চিংড়ি ঘেরের শ্রমিক

আমি সারাদিন চিংড়ি ধরি। রাতে ডাল-ভাত খাই।

পর্ব ৬৪ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

হালিমার পা দুটো সাদা।

সাদা বলতে রোগা সাদা না। নুনের সাদা। লবণ পানিতে আট ঘণ্টা দাঁড়ালে চামড়া এমন হয়। ফুলে যায়। চামড়ার নিচের রঙ বের হয়ে আসে। তারপর শুকোলে ফাটে। ফাটলে চুলকায়। চুলকালে ঘা হয়। ঘা শুকোয় না, কারণ পরদিন আবার লবণ পানিতে নামতে হয়।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর। সমুদ্র থেকে ত্রিশ কিলোমিটার ভেতরে, কিন্তু সমুদ্র এখানেও এসে গেছে। লবণ পানি ঢুকেছে খালে, নদীতে, মাটিতে। ধানের জমিতে এখন চিংড়ির ঘের। কারণ লবণ পানিতে ধান হয় না, চিংড়ি হয়।

হালিমা এই ঘেরে কাজ করে। বছর সাত হলো। তার আগে সে ধান ক্ষেতে কাজ করত। তার আগে সেই জমিতে তার শ্বশুরের ধান হতো। তার আগে তার শ্বশুরের বাবার। তারপর ঘের মালিকরা এল। জমি ভাড়া নিল। বাঁধ কাটল। লবণ পানি ঢুকিয়ে দিল। ধান শেষ।

হালিমার বয়স পঁয়ত্রিশ। দেখতে পঞ্চাশের মতো।

সকাল পাঁচটায় উঠে হালিমা রান্না করে। ভাত, ডাল। মরিচ ভর্তা। মাছ নেই। মাছ কেনার সামর্থ্য প্রতিদিন নেই। সপ্তাহে একদিন ছোট মাছ কেনে, তাও বাজারের সবচেয়ে সস্তা মাছ।

ছয়টায় বের হয়। খালি পায়ে। জুতো পরে পানিতে নামা যায় না, জুতো নষ্ট হয়। আর জুতো কিনতে টাকা লাগে। তাই খালি পা।

ঘের পনেরো মিনিটের হাঁটা। আল ধরে যেতে হয়। আলের দুই পাশে পানি। লবণ পানি। সকালের রোদে পানিটা চকচক করে। দেখতে সুন্দর। পোস্টকার্ডের মতো। বিদেশি সাংবাদিকরা আসে মাঝে মাঝে, ছবি তোলে, লেখে "সুন্দরবনের পাশে জলজ কৃষি।" ছবিতে সুন্দর দেখায়। ছবিতে হালিমার পায়ের ঘা দেখা যায় না।

ঘেরে পৌঁছলে মালিকের লোক থাকে। তালিকায় নাম দেয়। হালিমা নামে। পানিতে নামে।

পানি হাঁটু পর্যন্ত। কোথাও কোমর পর্যন্ত। ঘেরের মাপ বড়, তিন-চার একর। এক পাশে স্লুইস গেট, যেটা দিয়ে জোয়ারের সময় লবণ পানি ঢোকে। অন্য পাশে জাল পাতা।

হালিমার কাজ: চিংড়ি বাছাই।

জালে যা ওঠে সব চিংড়ি না। কাঁকড়া ওঠে, ছোট মাছ ওঠে, শামুক ওঠে, আবর্জনা ওঠে। হালিমা জাল থেকে চিংড়ি আলাদা করে। সাইজ অনুযায়ী বাছাই করে। বড় চিংড়ি এক ঝুড়িতে, মাঝারি আরেক ঝুড়িতে, ছোট আলাদা। বড় চিংড়ি রপ্তানি হবে। মাঝারি দেশের বাজারে। ছোট ফেলে দেওয়া হবে, অথবা শুঁটকি হবে।

হালিমার হাত দ্রুত চলে। চিংড়ি চেনে চোখ দেখে, হাতে ছুঁয়ে। গলদা, বাগদা, চাকা। কোনটা কত ওজন, কোনটা কোন গ্রেড, সব জানে। এই জ্ঞান কোনো বইয়ে নেই। এটা হাতের জ্ঞান।

আট ঘণ্টা ধরে এই কাজ করে। লবণ পানিতে দাঁড়িয়ে। রোদে। জানুয়ারিতে ঠান্ডা পানি, এপ্রিলে গরম পানি। পানি সবসময় লবণাক্ত।

দিনে পায় একশো পঞ্চাশ টাকা।

মালিকের নাম আনোয়ার সাহেব। ঢাকায় থাকেন। সাতক্ষীরায় আসেন বছরে দুইবার। ঘের দেখেন, হিসাব দেখেন, চলে যান। তাঁর ম্যানেজার গ্রামে থাকে। ম্যানেজারই মজুরি দেয়।

একশো পঞ্চাশ টাকা। হালিমা হিসাব জানে না, কিন্তু একটা জিনিস জানে। সে যে চিংড়ি সারাদিন ধরে বাছাই করে, সেগুলো ঝুড়িতে ভরে ভ্যানে চলে যায় খুলনায়। খুলনা থেকে ঢাকায়। ঢাকা থেকে বিমানে টোকিও, লন্ডন, প্যারিস।

টোকিওতে এক কেজি বাগদা চিংড়ির দাম কত? হালিমা জানে না। তার মেয়ে একদিন কারো ফোনে দেখে এসে বলল, "আম্মা, জাপানে এক কেজি চিংড়ি চল্লিশ ডলার।"

"ডলার কত টাকা?"

"একশো বিশ টাকা।"

"তাইলে চল্লিশ ডলার?"

মেয়ে হিসাব করল। "চার হাজার আটশো টাকা।"

হালিমা চুপ করে রইল। সে দিনে যত চিংড়ি বাছাই করে তার মোট দাম জাপানে লাখ টাকার বেশি। তার মজুরি একশো পঞ্চাশ। সে এক কেজি চিংড়ি কিনতে পারে না। সে সারাদিন চিংড়ি ধরে, রাতে ডাল-ভাত খায়।

এই হিসাব কে করেছে? কে ঠিক করেছে যে হালিমার হাতের কাজের দাম একশো পঞ্চাশ টাকা আর টোকিওর থালায় সেই চিংড়ির দাম পাঁচ হাজার? হালিমা জানে না। জানলেও কিছু বদলাত না।

চামড়ার রোগ প্রথম শুরু হয়েছিল দুই বছর আগে।

পায়ের তলায়। চুলকানি। তারপর লাল দাগ। তারপর ফোস্কা। ফোস্কা ফেটে ঘা। ঘা শুকোয় না। ডাক্তার বলল, "একজিমা। লবণ পানিতে নামবেন না।"

হালিমা বলল, "না নামলে খাব কী?"

ডাক্তার কিছু বলতে পারলেন না। মলম দিলেন। বললেন, "রাতে লাগাবেন। সকালে ধুয়ে ফেলবেন।"

হালিমা মলম লাগায় রাতে। সকালে ধোয়। তারপর লবণ পানিতে নামে। মলমের কাজ আট ঘণ্টা লবণ পানিতে শূন্য হয়ে যায়।

হাতেও শুরু হয়েছে। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ছত্রাক। সাদা সাদা দাগ। চুলকায়। নখ হলুদ হয়ে যাচ্ছে। চামড়া উঠে যাচ্ছে হাতের তালু থেকে। গোসলের সময় হালিমা নিজের হাত দেখে। হাত দুটো তার মনে হয় অন্যের।

ঘেরের অন্য মেয়েদেরও একই অবস্থা। ফাতেমার পায়ে ঘা শুকোয় না তিন মাস ধরে। রেহানার হাতে চর্মরোগ ছড়িয়েছে কব্জি পর্যন্ত। নাসিমার চোখ লাল থাকে সারাদিন, লবণ পানির ছিটা চোখে যায়।

কেউ ডাক্তারে যায় না। ডাক্তারের ফি তিনশো টাকা। দুই দিনের মজুরি। ওষুধ আরো পাঁচশো। পাঁচ দিনের মজুরি। মোট সাত দিন কাজ করে একদিনের চিকিৎসা।

হালিমার স্বামী জব্বার রিকশা চালায়। শ্যামনগর বাজারে। দিনে দুইশো-তিনশো টাকা আসে। দুজনে মিলে চারশো-পাঁচশো। দুটো ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে সুমি, ক্লাস সেভেন। ছোট ছেলে সাগর, ক্লাস থ্রি।

সুমি পড়ে ভালো। টিচার বলেছেন, "মেয়ে বুদ্ধিমান। পড়াশোনা চালিয়ে যান।" হালিমা চালাতে চায়। কিন্তু ক্লাস এইটের পরে কোচিং লাগবে। কোচিংয়ে মাসে দুই হাজার। হালিমার পুরো মাসের আয়ে সংসার চলে কোনোমতে। দুই হাজার বাড়তি কোথা থেকে আসবে?

সুমি যদি না পড়ে, সুমিও ঘেরে আসবে। সুমির পায়েও ঘা হবে। সুমির হাতেও ছত্রাক ধরবে।

হালিমা এটা ভাবতে চায় না। কিন্তু ভাবনা আসে। রাতে শোয়ার সময় আসে। পায়ের ঘা জ্বলে, আর ভাবনা জ্বলে।

একটা জিনিস হালিমা দেখেছে। বছরের পর বছর দেখছে।

ঘেরের চারপাশে যে জমি ছিল, যেখানে একসময় আমন ধান হতো, সেই জমিতে এখন কিছু হয় না। লবণ পানি মাটিতে ঢুকে গেছে। মাটি সাদা হয়ে গেছে। ঘাস গজায় না। গাছ মরে যায়। নারকেল গাছ, সুপারি গাছ, আম গাছ, একে একে শুকিয়ে গেছে।

মিষ্টি পানির পুকুর ছিল গ্রামে। সেই পুকুরেও লবণ ঢুকেছে। গোসলের পানি, খাওয়ার পানি, সব সমস্যা। এখন টিউবওয়েলের পানি খায়, কিন্তু সেই পানিতেও আয়রনের স্বাদ। কোনো কোনো টিউবওয়েলে আর্সেনিক।

ঘের মালিকরা টাকা কামাচ্ছে। চিংড়ি রপ্তানি হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। সরকার খুশি। কিন্তু মাটি মরছে। জমি মরছে। গ্রাম মরছে।

হালিমা এসব বড় বড় কথা বোঝে না। সে শুধু বোঝে, আগে তার শ্বশুরবাড়ির উঠোনে তুলসী গাছ ছিল। এখন গাছটা মরে গেছে। মাটিতে লবণ ধরেছে। তুলসী লবণ সহ্য করতে পারে না।

বিকেল চারটায় ঘের থেকে ওঠে হালিমা।

পা ধোয়। পুকুরের পানিতে। পুকুরের পানিতেও লবণ, তবু ঘেরের চেয়ে কম। পায়ের ঘা জ্বলে ওঠে ধোয়ার সময়। হালিমা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে। মুখ শক্ত রাখে। কোনো শব্দ করে না। পাশে অন্য মেয়েরাও ধুচ্ছে। কেউ কিছু বলে না। সবাই জানে। সবার একই ব্যথা।

বাড়ি ফিরে রান্না করে। ভাত, ডাল। আজ বাজার থেকে জব্বার একটু সবজি এনেছে। পটল। পটলের তরকারি রান্না করল।

সুমি পড়ছে। সাগর খেলছে। জব্বার রিকশা নিয়ে আবার বের হবে, সন্ধ্যার ভাড়া ধরবে।

হালিমা রান্না করতে করতে হাতের দিকে তাকায়। ছত্রাকের দাগ ছড়াচ্ছে। নতুন একটা দাগ কব্জির কাছে। চুলকায়। চুলকায় না। মলম লাগাবে রাতে। সকালে আবার পানিতে নামবে।

এটাই চক্র। চিংড়ি, লবণ, ঘা, মলম, ঘুম, চিংড়ি। বৃত্ত। বৃত্তের বাইরে যাওয়ার পথ হালিমা দেখে না।

জব্বার একদিন বলল, "ঘের ছেড়ে অন্য কাজ কর।"

"কী কাজ?"

"কাপড় সেলাই। পাড়ায় অনেকে করে।"

"মেশিন কোথায়? মেশিন কিনতে পাঁচ হাজার লাগে। পাঁচ হাজার কোথায়?"

জব্বার চুপ হয়ে গেল। পাঁচ হাজার কোথায়? দুজনের আয়ে সংসার চলে কোনোমতে। সঞ্চয় শূন্য। ধার আছে দুই হাজার। সেলাই মেশিন কেনা স্বপ্ন, বাস্তব না।

হালিমা আবার ঘেরে গেল। পরদিন। তার পরদিন। তার পরদিন। প্রতিদিন।

ঘের ছাড়ার উপায় নেই কারণ ঘের ছাড়লে খাবে কী। ঘেরে থাকলে শরীর খাবে। দুটো খারাপের মধ্যে একটা বেছে নিতে হয়। হালিমা শরীর খাওয়াটা বেছে নিয়েছে। পেটের ক্ষুধা চামড়ার ঘায়ের চেয়ে জরুরি।

১০

রাতে হালিমা শোয়ার আগে সুমির পাশে বসে।

সুমি ঘুমিয়ে গেছে। বইটা বুকের ওপর খোলা আছে। হালিমা বইটা সরিয়ে রাখল। সুমির হাতের দিকে তাকাল। নরম হাত। পরিষ্কার চামড়া। কোনো ঘা নেই, কোনো ছত্রাক নেই।

হালিমা চায় এই হাত এমনই থাকুক। এই হাত যেন কলমই ধরুক, চিংড়ি না।

কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মাঝে একশো পঞ্চাশ টাকা। সেটুকুই দূরত্ব। সেটুকুই সমুদ্র।

বাইরে বাতাস বইছে। দক্ষিণের বাতাস। লবণের গন্ধ। সুন্দরবনের দিক থেকে আসে। একসময় এই বাতাসে মধুর গন্ধ থাকত, গোলপাতার গন্ধ থাকত। এখন শুধু লবণ। সবকিছু লবণ হয়ে যাচ্ছে।

হালিমা চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। পায়ের ঘা জ্বলছে। মলম লাগাতে ভুলে গেছে। উঠবে না। ক্লান্ত। আগামীকাল সকালে আবার পাঁচটায় উঠতে হবে। ভাত বসাতে হবে। ডাল রাঁধতে হবে। তারপর খালি পায়ে হাঁটতে হবে ঘেরে। পানিতে নামতে হবে। চিংড়ি ধরতে হবে।

টোকিওতে কেউ চিংড়ি খাবে। থালায় সাজানো। লেবু কাটা পাশে। ওয়াসাবি। সয় সস। সেই মানুষটা জানবে না যে এই চিংড়ি হালিমার হাত দিয়ে গেছে। জানবে না যে সেই হাতে ছত্রাক আছে। জানবে না যে সেই হাতের মালিক দিনে একশো পঞ্চাশ টাকা পায়।

চিংড়ি টোকিওতে যাবে। হালিমা সাতক্ষীরায় থাকবে। এটাই নিয়ম। এই নিয়ম কে লিখেছে কেউ জানে না। কিন্তু নিয়ম চলছে। হালিমার আগেও চলেছে। হালিমার পরেও চলবে।