লিফটম্যান

মানুষ উপরে যায় ভালো জিনিস নিয়ে। নিচে নামে ময়লা নিয়ে। আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুটোই দেখি

পর্ব ৫৯ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

জব্বার লিফটের গেট টানে।

লোহার জালির গেট। ওজন পনেরো কেজি। ডানে টানলে খোলে, বামে টানলে বন্ধ। দিনে কতবার টানে? জব্বার গুনেছে একবার। দুশো আটান্ন বার। সকাল আটটা থেকে রাত দশটা। চৌদ্দ ঘণ্টা। তবে এখন দশ ঘণ্টা দেয়, বয়সের কারণে মালিক একটু ছাড় দিয়েছেন।

পুরান ঢাকার নারিন্দায় একটা আটতলা বিল্ডিং। বাসাবাড়ি। প্রতি তলায় দুটো ফ্ল্যাট। মোট ষোলটা পরিবার। আর নিচতলায় তিনটা দোকান। জব্বার এই বিল্ডিংয়ের লিফটম্যান। ম্যানুয়াল গেটের লিফট। অটোমেটিক না। গেট নিজে খুলতে হয়, নিজে বন্ধ করতে হয়, বোতাম টিপতে হয়, ফ্লোর ঘোষণা করতে হয়।

"দোতলা।"

"তিনতলা।"

"পাঁচতলা।"

জব্বারের গলা ভাঙা। চল্লিশ বছর ধরে ফ্লোর ঘোষণা করতে করতে গলা ক্লান্ত হয়ে গেছে। এখন আর জোরে বলে না। ফিসফিস করে বলে। যাত্রীরা বোঝে। যারা এই বিল্ডিংয়ে থাকে তারা জব্বারের ফিসফিস চেনে।

আট হাজার টাকা। মাসে।

জব্বারের বেতন। বিল্ডিংয়ের মালিক আনোয়ার সাহেব দেন। আনোয়ার সাহেব ষোলটা ফ্ল্যাট ভাড়া দেন। প্রতিটা ফ্ল্যাটের ভাড়া পনেরো থেকে কুড়ি হাজার। মাসে ফ্ল্যাট ভাড়া আসে তিন লাখের বেশি। দোকান ভাড়া আলাদা। সেখান থেকে জব্বারের বেতন আট হাজার।

জব্বার এই হিসাব জানে। সে হিসাব করতে পারে, অঙ্ক জানে। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছিল। পড়তে পারে, লিখতে পারে। কিন্তু ক্লাস এইটের সার্টিফিকেট দিয়ে ঢাকায় কী চাকরি পাওয়া যায়? জব্বার চেষ্টা করেছিল। গার্ড, পিয়ন, হেল্পার। সব জায়গায় পরিচিত লাগে। জব্বারের কোনো পরিচিত ছিল না।

পুরান ঢাকার এই বিল্ডিংয়ে তার চাচাতো ভাই কাজ করত। সে চলে গেল সৌদি। জব্বার তার জায়গায় ঢুকল। সেটা চল্লিশ বছর আগে। তখন বেতন ছিল পাঁচশো টাকা। এখন আট হাজার।

চল্লিশ বছরে বেতন বেড়েছে ষোলো গুণ। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে চল্লিশ গুণ।

জব্বার দাঁড়ায়।

দশ ঘণ্টা দাঁড়ায়। লিফটের ভেতরে চার ফুট বাই চার ফুট জায়গা। একটা ছোট টুল আছে, কাঠের, যেটায় মাঝে মাঝে বসে। কিন্তু কেউ লিফটে উঠলে দাঁড়াতে হয়। বসে থাকলে বেয়াদবি দেখায়।

দাঁড়ানোর ফলে পায়ে ভেরিকোজ ভেইন হয়েছে। বাঁ পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত নীল-সবুজ শিরা দড়ির মতো ফুলে আছে। সন্ধ্যায় পা ফুলে যায়। ব্যথা করে। রাতে পা উঁচু করে রাখতে হয়।

ডাক্তার বলেছে কমপ্রেশন স্টকিং পরতে। একজোড়ার দাম আটশো টাকা। জব্বার কিনেছিল একজোড়া। ছ মাসে ছিঁড়ে গেছে। আবার কেনেনি।

জব্বারের বয়স বাষট্টি। অবসরের বয়স পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। কিন্তু কার থেকে অবসর? সরকারি চাকরি না এটা। কোনো পেনশন নেই। কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। আট হাজার টাকা বেতন, আর একটা ছোট ঘর বিল্ডিংয়ের ছাদে, টিনের, যেখানে জব্বার আর তার বউ মরিয়ম থাকে। ভাড়া নেই ঘরের। এটাই বেতনের বাইরে একমাত্র সুবিধা।

জব্বার মানুষ দেখে।

চল্লিশ বছর ধরে এই বিল্ডিংয়ের মানুষ দেখছে। কে কখন বের হয়, কে কখন ফেরে, কার সাথে কে আসে, কার মুখে হাসি, কার চোখে জল। জব্বার সব দেখে। কিন্তু কিছু বলে না। লিফটম্যানের কাজ দেখা না, তোলা-নামানো।

তিনতলার হক সাহেব প্রতিদিন সকাল আটটায় নামেন। অফিসের ব্যাগ। টাই বাঁধা। জুতা পালিশ করা। লিফটে ওঠেন, "গ্রাউন্ড" বলেন। জব্বার নামায়। সন্ধ্যায় ফেরেন ক্লান্ত মুখে। টাই ঢিলা। জুতা ধুলোমাখা। হাতে মাঝে মাঝে পলিথিনের ব্যাগে শাকসবজি।

ছয়তলার লিপি আপা ঘরে থাকেন। বের হন কম। যখন বের হন, চোখ লাল থাকে। জব্বার জানে লিপি আপার স্বামী মারধর করে। সে শুনেছে রাতে চিৎকার। কিন্তু জব্বার কিছু বলতে পারে না। বললে চাকরি যাবে। "ভাড়াটিয়ার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাবে না" -- আনোয়ার সাহেবের নির্দেশ।

আটতলার রাজু, বয়স বিশ, প্রতিদিন রাত বারোটায় ফেরে। ধোঁয়ার গন্ধ গায়ে। জব্বার জানে কিসের ধোঁয়া। সেটাও বলে না।

"মানুষ উপরে যায় ভালো জিনিস নিয়ে। নিচে নামে ময়লা নিয়ে।"

জব্বার এটা খেয়াল করেছে বহু বছর আগে। সকালে মানুষ ওপরে যায় বাজারের ব্যাগ নিয়ে, টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে, নতুন জামা-কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে। নিচে নামে ময়লার বস্তা নিয়ে, ভাঙা জিনিসের বাক্স নিয়ে, পুরোনো কাগজের বান্ডিল নিয়ে।

"আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুটোই দেখি।"

জব্বার মাঝখানের মানুষ। ওপরেও না, নিচেও না। সে মানুষকে ওঠায়, নামায়। নিজে কোথাও যায় না। লিফটের ভেতরে চার ফুট বাই চার ফুট তার দুনিয়া। এই দুনিয়ায় সে দাঁড়িয়ে থাকে, আর পৃথিবী ওঠানামা করে।

কখনো কখনো জব্বার একা লিফটে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ ডাকেনি। কোনো ফ্লোরে কোনো বাতি জ্বলেনি। তখন সে লিফটের আয়নায় নিজের মুখ দেখে। বুড়ো মুখ। চুল পেকে গেছে। গাল কোটরে ঢুকে গেছে। চোখের নিচে কালি। এই মুখ চল্লিশ বছর আগে তরুণ ছিল।

জব্বারের তিন ছেলে। বড় সামাদ, রিকশা চালায়। মেজো কামাল, গার্মেন্টসে কাজ করে। ছোট ইমরান, মাদ্রাসায় পড়ে।

সামাদ মাঝে মাঝে আসে বাবাকে দেখতে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠে, লিফটে না। জব্বার জিজ্ঞেস করেছিল কেন। সামাদ বলেছিল, "তোমার লিফটে উঠলে মনে হয় তুমি আমার চাকর।"

জব্বার কিছু বলেনি। ছেলের কথায় একটা কষ্ট ছিল, সেটা সে বুঝেছে। লিফটম্যানের ছেলে হওয়ায় সামাদের লজ্জা নেই, কিন্তু বাবাকে চাকরের ভূমিকায় দেখার কষ্ট আছে।

মরিয়ম বলে, "ছেলেরা তোমাকে ভালোবাসে।"

জব্বার জানে। কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে ছেলেদের জন্য কিছু করতে পারেনি। সামাদের পড়ালেখা হয়নি, কারণ টাকা ছিল না। কামালকে গার্মেন্টসে ঢোকাতে হয়েছে ষোলো বছর বয়সে। শুধু ইমরান পড়ছে, মাদ্রাসায়, কারণ সেখানে খরচ কম।

আট হাজার টাকায় চারটা জীবন চলে না। তাই মরিয়ম চানাচুর বানায়। ছাদের ঘরে, ছোট চুলায়। বিকালে বিল্ডিংয়ের সামনে বসে বিক্রি করে। দিনে একশো-দেড়শো টাকা আসে। এই দুজনের রোজগার মিলিয়ে কোনোমতে চলে।

একদিন আনোয়ার সাহেব ডাকলেন।

তাঁর অফিস দোতলায়। জব্বার গেল। আনোয়ার সাহেব চেয়ারে বসে আছেন। সামনে টেবিলে কিছু কাগজপত্র।

"জব্বার, তুমি কত বছর ধরে কাজ করো?"

"চল্লিশ বছর, স্যার।"

"হুঁ।" আনোয়ার সাহেব কাগজের দিকে তাকালেন। "বিল্ডিংয়ে নতুন লিফট বসাবো। অটোমেটিক। বোতাম টিপলেই দরজা খুলবে, বন্ধ হবে। লিফটম্যান লাগবে না।"

জব্বার দাঁড়িয়ে শুনল। মুখে কোনো ভাব নেই। সে জানত এটা আসবে। পাশের বিল্ডিংয়ে গত বছর অটোমেটিক লিফট বসেছে। তার আগের বিল্ডিংয়েও। পুরান ঢাকায় একে একে ম্যানুয়াল লিফট উঠে যাচ্ছে। লিফটম্যানরাও।

"কবে থেকে?"

"তিন মাস পর। ইনস্টলেশনে সময় লাগবে।"

"আমি তারপর কী করব, স্যার?"

আনোয়ার সাহেব একটু চুপ ছিলেন। তারপর বললেন, "তোমাকে তিন মাসের বেতন এককালীন দেব। চব্বিশ হাজার টাকা। তুমি অনেক বছর কাজ করেছ, তাই এটুকু।"

চব্বিশ হাজার। চল্লিশ বছরের চাকরির শেষে। মাস প্রতি ছশো টাকা।

জব্বার ছাদে ফিরে যায়।

মরিয়ম চানাচুরের মসলা গুঁড়ো করছে। জব্বার চৌকিতে বসে। কিছু বলে না। মরিয়ম তাকায়।

"কী হয়েছে?"

"লিফট নিজে চলবে। আমি কোথায় যাবো?"

মরিয়ম হাত থামায়। সে বুঝতে পারে কী হয়েছে। সে জানত এটা হবে। পাড়ার অন্যান্য লিফটম্যান আগেই চাকরি হারিয়েছে। আবদুল কাকা, যে পাশের বিল্ডিংয়ে ছিল, এখন ফুটপাতে চায়ের দোকান দিয়েছে।

"ছাদের ঘর?"

"জানি না। স্যারকে জিজ্ঞেস করিনি।"

ঘর। এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বেতন গেলেও অন্য কাজ করা যায়। কিন্তু ঢাকায় ঘর? আট হাজার টাকা বেতনের মানুষ ঢাকায় ঘর ভাড়া নিতে পারে না। এই ছাদের টিনের ঘরটাই তাদের সম্বল। এটা গেলে কোথায় যাবে?

গ্রামে? জব্বারের গ্রাম ভোলায়। নদীভাঙনে বাড়ি গেছে বিশ বছর আগে। গ্রামে কিছু নেই।

তিন মাস।

জব্বার প্রতিদিন লিফটে দাঁড়ায়। গেট টানে। বোতাম টেপে। ফ্লোর ঘোষণা করে। সবকিছু আগের মতো। কিন্তু এখন সে জানে এটা শেষ হচ্ছে।

সে লিফটের দেয়ালে হাত রাখে। এই দেয়াল চেনে সে। এই গেটের প্রতিটা খাঁজ চেনে। কোন ফ্লোরে লিফট একটু ঝাঁকি দেয়, সেটা জানে। পাঁচতলায় একটু থমকে যায়, তারপর আবার চলে। সাততলায় গেট একটু আটকে যায়, জোরে টানতে হয়। এই সব খুঁত জব্বার জানে, যেভাবে একজন মানুষ তার নিজের শরীরের খুঁত জানে।

ইনস্টলাররা আসতে শুরু করেছে। মাপজোখ করছে। পুরোনো লিফটের পাশে নতুন শ্যাফট কাটবে। নতুন লিফট আসবে, চকচকে, স্টেইনলেস স্টিলের দরজা, ডিজিটাল ডিসপ্লে, মিউজিক বাজবে ভেতরে।

জব্বারের বদলে মিউজিক।

১০

শেষ দিন।

জব্বার সকালে লিফটে ঢোকে। শার্ট ইস্ত্রি করা। মরিয়ম ইস্ত্রি করে দিয়েছে। শেষ দিন বলে।

সে প্রতিটা ফ্লোরে যায়। কেউ ডাকেনি, নিজেই যায়। প্রতিটা ফ্লোরে গেট খোলে, বন্ধ করে। যেন বিদায় নিচ্ছে। প্রতিটা ফ্লোরের গন্ধ আলাদা। দোতলায় রান্নার গন্ধ। তিনতলায় আগরবাতি। চারতলায় ন্যাপথালিন। পাঁচতলায় শিশুর গায়ের গন্ধ। ছয়তলায় সিগারেটের ধোঁয়া। সাততলায় ধূপের গন্ধ। আটতলায় ফিনাইল।

জব্বার এই গন্ধগুলো চেনে। চল্লিশ বছর ধরে এই গন্ধে শ্বাস নিয়েছে।

বিকালে আনোয়ার সাহেব এলেন। একটা খাম দিলেন। চব্বিশ হাজার টাকা। জব্বার নিল। সালাম করল। আনোয়ার সাহেব বললেন, "ছাদের ঘর আরো এক মাস থাকতে পারো। তারপর ওটা স্টোর রুম বানাব।"

এক মাস।

জব্বার সিঁড়ি দিয়ে ছাদে ওঠে। আজ থেকে লিফটে তার জায়গা নেই। সিঁড়ি ভাঙতে হাঁটু কাঁপে। ভেরিকোজ ভেইন টনটন করে। আটতলা। একশো ছাপ্পান্নটা ধাপ। গুনেছে সে। চল্লিশ বছরে একবারই গুনেছে, প্রথমদিনে।

ছাদে দাঁড়িয়ে জব্বার ঢাকার দিকে তাকায়। ছাদের ওপর ছাদ। বিল্ডিংয়ের ওপর বিল্ডিং। প্রতিটাতে লিফট আছে। কতগুলোতে এখনো লিফটম্যান আছে?

কতদিন থাকবে?

মরিয়ম চা নিয়ে আসে। জব্বার চা খায়। চায়ে চিনি একটু বেশি। মরিয়ম জানে আজ একটু বেশি চিনি দরকার।

জব্বার চা শেষ করে। কাপ রাখে। নিচে তাকায়। বিল্ডিংয়ের সামনে একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। নতুন লিফটের যন্ত্রাংশ এসেছে।

লিফট নিজে চলবে। জব্বার কোথায় যাবে, সেটা এখনো ঠিক হয়নি।