গরু ব্যবসায়ী
গরুর ব্যবসায় বারো মাস ঝুঁকি, একদিন লাভ। সেই একদিনের লাভে বারো মাস চলে।
১
শামসুদ্দিন গরু চেনে চোখ দিয়ে না। হাত দিয়ে।
গরুর পিঠে হাত বুলিয়ে বলতে পারে ওজন কত। পাঁচ কেজি এদিক-ওদিক। গরুর পায়ের গোড়ালি ধরে বলতে পারে হাড় মোটা না চিকন, মাংস কেমন হবে। দাঁত দেখে বয়স বলে। চোখ দেখে স্বাস্থ্য বলে। নাকের ভেজা ভাব দেখে রোগ আছে কি না বলে।
এই বিদ্যা বাবার কাছ থেকে। বাবার বাবার কাছ থেকে। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা। ব্রহ্মপুত্রের চর। চরের মানুষ দুটো জিনিস চেনে: নদী আর গরু। নদী জমি খায়, গরু জমি দেয়। মানে গরু বেচে যে টাকা আসে, সেটা দিয়ে নতুন জমি কেনা যায়। যদি নদী সেই জমিও না খায়।
শামসুদ্দিনের বয়স পঁয়তাল্লিশ। বাইশ বছর ধরে গরুর ব্যবসা করে। বারো মাস তৈরি হয়, একটা দিনের জন্য। ঈদ-উল-আযহা।
২
জানুয়ারি। ঈদ আসতে এগারো মাস বাকি। শামসুদ্দিন চরে যায়। চিলমারীর চর, রৌমারীর চর, ভুরুঙ্গামারীর চর। এই চরগুলোতে মানুষ গরু পালে। ঘাসের অভাব নেই। চরের ঘাস সবুজ, নরম, প্রোটিনসমৃদ্ধ। নদীর পলিতে জন্মায়। এই ঘাস খেয়ে গরু মোটা হয়, তাগড়া হয়।
শামসুদ্দিন গরু কেনে বিশ হাজার থেকে পঁচিশ হাজার টাকায়। ছোট গরু। ছয় মাস থেকে এক বছর বয়সী। এদের খাওয়ায়, বড় করে। আট-দশ মাস পর ঈদের আগে এরা হয়ে যায় ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকার গরু। শামসুদ্দিন কেনে পঞ্চাশটা। পুঁজি দশ-বারো লাখ।
এই পুঁজি কোথা থেকে আসে? গত বছরের লাভ থেকে কিছু। মহাজনের কাছ থেকে কিছু। আর আড়তদারের কাছ থেকে কিছু। আড়তদার আগাম টাকা দেয়, শর্ত হলো ঈদের বাজারে তার মাধ্যমে বিক্রি করতে হবে। কমিশন দশ শতাংশ।
৩
অক্টোবর। ঈদ এক মাস পরে। শামসুদ্দিনের গরু তৈরি। পঞ্চাশটা গরু। চরের খোয়ালে বাঁধা। প্রতিটা তেলতেলে, স্বাস্থ্যবান, চওড়া পিঠ, মোটা ঠ্যাং।
এখন ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে।
চিলমারী থেকে ঢাকা। সড়ক পথে তিনশো কিলোমিটারের বেশি। ট্রাকে গরু তোলা যায়, কিন্তু ট্রাক ভাড়া বিশাল। একটা ট্রাকে আটটা গরু ওঠে। পঞ্চাশটা গরুর জন্য ছয়-সাতটা ট্রাক। ট্রাক প্রতি ভাড়া পনেরো হাজার। মোট এক লাখের বেশি।
শামসুদ্দিন অন্য পথ বেছে নেয়। হাঁটিয়ে নেবে।
পঞ্চাশটা গরু। চারজন রাখাল। শামসুদ্দিন নিজে। মোট পাঁচ জন। তিনশো কিলোমিটার। দিনে বিশ কিলোমিটার হাঁটে গরু। পনেরো দিন।
পনেরো দিন রাস্তায়। গরু নিয়ে। ধুলোয়, রোদে, বৃষ্টিতে।
৪
রাস্তার বিপদ।
প্রথম বিপদ: হাইওয়ে পুলিশ। চিলমারী থেকে ঢাকা পর্যন্ত চারটা চেকপোস্ট। প্রতি চেকপোস্টে পাঁচশো টাকা। কখনো হাজার। নির্ভর করে পুলিশের মেজাজের ওপর। কাগজপত্র ঠিক আছে কি না, সেটা বড় কথা না। টাকা দিলে কাগজ ছাড়াও যায়। টাকা না দিলে কাগজ থাকলেও আটকায়।
চার চেকপোস্টে দুই হাজার। কখনো চার হাজার। এটা নিশ্চিত খরচ।
দ্বিতীয় বিপদ: চোর। রাতে গরু চুরি হয়। শামসুদ্দিন রাতে ঘুমায় না। রাখালদের পালা করে জাগিয়ে রাখে। তবুও গত বছর তিনটা গরু চুরি হয়েছিল। বগুড়ার কাছে। রাতে। দড়ি কেটে নিয়ে গেছে। তিনটা গরুর দাম দেড় লাখ টাকা।
দেড় লাখ। শামসুদ্দিনের ছয় মাসের লাভ।
তৃতীয় বিপদ: গরু অসুস্থ হওয়া। তিনশো কিলোমিটার হাঁটলে গরুর পা ব্যথা হয়। খুর ফেটে যায়। জ্বর আসে। একটা গরু অসুস্থ হলে পুরো দল থামে। দাঁড়িয়ে ওষুধ দিতে হয়। পশু ডাক্তার ডাকতে হয়। সময় নষ্ট, টাকা নষ্ট।
চতুর্থ বিপদ: সড়ক দুর্ঘটনা। ট্রাক, বাস, সিএনজি। হাইওয়েতে গরু নিয়ে হাঁটা বিপজ্জনক। গরু ভয় পেলে ছুটে যায়। রাস্তায় গাড়ির সামনে পড়ে। গাড়ির ড্রাইভার রাগ করে। মারামারি হয়। গরু মরলে ক্ষতি শামসুদ্দিনের।
৫
পনেরো দিন পর ঢাকা।
গাবতলীর গরুর হাট। বিশাল মাঠ। হাজার হাজার গরু। শত শত ব্যবসায়ী। ক্রেতারা ঘুরছে। ঢাকার মধ্যবিত্ত। গাড়ি নিয়ে এসেছে। পরিবার নিয়ে এসেছে। বাচ্চারা গরু দেখে হাসছে।
শামসুদ্দিনের পঞ্চাশটা গরু এখন সাতচল্লিশটা। একটা রাস্তায় অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। দুটো বগুড়ায় বিক্রি করতে হয়েছে, কারণ হাঁটতে পারছিল না।
সাতচল্লিশটা গরু। গড়ে পয়ত্রিশ হাজার টাকায় কেনা। খাবার খরচ আট মাসে গরু প্রতি পাঁচ হাজার। রাখালের বেতন চারজনে মাসে চল্লিশ হাজার, আট মাসে তিন লাখ কুড়ি হাজার। রাস্তার খরচ, পুলিশ, চেকপোস্ট, খাওয়া: পঞ্চাশ হাজার।
মোট বিনিয়োগ: প্রায় বাইশ লাখ টাকা।
এখন বিক্রি করতে হবে গরু প্রতি গড়ে ষাট-সত্তর হাজারে। তাহলে লাভ হবে।
৬
ঈদের তিনদিন আগে। শামসুদ্দিন হাটে বসে আছে। গরুর পাশে। রোদে। ঘামে ভিজে আছে তার গেঞ্জি। লুঙ্গি কাদামাখা। মুখে দাড়ি, পনেরো দিন কামানো হয়নি।
ক্রেতারা আসে। দেখে। দাম জিজ্ঞেস করে। শামসুদ্দিন বলে, "এটা পঁচাত্তর হাজার।"
ক্রেতা বলে, "অনেক বেশি। পঞ্চাশ হাজার দেব।"
"ভাই, আট মাস ধরে খাইয়েছি। তিনশো কিলোমিটার হাঁটিয়ে এনেছি।"
"সেটা তোমার সমস্যা। আমি তো গরু কিনতে এসেছি, তোমার কষ্টের দাম দিতে আসিনি।"
ক্রেতা চলে যায়। শামসুদ্দিন বসে থাকে।
এভাবে দিন যায়। ঈদের দুইদিন আগে কিছু বিক্রি হয়। ঈদের একদিন আগে বেশি বিক্রি হয়। ঈদের দিন সকালে বাকিটা। শেষ দিনে দাম কমে। কারণ ঈদের পরে গরুর কোনো দাম নেই। কোরবানি হয়ে গেলে গরু আর গরু না, সে বোঝা।
শামসুদ্দিন এটা জানে। তাই শেষ দিনে সে দাম কমায়। ষাট হাজারের গরু পঞ্চাশে দেয়। কারণ বিক্রি না হলে ফিরিয়ে নিতে হবে। ফিরিয়ে নেওয়া মানে পরিবহন খরচ, খাবার খরচ, আর একটা গরু যার কোনো ক্রেতা নেই।
৭
হিসাব।
সাতচল্লিশটা গরু বিক্রি হলো। গড় বিক্রয়মূল্য: পঞ্চান্ন হাজার। মোট বিক্রি: প্রায় পঁচিশ লাখ পঁচাশি হাজার।
আড়তদারের কমিশন দশ শতাংশ: দুই লাখ আটান্ন হাজার।
হাতে পেল: তেইশ লাখ সাতাশ হাজার।
বিনিয়োগ ছিল: বাইশ লাখ।
লাভ: এক লাখ সাতাশ হাজার।
এগারো মাসের পরিশ্রমে এক লাখ সাতাশ হাজার টাকা। মাসে বারো হাজারের কম।
কিন্তু এটা ভালো বছরের হিসাব। যে বছর গরু চুরি হয় না, গরু মরে না, দাম ভালো পাওয়া যায়। খারাপ বছরে লোকসান হয়। গত বছর তিনটা গরু চুরি হয়েছিল। তার আগের বছর ঈদের আগে ভারী বৃষ্টি হয়েছিল, ক্রেতা কম এসেছিল, সাতটা গরু অবিক্রিত ছিল।
৮
শামসুদ্দিনের বউ রহিমা। তিন সন্তান। বড় ছেলে টিপু, বিশ বছর, বাবার সাথে ব্যবসায় আছে। মেয়ে শিরিন, আঠারো, দশম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ছেলে তুহিন, বারো।
রহিমা বলে, "গরুর ব্যবসা ছেড়ে দাও। টিপুকে ঢাকায় পাঠাও। চাকরি করুক।"
শামসুদ্দিন বলে, "চাকরিতে কত পাবে? দশ হাজার? বারো হাজার? গরুতে অন্তত লাভ হলে একটু বেশি পাওয়া যায়।"
"লাভ হলে। আর না হলে?"
শামসুদ্দিন চুপ।
গরুর ব্যবসায় বারো মাস ঝুঁকি, একদিন লাভ। সেই একদিনের লাভে বারো মাস চলে।
এই একটা লাইনে শামসুদ্দিনের পুরো জীবন। এগারো মাস ধরে সে গরু কেনে, খাওয়ায়, পালে, হাঁটায়, পাহারা দেয়, পুলিশকে ঘুষ দেয়, চোরের হাত থেকে বাঁচায়। তারপর একটা দিন আসে। ঈদ-উল-আযহা। সেদিন সব নির্ধারিত হয়। সেদিনের বাজারদর, সেদিনের আবহাওয়া, সেদিনের ক্রেতার মেজাজ। একটা দিনে এগারো মাসের ভাগ্য লেখা হয়।
জুয়ার চেয়েও খারাপ। জুয়ায় অন্তত পাশা একবারে ফেলা যায়। শামসুদ্দিনকে এগারো মাস অপেক্ষা করতে হয় পাশা ফেলার জন্য।
৯
চরে ফিরে এসেছে শামসুদ্দিন। ঈদের পরে। পকেটে টাকা আছে। এক লাখ সাতাশ হাজার। মহাজনের ঋণ শোধ করতে হবে। আড়তদারের বাকি মিটাতে হবে। রাখালদের বোনাস দিতে হবে। শিরিনের পরীক্ষার ফি দিতে হবে।
সব মিটিয়ে হাতে থাকবে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার।
জানুয়ারিতে আবার গরু কিনতে হবে। আবার পুঁজি লাগবে। আবার মহাজনের কাছে যেতে হবে।
চক্র। শামসুদ্দিন এই চক্রে আটকে আছে বাইশ বছর ধরে। তার বাবাও আটকে ছিল। পার্থক্য শুধু এই যে বাবার আমলে পুলিশকে ঘুষ দিতে হতো না আর গরু চুরি কম হতো।
শামসুদ্দিন চরের দিকে তাকায়। ব্রহ্মপুত্র শান্ত। শীতকালে নদী শুকায়। চর জেগে ওঠে। এই চরে ঘাস গজাবে। এই ঘাস গরু খাবে। এই গরু বড় হবে। এই গরু হাঁটবে তিনশো কিলোমিটার। এই গরু বিক্রি হবে ঈদের দিন।
শামসুদ্দিন জানুয়ারিতে আবার চরে যাবে। আবার গরু কিনবে। আবার পালবে। আবার হাঁটাবে। আবার বিক্রি করবে।
এটাই তার জীবন। গরুর পেছনে হাঁটা। বারো মাস হাঁটা। একদিন থামা। তারপর আবার হাঁটা।
১০
টিপু বলে, "বাবা, আমি ঢাকায় থাকতে চাই। হাটে একটা স্থায়ী দোকান নিতে চাই। মধ্যস্বত্বভোগী হতে চাই। গরু হাঁটানোর চেয়ে গরু কেনাবেচা করব। কমিশনে।"
শামসুদ্দিন ছেলের দিকে তাকায়। ছেলে বুদ্ধিমান। সে বুঝে গেছে আসল টাকা কোথায়। আসল টাকা হাঁটানোতে না, বসে থাকায়। আসল টাকা ঝুঁকিতে না, ঝুঁকি অন্যের কাঁধে চাপানোতে।
শামসুদ্দিন কিছু বলে না। সে গরুর পিঠে হাত বোলায়। নতুন কেনা গরু। ছোট। ছয় মাস বয়স। চোখ বড়, ভেজা। নাক ভেজা। সুস্থ।
এই গরুকে সে আট মাস খাওয়াবে। বড় করবে। তারপর তিনশো কিলোমিটার হাঁটাবে। তারপর কেউ কিনবে। কেউ জবাই করবে। মাংস ভাগ করবে। আল্লাহর নামে।
শামসুদ্দিনের হাত গরুর পিঠ থেকে সরে না। সে এই গরম পিঠ চেনে। এই শ্বাস চেনে। এই ঘাসের গন্ধ চেনে। সে গরুর ব্যবসায়ী, কিন্তু গরু তার কাছে শুধু পণ্য না। গরু তার সম্পদ, তার ঝুঁকি, তার ভরসা, তার বোঝা।
সন্ধ্যায় ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে বাতাস আসে। চরের ঘাস দোলে। গরুগুলো ঘাস খায়। শামসুদ্দিন বসে দেখে। এগারো মাস বাকি।