পুলিশ কনস্টেবল

ইউনিফর্ম পরলে মানুষ ভয় পায়। ইউনিফর্ম খুললে মানুষ দেখবে আমিও তাদের মতো গরিব

পর্ব ৬০ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ফারুকের ইউনিফর্মে দুটো দাগ আছে।

একটা বাঁ কাঁধে। চায়ের দাগ। থানায় তাড়াহুড়ো করে চা খেতে গিয়ে ছলকে পড়েছিল। ধুলেও ওঠেনি পুরো। আরেকটা ডান হাঁটুর কাছে। কাদামাটির। রাতে টহল দিতে গিয়ে গর্তে পা পড়েছিল, হাঁটু মাটিতে ঠেকেছিল। এই দুটো দাগ নিয়েই ফারুক ডিউটিতে যায়। ধোপার কাছে দেওয়ার টাকা নেই। নিজে ধোয়। সাবান দিয়ে। কিন্তু খাকি কাপড়ে দাগ জিদ্দি।

ফারুক কনস্টেবল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। মতিঝিল থানা। বারো হাজার টাকা বেতন। ষোলো ঘণ্টা ডিউটি। সপ্তাহে সাত দিন। ছুটি? মাসে দুইদিন। তাও নিশ্চিত না। ওসি বললে ছুটির দিনেও আসতে হয়।

সকাল ছটায় ফারুক থানায় রিপোর্ট করে।

প্যারেড। লাইনে দাঁড়ানো। এসআই সাহেব ইন্সপেকশন করেন। ইউনিফর্ম ঠিক আছে কি না, জুতা পালিশ করা কি না, ব্যাটন আছে কি না। ফারুক দাঁড়ায়। বুক টানটান। চোখ সামনে। এই প্যারেড ফারুক প্রতিদিন দেয়। বারো বছর ধরে।

তারপর ডিউটি অ্যাসাইনমেন্ট। আজ ফারুকের পোস্টিং মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায়। ট্রাফিক আর টহল। কিন্তু ট্রাফিক আর টহল ফারুকের আসল কাজ না। আসল কাজ অন্য।

ওসি ডাকেন। আলাদা ঘরে। দরজা বন্ধ।

"ফারুক, আজ কুড়ি হাজার।"

ফারুক মাথা নাড়ে। "জি স্যার।"

কুড়ি হাজার টাকা তুলতে হবে। হকার, দোকানদার, ট্রাক, টেম্পো, ভ্যান থেকে। চাঁদা। মাসিক চাঁদা কারো কারো, সাপ্তাহিক কারো। আর কিছু এককালীন, নতুন দোকান খুললে, নতুন ট্রাক রুটে নামলে।

ফারুক বের হয়। ব্যাটন হাতে। পকেটে একটা খাতা, কলম।

প্রথম স্টপ: মতিঝিল মোড়ে ফুটপাতের হকাররা। চারজন। একজন সিগারেট বিক্রি করে, একজন চা, একজন ফুচকা, একজন বই। প্রত্যেকের কাছ থেকে দুশো টাকা। সপ্তাহে একবার। আজ সেই দিন।

ফারুক যায়। সিগারেটওয়ালা আজিজ দেখে, পকেট থেকে ভাঁজ করা দুটো একশো টাকার নোট বের করে। কোনো কথা না। আজিজ জানে, ফারুক জানে। এই লেনদেন নীরব। হাত বদল হয়। ফারুক এগিয়ে যায়।

চাওয়ালা বলে, "ভাই, এই সপ্তাহে বিক্রি কম। একশো দিই?"

ফারুক থামে। তাকায়। কিছু বলে না। চাওয়ালা বোঝে। দুশো বের করে।

ফুচকাওয়ালী একজন মহিলা। বয়স পঞ্চাশের কাছে। সে দুশো টাকা দেয়। ফারুকের দিকে তাকায় না। মাটির দিকে তাকায়। ফারুকও তার দিকে তাকায় না।

বইওয়ালা আজ নেই। পরে আসবে।

মোট: ছশো। বাকি উনিশ হাজার চারশো।

এরপর দোকানগুলো।

মতিঝিল এলাকায় ছোট দোকান ত্রিশটার বেশি। সবার কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয় না। যাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়, তারা নির্দিষ্ট। ওসি লিস্ট দেন। লিস্টে নাম, দোকানের অবস্থান, পরিমাণ।

একটা ফার্মেসির মালিক হাসান। মাসিক পাঁচ হাজার। আজ মাসের প্রথম সপ্তাহ। হাসানের কাছে যায় ফারুক।

হাসান দোকানে বসে আছে। ওষুধের তাকে ওষুধ সাজানো। ফারুককে দেখে উঠে দাঁড়ায়। "আসেন, বসেন।"

ফারুক বসে না। দাঁড়িয়ে থাকে।

হাসান ড্রয়ার খোলে। একটা খাম বের করে। ফারুক নেয়। পকেটে রাখে। চলে যায়।

এভাবে দোকানে দোকানে। প্রতিটা দোকানে একই নিয়ম। কিছু দোকানদার হাসে, চা অফার করে, কিছু দোকানদার চুপচাপ টাকা দেয়, কিছু দোকানদার চোখে ঘৃণা নিয়ে তাকায়।

ফারুক সব সহ্য করে। ঘৃণার চোখও। কারণ ফারুকের পছন্দ নেই।

"ওপর থেকে বলে, আজ কুড়ি হাজার তোল।"

ফারুক এটা বউ নাজমাকে বলেনি কোনোদিন। বলে লাভ কী? নাজমা জানে ফারুক পুলিশে চাকরি করে। বেতন বারো হাজার। ফারুক প্রতি মাসে বাড়িতে দেয় দশ হাজার। বাকি দুই হাজার তার খাওয়া, যাতায়াত, ফোন।

কিন্তু দশ হাজার কি শুধু বেতন থেকে আসে? বারো হাজার বেতন, দুই হাজার নিজের খরচ, বাকি দশ হাজার? হিসাব মেলে।

মেলে, কারণ ফারুক চাঁদা থেকে কিছু রাখে না। পুরোটা ওপরে পাঠায়। কুড়ি হাজার তুললে কুড়ি হাজারই এসআইকে দেয়। এসআই ওসিকে দেন। ওসি কতটুকু রাখেন, কতটুকু ওপরে পাঠান, সেটা ফারুক জানে না। জানতেও চায় না।

ফারুকের সততা? না। ফারুক সৎ না। সে চাঁদা তোলে। কিন্তু সে নিজের জন্য চুরি করে না। কারণ ফারুক জানে নিচের মানুষ চুরি করলে ধরা পড়ে। ওপরের মানুষ করলে পদোন্নতি হয়।

কনস্টেবল পদে ঢুকতে ফারুকের লেগেছিল তিন লাখ টাকা।

ঘুষ। নিয়োগ পরীক্ষায় পাস করেছিল ঠিকই। শারীরিক পরীক্ষায়ও পাস। কিন্তু পাস করলেই চাকরি হয় না। তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছিল একজন মধ্যস্বত্বভোগীকে। সে টাকাটা কোথায় গেছে, কাকে দিয়েছে, ফারুক জানে না।

তিন লাখ কোথা থেকে এসেছিল? বাবা। ফারুকের বাবা কুমিল্লায় একটু জমি বিক্রি করেছিল। তিন কাঠা। বাবা বলেছিল, "সরকারি চাকরি। পেনশন পাবি। বুড়ো বয়সে ভাতা পাবি।"

বারো বছর হলো। তিন লাখ টাকার ওই ঋণ এখনো শোধ হয়নি। বেতন দিয়ে তিন লাখ শোধ করতে কত সময় লাগে? বারো হাজার বেতন, দশ হাজার বাড়িতে দেয়, দুই হাজার নিজের খরচ। সঞ্চয় শূন্য।

বাবা বলে, "টাকা লাগবে না। তুই ভালো থাক।"

কিন্তু জমি গেছে। তিন কাঠা জমি যেটা বাবার বাবার ছিল।

রাত দশটায় ফারুক থানায় ফেরে।

সারাদিনের হিসাব দেয় এসআইকে। কুড়ি হাজার? হ্যাঁ, কুড়ি হাজার একশো। একশো বেশি এসেছে একটা নতুন চায়ের দোকান থেকে, ফুটপাতে বসেছে আজ থেকে।

এসআই টাকা গোনেন। সন্তুষ্ট। "ভালো। কাল সকালে আসবে।"

ফারুক বের হয়। রাতের ঢাকা। মতিঝিলের রাস্তায় গাড়ি কম। কুকুর বেশি। ফারুক হেঁটে যায়। থানার পেছনে একটা ব্যারাক আছে, সেখানে কনস্টেবলরা থাকে। ফারুকের বিছানা তৃতীয় সারিতে, বাঁদিকে। পাশে কনস্টেবল মাজহার ঘুমাচ্ছে। তার পাশে জাহিদ। দশজন এক ঘরে।

ফারুক ইউনিফর্ম খোলে। হ্যাঙ্গারে ঝোলায়। লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে। গোসল করবে না, রাত বেশি হয়ে গেছে। কাল সকালে।

সে বিছানায় শোয়। ছাদের দিকে তাকায়। পাখা ঘুরছে। ঘড়ঘড় আওয়াজ। একটা ব্লেড একটু বাঁকা, তাই কাঁপে।

ঘুম আসে না।

ফারুক ভাবে।

বারো বছর আগে সে চাকরিতে ঢুকেছিল উত্তেজনায়। পুলিশ। ইউনিফর্ম। সম্মান। ক্ষমতা। মানুষ সালাম দেবে। মানুষ ভয় পাবে।

মানুষ ভয় পায় ঠিকই। কিন্তু ভয় আর সম্মান এক জিনিস না। হকার ফারুককে দেখলে ভয় পায়, সম্মান করে না। দোকানদার ফারুককে দেখলে ঘৃণা করে, সম্মান করে না। পথচারী ফারুককে দেখলে দূরে সরে যায়। সে জানে পুলিশ মানেই ঝামেলা।

ফারুক ভিলেন হতে চায়নি। সে চেয়েছিল মানুষকে সাহায্য করতে। ছোটবেলায় টিভিতে সিনেমা দেখত, পুলিশ ডাকাত ধরে, মানুষকে বাঁচায়। সে ভেবেছিল পুলিশ হলে সেও বাঁচাবে।

বাস্তবে সে চাঁদা তোলে। বাস্তবে সে হকারের হাত থেকে দুশো টাকা নেয়। বাস্তবে সে ফুচকাওয়ালী মহিলার মুখের দিকে তাকাতে পারে না।

"ইউনিফর্ম পরলে মানুষ ভয় পায়। ইউনিফর্ম খুললে মানুষ দেখবে আমিও তাদের মতো গরিব।"

ফারুক কাকে বলবে এই কথা? কাউকে না। এটা তার ভেতরে থাকে। ইউনিফর্মের নিচে।

শুক্রবার। ছুটি।

ফারুক বাড়ি যায়। বাড়ি মানে ভাড়া বাসা, মিরপুরে। একটা ঘর, রান্নাঘর শেয়ার। ভাড়া সাড়ে চার হাজার। নাজমা আর তিন বাচ্চা থাকে সেখানে। ফারুক থাকে ব্যারাকে। শুক্রবার শুক্রবার আসে।

বড় মেয়ে সুমাইয়া, বয়স দশ। মেজো ছেলে তাওহিদ, সাত। ছোট মেয়ে রুমা, তিন।

সুমাইয়া দৌড়ে আসে। "আব্বু!" জড়িয়ে ধরে। ফারুকের বুকে মুখ চাপা দেয়। ফারুক মেয়ের মাথায় হাত রাখে। এই মুহূর্তে সে কনস্টেবল না। সে বাবা।

নাজমা ভাত রেঁধেছে। মাছ, ডাল, ভর্তা। শুক্রবারে একটু ভালো রান্না হয়। ফারুক খায়। বাচ্চারা খায়। নাজমা পরে খায়।

তাওহিদ জিজ্ঞেস করে, "আব্বু, তুমি বন্দুক চালাও?"

"না।"

"তাহলে পুলিশ হয়ে কী করো?"

ফারুক হাসে। কিন্তু হাসিটা চোখে পৌঁছায় না। "মানুষকে সাহায্য করি।"

নাজমা ফারুকের দিকে তাকায়। সে কিছু বলে না। সে জানে ফারুক কী করে। পুরোটা না হলেও অনেকটা আন্দাজ করতে পারে। কিন্তু সে প্রশ্ন করে না। কারণ প্রশ্নের উত্তরে যা আসবে তা সহ্য করার চেয়ে না জানা ভালো।

১০

শনিবার সকাল। ফারুক আবার ইউনিফর্ম পরে।

আয়নায় দেখে। খাকি শার্ট, খাকি প্যান্ট, কালো বেল্ট, কালো জুতা। মাথায় ক্যাপ। বুকে ব্যাজ। কাঁধে র্যাংক। এই ইউনিফর্ম পরলে সে আর ফারুক থাকে না। সে হয়ে যায় "পুলিশ"।

বাইরে বের হয়। রাস্তায় একজন রিকশাওয়ালা ফারুককে দেখে সাইকেলের গতি বাড়ায়। একজন চাওয়ালা মুখ ফিরিয়ে নেয়। একটা বাচ্চা মায়ের আঁচল ধরে লুকায়।

ফারুক দেখে। প্রতিদিন দেখে। এই ভয় সে তৈরি করেনি। এই ভয় তৈরি হয়েছে দশকের পর দশক ধরে, হাজার হাজার কনস্টেবলের হাতে, হাজার হাজার ওসির নির্দেশে। ফারুক এই ব্যবস্থার একটা গিয়ার। সে ঘোরে, কারণ যন্ত্র ঘোরায়।

থানায় পৌঁছে। প্যারেড দেয়। ডিউটি নেয়।

ওসি ডাকেন। "আজ পঁচিশ হাজার।"

ফারুক মাথা নাড়ে। "জি স্যার।"

সে বের হয়। রোদে হাঁটে। মতিঝিলের দিকে। পকেটে খাতা, কলম। হাতে ব্যাটন। পায়ে কালো জুতা। জুতার পালিশ উঠে গেছে, কিন্তু দূর থেকে দেখলে চকচক করে।

দূর থেকে দেখলে ফারুককে ক্ষমতাবান মনে হয়। কাছ থেকে দেখলে সে একজন বারো হাজার টাকার মানুষ, যাকে কুড়ি হাজার তুলতে বলা হয়েছে, যে তোলে কারণ না তুললে বদলি হবে, বদলি হলে পরিবার না খেয়ে থাকবে।

ইউনিফর্মের ভেতরে ঘাম। ইউনিফর্মের বাইরে ভয়। মাঝখানে ফারুক।