বালু তোলা শ্রমিক
বালু সোনার চেয়ে দামি হয়ে গেছে। কিন্তু বালু তোলা মানুষের দাম বাড়েনি
১
মোক্তার পানিতে নামে ভোর পাঁচটায়।
নদীর পানি শীতকালে হাড় কাঁপায়। গ্রীষ্মে উষ্ণ, ঘোলা, পচা গাছপালার গন্ধ। বর্ষায় স্রোত এত বেশি যে ডুবে মরার সম্ভাবনা দ্বিগুণ। মোক্তার সব মৌসুমে নামে। সুনামগঞ্জের ধরলা নদীর একটা বাঁকে, যেখানে বালু জমে, সেখানে সে ডুব দেয়।
কোমরে দড়ি বাঁধা। দড়ির অন্য মাথা নৌকায়। দুজন সাথি নৌকায় বসে দড়ি ধরে রাখে। মোক্তার ডুব দেয়, নদীর তলদেশে হাত দিয়ে বালু তোলে, অ্যালুমিনিয়ামের গামলায় ভরে, ওপরে তোলে। একবার ডুবে তিন-চার মিনিট। উঠে শ্বাস নেয়। আবার ডোবে।
আট ঘণ্টা।
চারশো টাকা।
২
বালু তোলা বেআইনি। সরকারিভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনে লাইসেন্স লাগে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগে। মোক্তারের কোনোটাই নেই। ঠিকাদার বাচ্চু মিয়ারও নেই।
কিন্তু ঢাকায়, চট্টগ্রামে, সিলেটে যে বিল্ডিং উঠছে, সেগুলোর ফাউন্ডেশনে বালু লাগে। প্লাস্টারে বালু লাগে। রাস্তায় বালু লাগে। নির্মাণ শিল্প থামলে অর্থনীতি থামে। তাই বালু তোলা চলে। আইন থাকে কাগজে। নদী থাকে বাস্তবে।
পুলিশ আসে সপ্তাহে দুইবার। জিপে। থানার ওসি পাঠায় দুইজন কনস্টেবল। তারা আসে, বাচ্চু মিয়ার সাথে চা খায়, একটা খাম নেয়। খামে কত টাকা? মোক্তার জানে না। বাচ্চু মিয়া বলে তিরিশ শতাংশ।
রোজকার আয়ের তিরিশ শতাংশ পুলিশে যায়। বিশ শতাংশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে। দশ শতাংশ স্থানীয় মাস্তানকে। বাচ্চু মিয়ার হাতে থাকে চল্লিশ শতাংশ। তার থেকে নৌকা, জ্বালানি, দড়ি, গামলা, শ্রমিকের মজুরি।
মোক্তার পায় চারশো। বালুর ট্রাকের দাম আট হাজার। একটা ট্রাক ভরতে পনেরোজন শ্রমিকের দুইদিন লাগে।
৩
ডুব দিলে কানে চাপ পড়ে।
মোক্তারের ডান কানে কম শোনে। পাঁচ বছর আগে থেকে। একদিন খুব গভীরে ডুব দিয়েছিল, ফিরে এসে দেখল কান দিয়ে রক্ত পড়ছে। তারপর থেকে ডান কানে শোঁ শোঁ আওয়াজ হয়, যেন কেউ দূরে বাঁশি বাজাচ্ছে। রাতে বেশি শোনা যায়। ঘুম আসে না।
চোখেও সমস্যা। ঘোলা পানিতে চোখ খুলে কাজ করতে হয়। নদীর পানিতে কী আছে? শিল্প বর্জ্য, মানুষের মল, পচা পাতা, মরা মাছ। এই পানিতে চোখ রাখলে জ্বালা করে। মোক্তারের চোখ সবসময় লাল। কনজাংটিভাইটিস লেগেই থাকে।
চামড়া কুঁচকে গেছে। সারাদিন পানিতে থাকলে চামড়া ফুলে যায়, তারপর শুকিয়ে ফাটে। হাতের আঙুলের ডগা সাদা হয়ে থাকে, ভেজা কাগজের মতো। পায়ে ছত্রাক। কুঁচকিতে ছত্রাক। ঘামাচি না, ছত্রাক। চুলকানি এত বেশি যে রাতে ঘুমের মধ্যে চুলকে রক্ত বের করে ফেলে।
৪
গত মৌসুমে দুজন মারা গেছে এই বাঁকে।
একজন রফিক। বয়স পঁচিশ। ডুব দিয়েছিল, কোমরের দড়ি ছিঁড়ে গেছিল। স্রোত টেনে নিয়ে গেছিল। তিনদিন পর লাশ পাওয়া গেল দুই কিলোমিটার ভাটিতে, একটা চরে, বালুর ওপরে। যে বালু সে তুলত, সেই বালু তার কাফনের বিছানা হলো।
আরেকজন সুমন। ডুবে যায়নি। নৌকা উল্টে গিয়েছিল। বালু-ভর্তি নৌকা ভারসাম্য হারিয়ে কাত হয়ে গেল। সুমন সাঁতার জানত। কিন্তু বালুর বোঝা তার ওপর পড়েছিল। বালু পানিতে ভারী। মানুষকে চেপে ধরে। সুমন উঠতে পারেনি।
মোক্তার দুজনকেই চিনত। রফিকের সাথে একই নৌকায় কাজ করত। সুমনের সাথে চা খেত বিকালে।
তারা মারা যাওয়ার পর কাজ বন্ধ ছিল তিনদিন। চতুর্থদিনে সবাই ফিরে এল। নদীতে নামল। ডুব দিল। বালু তুলল। কারণ তিনদিন কাজ বন্ধ মানে তিনদিন পয়সা নেই। পয়সা নেই মানে তিনদিন না খেয়ে।
৫
মোক্তারের বউ হাসিনা বলে, "এই কাজ ছেড়ে দে।"
"কী করব?"
"ঢাকায় যা। রিকশা চালা। গার্মেন্টসে যা।"
মোক্তার ভাবে। ঢাকা। সে একবার গিয়েছিল, বোনের বিয়েতে, পনেরো বছর আগে। মানুষে মানুষে গিজগিজ। গাড়ির হর্ন। ধোঁয়া। সে গ্রামের মানুষ, নদীর মানুষ। ঢাকায় সে কী করবে?
আর নদী ছাড়তেও পারে না। নদী তার হাড়ে আছে। তার বাবা নদী থেকে মাছ ধরত। তার দাদা নৌকা চালাত। মোক্তার বালু তোলে। তিন প্রজন্ম, তিন রকম কাজ, কিন্তু সবই নদী।
"বালু সোনার চেয়ে দামি হয়ে গেছে," মোক্তার বলে। "দেশে যত বিল্ডিং হচ্ছে, তত বালু লাগছে। দাম বাড়ছে। কিন্তু বালু তোলা মানুষের দাম বাড়েনি।"
হাসিনা চুপ করে থাকে। সে জানে মোক্তার ঠিকই বলেছে। একটা ট্রাক বালু, আট হাজার টাকা। কন্সট্রাকশন কোম্পানি কেনে বারো হাজারে। মোক্তার পায় চারশো। এই অঙ্কে কোনো ন্যায় নেই। কিন্তু ন্যায় দিয়ে ভাত রান্না হয় না।
৬
এক হাজার ট্রাক বালু।
একটা নতুন প্রজেক্ট এসেছে। ঢাকার কাছে, কেরানীগঞ্জে, বিশতলা একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। ডেভেলপার কোম্পানি অর্ডার দিয়েছে এক হাজার ট্রাক বালু। প্রতি ট্রাক আট হাজার। মোট আশি লাখ টাকার বালু।
বাচ্চু মিয়ার চোখ চকচক করে। বড় অর্ডার। তিন মাসে ডেলিভারি দিতে হবে। মানে দিনে দশ-বারো ট্রাক। মানে আরো শ্রমিক লাগবে। মানে আরো ডুব, আরো বালু, আরো ঝুঁকি।
মোক্তার হিসাব করে।
এক হাজার ট্রাক বালু। প্রতি ট্রাকে পনেরোজন শ্রমিকের দুইদিন। মোট ত্রিশ হাজার শ্রমিক-দিন। প্রতি শ্রমিকের মজুরি চারশো। মোট শ্রমিক খরচ এক কোটি বিশ লাখ। আশি লাখ টাকার বালু তুলতে এক কোটি বিশ লাখ? না, বাচ্চু মিয়া এত দেবে না। সে দেবে ষাট লাখ। বাকি কুড়ি লাখ তার।
মোক্তার এই হিসাব জানে না। সে শুধু জানে চারশো টাকা। বাকি সব অন্যদের অঙ্ক।
৭
বিকালে কাজ শেষে মোক্তার নদীর পাড়ে বসে।
ভেজা লুঙ্গি গায়ে। শরীর থেকে নদীর গন্ধ আসে। কাদামাটি, শ্যাওলা, মাছের আঁশটে গন্ধ। সে বিড়ি ধরায়। ধোঁয়া ছাড়ে।
নদীর দিকে তাকায়। নদী চুপচাপ বয়ে যাচ্ছে। নদী জানে না তার বুকের ভেতর থেকে বালু তুলে নেওয়া হচ্ছে। জানলেও কিছু করতে পারে না। নদীও অসহায়, মোক্তারও অসহায়। দুজনেই কারো না কারো জন্য শরীর খুলে দিচ্ছে।
মোক্তারের ছেলে তানভীর, বয়স চৌদ্দ। সে-ও নদীতে আসতে চায়। বালু তুলতে চায়।
"বাবা, আমাকেও নিয়ে চলো।"
"না।"
"কেন?"
"তুই পড়বি।"
তানভীর নবম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল তিন কিলোমিটার দূরে। সে সাইকেলে যায়। সাইকেলটা মোক্তার কিনেছিল তিন হাজার টাকায়, সেকেন্ড হ্যান্ড। চেইন প্রায়ই খুলে যায়।
তানভীর বলে, "পড়ে কী হবে? তুমি বলো কত লেখাপড়া করা মানুষ বেকার?"
মোক্তার উত্তর দিতে পারে না। ছেলে ভুল বলেনি। গ্রামে তিনজন এসএসসি পাস ছেলে বেকার বসে আছে। একজন অনার্স পড়া ছেলে ভ্যান চালায়।
কিন্তু মোক্তার জানে নদীতে নামলে ছেলেও তার মতো হবে। কান বধির হবে। চোখ লাল হবে। চামড়া পচবে। আর একদিন দড়ি ছিঁড়ে যেতে পারে।
৮
রাতে মোক্তার শোয়। কানে সেই শোঁ শোঁ আওয়াজ। ডান কানে। থামে না কখনো। রাতে, দিনে, সবসময়। যেন নদী তার কানের ভেতরে ঢুকে গেছে, আর বের হচ্ছে না।
হাসিনা পাশে শুয়ে বলে, "ঘুমাও।"
"ঘুম আসে না।"
"কান বাজে?"
"হ্যাঁ।"
"ডাক্তার দেখাও।"
"পাঁচশো টাকা লাগবে। ওষুধ আলাদা।"
চুপ।
মোক্তার ছাদের দিকে তাকায়। টিনের ছাদ। বৃষ্টি পড়লে শব্দ হয়। এখন বৃষ্টি নেই, কিন্তু মোক্তারের কানে শব্দ আছে। নদীর শব্দ। বালুর শব্দ। স্রোতের শব্দ। যে নদী তাকে বাঁচায়, সেই নদী তাকে একটু একটু করে খাচ্ছে।
৯
একদিন মোক্তার হিসাব করে বসেছিল।
সে পনেরো বছর ধরে বালু তোলে। বছরে দুশো আশি দিন কাজ করে, বাকি দিন বৃষ্টি, ঈদ, অসুস্থতা। দিনে চারশো টাকা। বছরে এক লাখ বারো হাজার। পনেরো বছরে ষোলো লাখ আশি হাজার।
ষোলো লাখ আশি হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে কী কিনেছে সে? একটা টিনের ঘর, পুরোনো। তানভীরের সাইকেল, তিন হাজার টাকা। হাসিনার একটা সোনার নাকফুল, চার হাজার, বিয়ের পরে কিনে দিয়েছিল। বাকি সব খেয়েছে। ভাত, ডাল, তেল, লবণ, মরিচ।
ষোলো লাখ আশি হাজার টাকা খেয়ে ফেলেছে। পেটে। মানুষের পেট একটা কূপ। কত টাকাই ঢালো, ভরে না।
আর ঐ একই পনেরো বছরে কত বালু তুলেছে? কত ট্রাক? কত বিল্ডিং দাঁড়িয়েছে তার তোলা বালুতে? সেই বিল্ডিংগুলোর ফ্ল্যাটের দাম কত? পঞ্চাশ লাখ? এক কোটি?
মোক্তার অঙ্ক জানে না ভালো। কিন্তু এটুকু বোঝে: তার শরীর দিয়ে যে মূল্য তৈরি হয়, তার ভগ্নাংশও তার কাছে আসে না।
বালু তার হাত দিয়ে ওঠে। তারপর ট্রাকে। তারপর সাইটে। তারপর কংক্রিটে মেশে।
প্রতিটা ধাপে দাম বাড়ে। মোক্তারের ধাপে দাম সবচেয়ে কম।
হাসিনা ঘুমিয়ে গেছে। তানভীর ঘুমিয়ে গেছে। মোক্তার জেগে আছে। কান বাজছে। সারারাত বাজবে।
সে চোখ বন্ধ করে। ভোর পাঁচটায় আবার নদী। আবার ডুব। আবার বালু।
নদী বয়ে যায়। মোক্তার ডুবে যায়। দুজনেরই কোনো বিকল্প নেই।