দুধওয়ালা
আল্লাহ দেখলেও বাজার দেখে না।
১
রশিদের ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজে রাত তিনটায়।
সে অ্যালার্মের আগেই জেগে থাকে। শরীর অভ্যস্ত। বিশ বছর ধরে একই সময়ে জাগে। শীতে, গ্রীষ্মে, বর্ষায়। তিনটায় জাগা, সাড়ে তিনটায় গোয়ালঘরে ঢোকা, চারটায় দোহন শুরু।
সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া। রশিদের ছয়টা গরু। চারটা দুধ দেয়। দুটো শুকনো, মানে গর্ভবতী, দুধ দিচ্ছে না এখন। চারটা গরু থেকে দিনে ত্রিশ লিটার দুধ হয়। সকালে আঠারো, বিকালে বারো।
রশিদ দোহন করে নিজে। মেশিন নেই। হাতে। দুটো আঙুল আর তালুর চাপে দুধ নামে। বাম হাত, ডান হাত, বাম হাত, ডান হাত। ছন্দ। গরু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। জাবর কাটে। মাঝে মাঝে লেজ নাড়ায়। মাছি তাড়ায়।
আঠারো লিটার দুধ। অ্যালুমিনিয়ামের কলসিতে ভরে। দুটো কলসি। সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে বাঁধে।
২
সকাল পাঁচটা। আকাশ ধূসর। পাখি ডাকছে। কুয়াশা ভেজা রাস্তা। রশিদ সাইকেল চালায়। পেছনে আঠারো লিটার দুধ। সামনে দশ কিলোমিটার রাস্তা।
উল্লাপাড়া থেকে সদর পর্যন্ত। সংগ্রহ কেন্দ্র আছে বাজারের মোড়ে। সেখানে দুধ জমা দেয়। মিল্ক ভিটা, প্রাণ, আর কিছু স্থানীয় ক্রেতা।
দশ কিলোমিটার সাইকেলে। কাঁচা রাস্তা। ইটের খোয়া। গর্ত। বর্ষায় কাদা হয়, সাইকেলের চাকা আটকে যায়। তখন হেঁটে যেতে হয়, সাইকেল ঠেলে। দুধের ওজন আর সাইকেলের ওজন মিলিয়ে চল্লিশ কেজি ঠেলে কাদা রাস্তায় হাঁটা।
রশিদের হাঁটু ব্যথা করে। দশ বছর আগে শুরু হয়েছে। সাইকেল চালাতে চালাতে, দুধ বইতে বইতে। ডাক্তার বলেছে হাঁটুর তরুণাস্থি ক্ষয়ে যাচ্ছে। বিশ্রাম নিতে হবে। রশিদ হেসেছিল। "গরু কি বিশ্রামের দিন দুধ দেওয়া বন্ধ রাখবে?"
৩
সংগ্রহ কেন্দ্র। সকাল ছয়টা।
লাইন দেওয়া। রশিদের আগে সাতজন। প্রত্যেকের সাইকেলে বা ভ্যানে দুধের কলসি। কেউ দশ লিটার নিয়ে এসেছে, কেউ বিশ, কেউ পঞ্চাশ। পঞ্চাশ লিটার যে আনে, সে ব্যবসায়ী। বিভিন্ন খামার থেকে কিনে আনে।
পরীক্ষা হয়। ল্যাক্টোমিটার দিয়ে ঘনত্ব মাপে। ফ্যাট পরীক্ষা করে। এসএনএফ দেখে। আর ফরমালিন টেস্ট।
ফরমালিন। দুধে ফরমালিন মেশালে দুধ নষ্ট হয় না। তিন দিন, চার দিন রাখা যায়। কিন্তু ফরমালিন বিষ। ক্যান্সার করে। কিডনি নষ্ট করে।
রশিদের দুধে ফরমালিন নেই। কখনো ছিল না। ল্যাক্টোমিটার ভাসে ঠিক জায়গায়। ফ্যাট ঠিক। সব ঠিক। খাঁটি দুধ।
পরীক্ষক বলে, "রশিদ ভাই, আপনার দুধ সবসময় ঠিক।"
রশিদ মাথা নাড়ে। সে জানে তার দুধ ঠিক। সে এটাও জানে ঠিক থাকার কোনো পুরস্কার নেই।
৪
দাম: প্রতি লিটার পঞ্চান্ন টাকা।
রশিদের আঠারো লিটার। নয়শো নব্বই টাকা।
পাশের গ্রামের জহির। জহিরও আঠারো লিটার নিয়ে এসেছে। জহিরের দুধে ল্যাক্টোমিটার একটু নিচে ভাসে। মানে পানি মেশানো আছে। সামান্য। দুই-তিন লিটার পানি। কিন্তু পরীক্ষায় পাস হয়ে যায়, কারণ ঠিক এতটুকু মেশায় যতটুকু মেশালে ল্যাক্টোমিটারে ধরা পড়ে না।
জহিরের আসল দুধ পনেরো লিটার। পানি মিশিয়ে আঠারো। দাম পায়: নয়শো নব্বই টাকা।
রশিদের আসল দুধ আঠারো লিটার। দামও নয়শো নব্বই।
একই টাকা। রশিদ আঠারো লিটার খাঁটি দুধ দেয়। জহির পনেরো লিটার দুধ আর তিন লিটার পানি দেয়। রশিদের খরচ বেশি, কারণ গরুকে বেশি খাওয়াতে হয় বেশি দুধের জন্য। জহিরের খরচ কম, কারণ বাকি তিন লিটার পানি। পানির দাম শূন্য।
"আমি খাঁটি দুধ দিই। পাশের গ্রামের লোক পানি মেশায়। দাম একই। তাহলে আমি খাঁটি দুধ দিই কেন?"
রশিদ এই প্রশ্ন নিজেকে করে। উত্তর একটাই।
৫
বাবা।
রশিদের বাবা আবদুর রহিম। মারা গেছে আট বছর আগে। তিনিও দুধ বিক্রি করতেন। একই রাস্তায়। একই সংগ্রহ কেন্দ্রে। একই সাইকেলে। এই সাইকেলটা বাবার। রশিদ এখনো চালায়।
বাবা বলতেন, "দুধে পানি মেশালে আল্লাহ দেখেন।"
রশিদ বড় হয়েছে এই কথা শুনে। বাবা কোনোদিন দুধে পানি মেশাননি। বাবা গরিব মরেছেন, কিন্তু দুধ খাঁটি রেখেছেন।
রশিদও মেশায় না। বাবার কথা মনে আছে। বাবার হাত মনে আছে। সেই হাত দিয়ে দুধ দোহন করতেন, সেই হাত দিয়ে কলসি ভরতেন, সেই হাত কখনো নলের কাছে যায়নি কলসি নিয়ে।
কিন্তু আল্লাহ দেখলেও বাজার দেখে না।
বাজার দেখে ল্যাক্টোমিটার। ল্যাক্টোমিটার বলে দুধের ঘনত্ব কত। পানি মেশালে ঘনত্ব কমে। কিন্তু যদি পানির সাথে সামান্য ইউরিয়া মেশায়? ঘনত্ব ঠিক থাকে। ল্যাক্টোমিটার ধরতে পারে না। কেউ কেউ এটা করে। রশিদ জানে কে করে। সে নাম বলে না। নাম বলে লাভ নেই। সবাই জানে, কেউ কিছু করে না।
৬
রশিদের হিসাব।
ছয়টা গরু। প্রতিদিন খাবার খরচ: খড় ত্রিশ টাকা প্রতি গরু, দানাদার খাদ্য পঞ্চাশ টাকা, ভুসি কুড়ি টাকা। মোট একশো টাকা প্রতি গরু। ছয়টায় ছশো। মাসে আঠারো হাজার।
দুধের আয়: দিনে ত্রিশ লিটার, পঞ্চান্ন টাকায় ষোলোশো পঞ্চাশ। মাসে আটচল্লিশ হাজার দেড়শো। বিকালের দুধ কিছু স্থানীয়ভাবে বিক্রি করে, দাম একটু কম, পঞ্চাশ টাকা। তাতে মাসে প্রায় ছেচল্লিশ হাজার।
খরচ: গরুর খাবার আঠারো হাজার। পশু চিকিৎসা দুই হাজার। সাইকেল মেরামত পাঁচশো। কলসি, দড়ি, ছোটখাটো খরচ পাঁচশো। মোট একুশ হাজার।
হাতে থাকে পঁচিশ হাজার। মাসে। পাঁচ জনের সংসার চালাতে হয়। বউ, তিন ছেলেমেয়ে, আর রশিদ নিজে।
জহির যদি পানি মিশিয়ে তিন লিটার বাঁচায়, তাহলে মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বেশি পায়। গরুর খাবার কম লাগে। বছরে ষাট হাজার টাকা। রশিদের তুলনায়।
সততার দাম: বছরে ষাট হাজার টাকা।
৭
রশিদের বড় ছেলে সাব্বির। বয়স ষোলো। দশম শ্রেণি।
সাব্বির একদিন জিজ্ঞেস করল, "বাবা, তুমি কেন পানি মেশাও না? সবাই মেশায়।"
রশিদ থামল। ভাতের থালা থেকে মুখ তুলল। সাব্বিরের দিকে তাকাল। ছেলে বড় হচ্ছে। বুদ্ধিমান ছেলে। ক্লাসে ফার্স্ট হয়। অংক ভালো পারে। অংক পারলেই বোঝে কে কত পাচ্ছে, কে কত কম পাচ্ছে।
"বাবা বলতেন, দুধে পানি মেশালে আল্লাহ দেখেন।"
"দাদা তো মারা গেছেন।"
"তাতে কী? কথা তো মরেনি।"
সাব্বির চুপ হলো। কিন্তু তার চোখে প্রশ্ন রয়ে গেল। সে প্রশ্নটা আর মুখে বলল না, কিন্তু রশিদ জানে প্রশ্নটা কী: মরা মানুষের কথা কতদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়?
রশিদ জানে না কতদিন। সে শুধু জানে সে বেঁচে থাকা পর্যন্ত রাখবে। তারপর সাব্বিরের ব্যাপার।
৮
বিকাল। দ্বিতীয় দফা দোহন।
গরু ছয়টা। কিন্তু শঙ্খলা নামের গরুটা অসুস্থ। দুধ কমে গেছে। স্তনে সংক্রমণ। ম্যাস্টাইটিস। পশু ডাক্তার বলেছে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক চলাকালে দুধ ফেলে দিতে হবে। পাঁচ দিন। পাঁচ দিনে শঙ্খলার দুধ সাত-আট লিটার নষ্ট। মানে সাড়ে তিনশো-চারশো টাকা প্রতিদিন।
রশিদ দুধ ফেলে দেয়। অ্যান্টিবায়োটিকমিশ্রিত দুধ বিক্রি করা যায় না। করা উচিত না। কেউ কেউ করে। রশিদ করে না।
পাঁচ দিনে দুই হাজার টাকার দুধ নষ্ট। প্লাস অ্যান্টিবায়োটিকের খরচ আটশো। প্লাস ডাক্তারের ফি তিনশো।
তিন হাজার একশো টাকা। একটা গরুর একটা অসুখে।
গরু মেশিন না। গরু অসুস্থ হয়। বাচ্চা দেয়। শুকিয়ে যায়। মারা যায়। প্রতিটা ঘটনায় খরচ। প্রতিটা ঘটনায় দুধ কমে। কিন্তু গরুর খাবারের খরচ কমে না।
৯
রাত আটটায় রশিদ শোয়। সাড়ে আটটায় ঘুমিয়ে পড়ে। গভীর, ভারী ঘুম। শরীর ক্লান্ত। ভোর তিনটায় উঠবে। এর মধ্যে সাড়ে ছয় ঘণ্টা ঘুম।
স্বপ্ন দেখে না রশিদ। এত ক্লান্ত থাকে যে স্বপ্ন দেখার শক্তি নেই।
কখনো কখনো রাতে গরু ডাকে। রশিদ উঠে যায়। গোয়ালঘরে যায়। দেখে কী হয়েছে। হয়তো সাপ ঢুকেছে। হয়তো শেয়াল এসেছে। হয়তো গরুর পেট ব্যথা করছে। রশিদ দেখে, সামলায়, ফিরে আসে। আবার শোয়।
রশিদের বউ নাজমা বলে, "তুমি মানুষ না, গরুর চাকর।"
রশিদ হাসে। নাজমা ভুল বলেনি। সে গরুর চাকর। ভোর তিনটায় ওঠে গরুর জন্য। সারাদিন খটে গরুর জন্য। রাতে জেগে থাকে গরুর জন্য। গরু দুধ দেয়। দুধ বিক্রি হয়। টাকা আসে। টাকায় সংসার চলে। কিন্তু সংসার চালানোর জন্য রশিদকে গরুর চাকর হতে হয়।
১০
একদিন সংগ্রহ কেন্দ্রে নতুন নিয়ম এল।
কোম্পানি বলল, "এখন থেকে গ্রেড অনুযায়ী দাম। ফ্যাট বেশি হলে দাম বেশি। ফ্যাট কম হলে দাম কম।"
এটা ভালো খবর হওয়া উচিত ছিল রশিদের জন্য। তার দুধে ফ্যাট বেশি। খাঁটি দুধ, ভালো গরু, ভালো খাবার। কিন্তু গ্রেডিং করে কে? কোম্পানির লোক। গ্রেডিং মেশিন একটা। লাইনে ত্রিশ জন। তাড়াহুড়ো। সবার দুধ ঠিকমতো পরীক্ষা হয় না। অনেকের দুধ একসাথে মিশে যায়। গ্রেডিং হয় গড়পড়তা।
রশিদের খাঁটি দুধ আর জহিরের মেশানো দুধ একই গ্রেডে পড়ে।
রশিদ প্রতিবাদ করল। "আমার দুধ আলাদা করে টেস্ট করেন।"
পরীক্ষক বলল, "ভাই, সময় নাই। লাইন দেখেন। সবার দুধ একসাথে হয়ে যায়।"
রশিদ চুপ হলো। সে বুঝল সিস্টেম বদলেও কিছু বদলায় না। কারণ সিস্টেম চালায় মানুষ। মানুষের সময় নেই, মানুষের আগ্রহ নেই, মানুষের দরকার নেই রশিদের খাঁটি দুধ আর জহিরের মেশানো দুধ আলাদা করার।
১১
সন্ধ্যায় রশিদ গোয়ালঘরে বসে। গরুগুলো জাবর কাটছে। চোখ বড় বড়। শান্ত। তারা জানে না দুধের দাম কত। তারা জানে না দুধে কেউ পানি মেশায়। তারা শুধু ঘাস খায়, দুধ দেয়, বাচ্চা দেয়। সরল জীবন।
রশিদ ভাবে, গরুর জীবন তার চেয়ে সরল। গরুকে সততার দাম দিতে হয় না।
সে উঠে দাঁড়ায়। গোয়ালঘর থেকে বের হয়। আকাশে চাঁদ উঠেছে। রাস্তায় কেউ নেই। দূরে মসজিদে আজান হচ্ছে। রশিদ শোনে।
বাবার কথা মনে পড়ে: "দুধে পানি মেশালে আল্লাহ দেখেন।"
রশিদ মনে মনে বলে: "আল্লাহ দেখলেও বাজার দেখে না। কিন্তু আমি বাজারের জন্য দুধ দিই না। আমি আল্লাহর জন্যও দিই না। আমি বাবার জন্য দিই।"
সে ঘরে ফেরে। খায়। শোয়। ভোর তিনটায় উঠবে। গরু দোহাবে। আঠারো লিটার খাঁটি দুধ কলসিতে ভরবে। সাইকেলে চড়ে দশ কিলোমিটার যাবে। সেই একই রাস্তায়। সেই একই দামে বিক্রি করবে। যেদিন পানি মেশায়, সেদিন বাবার হাত তার কাঁধে আর থাকবে না।
রশিদ পানি মেশায় না। এটাই তার সম্পদ। টাকায় যার দাম নেই।