চা বাগানের শ্রমিক
চার প্রজন্মে আমাদের কিছু বদলায়নি। শুধু মালিক বদলেছে।
১
মঙ্গলীর পিঠ বাঁকা।
জন্ম থেকে না। বছরের পর বছর ঝুঁকে চা পাতা তুলতে তুলতে বাঁকা হয়েছে। তার মায়ের পিঠও বাঁকা ছিল। তার ঠাকুমারও। তিন প্রজন্মের নারী, তিনটে বাঁকা পিঠ। চা গাছ নিচু, তাই পিঠ ঝুঁকতে হয়। সারাদিন ঝুঁকলে পিঠ একদিন সোজা হতে ভুলে যায়।
মঙ্গলী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে থাকে। ন্যাশনাল টি কোম্পানির বাগানে। বাগান বলতে শুধু চা গাছের সারি না। বাগান মানে একটা জগৎ। এই জগতের ভেতরে মঙ্গলীর জন্ম হয়েছে, এই জগতের ভেতরে সে মরবে। বাগানের বাইরে তার কিছু নেই। জমি নেই, বাড়ি নেই, ঠিকানা নেই। বাগানই তার দেশ।
মঙ্গলীর বয়স পঁয়তাল্লিশ। চতুর্থ প্রজন্ম। তার প্রপিতামহ এসেছিল ব্রিটিশ আমলে। ছোটনাগপুর থেকে। বিহার থেকে। ওড়িশা থেকে। ঠিক কোথা থেকে সে জানে না। কেউ জানে না। ব্রিটিশরা বলেছিল, "চা বাগানে কাজ আছে। খাওয়া-থাকা ফ্রি। আসো।" তারা এসেছিল। ট্রেনে, গরুর গাড়িতে, পায়ে হেঁটে। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে। তারপর আর ফেরেনি।
২
সকাল ছয়টায় সাইরেন বাজে।
মঙ্গলী ওঠে। ঘরটা ছোট। একটা ঘর, মাটির দেয়াল, টিনের চাল। বাগান কোম্পানি দিয়েছে। বিনা ভাড়ায়। কিন্তু এই ঘর মঙ্গলীর না। এই ঘরের মালিক বাগান কোম্পানি। মঙ্গলী চাকরি ছাড়লে ঘর ছাড়তে হবে। ঘরের সাথে চাকরি বাঁধা, চাকরির সাথে ঘর।
বাগানে স্কুল আছে। বাগান কোম্পানির স্কুল। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। তার পর? তার পর বাইরের স্কুলে যেতে হয়। বাইরের স্কুল তিন কিলোমিটার দূরে। বাসের ভাড়া লাগে। বইয়ের খরচ লাগে। বেশিরভাগ বাচ্চা চতুর্থ শ্রেণির পর আর যায় না।
বাগানে হাসপাতাল আছে। একটা ঘর। একজন কম্পাউন্ডার। ডাক্তার আসেন সপ্তাহে একদিন। প্যারাসিটামল দেন। বাকি সব রোগে বাইরে যেতে হয়। বাইরে মানে শ্রীমঙ্গল সদর। সেখানে যেতে সময় লাগে, টাকা লাগে, ছুটি লাগে।
বাগান কোম্পানি সবকিছু দেয়: ঘর, স্কুল, হাসপাতাল। কিন্তু সবকিছুই নিম্নমানের। যথেষ্ট যেন শ্রমিক বেঁচে থাকে। যথেষ্ট যেন কাজ করতে পারে। এর বেশি না।
৩
সকাল সাতটায় মঙ্গলী বাগানে ঢোকে।
মাথায় ডালা। পিঠে বড় ঝুড়ি, বাঁশের, দড়ি দিয়ে কাঁধে বাঁধা। হাত দুটো চা গাছের ডগায়। দুটো পাতা আর একটা কুঁড়ি। "দুই পাতা এক কুঁড়ি।" এটাই নিয়ম। এটাই মন্ত্র। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছে। মা বলত, "দুই পাতা এক কুঁড়ি। বেশি ছিঁড়লে চা খারাপ হয়। কম ছিঁড়লে ওজন কম হয়।"
মঙ্গলীর হাত দ্রুত চলে। বাম হাতে ডাল ধরে, ডান হাতে পাতা তোলে। টুক। টুক। টুক। একটার পর একটা। ঝুড়িতে পড়ে। ঝুড়ি ভারী হয়। পিঠের বোঝা বাড়ে।
কোটা: তেইশ কেজি। দিনে তেইশ কেজি চা পাতা তুলতে হবে। কম তুললে মজুরি কাটবে। বেশি তুললে? বেশি তুললে কোনো বোনাস নেই। আগামীকাল কোটা বাড়ানো হবে না। শুধু আজকের কোটা পূরণ হবে। আর আগামীকাল আবার তেইশ কেজি।
মঙ্গলী দিনে তেইশ কেজি তোলে। কখনো চব্বিশ। কখনো পঁচিশ। বেশি তুলে কী লাভ? কোনো লাভ নেই। কিন্তু তুলে ফেলে। কারণ হাত থামাতে পারে না। হাত নিজে থেকে চলে। পেশি মনে রেখেছে।
৪
দুপুরে বিশ্রাম। আধা ঘণ্টা।
মঙ্গলী গাছের ছায়ায় বসে। ভাত খায়। অ্যালুমিনিয়ামের ডাবায় ভাত, একটু তরকারি। চা বাগানের শ্রমিক চা খায়, কিন্তু সেই চা বাগানের চা না। বাজারের সস্তা চা। বাগানের চা রপ্তানি হয়, অথবা ঢাকার বড় বড় দোকানে যায়। শ্রমিকদের জন্য নিচু গ্রেডের ডাস্ট টি দেওয়া হয়, মাসে আধা কেজি।
মঙ্গলী ভাত খেতে খেতে বাগানের দিকে তাকায়। সবুজ। যতদূর চোখ যায় সবুজ। ঢেউয়ের মতো চা গাছের সারি। দেখতে সুন্দর। পর্যটকরা আসে, ছবি তোলে, বলে "কী সুন্দর!" সুন্দর। কিন্তু এই সবুজের প্রতিটা পাতায় মঙ্গলীর হাতের ছাপ আছে। পর্যটকরা সেটা দেখে না।
পাশে রাধা বসে আছে। রাধাও চা শ্রমিক। বয়স পঞ্চাশ। রাধার মেয়ে চা শ্রমিক। রাধার মেয়ের মেয়েও হবে চা শ্রমিক। এটা বংশপরম্পরা। রাজপরিবারে যেমন রাজা হওয়া বংশপরম্পরা, চা বাগানে শ্রমিক হওয়া বংশপরম্পরা। পার্থক্য শুধু মুকুট আর ঝুড়িতে।
৫
মঙ্গলীর মজুরি দিনে একশো সত্তর টাকা।
২০২৪ সালের হার। এর আগে ছিল একশো বিশ। তার আগে পঁচানব্বই। শ্রমিকরা আন্দোলন করেছিল ২০২৩ সালে। রাস্তায় নেমেছিল। স্লোগান দিয়েছিল। পুলিশ এসেছিল। লাঠিচার্জ হয়েছিল। তারপর সরকার হস্তক্ষেপ করেছিল। মজুরি বাড়িয়ে একশো সত্তর করেছিল।
একশো সত্তর টাকা।
মঙ্গলী হিসাব করে। মাসে ছাব্বিশ দিন কাজ করলে চার হাজার চারশো বিশ টাকা। ছুটির দিনে কোনো মজুরি নেই। অসুস্থ হলে কোনো মজুরি নেই। বৃষ্টিতে কাজ বন্ধ থাকলে কোনো মজুরি নেই। বাস্তবে মাসে তিন-সাড়ে তিন হাজার আসে।
মঙ্গলীর স্বামী বুধন। সেও চা শ্রমিক। তার মজুরিও একশো সত্তর। দুজনে মিলে সাত হাজার। তিনটা বাচ্চা। বড় ছেলে সুরজ, আঠারো, বাগানেই কাজ ঢুকেছে। মেয়ে লক্ষ্মী, পনেরো, স্কুলে যায়। ছোট ছেলে কালু, দশ।
সাত হাজার টাকায় পাঁচজনের সংসার। চালের দাম কেজি ষাট টাকা। দিনে তিন কেজি চাল লাগে। মাসে নব্বই কেজি। পাঁচ হাজার চারশো শুধু চালে। বাকি থাকে ষোলোশো টাকা। তেল, নুন, মরিচ, ডাল, সবজি, সাবান, কেরোসিন।
হিসাব মেলে না। কোনোদিন মেলেনি। মঙ্গলীর মায়ের সময়ও মেলেনি। তার ঠাকুমার সময়ও না।
৬
বাগানের বাইরে মঙ্গলীর কিছু নেই।
জমি নেই। বাগানের ভেতরে যে ঘরে থাকে সেটা বাগানের। বাগানের বাইরে এক ইঞ্চি মাটি নেই তার নামে। কোনো দলিল নেই। কোনো সম্পত্তি নেই।
মঙ্গলীর প্রপিতামহ যখন এসেছিল, তাকে বলা হয়েছিল, "থাকবে, খাবে, কাজ করবে।" চুক্তি ছিল মৌখিক। কাগজ ছিল না। প্রপিতামহ স্বাক্ষর করতে জানত না। ব্রিটিশ সাহেব বলেছিল, "আঙুলের ছাপ দাও।" দিয়েছিল। কোন কাগজে? সে জানত না। কী লেখা ছিল? সে পড়তে পারত না।
চার প্রজন্ম পরে মঙ্গলী এখনো আঙুলের ছাপ দেয়। হাজিরা খাতায়। মজুরি খাতায়। সে সই করতে পারে, নাম লিখতে পারে, কিন্তু আঙুলের ছাপই দেয়। অভ্যাস।
বাগান থেকে বের হয়ে কোথায় যাবে? কোনো গ্রাম তার না। কোনো শহর তার না। জাতীয় পরিচয়পত্রে ঠিকানা লেখা আছে: "ন্যাশনাল টি কোম্পানি বাগান, শ্রীমঙ্গল।" বাগানই ঠিকানা। বাগানই পরিচয়।
৭
বিকেল চারটায় ওজন হয়।
সারদিনের তোলা পাতা নিয়ে মঙ্গলী লাইনে দাঁড়ায়। সামনে একটা বড় দাঁড়িপাল্লা। সুপারভাইজার ওজন করে। খাতায় লেখে।
"মঙ্গলী। তেইশ কেজি দুইশো গ্রাম।"
কোটা পূরণ। মঙ্গলী সরে যায়। পেছনে রাধা। রাধার ঝুড়িতে কম।
"রাধা। উনিশ কেজি।"
সুপারভাইজার মুখ শক্ত করল। "চার কেজি কম।"
রাধা বলল, "শরীর ভালো নাই। পিঠে ব্যথা।"
"মজুরি কাটবে।"
রাধা কিছু বলল না। মাথা নামিয়ে চলে গেল।
মঙ্গলী দেখল। রাধার পিঠ আরো বাঁকা হয়ে গেছে আজ। রাধার বয়স পঞ্চাশ। আর কত বছর তুলবে? পঁয়ষট্টি? সত্তর? চা বাগানে অবসরের বয়স নেই। যত দিন পারো কাজ করো। না পারলে থামো। থামলে ঘর ছাড়ো। ঘর ছাড়লে কোথায় যাবে?
কোথাও না। বাগানের পাশের ঝোপে। রাস্তার ধারে। কেউ কেউ ভিক্ষা করে শ্রীমঙ্গল বাজারে। যারা সারাজীবন চা তুলেছে, তারা শেষ বয়সে হাত পাতে।
৮
মঙ্গলী একটা কথা বলে মাঝে মাঝে। বুধনকে বলে। রাধাকে বলে। নিজেকে বলে।
"আমার পূর্বপুরুষ ব্রিটিশ আমলে এসেছিল। চার প্রজন্মে আমাদের কিছু বদলায়নি। শুধু মালিক বদলেছে।"
এটা সত্য। ব্রিটিশ গেছে, পাকিস্তান গেছে, বাংলাদেশ হয়েছে। বাগানের মালিক বদলেছে। ব্রিটিশ কোম্পানি থেকে পাকিস্তানি মালিক, তারপর বাংলাদেশি মালিক। কিন্তু শ্রমিকের জীবন বদলায়নি। মজুরি বেড়েছে, তবে মুদ্রাস্ফীতিও বেড়েছে। ঘর সেই একই। স্কুল সেই একই। হাসপাতাল সেই একই। কোটা বেড়েছে, কিন্তু পিঠ সেই একইভাবে ঝোঁকে।
মঙ্গলীর ছেলে সুরজ বাগানে ঢুকেছে। পঞ্চম প্রজন্ম। সুরজ বলে, "আমি থাকব না, আম্মা। ঢাকায় যাব।" মঙ্গলী বলে, "যা।" কিন্তু জানে সুরজ যাবে না। কোথায় যাবে? কী করবে? ঢাকায় ঘর নেই, চেনা মানুষ নেই, পুঁজি নেই। বাগানে অন্তত ঘর আছে, খাবার আছে, পরিচিত মুখ আছে।
বাগান ছাড়া মঙ্গলীর পরিবার বেঁচে থাকতে পারবে না। বাগানে থাকলে বেঁচে থাকবে, কিন্তু বদলাবে না।
এটাকে কী বলে? স্বাধীনতা? দাসত্ব? মঙ্গলী শব্দ দুটোর কোনোটাই ভাবে না। সে শুধু জানে, সকালে উঠতে হয়। পাতা তুলতে হয়। ঘরে ফিরতে হয়। ভাত খেতে হয়। ঘুমোতে হয়। এটুকুই জীবন।
৯
গত বছর বাগানে একটা ঘটনা হয়েছিল।
একজন পর্যটক এসেছিল। বিদেশি। ক্যামেরা হাতে। গাইড সাথে। বাগানের ম্যানেজার তাকে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল। সবুজ টিলা, চা গাছের সারি, কুয়াশা। পর্যটক ছবি তুলছিল।
তারপর সে মঙ্গলীর দিকে ক্যামেরা তাক করল। মঙ্গলী পাতা তুলছিল। পিঠে ঝুড়ি। বাঁকা পিঠ। ঘামে ভেজা চুল। পর্যটক বলল গাইডকে, "আস্ক হার ইফ আই ক্যান টেক আ ফটো।"
গাইড বাংলায় বলল, "আপা, একটা ছবি তুলবে।"
মঙ্গলী কিছু বলল না। কী বলবে? হ্যাঁ বলল না, না-ও বলল না। ছবি উঠে গেল।
পর্যটক চলে গেল। সেই ছবি হয়তো কোনো ইনস্টাগ্রামে আছে, কোনো ট্রাভেল ব্লগে আছে। ক্যাপশনে লেখা থাকবে, "টি গার্ডেন ওয়ার্কার, সিলেট, বাংলাদেশ।" হয়তো হাজার লাইক পেয়েছে। হয়তো কেউ কমেন্ট করেছে, "বিউটিফুল।" হয়তো কেউ লিখেছে, "সো অথেন্টিক।"
মঙ্গলী জানে না। মঙ্গলীর ইনস্টাগ্রাম নেই। মঙ্গলীর ফোন নেই। মঙ্গলী শুধু জানে, সেই পর্যটক একটা ছবি নিয়ে গেছে। বিনিময়ে কিছু দেয়নি। একটা ধন্যবাদও না।
১০
সন্ধ্যায় মঙ্গলী ঘরের সামনে বসে।
চা বানিয়েছে। বাজারের সস্তা চা। দুধ নেই, চিনি একটু। কালো চা। এক কাপ হাতে নিয়ে বসে আছে।
বাগানের ওপর সন্ধ্যা নামছে। টিলার ওপরে চা গাছের সারি অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। কোথাও একটা পাখি ডাকছে। বাতাসে চা পাতার গন্ধ, ভেজা মাটির গন্ধ।
মঙ্গলী চা খায়। চায়ের স্বাদে তেতো লাগে। চিনি কম দিয়েছে। আগামীকাল আবার সকাল ছয়টায় সাইরেন বাজবে। আবার ঝুড়ি পিঠে নেবে। আবার দুই পাতা এক কুঁড়ি তুলবে। আবার তেইশ কেজি।
বুধন ঘরের ভেতর থেকে বলল, "খাবি?"
মঙ্গলী উঠল। ঘরে ঢুকল। ভাত খেল। শুয়ে পড়ল।
পিঠ ব্যথা করছে। বাঁকা পিঠ সোজা করে শুতে পারে না। একপাশে কাত হয়ে শোয়। চোখ বন্ধ। অন্ধকারে চা গাছের সারি ভাসে। সবুজ সারি, অন্তহীন। মঙ্গলী ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুমের মধ্যেও তার হাত নড়ে। টুক। টুক। দুই পাতা এক কুঁড়ি। শরীর ভুলতে পারে না।
বাইরে চাঁদ উঠেছে। চা বাগানের ওপর চাঁদের আলো পড়ে। সবকিছু রুপোলি। সুন্দর। কিন্তু চাঁদ শ্রমিকের মজুরি দেয় না। চাঁদ শুধু আলো দেয়। সেই আলোতে বাগানের সৌন্দর্য দেখা যায়, শ্রমিকের কষ্ট দেখা যায় না।