তামাক চাষি
টাকা আর স্বাস্থ্যের মধ্যে বেছে নিতে বললে গরিব মানুষ সবসময় টাকা বেছে নেয়।
১
শহিদুলের নখ হলুদ। আঙুলের ডগা হলুদ। জামার কলার হলুদ। তামাকের আঠা। ধুলেও যায় না। চামড়ায় ঢুকে গেছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর। শহিদুলের জমি চার বিঘা। পাঁচ বছর আগে ধান চাষ করত। বোরো মৌসুমে বিঘা প্রতি পনেরো মণ ধান। মণ আটশো টাকায় বিক্রি। বিঘায় বারো হাজার। চার বিঘায় আটচল্লিশ হাজার। খরচ বাদে হাতে থাকত কুড়ি হাজার। ছয় মাসের খাটুনিতে কুড়ি হাজার টাকা।
তারপর ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর লোক এল।
গাড়ি নিয়ে এল। শার্ট-প্যান্ট পরা লোক। হাতে ব্যাগ। ব্যাগে ব্রোশার। ব্রোশারে রঙিন ছবি। সুন্দর তামাক গাছ। হাসিমুখ চাষি। টাকার বান্ডিল।
"ভাই, তামাক লাগান। বীজ আমরা দেব। সার আমরা দেব। কীটনাশক আমরা দেব। ফসল আমরা কিনব। দাম গ্যারান্টি।"
শহিদুল শুনল। হিসাব করল। তামাকে বিঘায় ষাট হাজার টাকা আয়। ধানে বারো হাজার। পাঁচ গুণ।
পাঁচ গুণ।
শহিদুল ধান ছেড়ে দিল।
২
তামাক চাষ ধানের মতো না। ধান লাগাও, পানি দাও, সার দাও, অপেক্ষা করো। তামাকে হাত লাগে। প্রতিটা পাতা হাতে তুলতে হয়। নিচের পাতা আগে পাকে, ওপরের পরে। দুই মাস ধরে তোলা চলে। ভোর চারটায় মাঠে যায় শহিদুল। শিশির ভেজা পাতা ভাঙে। আঠা লাগে হাতে। শরীরে। চোখে জ্বালা করে।
তারপর শুকানো।
শহিদুলের উঠোনে একটা শুকানো বার্ন আছে। মাটির দেয়াল, টিনের ছাদ। ভেতরে বাঁশের র্যাকে পাতা সাজানো। নিচে কাঠের আগুন। ধোঁয়া। সাত দিন সাত রাত ধোঁয়া দিতে হয়। তাপমাত্রা ঠিক রাখতে হয়। বেশি হলে পাতা পুড়বে। কম হলে শুকাবে না।
শহিদুল রাতে ঘুমায় না। বার্নের পাশে বসে থাকে। ধোঁয়ার মধ্যে। চোখ লাল হয়ে যায়। ফুসফুসে ধোঁয়া ঢোকে। কাশি হয়।
কিন্তু টাকা আসে। ধানের চেয়ে তিন গুণ, চার গুণ, কখনো পাঁচ গুণ।
৩
শহিদুলের ছেলে ফয়সাল। বয়স আট। মেয়ে তাহমিনা, বয়স পাঁচ।
ফয়সালের হাঁপানি।
কবে থেকে শুরু হয়েছে শহিদুল ঠিক মনে করতে পারে না। তিন বছর, চার বছর, এদিকে সেদিকে। বার্ন বানানোর পর থেকে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, যখন পাতা শুকায়, ফয়সাল রাতে ঘুমাতে পারে না। বুকে শব্দ হয়। শ্বাস টানতে কষ্ট হয়। শহিদুলের বউ রাবেয়া ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে থাকে। পিঠ থাপড়ায়।
মিঠাপুকুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেছে একবার। ডাক্তার বললেন, "অ্যাজমা। ধোঁয়ার কারণে। ধোঁয়া থেকে দূরে রাখেন।"
কীভাবে দূরে রাখবে? বার্ন উঠোনে। ঘর উঠোনে। দূরত্ব বিশ ফুট। ধোঁয়া দেয়াল মানে না।
তাহমিনাও কাশে। এখনো হাঁপানি ধরেনি। কিন্তু কাশে। সকালে কাশে, রাতে কাশে। রাবেয়া বলে, "তাহমিনারও হবে। সময়ের ব্যাপার।"
শহিদুল চুপ থাকে। সে জানে রাবেয়া ঠিক বলছে।
৪
মাটির কথা।
শহিদুল খেয়াল করেছে দ্বিতীয় বছর থেকে। প্রথম বছর ফলন দারুণ ছিল। বিঘায় সত্তর হাজার টাকার তামাক হয়েছিল। দ্বিতীয় বছর একটু কম। তৃতীয় বছর আরো কম। চতুর্থ বছর কোম্পানির লোক এসে বলল, "সার বাড়ান। মাটিতে নাইট্রোজেন কমে গেছে।"
তামাক নাইট্রোজেন খায়। ধানও খায়, কিন্তু তামাক বেশি খায়। ধানের খড় মাটিতে মিশে যায়, কিছুটা ফেরত দেয়। তামাকের কিছু ফেরত দেওয়ার নেই। পাতা সব তুলে নেওয়া হয়। কান্ড শুকিয়ে জ্বালানি হয়। মাটি শুধু দেয়, পায় না।
পঞ্চম বছর। মাটি ধূসর হয়ে গেছে। আগে কালো ছিল, তেলতেলে, কেঁচো ছিল। এখন ধূসর, শুকনো, ফাটা। কেঁচো নেই। কেঁচো চলে গেছে।
কোম্পানি বলে, "আরো সার দিন।" কিন্তু সারের দাম বাড়ছে। কোম্পানির সার আগে ফ্রি ছিল, এখন ভর্তুকি মূল্যে। ভর্তুকি মূল্য বাজার মূল্যের চেয়ে সামান্য কম। সামান্য।
শহিদুল হিসাব করে। তামাকে আয় কমছে। খরচ বাড়ছে। কিন্তু এখনো ধানের চেয়ে বেশি। তাই সে থামে না।
৫
প্রতিবেশী আমিনুল।
আমিনুলের জমি শহিদুলের জমির পাশে। আমিনুল ধান চাষ করে। সবজি করে। লাউ, মিষ্টি কুমড়া, পালং শাক।
আমিনুল শহিদুলের বাড়িতে এল একদিন সন্ধ্যায়। মুখ কালো।
"শহিদুল, তোমার বার্নের ধোঁয়ায় আমার সবজি নষ্ট হচ্ছে।"
শহিদুল জানে। ধোঁয়ায় সালফার ডাই-অক্সাইড থাকে। পাতার ক্লোরোফিল নষ্ট করে। আমিনুলের লাউ গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। ফলন কমছে।
"কী করব আমিনুল ভাই? বার্ন না চালালে তামাক শুকাবে কীভাবে?"
"তোমার জমির ধোঁয়ায় আমাদের ফসল নষ্ট হচ্ছে। এটা তো ঠিক না।"
শহিদুল চুপ। সে কী বলবে? আমিনুল ঠিকই বলছে। কিন্তু তামাক ছেড়ে দিলে শহিদুলের সংসার চলবে কীভাবে? ধানে ফিরে গেলে আয় তিন ভাগের এক ভাগ। ফয়সালের ওষুধের খরচই বের হবে না।
আমিনুল চলে গেল। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটা দেয়াল তৈরি হলো। মাটির দেয়াল না। ধোঁয়ার দেয়াল।
৬
কোম্পানির সিস্টেমটা শহিদুল ধীরে ধীরে বুঝেছে।
বীজ তারা দেয়। কিন্তু সেই বীজ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। বিশেষ জাত। উচ্চ নিকোটিন। শুধু কোম্পানির বীজ চলবে।
সার তারা দেয়। ভর্তুকি মূল্যে। কিন্তু হিসাবে লেখা থাকে। ফসল বিক্রির সময় কেটে রাখে। আগে ফ্রি ছিল, এখন কাটে।
ফসল তারা কেনে। গ্যারান্টি। কিন্তু দাম তারা ঠিক করে। গ্রেডিং তারা করে। পাতার মান যাচাই তারা করে। গ্রেড কমিয়ে দিলে দাম কমে। চাষি আপত্তি করতে পারে না। কোম্পানির গ্রেডিং চূড়ান্ত।
কন্ট্র্যাক্ট ফার্মিং। শব্দটা ইংরেজিতে সুন্দর শোনায়। বাংলায় এর মানে: তুমি শ্রম দাও, ঝুঁকি নাও, জমি দাও, স্বাস্থ্য দাও। আমরা দাম ঠিক করি।
শহিদুল একবার কোম্পানির ফিল্ড অফিসারকে জিজ্ঞেস করেছিল, "আমি যে তামাক বিক্রি করি আশি টাকা কেজিতে, সেটা সিগারেটে কত হয়?"
ফিল্ড অফিসার হেসেছিল। "ভাই, হিসাব করে লাভ নাই।"
শহিদুল পরে নিজে হিসাব করেছে। এক কেজি তামাক থেকে প্রায় এক হাজার সিগারেট হয়। একটা সিগারেট খুচরা দামে দশ টাকা। এক হাজার সিগারেটে দশ হাজার টাকা। চাষি পায় আশি টাকা। কোম্পানি পায় বাকিটা। কাঁচামালের দাম আর খুচরা দামের অনুপাত: এক বনাম একশো পঁচিশ।
৭
রাবেয়া একদিন বলল, "ধানে ফিরে যাও।"
শহিদুল ভাতের থালা থেকে মুখ তুলে তাকাল। রাবেয়ার চোখ লাল। রান্নাঘরের ধোঁয়ায় না, কান্নায়।
"ফয়সালের কী হবে? ডাক্তার বলেছে ধোঁয়া থেকে দূরে রাখতে। আমরা ধোঁয়ার মধ্যে রাখছি।"
"ধানে ফিরে গেলে ফয়সালের ওষুধের টাকা আসবে কোথা থেকে?"
"ওষুধ কেন লাগে? ধোঁয়ার জন্যই তো লাগে। ধোঁয়া না থাকলে ওষুধ লাগবে না।"
শহিদুল ভাবল। রাবেয়ার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু অংক নেই। ধানে ফিরে গেলে আয় কমবে। ফয়সালের হাঁপানি কমবে, কিন্তু সংসার চলবে না। ওষুধ না লাগলেও খাবার লাগবে। স্কুলের খরচ লাগবে। কাপড় লাগবে।
টাকা আর স্বাস্থ্যের মধ্যে বেছে নিতে বললে গরিব মানুষ সবসময় টাকা বেছে নেয়। কারণ স্বাস্থ্যের দাম দিতে টাকা লাগে।
শহিদুল বলল, "আরো দুই বছর। তারপর দেখি।"
রাবেয়া উঠে গেল। সে জানে দুই বছর মানে চিরকাল।
৮
এপ্রিল। তামাক তোলা শেষ। শুকানো শেষ। গাঁটরি বেঁধে কোম্পানির ডিপোতে জমা দিয়েছে শহিদুল।
গ্রেডিং হলো। শহিদুলের তামাকের ষাট শতাংশ গ্রেড-টু পেল। চল্লিশ শতাংশ গ্রেড-থ্রি। গ্রেড-ওয়ান একটাও না।
গ্রেড-টু: আশি টাকা কেজি। গ্রেড-থ্রি: পঞ্চাশ টাকা।
শহিদুলের চার বিঘায় ফলন হয়েছে এক হাজার দুইশো কেজি। ষাট শতাংশ গ্রেড-টু মানে সাতশো কুড়ি কেজি, আশি টাকায়: সাতান্ন হাজার ছশো টাকা। চল্লিশ শতাংশ গ্রেড-থ্রি মানে চারশো আশি কেজি, পঞ্চাশ টাকায়: চব্বিশ হাজার।
মোট: একাশি হাজার ছশো টাকা।
সার, কীটনাশক, বীজের বাকি কেটে রাখল কোম্পানি: আঠারো হাজার।
হাতে পেল: তেষট্টি হাজার ছশো।
ধানে পেত: কুড়ি হাজার।
পার্থক্য: তেতাল্লিশ হাজার ছশো।
তেতাল্লিশ হাজার ছশো টাকা। এই টাকার বিনিময়ে শহিদুল দিয়েছে: ফয়সালের ফুসফুস, তাহমিনার কাশি, নিজের ঘুম, রাবেয়ার চোখের জল, আমিনুলের লাউ গাছ, চার বিঘা জমির নাইট্রোজেন।
৯
রাতে শহিদুল বার্নের পাশে বসে। মৌসুম শেষ। আগুন নেই। ধোঁয়া নেই। কিন্তু দেয়ালে গন্ধ আছে। মাটিতে গন্ধ আছে। তামাকের তীব্র, তেতো, মিষ্টি গন্ধ। এই গন্ধ ছাড়বে না কোনোদিন।
ঘরের ভেতর থেকে ফয়সালের শ্বাসের শব্দ আসে। হুইসেলের মতো। বুকের ভেতর বাতাস আটকে যাচ্ছে, ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে বের হচ্ছে।
শহিদুল তারার দিকে তাকায়। আকাশ পরিষ্কার। এই আকাশের নিচে সে তামাক ফলায়। এই তামাক বিদেশে রপ্তানি হয়। কোম্পানির শেয়ার বাড়ে। শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড আসে। লন্ডনে কেউ ওয়াইন খায়, ঢাকায় কেউ সিগারেট টানে।
আর রংপুরে একটা আট বছরের ছেলে রাতে ঘুমাতে পারে না।
শহিদুল ওঠে। ঘরে যায়। ফয়সালের পাশে শোয়। ছেলের বুকে হাত রাখে। বুকটা কাঁপছে। প্রতিটা শ্বাসে কাঁপছে।
শহিদুল চোখ বোজে।
আগামী নভেম্বরে আবার বীজ লাগাবে। কোম্পানির লোক আবার আসবে। বীজ দেবে, সার দেবে, হাসিমুখে কাগজে সই নেবে। শহিদুল সই করবে। কারণ তেতাল্লিশ হাজার ছশো টাকা। কারণ ধানে কুড়ি হাজার। কারণ পার্থক্যটা স্বাস্থ্যের চেয়ে বড়।
গরিবের কাছে স্বাস্থ্য বিলাসিতা। বেঁচে থাকাটাই যথেষ্ট।
১০
মিঠাপুকুরে তামাক চাষির সংখ্যা বাড়ছে প্রতি বছর। পাঁচ বছর আগে এই ইউনিয়নে তামাক চাষি ছিল বিশ জন। এখন আশি। ধানের জমি কমছে। তামাকের জমি বাড়ছে। জেলা কৃষি অফিসার কাগজে লেখেন: "তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।" মাঠে কোম্পানির গাড়ি চলে।
আমিনুল বলে, "দশ বছর পর এখানে ধান হবে না। মাটি মরে যাবে। তখন তামাকও হবে না।"
শহিদুল বলে, "দশ বছর পরের কথা ভাবার সুযোগ কই? আমি তো এই বছরটা পার করতে পারি না।"
এটাই তামাকের ফাঁদ। আজকের টাকা আগামীকালের জমি খায়। আগামীকালের জমি না থাকলে পরশুর টাকা নেই। কিন্তু আজকে না খেলে আগামীকাল আসবে না।
শহিদুল জানে এটা। সে বোকা না। সে গরিব।
গরিব মানুষের দূরদৃষ্টি নেই, এটা ভুল। গরিব মানুষ দেখতে পায়। শুধু ভিন্ন পথে হাঁটার সামর্থ্য নেই।
সকালে শহিদুল মাঠে যায়। তামাক তোলা শেষ। এখন জমি পতিত। মাটি ধূসর। ফাটা। এই মাটিতে আগে কেঁচো ছিল। কেঁচো চলে গেছে। পাখি কমেছে। মাটির গন্ধ বদলে গেছে। আগে মাটির গন্ধে প্রাণ ছিল। এখন রাসায়নিকের গন্ধ। কীটনাশকের গন্ধ। নিকোটিনের গন্ধ।
শহিদুল দাঁড়ায়। মাটির দিকে তাকায়। এই মাটিতে তার বাবা ধান ফলাত। দাদা ধান ফলাত। তারা গরিব ছিল, কিন্তু মাটি সুস্থ ছিল। বাতাস পরিষ্কার ছিল। বাচ্চারা রাতে ঘুমাতে পারত।
শহিদুল ঘুরে বাড়ি ফেরে। ঘরে ঢুকে দেখে ফয়সাল ঘুমাচ্ছে। দিনের বেলা, যখন ধোঁয়া নেই, ফয়সাল একটু ঘুমাতে পারে।
শহিদুল ছেলের মুখের দিকে তাকায়। তারপর ঘর থেকে বের হয়। কোম্পানির ফিল্ড অফিসারকে ফোন করে। "আগামী মৌসুমের বীজ কবে পাব?"