আনসার
সেনাবাহিনী এলে ক্যামেরা আসে। আমরা আসলে কেউ দেখে না।
১
সাত্তারের ইউনিফর্ম খাকি রঙের। কিন্তু খাকি রঙটা আর চেনা যায় না। এত ধোয়া হয়েছে যে রঙটা ফ্যাকাশে হলুদ হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় সাদা। কনুইতে সেলাই। পকেটের একটা বোতাম নেই। বেল্টের বাকল মরচে ধরা।
এটাই তার একমাত্র ইউনিফর্ম। এগারো বছর আগে পেয়েছিল। ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে জমা দিলে নতুন দেওয়ার কথা। সাত্তার তিনবার দিয়েছে। তিনবারই বলেছে, "আসবে।" আসেনি।
সাত্তারের বয়স বিয়াল্লিশ। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার মানুষ। আনসার ভিডিপি সদস্য। খণ্ডকালীন। ফুলটাইম চাকরি না, পার্টটাইম দায়িত্ব। মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা পায়। কখনো পায়, কখনো দুই মাস পর একসাথে পায়। কখনো তিন মাস পর। কখনো পায় না, তারপর হঠাৎ চার মাসের একসাথে এসে যায়।
বাকি সময় সে দিনমজুর। অন্যের জমিতে হাল দেয়, ধান কাটে, মাটি কাটে। যখন ডাক আসে আনসারের, তখন কোদাল রেখে লাঠি তুলে নেয়।
লাঠি। বাঁশের লাঠি। এটাই তার অস্ত্র।
২
প্রশিক্ষণ হয়েছিল একবার। দশ বছর আগে। উপজেলা সদরে। সাত দিন।
প্রথম দিন কুচকাওয়াজ শেখাল। বাম, ডান, থাম। দ্বিতীয় দিন পিটি। তৃতীয় দিন "শৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা" বিষয়ে ক্লাস। একজন ইন্সপেক্টর এসে পাওয়ার পয়েন্ট দেখালেন। সাত্তার পাওয়ার পয়েন্ট আগে দেখেনি। দেখল। বুঝল না।
চতুর্থ দিন লাঠি চালনা। এটা সাত্তার পারে। ছোটবেলা থেকে পারে। গ্রামের ছেলে, বাঁশ দিয়ে খেলেছে সারা জীবন। ইন্সট্রাক্টর সাত্তারকে দেখে বললেন, "তুমি আগে থেকে জানো?"
"জি স্যার।"
"ভালো। তুমি অন্যদের শেখাও।"
পঞ্চম দিন বৃষ্টিতে ভিজে প্যারেড। ষষ্ঠ দিন আবার ক্লাস। সপ্তম দিন সার্টিফিকেট। সাত্তার কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল। সেই কাগজ এখনো তার টিনের বাক্সে আছে। ভাঁজের দাগগুলো এত গভীর যে কাগজটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
এই হলো তার প্রশিক্ষণ। সাত দিন। একটা বাঁশের লাঠি। তারপর তাকে পাঠানো হয় বন্যায়, ঘূর্ণিঝড়ে, নির্বাচনে।
৩
২০২৪ সালের বন্যা আগস্টে এল।
যমুনা ফুলে উঠল। সিরাজগঞ্জে পানি ঢুকল চারদিক দিয়ে। বেলকুচির নিচু জমি তিন ঘণ্টায় তলিয়ে গেল। সাত্তার সকালে মাঠে ছিল। ইউএনও অফিস থেকে ফোন এল চেয়ারম্যানের কাছে। চেয়ারম্যান সাত্তারকে ডাকল।
"সাত্তার, পশ্চিম পাড়ার লোকজনকে সরাও। পানি বাড়ছে।"
সাত্তার লাঠি নিয়ে বের হলো। কোনো নৌকা নেই। কোনো লাইফ জ্যাকেট নেই। কোনো মেগাফোন নেই। শুধু সাত্তার, তার বাঁশের লাঠি, আর তার গলা।
"পানি আসতেছে! বাড়ি ছাড়েন! স্কুলে যান!"
বাড়ি বাড়ি গেল। দরজায় দরজায় ধাক্কা দিল। কেউ শুনল, কেউ শুনল না। বুড়ো আলী মিয়া বললেন, "আমি যামু না। মরলে এই বাড়িতে মরমু।" সাত্তার জোর করে তাঁকে কাঁধে তুলে নিল। আলী মিয়ার ওজন বেশি না, কিন্তু পানি কোমর পর্যন্ত উঠে গেছে। স্রোত আছে। পা পিছলে যাচ্ছে মাটিতে। সাত্তার বাঁশের লাঠি মাটিতে গেঁথে ভর দিয়ে হাঁটল।
স্কুলে পৌঁছে দিল আলী মিয়াকে। ফিরে গেল। আরেক বাড়ি। মরিয়মের বাড়ি। মরিয়মের তিনটা বাচ্চা। স্বামী ঢাকায়। মরিয়ম কাঁদছে। বাচ্চারা কাঁদছে। সাত্তার দুটো বাচ্চা কোলে নিল, একটা পিঠে। মরিয়মকে বলল, "আমার কাঁধ ধরেন।"
পানি বুকে উঠে গেছে।
স্রোতে একটা টিনের চাল ভেসে এল। ধার দিয়ে সাত্তারের বাম হাত কেটে গেল। রক্ত পানিতে মিশে গেল। সাত্তার থামল না। থামলে পানি বাড়বে।
৪
সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সাত্তার পানিতে ছিল। সতেরোটা পরিবার সরাল। একশো তিনজন মানুষ। গুনেছে পরে, তখন গোনার সময় ছিল না।
রাতে স্কুলের বারান্দায় বসে সাত্তার হাতের কাটাটায় নিজেই কাপড় বাঁধল। গামছার একটা টুকরো ছিঁড়ে জড়িয়ে দিল। ডেটল নেই, ব্যান্ডেজ নেই। গামছা আছে।
পানি নামতে তিন দিন লাগল। তিন দিন সাত্তার স্কুলে থাকল। ত্রাণ এল দ্বিতীয় দিনে। চালের বস্তা, চিড়া, গুড়। ত্রাণ বিতরণ কে করবে? সাত্তার। লাইনে দাঁড় করাও, নাম লেখো, পরিমাণ দাও। সাত্তারের লেখাপড়া অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। সে খাতায় নাম লিখল, পরিমাণ লিখল। হাতের কাটা থেকে কাপড়ের মধ্য দিয়ে পানি চুঁইয়ে খাতায় পড়ল। কিন্তু লেখা পড়া যায়।
তৃতীয় দিনে সেনাবাহিনী এল। হেলিকপ্টার। ক্যামেরা। সাংবাদিক। টেলিভিশনের লোক।
সাত্তার স্কুলের বারান্দা থেকে দেখল। সেনাবাহিনীর ছেলেরা রাবার বোটে করে কয়েকটা পরিবার নিয়ে এল। ক্যামেরার সামনে ত্রাণ দিল। সবার গায়ে পরিষ্কার ইউনিফর্ম। সবকিছু পরিপাটি।
সাত্তারের ফ্যাকাশে খাকি ইউনিফর্মে শুকনো কাদা। হাতে রক্তমাখা গামছা। কোনো ক্যামেরা তার দিকে ফেরেনি।
৫
বন্যার পর ইউএনও সাহেব এলেন পরিদর্শনে। সাত্তারকে ডাকলেন।
"তুমিই সাত্তার? বন্যায় ভালো কাজ করেছ।"
"জি স্যার।"
"তোমাকে একটা সার্টিফিকেট দেব। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।"
সাত্তার মাথা নামাল। সার্টিফিকেট। তার টিনের বাক্সে আরেকটা কাগজ জমা হবে।
"স্যার, ভাতাটা তিন মাস পাইনি।"
ইউএনও সাহেব একটু থামলেন। তারপর বললেন, "দেখছি। ফাইল করো।"
সাত্তার ফাইল করল। ফাইল কোথায় গেল কেউ জানে না।
৬
নির্বাচন এল। ২০২৪-এর পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।
সাত্তারকে ডাকা হলো। পোলিং সেন্টারে দাঁড়াও। শৃঙ্খলা রক্ষা করো। ভোটারদের লাইনে রাখো।
সাত্তার সকাল ছয়টায় পোলিং সেন্টারে গেল। লাঠি হাতে দাঁড়াল গেটে। ভোটাররা আসতে লাগল। লাইন হলো। কেউ ঠেলাঠেলি করলে সাত্তার বলল, "লাইনে থাকেন।" কেউ শুনল, কেউ গালি দিল।
দুপুরে চেয়ারম্যান প্রার্থীর লোকজন এল। চারজন। মোটা মোটা। সাত্তারকে বলল, "সরো।"
সাত্তার সরল না।
"আমি ডিউটিতে আছি।"
একজন সাত্তারের বুকে ধাক্কা দিল। সাত্তার পড়ে গেল। লাঠিটা হাত থেকে ছিটকে গেল। চারজন ভেতরে ঢুকে গেল।
সাত্তার উঠে বসল। পিঠে ব্যথা। লাঠি তুলে নিল। আবার দাঁড়াল। কী করবে? পুলিশ নেই, ম্যাজিস্ট্রেট ভেতরে, ফোন করার কেউ নেই।
সে দাঁড়িয়ে রইল। লাঠি হাতে। একা।
সন্ধ্যায় ভোট শেষ হলো। সাত্তার বাড়ি ফিরল। ফাতেমা জিজ্ঞেস করল, "খাবে?" সাত্তার খেল। ভাত, ডাল, একটু আলুভর্তা। রাতে শুয়ে পিঠের ব্যথাটা বাড়ল।
পরদিন সে আবার দিনমজুরির কাজে গেল। পিঠে ব্যথা নিয়ে।
৭
ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে আবার ডাক আসে।
সাত্তার মাইকিং করে। "ঘূর্ণিঝড় আসতেছে! আশ্রয়কেন্দ্রে যান!" গ্রামের রাস্তায় হাঁটে, গলা ফাটিয়ে চেঁচায়। মাইক নেই, নিজের গলাটাই মাইক। গলা ভাঙে। তারপরও চেঁচায়।
ঘূর্ণিঝড় আসে। গাছ পড়ে। টিন ওড়ে। সাত্তার আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ গোনে, পানি দেয়, বাচ্চাদের সামলায়। ঘূর্ণিঝড় চলে যায়। সাত্তার ধ্বংসস্তূপ সরায়। রাস্তা থেকে গাছ সরায়। খবরের কাগজে লেখে: "সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে উদ্ধার কাজ চলছে।"
সাত্তারের নাম নেই। আনসারের নাম নেই।
৮
সাত্তারের বউ ফাতেমা সেলাই করে। পাড়ার মেয়েদের ব্লাউজ, পেটিকোট। মাসে দুই-তিন হাজার আসে। দুই মেয়ে স্কুলে যায়। ছেলে মাদ্রাসায়। সাত্তারের দিনমজুরিতে মাসে পাঁচ-ছয় হাজার আসে। আনসারের ভাতা তিন হাজার, যখন আসে। মোট দশ-বারো হাজার। পাঁচজনের সংসার।
সাত্তার হিসাব করে না। হিসাব করলে ভয় লাগে। সে শুধু কাজ করে। সকালে উঠে কাজে যায়। ডাক এলে লাঠি নিয়ে দৌড়ায়। ডাক না এলে কোদাল নিয়ে মাঠে যায়।
রাতে ফাতেমা মাঝে মাঝে বলে, "আনসারের কাজটা ছেড়ে দাও। তিন হাজার টাকায় জান দিতে হয় কেন?"
সাত্তার বলে, "ডাক দিলে যেতে হয়। এটা দায়িত্ব।"
"দায়িত্ব তোমাকে খাওয়ায় না।"
সাত্তার চুপ থাকে। ফাতেমা ঠিকই বলে। তিন হাজার টাকায় বন্যায় বুক পর্যন্ত পানিতে দাঁড়ানো, নির্বাচনে বুকে ধাক্কা খাওয়া, ঘূর্ণিঝড়ে গলা ফাটানো। কোনো হিসাবে মেলে না।
কিন্তু সাত্তার ছাড়ে না। ছাড়তে পারে না। এই লাঠিটা, এই ফ্যাকাশে ইউনিফর্মটা, এটাই তার পরিচয়ের একমাত্র প্রমাণ যে সে শুধু একজন দিনমজুর না। সে কিছু একটা।
৯
একদিন সাত্তারের ছেলে রাতে টিভিতে খবর দেখছিল। বন্যার খবর। অন্য জেলায়। সেনাবাহিনী উদ্ধার করছে। হেলিকপ্টার, রাবার বোট, পরিষ্কার ইউনিফর্ম।
ছেলে বলল, "বাবা, তুমিও তো বন্যায় মানুষ বাঁচাও। তোমার ছবি কেন টিভিতে আসে না?"
সাত্তার হাসল। হাসিটা টিভির আলোতে দেখা গেল। ক্লান্ত হাসি।
"সেনাবাহিনী এলে ক্যামেরা আসে। আমরা আসলে কেউ দেখে না।"
ছেলে বুঝল কি না সাত্তার জানে না। ছেলের বয়স তেরো। তেরো বছরে কিছু কিছু কথা মাথায় থেকে যায়।
সাত্তার টিভি বন্ধ করল। ঘরে অন্ধকার নামল। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে। দূরে যমুনার পানির শব্দ। নদী সবসময় আছে। নদী সবসময় হুমকি।
সাত্তার শুয়ে পড়ল। আগামীকাল ভোরে মাঠে যেতে হবে। অন্যের জমিতে ধান কাটতে হবে। লাঠিটা দরজার পাশে হেলান দেওয়া আছে। সেটাও আগামীকাল লাগতে পারে, নাও লাগতে পারে।
সাত্তার ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে তার বাম হাত কাঁপল। বন্যার কাটা দাগটা এখনো আছে। সারবে না। শরীরে কিছু কিছু দাগ থাকে যেগুলো কেউ দেখে না, কিন্তু শরীর মনে রাখে।