পাটকল শ্রমিক

পাট সোনালি আঁশ। আমরা পাটের মতো ফেলে দেওয়া হয়েছি।

পর্ব ৬৩ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

করিমের হাত দুটো বড়।

আঙুলগুলো মোটা, জোড়ায় জোড়ায় ফোলা। বাম হাতের তর্জনি একটু বাঁকা, কারণ ১৯৯৮ সালে স্পিনিং মেশিনে আটকে গিয়েছিল। হাড় ভেঙেছিল। ডাক্তার দেখিয়েছিল মিল হাসপাতালে। ডাক্তার বললেন, "প্লাস্টার দিচ্ছি, তিন সপ্তাহে ভালো হবে।" দুই সপ্তাহে প্লাস্টার খুলে কাজে ফিরেছিল করিম। কারণ মিলে শ্রমিক কম ছিল, সুপারভাইজার বলেছিল, "আসো। এক হাতে করো।"

এক হাতে করেছিল। তারপর দুই হাতে। আঙুলটা সোজা হয়নি। বাঁকা থেকে গেছে। তবু মেশিন চালিয়েছে। তিরিশ বছর।

খুলনার খালিশপুর জুট মিল। সরকারি মিল। একসময় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করত। সকাল আটটায় সাইরেন বাজত, খালিশপুরের আকাশে ঘুরত সেই শব্দ। শ্রমিকরা সারিবদ্ধভাবে ঢুকত গেটে। গেটে চৌকিদার দাঁড়াত। করিম সবসময় দশ মিনিট আগে আসত। সে দেরি করে না। দেরি করলে শিফট ফেলে যেতে হয়, শিফট ফেললে মজুরি কাটে।

করিমের কাজ ছিল স্পিনিং সেকশনে।

কাঁচা পাট আসত বেলিং সেকশন থেকে। ভেজা, তেল মাখানো, নরম করা। সেই পাট ঢোকাতে হতো স্পিনিং মেশিনে। মেশিনটা বিশাল, ব্রিটিশ আমলের। ডান্ডি থেকে আনা। ১৯৫৫ সালে বসানো। লোহার চাকা ঘুরত, সুতা বের হতো অন্য দিক দিয়ে। পাটের আঁশ পাকিয়ে পাকিয়ে সুতা হতো। সেই সুতা দিয়ে বস্তা হতো, চটের কাপড় হতো, দড়ি হতো।

করিম মেশিনের সাথে কথা বলত। না, পাগল না। শব্দ এত বেশি ছিল যে মানুষের সাথে কথা বলা যেত না। মেশিনের ঘটঘট আওয়াজ, চাকার ঘূর্ণন, মোটরের গুনগুন। এই শব্দের মধ্যে করিম মেশিনের ভাষা শিখেছিল। কোন শব্দ মানে সবকিছু ঠিক আছে। কোন শব্দ মানে বিয়ারিং শেষ হচ্ছে। কোন শব্দ মানে সুতা জড়িয়ে গেছে। সে কান পেতে শুনত। হাত দিয়ে কাঁপন অনুভব করত। মেশিন তার কাছে জীবন্ত ছিল।

তিরিশ বছর। ১৯৯০ থেকে ২০২০। তিরিশটা বর্ষা, তিরিশটা শীত, তিরিশটা গরম। করিম মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছে।

মিল বন্ধ হলো ২০২০ সালে।

সরকার বলল, "পুনর্গঠন।" শব্দটা সুন্দর। পুনর্গঠন মানে পুনর্নির্মাণ, নতুন করে গড়া। কিন্তু শ্রমিকদের কাছে পুনর্গঠন মানে বন্ধ। পুনর্গঠন মানে তালা। পুনর্গঠন মানে পাঁচশো শ্রমিক রাস্তায়।

একদিন সকালে সাইরেন বাজল না। গেট বন্ধ। তালা ঝুলছে। চৌকিদার নেই। শ্রমিকরা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। কেউ কাঁদছে, কেউ চুপ, কেউ গালি দিচ্ছে সরকারকে।

করিম গেটের তালার দিকে তাকিয়ে রইল। তালাটা নতুন। চকচক করছে। মিলের ভেতরে মেশিনগুলো বসে আছে। নিশ্চুপ। করিমের মেশিনও। সে ভাবল, মেশিনটা কি জানে সে আর আসবে না? মেশিন জানে না। মেশিন অপেক্ষা করে না।

পাঁচশো শ্রমিক। পাঁচশো পরিবার। দুই হাজার মানুষ। রাতারাতি আয় শূন্য।

করিমের দক্ষতা: স্পিনিং মেশিন অপারেশন।

পঞ্চান্ন বছর বয়সে এটাই সে জানে। এটাই সে পারে। এটাই সে তিরিশ বছর ধরে করেছে। এখন এই দক্ষতা দিয়ে কী হবে?

খুলনায় অন্য কোনো পাটকল নেই যেটা চালু আছে। ঢাকায়ও পাটকলগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে। পাট শিল্প মরে যাচ্ছে। প্লাস্টিক এসেছে, পলিপ্রোপিলিন এসেছে, সিনথেটিক ফাইবার এসেছে। পাটের বস্তার জায়গায় প্লাস্টিকের বস্তা। পাটের দড়ির জায়গায় নাইলনের দড়ি।

করিম চাকরি খুঁজল। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে গেল। বললেন, "আমি মেশিন চালাতে পারি।"

"কোন মেশিন?"

"স্পিনিং মেশিন। পাটের।"

"আমাদের সেলাই মেশিন। আপনার বয়স কত?"

"পঞ্চান্ন।"

লোকটা আর কিছু বলল না। সেটাই উত্তর।

করিম একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে গেল। গার্ড হিসেবে। "বয়স বেশি, চাই না।" চায়ের দোকানে কাজ চাইল। "তোমার হাত দিয়ে কাপ ধরতে পারবে? আঙুল তো বাঁকা।"

করিমের বাঁকা আঙুলটা সে মিলের জন্য হারিয়েছে। এখন সেই বাঁকা আঙুলই তাকে কাজ থেকে বাদ দিচ্ছে।

পেনশন। সরকার বলেছিল পেনশন দেবে। তিরিশ বছরের চাকরি, পেনশন পাওয়ার অধিকার আছে।

ফাইল করল। কাগজপত্র জমা দিল। জাতীয় পরিচয়পত্র, নিয়োগপত্র, সার্ভিস বুক, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কপি। যা যা চেয়েছে সব দিয়েছে।

"প্রসেস হচ্ছে।"

এক বছর পর গেল। "প্রসেস হচ্ছে।"

দুই বছর পর গেল। "ফাইলটা খুঁজে পাচ্ছি না। আবার জমা দেন।"

আবার জমা দিল। আবার কাগজপত্র। এবার সার্ভিস বুকের ফটোকপি চাইল। সার্ভিস বুকটা জীর্ণ, অনেক পাতা ছিঁড়ে গেছে। ফটোকপি করাতে গেলে দোকানদার বলল, "এত পুরোনো কাগজ। পড়া যাচ্ছে না।"

তিন বছর হয়ে গেল। পেনশন আসেনি। করিম প্রতি মাসে উপজেলা অফিসে যায়। বাসে। বাসের ভাড়া চল্লিশ টাকা, যাওয়া-আসা আশি। প্রতি মাসে আশি টাকা খরচ করে শোনে, "আসবে। ধৈর্য ধরেন।"

করিম ধৈর্য ধরেছে। তিরিশ বছর মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে ধৈর্য শিখেছে। কিন্তু পেটে ক্ষুধা ধৈর্য মানে না।

করিম এখন ভ্যান চালায়।

খুলনা শহরে। সবজি বাজার থেকে সবজি তুলে দোকানে দোকানে পৌঁছে দেয়। ভ্যানটা তার না, ভাড়া নেওয়া। দিনে দুইশো টাকা ভাড়া। যা কামাই করে তার থেকে দুইশো বাদ দিলে হাতে তিনশো-চারশো থাকে। কখনো পাঁচশো। কখনো দুইশোই থাকে না।

ভ্যানে পাঁচশো কেজি সবজি তোলা হয়। আলু, পেঁয়াজ, বেগুন, লাউ। করিম টানে। খুলনার রাস্তায়, গরমে, বৃষ্টিতে, কাদায়। যে হাত তিরিশ বছর স্পিনিং মেশিন চালিয়েছে, সেই হাত এখন ভ্যানের হাতল ধরে।

দুটো কাজের মধ্যে মিল একটাই: দুটোতেই শরীর খাটে।

পার্থক্য হলো, মেশিন চালাতে দক্ষতা লাগত। ভ্যান চালাতে শুধু জোর লাগে। করিমের কাছে দক্ষতা ছিল। সেটা অকেজো হয়ে গেছে। জোর আছে এখনো, কিন্তু কত দিন থাকবে? পঞ্চান্ন বছরের শরীর। হাঁটুতে ব্যথা। কোমরে ব্যথা। বাঁকা আঙুলে ব্যথা।

করিমের বউ আমেনা সেলাই করে। পাড়ায় কিছু অর্ডার পায়। মাসে দুই-তিন হাজার। ছেলে ফরিদ ঢাকায় গেছে, গার্মেন্টসে কাজ করে। মাসে পাঁচ হাজার পাঠায়। মেয়ে রুবিনা স্কুল শেষ করতে পারেনি, বিয়ে হয়ে গেছে।

করিমের একটা ঘর আছে মিলের কোয়ার্টারে। কিন্তু মিল বন্ধ, কোয়ার্টার থেকে উচ্ছেদ নোটিশ এসেছে। "সরকারি সম্পত্তি, অনধিকার প্রবেশ।" তিরিশ বছর এখানে থেকেছে, এখন অনধিকার।

আমেনা বলে, "কোথায় যাব?"

করিম বলে, "দেখা যাবে।"

দেখা যাবে। এই দুটো শব্দ দিয়ে করিম তিন বছর ধরে চলছে। পেনশন? দেখা যাবে। বাসা? দেখা যাবে। ভবিষ্যৎ? দেখা যাবে।

মিলের সামনে দিয়ে যেতে হয় প্রতিদিন। ভ্যান চালিয়ে।

বিশাল গেট। মরচে ধরা। তালা এখনো আছে, তবে তালাটাও মরচে ধরেছে। দেয়ালে ঘাস গজিয়েছে। ফাটল ধরেছে কংক্রিটে। চিমনি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ধোঁয়া নেই। একসময় এই চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া বের হতো, খালিশপুরের আকাশ ধোঁয়ায় ঢাকা থাকত। শ্রমিকরা সেই ধোঁয়া নিঃশ্বাসে টানত। ফুসফুসে জমা হতো। অনেকে মারা গেছে ফুসফুসের রোগে। কিন্তু ধোঁয়া মানে কাজ। ধোঁয়া মানে জীবিকা। ধোঁয়া বন্ধ মানে সব বন্ধ।

করিম ভ্যান চালাতে চালাতে মিলের দিকে তাকায়। ভেতরে তার মেশিন আছে। ধুলো পড়ছে তার ওপরে। মরচে ধরছে। ইঁদুর বাসা বানাচ্ছে। সেই মেশিন যেটা করিমের হাতের স্পর্শে কাঁপত, সুতা বের করত, পাটকে সোনায় রূপান্তর করত।

পাট সোনালি আঁশ। স্কুলের বইয়ে লেখা থাকে। করিম এই কথা জানে। কিন্তু সে জানে আরেকটা কথা যেটা স্কুলের বইয়ে লেখা নেই। সোনালি আঁশের শ্রমিকদের ফেলে দেওয়া হয় পাটের আঁশের মতোই। কাজ শেষ হলে ফেলে দাও।

একদিন করিম ভ্যানে পাঁচশো কেজি আলু তুলে টানছে। ডিসেম্বরের সকাল। শীত। কুয়াশা। রাস্তায় আলো কম। একটা ট্রাক পাশ দিয়ে গেল, হাওয়ায় করিমের গামছা উড়ে গেল।

করিম থামল। গামছা তুলল। ভ্যানের হাতলে হাত রাখল। দাঁড়িয়ে রইল একটু। নিঃশ্বাস নিল।

তার পেছনে পাঁচশো কেজি আলু। তার সামনে খুলনা শহরের রাস্তা। তার ডানদিকে পাটকলের চিমনি, ধোঁয়াহীন, নিঃশব্দ।

করিম টানতে শুরু করল। পা ফেলল একটার পর একটা। ভ্যানের চাকা ঘুরল। আলু নড়ল।

এই হাত। এই করিমের হাত। যে হাত তিরিশ বছর যন্ত্রপাতি চালিয়েছে, ব্রিটিশ আমলের মেশিনের প্রতিটা বাদাম-বোল্ট চিনত, চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারত কোন বিয়ারিং বদলাতে হবে। এই হাত এখন পাঁচশো কেজি সবজি টানে।

করিম টানে। কারণ থামলে পেট চলে না। কারণ পেনশন আসেনি। কারণ পঞ্চান্ন বছরে নতুন কিছু শেখার সুযোগ নেই। কারণ পাট মরে গেছে, আর পাটের সাথে করিমও।

১০

সন্ধ্যায় করিম ভ্যান জমা দিয়ে বাড়ি ফেরে। কোয়ার্টারের ঘরটা ছোট, অন্ধকার। বিদ্যুৎ আছে, তবে লোডশেডিং যায়। মোমবাতি জ্বালায় আমেনা।

মোমবাতির আলোতে করিম দেয়ালে ঝোলানো ছবিটার দিকে তাকায়। মিলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ছবি। ২০১০ সাল। করিম দড়ি টানাটানিতে জিতেছিল। ছবিতে সে হাসছে। তার দলের পাঁচজন। সবাই মিলের শ্রমিক। সবার গায়ে নীল জার্সি, মিলের নাম লেখা।

সেই পাঁচজনের মধ্যে রহমান মারা গেছে, হার্ট অ্যাটাকে। মজিদ ঢাকায় গেছে, রিকশা চালায়। বাবুল গ্রামে ফিরে গেছে, চাষবাস করে। আমজাদ কোথায় গেছে কেউ জানে না।

পাঁচজন। পাঁচ দিকে ছিটকে গেছে। মিলের তালা তাদের ছিটকে দিয়েছে।

করিম মোমবাতি নিভিয়ে দেয়। অন্ধকারে শোয়। আমেনা পাশে শুয়ে আছে। দুজনেই চুপ। কিছু বলার নেই। যা বলার তিন বছরে বলা হয়ে গেছে।

করিমের কানে একটা শব্দ বাজে। মেশিনের শব্দ। ঘটঘট। ঘটঘট। তিরিশ বছরের শব্দ। সেটা কানে থেকে গেছে। ডাক্তার বলে টিনিটাস, কারখানার আওয়াজে কানের ক্ষতি। করিম বলে, মেশিন ডাকছে। মেশিন তাকে ডাকছে। সে যেতে পারে না।

রাতে করিম স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে মিল চালু আছে। সাইরেন বাজছে। সে গেটে দাঁড়িয়ে আছে। ইউনিফর্ম পরা। সবকিছু আগের মতো। সে ঢুকছে। মেশিনের সামনে দাঁড়াচ্ছে। পাট ঢোকাচ্ছে। সুতা বের হচ্ছে।

ঘুম ভাঙে। ভোর হয়নি এখনো। কোয়ার্টারের বাইরে রাস্তায় একটা কুকুর ডাকছে। করিম উঠে বসে। হাত দুটো দেখে। অন্ধকারে দেখা যায় না, কিন্তু সে জানে হাত দুটো আছে। বাঁকা আঙুলসহ।

আজও ভ্যান টানতে হবে। করিম ওঠে।