রাজমিস্ত্রি সর্দার

কাগজে যা আছে, মাটিতে সেটা হয় না। আমি মাটি বুঝি

পর্ব ৫৮ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আমিনুল ব্লুপ্রিন্ট পড়তে পারে।

এটা শুনলে কেউ অবাক হবে না। কিন্তু আমিনুল পঞ্চম শ্রেণির পরে স্কুলে যায়নি। সে ব্লুপ্রিন্ট পড়তে শিখেছে দেখে, করে, ভুল করে। পঁচিশ বছর ধরে ইট গেঁথে, কংক্রিট ঢেলে, ফ্লোর লেভেল মেপে। কাগজে কোন লাইনের মানে কী, সেটা তাকে কেউ শেখায়নি। সে নিজে বুঝে নিয়েছে।

ঢাকার মিরপুরে একটা বারোতলা বিল্ডিং উঠছে। আমিনুল সর্দার। তার হাতের নিচে কুড়িজন শ্রমিক। রাজমিস্ত্রি, যোগালি, রড বাইন্ডার, শাটারিং মিস্ত্রি। সবাই তার কথা শোনে। কারণ আমিনুল জানে কোথায় কতটুকু সিমেন্ট লাগবে, কোন কলামে কত রড বসবে, কোন বিমের ক্লিয়ারেন্স কত হবে।

ইঞ্জিনিয়ার আসে সপ্তাহে দুইবার। সাদা হেলমেট, পরিষ্কার জুতা, হাতে ফাইল। সে ব্লুপ্রিন্ট ধরে দাঁড়ায়, মাপ চেক করে, মাথা নাড়ে। তারপর আমিনুলকে বলে, "বাকিটা তুমি দেখো।"

আমিনুল দেখে। কারণ ইঞ্জিনিয়ার সপ্তাহে দুইবার আসে, আমিনুল থাকে সাতদিন।

এক হাজার টাকা। দিনে।

আমিনুল সর্দার বলে বেশি পায়। সাধারণ রাজমিস্ত্রি পায় সাতশো-আটশো। যোগালি পায় পাঁচশো। হেল্পার পায় তিনশো-সাড়ে তিনশো। আমিনুল পায় এক হাজার। মাসে ছুটি বাদ দিয়ে ছাব্বিশ দিন কাজ করলে ছাব্বিশ হাজার।

ইঞ্জিনিয়ারের বেতন? আমিনুল শুনেছে পঞ্চাশ হাজার। তবে ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটা সদ্য পাস করা। দুই বছরের অভিজ্ঞতা। সে জানে কাগজে কী লেখা আছে। সে জানে না মাটি কেমন, কংক্রিট কতক্ষণে জমে, শীতকালে ঢালাই কেন বিপজ্জনক।

"কাগজে যা আছে, মাটিতে সেটা হয় না। আমি মাটি বুঝি।"

আমিনুল এটা গর্ব করে বলে না। সত্য বলে। সে দেখেছে কাগজে দশ ফুট গভীর ফাউন্ডেশন দেওয়া আছে, কিন্তু মাটি খুঁড়তে গিয়ে আট ফুটে পানি উঠে গেছে। তখন ইঞ্জিনিয়ার ফোনে কথা বলে, কনসালট্যান্ট জিজ্ঞেস করে। আমিনুল ততক্ষণে পাম্প বসিয়ে পানি সেচে ফেলেছে, ড্রাই পিট বানিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। কারণ দেরি হলে ঠিকাদারের টাকা যায়। ঠিকাদারের টাকা গেলে আমিনুলের মজুরি আটকে যায়।

আমিনুলের শরীরে কাজের ছাপ আছে।

বাঁ হাতের তর্জনীতে একটা কালো দাগ। কংক্রিট পড়েছিল পনেরো বছর আগে, নখ উঠে গিয়েছিল। নখ আবার গজিয়েছে, কিন্তু আগের মতো না। ডান হাঁটুতে একটা বড় দাগ। শাটারিং খুলতে গিয়ে লোহার পাত পায়ে কেটে গিয়েছিল। আট ফোঁড় লেগেছিল। আমিনুল দুইদিন বিশ্রাম নিয়ে তৃতীয়দিনে কাজে ফিরেছিল। কারণ দুইদিনের মজুরি কে দেবে?

কোমর ব্যথা। প্রতিদিন। সকালে উঠলেই কোমরে একটা শক্ত টান। ঝুঁকে কাজ করতে করতে কোমরের ডিস্ক সরে গেছে। ডাক্তার বলেছে অপারেশন লাগবে। খরচ দেড় লাখ। আমিনুল ওষুধ খায়। ব্যথানাশক। দিনে দুটো। ওষুধ ফুরিয়ে গেলে ব্যথা ফিরে আসে।

উচ্চতাভীতি নেই আমিনুলের। বারোতলার ওপরে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালেও তার মাথা ঘোরে না। কিন্তু একটা ভয় আছে। সে জানে এই উচ্চতায় কোনো সেফটি নেট নেই। কোনো হারনেস নেই। বাতাস জোরে বইলে একজন শ্রমিক পড়ে যেতে পারে। পড়ে গেলে?

গত বছর পাশের সাইটে একজন পড়েছিল। সাততলা থেকে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু। পুলিশ এসেছিল। রিপোর্ট হয়েছিল। তারপর? কিছু না। ঠিকাদার পরিবারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছিল। ক্ষতিপূরণ। একটা জীবনের দাম।

সেফটি মিটিং।

একটা বিদেশি এনজিও এসেছে সাইটে। তিনজন। একজন বিদেশি, গোরা চামড়া, হেলমেটে স্টিকার লাগানো। দুজন বাংলাদেশি, দোভাষীর কাজ করে। তারা শ্রমিকদের একটা ছাউনির তলায় জড়ো করেছে। প্রজেক্টর দিয়ে স্লাইড দেখাচ্ছে।

হারনেস। হেলমেট। সেফটি নেট। ফার্স্ট এইড কিট। ফায়ার এক্সটিংগুইশার।

শ্রমিকেরা বসে দেখে। মাথা নাড়ে। "হ্যাঁ, বুঝেছি।" "জি, পরব।" "জি, মানব।"

বিদেশি মানুষটা হাসে। সন্তুষ্ট। সে একটা বাক্স রেখে যায়। বাক্সে পাঁচটা হারনেস, দশটা হেলমেট, একটা ফার্স্ট এইড কিট।

তারা চলে যায়।

আমিনুল বাক্সটা খোলে। হারনেস বের করে। দেখে। ওজন করে হাতে। ভারী। পরলে শরীরে বাঁধতে পাঁচ মিনিট লাগবে। খুলতে পাঁচ মিনিট। প্রতিবার এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে যেতে খুলতে হবে, আবার পরতে হবে।

"হারনেস পরলে কাজ হয় না।"

শ্রমিকেরা শোনে। তারা জানে আমিনুল ঠিক বলেছে।

"কাজ না হলে পয়সা হয় না। পয়সা না হলে খাওয়া হয় না।"

বাক্স বন্ধ হয়। কোণায় রাখা হয়। ধুলো জমতে শুরু করে।

আমিনুল গ্রামের ছেলে। কুষ্টিয়ার একটা গ্রাম। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। তারপর বাবা মারা গেল। বাবাও রাজমিস্ত্রি ছিল। গ্রামে পাকা বাড়ি বানাত। আমিনুলের বয়স তখন এগারো।

সে বাবার পরিচিত এক সর্দারের সাথে ঢাকায় এল। যোগালি হিসেবে। সিমেন্ট মেশাতো। ইট বহন করত। মাথায় করে ইট নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠত। দশটা ইট, প্রতিটা তিন কেজি। মাথায় ত্রিশ কেজি। পাঁচতলা পর্যন্ত। দিনে পঞ্চাশবার।

তিন বছরে যোগালি থেকে রাজমিস্ত্রি হলো। আরো পাঁচ বছরে রাজমিস্ত্রি থেকে সর্দার। কেউ প্রমোশন দেয়নি। আমিনুল দেখে শিখেছে। যে সর্দারের হাতে কাজ করত, তার প্রতিটা কাজ খেয়াল করত। কোন মিক্সে কতটুকু সিমেন্ট, কতটুকু বালু, কতটুকু পানি। কোন ওয়ালে কত রড। কোন স্ল্যাবে কত পুরুত্ব।

সে জিজ্ঞেস করত না। জিজ্ঞেস করলে ধমক খেত। সে দেখত। মনে রাখত। রাতে টর্চ জ্বালিয়ে সাইটের ফেলে দেওয়া ব্লুপ্রিন্ট পড়ার চেষ্টা করত। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা পড়তে পারে, ইংরেজি পারে না। কিন্তু ব্লুপ্রিন্টে ভাষা লাগে না। সংখ্যা লাগে, মাপ লাগে, দাগ বুঝতে পারলেই হয়।

ঠিকাদার মান্নান সাহেব বিশ্বাস করেন আমিনুলকে।

তিনি পনেরো বছর ধরে আমিনুলের সাথে কাজ করছেন। পাঁচতলা থেকে বারোতলা পর্যন্ত, বত্রিশটা বিল্ডিংয়ে আমিনুল সর্দার ছিল। একটাতেও বড় সমস্যা হয়নি। ফাটল ধরেনি। হেলেনি। ভেঙে পড়েনি।

"আমিনুল না থাকলে আমি বিল্ডিং করি না।" মান্নান সাহেব এটা ইঞ্জিনিয়ারের সামনেই বলেন। ইঞ্জিনিয়ার একটু অস্বস্তিতে পড়ে। সে পাঁচ বছর পড়েছে বুয়েটে। আমিনুল পড়েছে পাঁচ বছর প্রাইমারি স্কুলে। কিন্তু সাইটে ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে আমিনুলের কথার দাম বেশি।

এটা কি ন্যায্য? আমিনুল এই প্রশ্ন করে না। ন্যায্য কি না সেটা তার ভাববার বিষয় না। সে জানে একটাই সত্য: সে ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে কম পায়। ইঞ্জিনিয়ার পঞ্চাশ হাজার পায় মাসে অফিসে বসে। আমিনুল ছাব্বিশ হাজার পায় বারোতলায় দাঁড়িয়ে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে।

দুপুরে সাইটে খাবার আসে।

একজন বুড়ি মহিলা আসে, মাথায় হাঁড়ি নিয়ে। ভাত, ডাল, আলু ভাজি। প্লেট প্রতি চল্লিশ টাকা। কুড়িজন শ্রমিক বসে খায় অসমাপ্ত ফ্লোরে, কংক্রিটের ওপরে। পায়ের তলায় সিমেন্টের ধুলো। সামনে খোলা আকাশ, কারণ দেয়াল এখনো ওঠেনি।

আমিনুল খায়। ভাতে একটু বেশি ডাল চায়। বুড়ি দেয়। সর্দার বলে একটু বেশি পায়।

খাওয়ার পরে পাঁচ মিনিট বিশ্রাম। আমিনুল একটা কলামে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে। ঘুম না, বিশ্রাম। তারপর আবার কাজ।

বিকালে ইঞ্জিনিয়ার ফোন করে। "কতটুকু হলো?"

"সাততলার কলাম শেষ। আগামীকাল বিম।"

"ব্লুপ্রিন্ট অনুযায়ী?"

"হ্যাঁ।"

ইঞ্জিনিয়ার আসবে পরশু। দেখবে। মাথা নাড়বে। চলে যাবে।

আমিনুলের ছেলে মাহমুদ। বয়স বিশ। সে-ও রাজমিস্ত্রি। আমিনুলের হাতে শিখেছে। কিন্তু আমিনুল চায়নি ছেলে রাজমিস্ত্রি হোক। সে চেয়েছিল মাহমুদ পড়ুক। মাহমুদ এসএসসি পাস করেছে। তারপর বলল, "আর পড়ব না। কাজ করব।"

"কেন?"

"পড়ে কী হবে? তুমি অক্ষরজ্ঞানহীন, তোমার চেয়ে বেশি কামাই করে এমন পড়ুয়া কজন আছে গ্রামে?"

আমিনুল চুপ ছিল। ছেলের যুক্তি ভুল না। কিন্তু ঠিকও না। আমিনুল জানে সে ব্যতিক্রম। সব যোগালি সর্দার হয় না। বেশিরভাগ সারাজীবন যোগালিই থাকে। মাহমুদ যদি তার মতো ব্যতিক্রম না হয়?

কিন্তু মাহমুদ এসে গেছে। এখন সে আমিনুলের সাইটে কাজ করে। রাজমিস্ত্রি। সাতশো টাকা দিনে। আমিনুল তাকে আলাদা চোখে দেখে না। সে চায় ছেলে কাজ শিখুক ঠিকমতো। কোনো ছাড় নেই। ভুল করলে ধমক।

"বাবা, তুমি অন্যদের ধমকাও না, আমাকে কেন ধমকাও?"

"তুই আমার ছেলে বলে। ভুল করলে আমার নাম যাবে।"

সন্ধ্যায় আমিনুল সাইটের পাশের টিনের ঘরে ফেরে।

শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা। একটা লম্বা ঘর, দুপাশে চৌকি। কুড়িজন এক ঘরে। মশারি আছে কারো কারো। আমিনুলের আছে। সর্দার বলে আলাদা একটু জায়গা পায়, কোণায়।

সে গোসল করে টিউবওয়েলের পানিতে। কাপড় বদলায়। লুঙ্গি, গেঞ্জি। তারপর ফোন করে বাড়িতে। কুষ্টিয়ায়। বউ রহিমার সাথে কথা বলে। "কেমন আছো?" "ভালো।" "বাচ্চারা?" "ভালো।" "টাকা পাঠাব শুক্রবারে।" "ঠিক আছে।"

এই কটা কথা। প্রতিদিন একই কথা। আমিনুল ঢাকায় থাকে মাসে ছাব্বিশ দিন। বাড়ি যায় মাসে চারদিন। সন্তানেরা বড় হচ্ছে তাকে ছাড়াই। ছোট মেয়ে ফারিয়া, বয়স আট, বাবাকে চেনে ফোনের ভয়েসে। মুখ দেখে মাসে চারবার।

আমিনুল ভাবে এটাই জীবন। এটাই সবার জীবন যারা ঢাকায় কাজ করে, গ্রামে পরিবার রেখে। লাখ লাখ মানুষ। একই গল্প।

১০

পরদিন সকালে আমিনুল সাইটে দাঁড়ায়।

হেলমেট পরে। সর্দার বলে হেলমেট পরতেই হয়। বাকি শ্রমিকদের মধ্যে অর্ধেক পরে, অর্ধেক পরে না। যারা পরে না তাদের আমিনুল ধমকায়। তারা পরে। আমিনুলের চোখের আড়ালে আবার খোলে।

হারনেস? বাক্সে আছে। কোণায়। ধুলো জমেছে ওপরে। কেউ ছোঁয়নি।

আমিনুল ওপরে তাকায়। বারোতলা। আকাশ দেখা যায়। কাল এই আকাশের নিচে আরেকটা স্ল্যাব বসবে। তারপর আরেকটা। তারপর ছাদ। তারপর বিল্ডিং শেষ। তারপর আরেকটা বিল্ডিং।

তেত্রিশটা হবে। সে গুনে রাখে। জীবনে কতটা বিল্ডিং বানিয়েছে।

এই শহরে, যে শহরে সে থাকে টিনের ঘরে, সেই শহরের আকাশ ছুঁয়ে আছে তার হাতে গড়া দালান। কিন্তু সেই দালানের কোনো ফ্ল্যাটে সে কোনোদিন থাকবে না। সে জানে এটা। এতে কোনো তিক্ততা নেই তার মনে। আমিনুল তিক্ততা বোঝে না। সে বোঝে কলাম, বিম, স্ল্যাব, ফাউন্ডেশন।

সে কাজ শুরু করে। রোদ ওঠে। সিমেন্টের গন্ধ। লোহার গন্ধ। ঘামের গন্ধ।

শহর ওপরে ওঠে। আমিনুল নিচে থাকে।