। গ্রামের হাড়ভাঙা কবিরাজ বাঁশের ফালি দিয়ে বেঁধে দিল। হাড় জোড়া লাগল, কিন্তু বাঁকা। করিম আর সোজা হাঁটতে পারে না। পাথর ভাঙতে পারে না।

এখন করিম বাড়িতে বসে থাকে। মাঝে মাঝে বিড়ি বানায়, বিক্রি করে। দিনে ত্রিশ-চল্লিশ টাকা আসে। বাকিটা আছিয়া।

করিম একদিন বলেছিল, "তুই কাজ ছেড়ে দে। আমি কিছু একটা করব।"

আছিয়া বলেছিল, "কী করবে? পাথরে পা ভেঙেছে, আর কী ভাঙাবে?"

করিম চুপ হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে এ বিষয়ে আর কথা হয়নি।

রুবিনা। ছয় বছর।

চুল রোদে পুড়ে খয়েরি হয়ে গেছে। পেট একটু ফোলা, কৃমির জন্য। পায়ে চটি নেই। সে আছিয়ার পাশে বসে থাকে সারাদিন। বাড়িতে রাখলে কে দেখবে? করিম পারে না, সে নিজেই অর্ধেক পঙ্গু। তাই রুবিনা মায়ের সাথে পাথরের খনিতে আসে।

রুবিনা ছোট ছোট পাথরের টুকরো জড়ো করে। একটা ভাঙা প্লাস্টিকের বালতিতে রাখে। মাঝে মাঝে নিজেও একটা ছোট হাতুড়ি দিয়ে ঠুকঠাক করে। খেলার মতো। কিন্তু খেলা না।

আছিয়া রুবিনার দিকে তাকায়। মেয়ের হাত এখনো নরম। আঙুলগুলো সরু। নখ পরিষ্কার। এই হাত এখনো পাথর চেনে না। কিন্তু পাথরের ধুলো ইতিমধ্যে এই হাতে বসছে। রুবিনার নাকেও সেই ধুলো ঢুকছে। ছয় বছরের ফুসফুসে।

"মা, আমিও পাথর ভাঙবো?"

আছিয়া হাতুড়ি নামিয়ে রাখে। ঘামে ভেজা কপাল মোছে। মেয়ের দিকে তাকায়।

"না। তুই পড়বি।"

রুবিনা মাথা নাড়ে। সে জানে পড়া মানে স্কুল। স্কুল মানে বই, খাতা, পেন্সিল। সে দেখেছে অন্য বাচ্চাদের ব্যাগ কাঁধে স্কুলে যেতে। সেও যেতে চায়।

স্কুল তিন কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ি রাস্তা। কাঁচা মাটি। বর্ষায় পিচ্ছিল হয়ে যায়। সাপ থাকে। ছয় বছরের বাচ্চাকে একা পাঠানো যায় না। কেউ সাথে যাবে? আছিয়া পারে না, সকাল ছটায় পাথর ভাঙতে আসতে হয়। করিম পারে না, তিন কিলোমিটার তার পায়ে সহ্য হয় না।

বাসও নেই। রিকশাও নেই। শুধু পায়ে হাঁটা।

"পড়বি" শব্দটা আছিয়ার মুখে ঘুরে ঘুরে আসে। এটা একটা প্রার্থনা, পরিকল্পনা না। সে জানে পড়ার জন্য যা লাগে, তার কিছুই তার কাছে নেই। টাকা নেই। রাস্তা নেই। সময় নেই। শুধু ইচ্ছা আছে। ইচ্ছা দিয়ে স্কুলে ভর্তি হয় না।

দুপুরে রোদ মাথার ওপরে এসে দাঁড়ায়। পাথরগুলো তেতে ওঠে। খালি পায়ে দাঁড়ালে পা পোড়ে। আছিয়া একটা পাটের বস্তা বিছিয়ে বসে। পাশে রুবিনা শুয়ে পড়ে, ঘুমিয়ে যায়।

আছিয়া মেয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকায়। রুবিনার নাকের ডগায় ধুলোর স্তর। ভ্রূ-তে ধুলো। চুলে ধুলো। এই ধুলো সাবান দিয়ে ধুলেও যায় না পুরোপুরি। রাতে বিছানায়ও ধুলো থাকে। বালিশে ধুলো। কাশি।

আছিয়া নিজের কাশির কথা ভাবে না। রুবিনার কাশির কথা ভাবে। রুবিনাও মাঝে মাঝে কাশে। শুকনো কাশি। এখনো রক্ত আসে না। কিন্তু আসবে। পাঁচ বছর, দশ বছর। একই ধুলো, একই ফুসফুস।

"পাথর ভাঙি আমি। পাথর আমাকেও ভাঙছে।"

এই কথাটা আছিয়া কাকে বলেছিল? একদিন এক সাংবাদিক এসেছিল। ক্যামেরা নিয়ে। ছবি তুলেছিল। কথা জিজ্ঞেস করেছিল। আছিয়া এই কথা বলেছিল। সাংবাদিক লিখে নিয়ে গেছিল। পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল কি না আছিয়া জানে না। সে পত্রিকা পড়ে না। পড়তে পারে না।

বিকাল পাঁচটায় কাজ শেষ।

আছিয়া ঝুড়ি গোনে। আজ পঁয়ত্রিশ ঝুড়ি গ্রাভেল হয়েছে। ঠিকাদার মালেক আসে, গোনে, খাতায় দাগ দেয়। দুশো টাকা দেয়। ময়লা দুটো একশো টাকার নোট।

আছিয়া নোট দুটো শাড়ির আঁচলে বাঁধে। রুবিনার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করে। দেড় কিলোমিটার। টিনের ঘর। একটা ঘর, একটা রান্নাঘর। পায়খানা বাইরে, ঝোপের আড়ালে।

করিম বসে আছে দরজায়। বিড়ির ধোঁয়া। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। আছিয়া ভেতরে যায়। চুলায় আগুন দেয়। ভাত চড়ায়। আলু সেদ্ধ করে। শুকনো মরিচ ভাজে। তেলের বদলে আজ পানি দিয়ে ডাল রান্না করে। তেল ফুরিয়ে গেছে, কিনতে হবে আগামীকাল।

রুবিনা খায়। করিম খায়। আছিয়া খায়। কেউ কথা বলে না। খাওয়ার সময় কথা বলার মতো শক্তি থাকে না। ভাত চিবানো, গেলা, আবার চিবানো। মুখের ভেতরে ভাতের সাথে সূক্ষ্ম পাথরের গুঁড়ো মেশে। দাঁতে কিড়মিড় করে।

রাতে আছিয়া বিছানায় শোয়। বিছানা বলতে মাটিতে পাতা একটা পুরোনো কাঁথা। রুবিনা পাশে। করিম অন্যপাশে, ভাঙা পায়ের দিকটা দেয়ালে ঠেকিয়ে।

আছিয়ার পিঠ ব্যথা করে। কোমর ব্যথা করে। কাঁধ ব্যথা করে। হাতের তালু জ্বলে। সারাদিন সাড়ে তিন কেজি হাতুড়ি ওঠানো-নামানো। শরীর একটা যন্ত্র হয়ে গেছে। যন্ত্রও ক্ষয়ে যায়। আছিয়ার শরীরও ক্ষয়ে যাচ্ছে।

সে কাশে। চাপা কাশি, যেন রুবিনা না জাগে। বুকের ভেতরে কিছু একটা বাজে, ঘড়ঘড় শব্দ। শ্বাস নিলে যেন কেউ বুকের ভেতরে বালি ঢালছে।

আছিয়া জানে সে অসুস্থ। কতটা অসুস্থ জানে না। ডাক্তার দেখায়নি। ডাক্তার দেখাতে টাকা লাগে। টাকা নেই। হাসপাতাল দূরে। যেতে ভাড়া লাগে। ভাড়ার টাকাও নেই।

সে চোখ বন্ধ করে। ঘুমের চেষ্টা করে। আগামীকাল সকাল ছটায় আবার পাথর।

১০

আছিয়ার মা ছিল পাথর ভাঙা শ্রমিক। জোহরা বেগম। সেও এই পাহাড়ে বসে পাথর ভাঙত। সেও কাশত। সেও রক্ত ফেলত। বিয়াল্লিশ বছর বয়সে মারা গেল। ফুসফুসের রোগ। ডাক্তার বলেছিল সিলিকোসিস। তখন আছিয়ার বয়স বারো। মায়ের হাতুড়ি তুলে নিল সে। মায়ের জায়গায় বসল।

চব্বিশ বছর হয়ে গেছে।

আছিয়ার বয়স এখন ছত্রিশ। দেখতে পঞ্চাশের মতো। চুল পেকে গেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে। হাতের শিরা দড়ির মতো ফুলে আছে। পিঠ একটু বেঁকে গেছে, সারাদিন ঝুঁকে বসে কাজ করার ফলে।

রুবিনাও কি এই পাথরে বসবে? আছিয়ার মায়ের পরে আছিয়া। আছিয়ার পরে রুবিনা? তিন প্রজন্মের ফুসফুসে একই ধুলো?

আছিয়া এটা ভাবে না। ভাবলে পাথর ভাঙা যায় না। ভাবলে হাতুড়ি ভারী লাগে। ভাবলে কাশি বাড়ে।

সে হাতুড়ি তোলে। পাথরে আঘাত করে। টুকরো ছিটকে যায়। ধুলো ওঠে। আছিয়া শ্বাস নেয়। ধুলো ঢোকে।

সকালের রোদ পাহাড়ের গায়ে পড়ে। পাথরগুলো চকচক করে। দূর থেকে দেখলে সুন্দর। কাছ থেকে দেখলে এক নারী বসে আছে, তার পাশে তার মেয়ে, আর দুজনের মাঝখানে একটা হাতুড়ি, যেটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাত বদল করে।

ঠিকাদার মালেক একবার বলেছিল, "আছিয়া, তোর মেয়েকে কেন আনিস? বাড়িতে রাখ।"

আছিয়া বলেছিল, "বাড়িতে কে রাখবে?"

"তাহলে কোনো আত্মীয়ের কাছে দিয়ে দে।"

আছিয়া হেসেছিল। হাসিটা শুকনো, ধুলোর মতো। আত্মীয়? তার মামা বাড়ি নাই, ফুপু বাড়ি নাই। যেটুকু আছে সেখানে আরো পাঁচটা মুখ খাচ্ছে। কে নেবে রুবিনাকে?

তাই রুবিনা আসে। পাথরের ওপরে বসে। ধুলোতে শ্বাস নেয়। মায়ের পাশে।

একদিন একটা ট্রাক এল গ্রাভেল নিতে। ড্রাইভার নামল, সিগারেট ধরাল, রুবিনার দিকে তাকাল। "বাচ্চাডারে এইখানে কেন? ধুলায় মরবো না?"

কেউ উত্তর দিল না। ড্রাইভার ট্রাক ভরে চলে গেল। ধুলো উড়ল ট্রাকের পেছনে। সেই ধুলো রুবিনার মুখে এসে বসল।

"পড়বি" শব্দটা সকালের বাতাসে মিলিয়ে যায়। রুবিনা একটা ছোট পাথর তুলে নেয়। হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে দেখে। পাথর ভাঙে না। সে আরো জোরে মারে। পাথর ভাঙে।

আছিয়া দেখে। কিছু বলে না। তার চোখে পানি আসে, কিন্তু ধুলোর জন্য না কষ্টের জন্য সেটা সে নিজেও জানে না।

হাতুড়ি ওঠে। পড়ে। পাথর ভাঙে। ধুলো ওঠে।