মৌচাষি
মৌমাছি কামড়ায়, বাঘ খায়। আমি তবুও যাই। কারণ মধু ছাড়া আমার কিছু নেই।
১
আবু তালেবের শরীরে ছাব্বিশটা দাগ আছে।
তেরোটা বাঘের থাবার। বাকিটা মৌমাছির। মৌমাছির দাগ ছোট, গোল, সাদা। বাঘের দাগ লম্বা, গভীর, কালচে। সে দুটোর পার্থক্য বলতে পারে চোখ বুজে, শুধু আঙুল বুলিয়ে।
সুন্দরবন। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা। আবু তালেবের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ গ্রামে। বাড়ি বললে ভুল হবে। টিনের চালা। মাটির দেয়াল। একটা ঘর, একটা রান্নাঘর। সামনে খোলা জায়গা। পেছনে নদী। নদীর ওপারে সুন্দরবন।
আবু তালেব মৌয়াল। মধু আহরণকারী। তার বাবা মৌয়াল ছিল। দাদা ছিল। দাদার বাবাও। কত প্রজন্ম ধরে এই বংশ সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করে, সেটা কেউ গুনে রাখেনি। শুধু মৃত্যুর হিসাব আছে।
আবু তালেবের বাবা সুন্দরবনে মারা গেছে। বাঘে না। সাপে। কেউটের কামড়। ১৯৯৬ সাল। আবু তালেবের তখন বয়স চৌদ্দ। সেই বছর থেকে সে বনে যায়।
২
এপ্রিল মাস। মধু মৌসুম।
আবু তালেব প্রস্তুতি নেয় মার্চ থেকে। নৌকা মেরামত করে। দড়ি কেনে। মশাল বানায়। কাপড়ের মুখোশ সেলাই করে। পুরনো শাড়ি দিয়ে বানানো মুখোশ, মৌমাছি থেকে বাঁচার জন্য।
সাথে যায় চার জন। করিম, জব্বার, হাসেম, আর তালেবের ভাগনে বাচ্চু। বাচ্চু নতুন। প্রথমবার যাচ্ছে। আঠারো বছর বয়স।
আবু তালেব বাচ্চুকে বলে, "বনে ঢুকলে তিনটা কথা মনে রাখবি। এক: শব্দ করবি না। দুই: দৌড়াবি না। তিন: পেছনে তাকাবি না।"
"কেন পেছনে তাকাব না?"
"বাঘ পেছন থেকে আসে। তাকালে দেখবি। দেখলে ভয় পাবি। ভয় পেলে দৌড়াবি। দৌড়ালে মরবি।"
বাচ্চু হাসল। আবু তালেব হাসল না।
৩
নৌকা ছাড়ল ভোর পাঁচটায়। জোয়ারের পানিতে। পশুর নদী ধরে দক্ষিণে। দুই ঘণ্টায় বনের ভেতরে।
সুন্দরবনের ভেতরে ঢুকলে পৃথিবী বদলে যায়। আকাশ দেখা যায় না। গাছের ডালপালা মাথার ওপরে জাল বুনে রেখেছে। আলো সবুজ হয়ে ঝরে। জলের গন্ধ। কাদার গন্ধ। পচা পাতার গন্ধ। মাছের গন্ধ। সবকিছু মিলে একটা ভারী, ভেজা, প্রাচীন গন্ধ।
শব্দ আছে। পাখির ডাক। বানরের ডাক। জলের ছলাৎ ছলাৎ। কখনো মাছ লাফায়। কখনো কুমির পানিতে নামে। কখনো সাপ গাছ থেকে ঝোলে।
আবু তালেব পানির দিকে তাকায়। কুমির। কুমির এখানে কম না। কিন্তু মৌয়ালরা কুমিরকে ভয় পায় না বেশি। কুমির পানিতে থাকে। মৌয়ালরা ডাঙায়। সমস্যা হয় যখন জোয়ারে পানি ওঠে আর মৌয়াল হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে মধু কাটে।
আসল ভয় বাঘ।
৪
তিন বন্ধু মারা গেছে বিশ বছরে।
সেলিম। ২০০৮ সালে। কটকা এলাকায়। মধু কাটছিল। পেছন থেকে বাঘ এসেছিল। সেলিমের ঘাড় কামড়ে ধরেছিল। বাকিরা ঢোল পিটিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে বাঘ তাড়িয়েছিল। কিন্তু তত ক্ষণে সেলিমের ঘাড়ের হাড় ভেঙে গেছে। নৌকায় তুলেছিল। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে মারা গেছে।
মজিদ। ২০১৪ সালে। ডুবকি নদীর ধারে। একা গেছিল। এটাই ভুল। একা যেতে নেই। মজিদের লাশ পাওয়া যায়নি। শুধু তার লুঙ্গি পাওয়া গেছিল একটা গোলপাতার ঝোপে। রক্তমাখা।
ইদ্রিস। ২০২১ সালে। হিরণ পয়েন্টের কাছে। ইদ্রিস অভিজ্ঞ ছিল। ত্রিশ বছর ধরে বনে যেত। বাঘের আচরণ জানত। কিন্তু সেদিন বাঘটা অসুস্থ ছিল। অসুস্থ বাঘ বিপজ্জনক। সুস্থ বাঘ মানুষ দেখলে সরে যায়। অসুস্থ বাঘ শিকার করতে পারে না, তাই মানুষ ধরে। ইদ্রিসকে ধরেছিল।
আবু তালেব তিনটা জানাজায় গেছে। তিনটা জানাজায় মাটি দিয়েছে। তিনবার ভেবেছে, আর যাবে না। তিনবার এপ্রিল এলে আবার গেছে।
৫
সাত দিন বনের ভেতরে।
প্রথম দিন: ক্যাম্প বানানো। নৌকা বেঁধে ডাঙায় উঠে একটা জায়গা পরিষ্কার করা। মাটিতে পলিথিন বিছানো। চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া না, দড়ি টানানো, দড়িতে শুকনো পাতা ঝোলানো। বাঘ এলে পাতা নড়বে, শব্দ হবে। রাতে পালা করে জেগে থাকা। আগুন জ্বালিয়ে রাখা।
দ্বিতীয় দিন থেকে: মধু খোঁজা। খলিসা গাছ, গরান গাছ, কেওড়া গাছ। মৌচাক থাকে গাছের উঁচু ডালে। দশ ফুট, বিশ ফুট, কখনো ত্রিশ ফুট উঁচুতে। আবু তালেব গাছে ওঠে। হাতে মশাল। ধোঁয়া দেয়। মৌমাছি ধোঁয়ায় সরে যায়। কিন্তু সব সরে যায় না। কিছু মৌমাছি আক্রমণ করে। মুখে, হাতে, গলায় কামড়ায়। আবু তালেব কামড় খায়, মধু কাটে। হাতে ধারালো দা। চাক কেটে বালতিতে নামায়।
মশা। সুন্দরবনের মশা শহরের মশার মতো না। এগুলো বড়, কালো, এবং দিনে কামড়ায়। রাতেও কামড়ায়। সারাক্ষণ কামড়ায়। মশারি নেই। ধোঁয়া দেয় কাঁচা পাতা জ্বালিয়ে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে। মশা কিছুটা কমে।
সাত দিনে আবু তালেবের দল পঞ্চাশ কেজি মধু সংগ্রহ করে।
৬
ফেরার পথে আবু তালেবের হাতের দিকে তাকালে দেখা যায় ইতিহাস।
হাত ফোলা। মৌমাছির কামড়ে ফুলে আছে। আঙুলগুলো লাল। কবজি লাল। হাতের পেছনে পাঁচটা কামড়ের দাগ, প্রতিটা একটা ছোট পাহাড়ের মতো ফুলে আছে। এই ফোলা তিন দিনে কমবে। কিন্তু চামড়া শক্ত হয়ে গেছে বহু বছরে। কামড়ের ব্যথা আগের মতো লাগে না। শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
মুন্সিগঞ্জ ঘাটে নৌকা ভিড়ল। বউ হালিমা অপেক্ষায়। সাত দিন সে ঘুমায়নি। প্রতিদিন নদীর দিকে তাকিয়েছে। প্রতিরাতে কান পেতে শুনেছে বাঘের ডাক আসে কি না বনের দিক থেকে।
আবু তালেব নৌকা থেকে নামল। হালিমা কিছু বলল না। শুধু তাকাল। জীবিত ফিরেছে। এটুকুই যথেষ্ট।
৭
মধ্যস্বত্বভোগীর নাম মোতালেব।
মোতালেব শ্যামনগর বাজারে বসে। তার দোকান আছে। দোকানে মধু কেনে, ড্রাম ভরে ঢাকায় পাঠায়। আবু তালেব পঞ্চাশ কেজি মধু নিয়ে এল।
মোতালেব মধু পরীক্ষা করল। আঙুলে নিয়ে চাখল। চোখ বুজে স্বাদ নিল। "খলিসা ফুলের মধু। ভালো। পাঁচশো টাকা কেজি।"
পঞ্চাশ কেজি, পাঁচশো টাকা। মোট পঁচিশ হাজার।
আবু তালেব জানে মোতালেব এই মধু ঢাকায় বিক্রি করবে পনেরোশো টাকা কেজিতে। পঞ্চাশ কেজিতে পঁচাত্তর হাজার। মোতালেবের লাভ পঞ্চাশ হাজার। পরিবহন খরচ বাদে চল্লিশ হাজার নিট।
আবু তালেব সাত দিন বনে কাটিয়েছে। বাঘের এলাকায়। মৌমাছির কামড় খেয়েছে। মশার কামড় খেয়েছে। ঘুমায়নি। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সম্ভাবনা ছিল। পেয়েছে পঁচিশ হাজার।
মোতালেব দোকানে বসে ফোন করেছে। ড্রাম ভরেছে। ট্রাকে তুলেছে। পেয়েছে চল্লিশ হাজার।
"বাঘের ভয় সামলাই আমি। দাম ঠিক করে মধ্যস্বত্বভোগী।"
আবু তালেব এটা বলে হাসে। হাসিটা তিক্ত। কিন্তু তিক্ততায় অভ্যস্ত সে।
৮
পঁচিশ হাজার টাকা। সাত দিনের আয়।
এই টাকায় কী হয়? আবু তালেবের পরিবার: হালিমা, দুই ছেলে, এক মেয়ে। মাসে খরচ আট হাজার। ভাত, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, নুন। মাছ নদী থেকে ধরে। সবজি উঠোনে। কিন্তু বাকি যা লাগে, ওষুধ, ছেলেদের স্কুল, লুঙ্গি-শাড়ি, সেগুলোর জন্য টাকা।
মধু মৌসুম এপ্রিল থেকে জুন। তিন মাস। তিন মাসে চারবার বনে যায়। প্রতিবার সাত দিন। প্রতিবার পঞ্চাশ কেজি মধু। মোট দুইশো কেজি। এক লাখ টাকা।
এক লাখ টাকা সারা বছরের আয়।
বাকি নয় মাস কী করে? মাছ ধরে। কাঁকড়া ধরে। দিনমজুরি করে। কিন্তু মূল আয় মধু।
এক লাখ টাকায় একটা পরিবার এক বছর চলে। রংপুরে তামাক চাষি তেষট্টি হাজার পায় ছয় মাসে। ঢাকায় গার্মেন্টস শ্রমিক পায় দশ হাজার মাসে, বছরে এক লাখ কুড়ি হাজার। আবু তালেবের আয় গার্মেন্টস শ্রমিকের চেয়ে কম। কিন্তু আবু তালেব বাঘের এলাকায় যায়।
কোনো ভাতা নেই। কোনো বিমা নেই। বনে মারা গেলে সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ পায় পরিবার: এক লাখ টাকা। একটা মানুষের দাম এক লাখ টাকা। আবু তালেবের এক বছরের আয়ের সমান।
৯
রাতে হালিমা বলে, "আর যেও না।"
আবু তালেব বলে, "তাহলে খাব কী?"
"মাছ ধরো।"
"মাছে সংসার চলে না। তুমি জানো।"
হালিমা জানে। সে চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর বলে, "সেলিম ভাইয়ের বউ এখন কেমন আছে?"
আবু তালেব চুপ। সেলিমের বউ নূরজাহান। সেলিম মারা যাওয়ার পর নূরজাহান তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে। সেখানে কাজ করে। অন্যের বাড়িতে ধান সেদ্ধ করে, ঝি-এর কাজ করে। ছেলেরা স্কুল ছেড়েছে।
হালিমা জানে তার ভবিষ্যতও সেরকম হতে পারে। যেকোনো এপ্রিলে।
"মৌমাছি কামড়ায়, বাঘ খায়। আমি তবুও যাই। কারণ মধু ছাড়া আমার কিছু নেই।"
আবু তালেব এটা বলে হালিমাকে না। নিজেকে বলে। প্রতি বছর এপ্রিলের আগে নিজেকে বলে। একটা মন্ত্রের মতো। একটা যুক্তির মতো। একটা অজুহাতের মতো।
১০
বাচ্চু ফিরে এসেছে প্রথম বনযাত্রা থেকে। তার চোখ বড়। সে অনেক কথা বলছে। উত্তেজিত। "মামা, বাঘের পায়ের ছাপ দেখলাম! এত বড়! আর মধু কাটার সময় মৌমাছি যখন ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করল, আমি ভয়ে লাফ দিতে যাচ্ছিলাম, তুমি ধরলে..."
আবু তালেব শোনে। বাচ্চুর উত্তেজনা দেখে তার মনে পড়ে নিজের প্রথম যাত্রা। চৌদ্দ বছর বয়সে। বাবা মারা যাওয়ার পর। সেবারও সে উত্তেজিত ছিল। ভয় পেয়েছিল। কিন্তু উত্তেজনা ভয়কে ঢেকে দিয়েছিল।
দশ বছর পর উত্তেজনা চলে যায়। শুধু ভয় থাকে। কুড়ি বছর পর ভয়ও চলে যায়। শুধু অভ্যাস থাকে। অভ্যাস আর অভাব।
আবু তালেব বাচ্চুর মাথায় হাত রাখে। "ভালো করেছিস। পরের বারও যাবি।"
বাচ্চু হাসে। সে জানে না এই হাসি একদিন মুছে যাবে। যেদিন তার কোনো বন্ধু বনে ফিরবে না, সেদিন।
নদীর ওপারে সুন্দরবন কালো হয়ে আছে সন্ধ্যার আলোয়। গাছের সারি দেখে মনে হয় দেয়াল। কিন্তু দেয়াল না। এটা দরজা। আবু তালেবের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে এই দরজা দিয়ে ঢুকেছে। কেউ ফিরেছে মধু নিয়ে। কেউ ফেরেনি।
আবু তালেব নদীর দিকে তাকায়। পানিতে তারার ছায়া ভাঙছে। কোথাও একটা বাঘ ডাকল। গভীর, নিচু, পেটের ভেতর থেকে আসা আওয়াজ। হালিমা শিউরে উঠল। আবু তালেব নড়ল না। সে এই আওয়াজ চেনে। এই আওয়াজ তার জীবিকা। এই আওয়াজ তার মৃত্যু হতে পারে।
দুটোই একই বনে থাকে।