পোস্টম্যান
চিঠি শেষ হলে আমিও শেষ।
১
সাইকেলটা অ্যাটলাস কোম্পানির। কালো রঙ। পঞ্চাশ বছর পুরোনো।
রমজান যখন এই সাইকেল পেয়েছিল তখন সাইকেলটা নতুন ছিল। ১৯৭৪ সাল। রমজানের বয়স কুড়ি। সদ্য চাকরি পেয়েছে পোস্ট অফিসে। চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায়। পোস্টমাস্টার বললেন, "এই তোমার সাইকেল, এই তোমার ব্যাগ। কাল থেকে ডাক বিলি।"
ব্যাগটা খাকি রঙের, কাঁধে ঝোলানো। সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে বাঁধা থাকে। সাইকেলের চেইন তখন ঝকঝক করত। হ্যান্ডেলে রাবারের গ্রিপ ছিল। ব্রেক কাজ করত। ঘণ্টা বাজত।
এখন চেইন মরচে ধরা। হ্যান্ডেলের রাবার ক্ষয়ে গেছে, খালি ধাতু। ব্রেক কাজ করে, তবে শব্দ হয়, যেন কেউ পুরোনো দরজা খুলছে। ঘণ্টা বাজে না। কিন্তু রমজান চালায়। প্রতিদিন চালায়।
রমজানের বয়স এখন সত্তর।
২
একসময় দুইশো চিঠি আসত দিনে।
ব্যাগ ভারী হতো। সাইকেলের ক্যারিয়ার নুয়ে পড়ত। রমজান সকাল আটটায় পোস্ট অফিস থেকে বের হতো, ফিরত বিকেল পাঁচটায়। পুরো উপজেলা ঘুরত। কাঁচা রাস্তা, পাকা রাস্তা, মাটির আল, বাঁশের সাঁকো। বর্ষায় সাইকেল কাঁদায় আটকে যেত, তখন কাঁধে তুলে হাঁটত। ব্যাগ ভিজত না। রমজান ভিজত।
দুইশো চিঠি। মানে দুইশো বাড়ি। দুইশো মুখ। দুইশো অপেক্ষা।
কেউ ছেলের চিঠি পেত। ছেলে ঢাকায় কাজ করে, মাসে একটা চিঠি দেয়। মা চিঠি হাতে নিয়ে কাঁদত। পড়তে পারত না, রমজানকে দিয়ে পড়াত। রমজান পড়ত। "আম্মা, আমি ভালো আছি। টাকা পাঠাচ্ছি মানি অর্ডারে।"
কেউ প্রেমের চিঠি পেত। সেগুলো রমজান চিনত। খামের ওপর গোলাপি কালি। ভেতরে আতরের গন্ধ। রমজান কখনো খোলেনি। কখনো খুলবেও না। চিঠি পবিত্র।
কেউ সরকারি নোটিশ পেত। জমির খাজনা, কোর্টের সমন, কর দপ্তরের চিঠি। এগুলো পেলে মানুষ খুশি হতো না। রমজানের দিকে তাকাত, যেন রমজানই খারাপ খবর নিয়ে এসেছে। রমজান বলত, "আমি বাহক। খবর আমার না।"
দুইশো চিঠি। প্রতিদিন। পঞ্চাশ বছর।
৩
তারপর মোবাইল এল।
প্রথমে গ্রামে একটা দুইটা ফোন ছিল। চেয়ারম্যানের ছেলের কাছে, ডাক্তারের কাছে। তারপর দশটা। তারপর পঞ্চাশটা। তারপর সবার কাছে।
চিঠি কমতে লাগল। দুইশো থেকে একশো। একশো থেকে পঞ্চাশ। পঞ্চাশ থেকে কুড়ি।
রমজান দেখল। চিঠি কমছে, কিন্তু সে কমছে না। সে প্রতিদিন সাইকেলে বের হয়। কুড়িটা চিঠি দিতে সারাদিন লাগে না, তিন ঘণ্টায় হয়ে যায়। বাকি সময় কী করে? সাইকেল চালায়। পুরোনো রুটে। পুরোনো রাস্তায়। যেখানে একসময় থামত, সেখানে এখন থামে না। থামার কেউ নেই।
ইমেইল এল। রমজান ইমেইল কী জিজ্ঞেস করল পোস্টমাস্টারকে। পোস্টমাস্টার বললেন, "ইলেকট্রনিক মেইল। কম্পিউটারে চিঠি।"
"সেটা কে বিলি করে?"
"কেউ না। নিজে নিজে চলে যায়।"
রমজান কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, "তাহলে পোস্টম্যানের দরকার নেই।"
পোস্টমাস্টার কিছু বললেন না।
৪
কিন্তু একটা জিনিস ইমেইল পারে না। সরকারি কাগজ। জমির দলিল, আদালতের সমন, মৃত্যু সনদ, জন্ম সনদ, পেনশনের কাগজ। এগুলো এখনো ডাকে আসে। সিলমোহর লাগানো খাম। সরকারি নীল কালিতে ঠিকানা। এগুলোই এখন রমজানের চিঠি।
কুড়িটা চিঠির মধ্যে পনেরোটাই সরকারি। বাকি পাঁচটা মানি অর্ডার। প্রবাসী ছেলেরা এখনো মানি অর্ডার পাঠায়। যেসব মায়ের ফোন নেই, যেসব মায়ের মোবাইল ব্যাংকিং নেই। বছরে সেই মায়ের সংখ্যাও কমছে।
রমজান জানে একদিন কুড়িটা চিঠিও শূন্য হবে। সবকিছু ডিজিটাল হবে। সরকারি কাগজও ইমেইলে যাবে। সেদিন রমজানের সাইকেল থেমে যাবে।
"চিঠি শেষ হলে আমিও শেষ।" সে বলে এটা হাসতে হাসতে। কিন্তু হাসিটা চোখে পৌঁছায় না।
৫
আজ সকালে রমজানের ব্যাগে একটাই বিশেষ চিঠি। মৃত্যু সনদ।
চাঁদপুর সদর হাসপাতাল থেকে এসেছে। ঠিকানা: ময়না বেগম, স্বামী মরহুম আবদুল করিম, গ্রাম দক্ষিণ চরকাকৈর।
রমজান আবদুল করিমকে চিনত। মানে চিনত বললে কম বলা হয়। পঞ্চাশ বছর ধরে তার বাড়িতে চিঠি দিয়েছে। প্রথমে আবদুল করিমের বাবার নামে আসত। তারপর আবদুল করিমের নামে। ছেলে সৌদি আরবে, প্রতি মাসে মানি অর্ডার পাঠাত। রমজান সেই টাকা পৌঁছে দিত। আবদুল করিম চা খাওয়াত। বলত, "রমজান ভাই, বসো। এক কাপ খাও।"
আবদুল করিম গত মাসে মারা গেছে। হার্ট অ্যাটাক। বাষট্টি বছর বয়স।
আজ রমজান তার মৃত্যু সনদ নিয়ে যাচ্ছে তার বিধবা স্ত্রীর কাছে।
৬
ময়নার বাড়ি গ্রামের শেষ মাথায়। পাকা রাস্তা থেকে মাটির আল ধরে পাঁচ মিনিট। সাইকেল রাখল রমজান আলের মুখে। হেঁটে গেল।
উঠোনে ময়না বসে আছে। পান খাচ্ছে। চুল সাদা। মুখে বলিরেখা। কিন্তু চোখ পরিষ্কার।
"ময়না বিবি।"
"কে? রমজান ভাই?"
"হ্যাঁ।"
"বসো। চা দিই।"
"না। একটা চিঠি আছে।"
রমজান খামটা বের করল। ময়না হাত বাড়াল। খামটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখল। সিলমোহর দেখল। তারপর রমজানের দিকে তাকাল।
"পড়ে দাও। চোখে দেখি না। চশমা ভাঙা।"
রমজান জানত এই কথা আসবে। সে কত মৃত্যু সনদ পড়ে দিয়েছে জীবনে। কত জন্ম সনদ। কত আদালতের নোটিশ। রমজান শুধু বাহক না। রমজান পাঠকও।
খামটা খুলল। কাগজটা বের করল। ভাঁজ খুলল।
"মৃত্যু সনদ। নাম: আবদুল করিম, পিতা মরহুম আবদুস সালাম। মৃত্যুর তারিখ: ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। কারণ: হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ। স্থান: চাঁদপুর সদর হাসপাতাল।"
ময়না চুপ করে শুনল। পান চিবানো থামল না। চোখ শুকনো। কাঁদল না। বুড়ো মানুষদের কান্না ভেতরে থাকে, বাইরে আসে না।
"আর কিছু লেখা আছে?"
"না। এটুকুই।"
ময়না কাগজটা ভাঁজ করল। আঁচলে রাখল। বলল, "বসো। চা দিই।"
রমজান বসল। এবার না বলল না। ময়না উঠে ঘরে গেল। চুলায় পানি বসাল। রমজান উঠোনে বসে চারদিক দেখল। আবদুল করিম যে গাছটার নিচে বসত সেটা এখনো আছে। কাঁঠাল গাছ। ডালে একটা দড়ি বাঁধা, সেখানে কাপড় শুকোচ্ছে।
ময়না চা নিয়ে এল। দুই কাপ। একটা রমজানের, একটা নিজের।
"করিম ভাই সবসময় বলত, রমজান ভাই আসলে চা দিবি।" ময়না বলল।
রমজান চা খেল। চায়ে চিনি বেশি। আবদুল করিমও চায়ে চিনি বেশি দিত।
৭
রমজান ফিরতে ফিরতে ভাবল।
পঞ্চাশ বছরে সে কত মৃত্যু সনদ দিয়েছে? গোনা যাবে না। প্রথম মৃত্যু সনদ দেওয়ার কথা মনে আছে। ১৯৭৬ সালে। গ্রামের মাতব্বরের মৃত্যু সনদ। তার মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। রমজান পানি এনে দিয়েছিল।
তারপর কত মৃত্যু। কত সনদ। রমজান সব মনে রাখেনি, কিন্তু শরীর মনে রেখেছে। প্রতিটা বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়ালে একটা ওজন অনুভব হয়। কোনো দরজায় ভালো খবর, কোনো দরজায় মন্দ। রমজান দুটোই বহন করে। সমান ওজনে।
"আমি সংবাদ বহন করি। ভালো আর মন্দ দুটোই।"
সে এটা একবার পোস্টমাস্টারকে বলেছিল। পোস্টমাস্টার বললেন, "তুমি দার্শনিক হয়ে যাচ্ছো, রমজান।"
রমজান হাসল। দর্শন তার জানা নেই। সে শুধু জানে সাইকেল চালাতে। চিঠি দিতে। কখনো ভালো খবর, কখনো মন্দ খবর।
৮
রমজানের বয়স সত্তর। অবসরের বয়স কবে পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সে যায়নি। যাওয়ার কথা বলেনি। পোস্টমাস্টারও বলেননি। কেন বলেননি? হয়তো রমজানের বদলে কেউ আসতে চায় না। পোস্টম্যানের চাকরি কেউ করতে চায় না। বেতন কম, কাজ কঠিন, সাইকেলে সারাদিন ঘোরা। তরুণরা ঢাকায় যায়, গার্মেন্টসে ঢোকে, রিকশা চালায়। পোস্টম্যান হতে চায় না।
তাই রমজান চালায়। হাঁটু ব্যথা করে। চোখে ঝাপসা দেখে। কানে কম শোনে। কিন্তু সাইকেল চালায়। রাস্তা চেনে চোখ বন্ধ করেও। কোন বাড়ি কোথায়, কার নাম কী, কে কোন ঘরে থাকে, সব মুখস্থ। এটা তার মেমরি। এটাই তার মূলধন।
সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখলে পুরোনো ছন্দ ফিরে আসে। শরীর মনে রাখে।
একদিন এই শরীর আর পারবে না। একদিন এই সাইকেল আর চলবে না। সেদিন হাইমচরের শেষ পোস্টম্যান অবসরে যাবে। তার পর আর কেউ আসবে না।
চিঠি শেষ হয়ে যাচ্ছে। রমজানও শেষ হয়ে যাচ্ছে। দুজনে একসাথে।
৯
সন্ধ্যায় রমজান পোস্ট অফিসে ব্যাগ রাখল। খালি ব্যাগ। আজকের সব চিঠি দেওয়া হয়ে গেছে। সাইকেল হেলান দিল দেয়ালে।
পোস্ট অফিসের সামনে একটা বটগাছ। রমজান যেদিন প্রথম এসেছিল সেদিনও এই গাছ ছিল। তখন ছোট ছিল। এখন বিশাল। ছায়া পড়ে পুরো উঠোনে।
গাছ বাড়ে। চিঠি কমে। পোস্টম্যান বুড়ো হয়।
রমজান সাইকেলের সিটে হাত রাখল। সিটের চামড়া ফেটে গেছে। ভেতরের ফোম বের হয়ে আসছে। রমজান একটু চাপ দিল। সিটটা দুলে উঠল।
আগামীকাল আবার আসবে। আবার ব্যাগ কাঁধে নেবে। আবার সাইকেল চালাবে। পনেরোটা চিঠি হোক, দশটা হোক, পাঁচটা হোক। একটা হলেও আসবে।
কারণ সেই একটা চিঠির জন্য কেউ না কেউ অপেক্ষা করছে। হয়তো একজন বিধবা যার চশমা ভাঙা। হয়তো একজন মা যার ছেলে বিদেশে। হয়তো একজন কৃষক যার জমির কাগজ আসবে।
রমজান তাদের জন্য আসবে। যত দিন পায়ে জোর আছে।
বটগাছের পাতা ঝরল একটা। রমজানের কাঁধে পড়ল। সে ঝেড়ে ফেলল। উঠল। বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। সাইকেল ঠেলে। কারণ ফেরার পথে সে সাইকেলে চড়ে না। হাঁটু বিশ্রাম চায়।