কামলা
একশো বছর আগে আমাদের আনা হয়েছিল। একশো বছর পরেও আমরা সেই চা বাগানেই আছি। শুধু শিকল বদলেছে।
১
বুধনির ঠিকানা নেই।
মানে ঠিকানা আছে, কিন্তু সেটা তার না। ঠিকানা হলো: ফিনলে টি এস্টেট, লেবার লাইন নম্বর ৩, ঘর ১৭, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার। এই ঠিকানার প্রতিটা শব্দ কোম্পানির। এস্টেট কোম্পানির। লেবার লাইন কোম্পানির। ঘর কোম্পানির। মাটি কোম্পানির। বুধনি শুধু তার দুটো হাত নিয়ে এই ঠিকানায় থাকে।
বুধনি আদিবাসী। উরাওঁ। তার পূর্বপুরুষ ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে এসেছিল। বিহার, রাঁচি, ঝাড়খণ্ড। ব্রিটিশরা এনেছিল। ১৮৮০ সালের দিকে। চা বাগানে কাজ করাতে। স্থানীয় বাঙালিরা চা বাগানে কাজ করতে রাজি হতো না। ওরা জানত এটা দাসশ্রম। তাই ব্রিটিশরা ভেতর থেকে এনেছিল। সাঁওতাল, মুণ্ডা, উরাওঁ, ভিল, কোল। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জমি, ঘর, ভালো মজুরি।
একশো বছরেরও বেশি হয়ে গেছে। জমি পাওয়া হয়নি।
বুধনির বয়স পঁয়তাল্লিশ। তার মা এই বাগানে কাজ করত। তার দাদি এই বাগানে কাজ করত। তার দাদির মা এই বাগানে কাজ করত। চার প্রজন্ম। একই লেবার লাইন। একই কাজ। চা পাতা তোলা।
২
ভোর পাঁচটায় হুইসেল বাজে।
এই হুইসেল বুধনির ঘড়ি। সারদার বাজায়। সারদার মানে সুপারভাইজার। বাগানের ভাষায় সারদার। সে-ও আদিবাসী। কিন্তু কোম্পানির হয়ে কাজ করে। আদিবাসীদের ওপর নজর রাখে।
বুধনি উঠে পড়ে। মুখ ধোয়ে। শাড়ি পরে। মাথায় ঝুড়ি নেয়। পিঠে বাঁশের ঝুড়ি। এই ঝুড়িতে চা পাতা রাখবে।
লেবার লাইন থেকে বাগানে যায়। পাঁচশো মিটার হাঁটা। রাস্তার দুপাশে চা গাছের সারি। সবুজ, ঘন, ছাঁটা। চা গাছ কোমর সমান উঁচু রাখা হয়। যাতে পাতা তুলতে সুবিধা হয়। গাছ বড় হতে দেওয়া হয় না। মানুষকেও বড় হতে দেওয়া হয় না। দুটোকেই একই উচ্চতায় রাখা হয়।
বুধনি পাতা তোলে। দুটো পাতা আর একটা কুঁড়ি। এটাই নিয়ম। নিচের পুরনো পাতা না। ওপরের কচি পাতা। দুটো পাতা, একটা কুঁড়ি। হাতের আঙুল আর বুড়ো আঙুলের চিমটিতে ভাঙে। ডান হাত ভাঙে, বাম হাত ঝুড়িতে ফেলে।
সারাদিন।
৩
দৈনিক মজুরি: একশো সত্তর টাকা।
এই দাম ২০২৩ সালে ঠিক হয়েছে। তার আগে ছিল একশো বিশ। তার আগে ছিল একশো দুই। প্রতিবার বাড়ে দশ-বিশ টাকা। প্রতিবার আন্দোলন হয়। শ্রমিকেরা রাস্তায় নামে। পুলিশ আসে। লাঠিচার্জ হয়। তারপর সামান্য বাড়ে।
একশো সত্তর টাকা। দিনে আট ঘণ্টা কাজ। ঘণ্টায় একুশ টাকা বারো পয়সা। মিনিটে পঁয়ত্রিশ পয়সা।
বুধনি দিনে তেইশ কেজি পাতা তোলে। এটা ন্যূনতম। তেইশ কেজি না তুললে মজুরি কাটা হয়। তেইশ কেজির বেশি তুললে প্রতি কেজি অতিরিক্তে তিন টাকা।
তেইশ কেজি চা পাতা। এই পাতা প্রক্রিয়াজাত হয়ে চা হয়। শুকিয়ে, গড়িয়ে, জারণ করে, আবার শুকিয়ে। তেইশ কেজি কাঁচা পাতা থেকে প্রায় পাঁচ কেজি চা হয়। পাঁচ কেজি চায়ের নিলাম দাম: তিনশো টাকা কেজি। পনেরোশো টাকা। খুচরা দামে আটশো থেকে হাজার টাকা কেজি। পাঁচ কেজিতে চার-পাঁচ হাজার টাকা।
বুধনি পায় একশো সত্তর।
৪
লেবার লাইন।
একটা সারিবদ্ধ ঘর। টিনের ছাদ। ইটের দেয়াল। একটা ঘর, একটা ছোট রান্নাঘর। পায়খানা বাইরে। কমন। দশটা পরিবারে একটা পায়খানা। পানির কল বাইরে। কমন। পাঁচটা পরিবারে একটা কল।
বুধনির ঘরে একটা খাট। একটা তাক। তাকে থালা-বাসন, কাপড়। মেঝেতে চাটাই। ছেলে সন্তু মেঝেতে ঘুমায়। বুধনি আর মেয়ে সুমতি খাটে।
বুধনির স্বামী মঙ্গল মারা গেছে সাত বছর আগে। যক্ষ্মা। বাগানের হাসপাতালে চিকিৎসা হয়েছিল। হাসপাতালে ডাক্তার একজন। কম্পাউন্ডার একজন। ওষুধ সীমিত। মঙ্গল শহরের হাসপাতালে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু শহরে যেতে টাকা লাগে। বাগানের হাসপাতাল ফ্রি। ফ্রি মানে বিনামূল্যে না। ফ্রি মানে বিকল্পহীন।
মঙ্গল মারা গেল। বুধনি একা।
৫
জমির অধিকার। শব্দটা বুধনি শুনেছে। ইউনিয়ন পরিষদের মিটিংয়ে। এনজিওর লোক এসেছিল। "আদিবাসী চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার দিতে হবে।"
বুধনি হাসে। ভূমি অধিকার। একশো বছরেরও বেশি আগে তার পূর্বপুরুষদের জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আনা হয়েছিল। এখনো সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। এখন এনজিওর লোক বলছে অধিকার দিতে হবে। কে দেবে? কোম্পানি? সরকার?
বাগানের জমি কোম্পানির। লিজ। সরকারের কাছ থেকে লিজ নেওয়া। নব্বই বছর, একশো বছরের লিজ। লিজের মেয়াদ শেষ হলে নবায়ন হয়। শ্রমিকদের জিজ্ঞেস করা হয় না।
বুধনি জন্মেছে এই বাগানে। তার জন্ম নিবন্ধন আছে। ভোটার আইডি আছে। জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। কিন্তু জমির দলিল নেই। ঘরের মালিকানা নেই। সে চলে গেলে ঘর কোম্পানি অন্যকে দেবে। সে মরে গেলে ছেলে যদি বাগানে কাজ করে, তাহলে ঘর পাবে। না করলে বের হয়ে যেতে হবে।
চার প্রজন্ম। কোনো সম্পদ নেই। কোনো জমি নেই। কোনো বাড়ি নেই। আছে শুধু দুটো হাত আর পাতা তোলার দক্ষতা।
৬
সুমতি। বুধনির মেয়ে। বয়স সতেরো। অষ্টম শ্রেণি পাস করে থেমে গেছে। বাগানের স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। তারপর? তারপর শহরে যেতে হয়। শ্রীমঙ্গলে। সেখানে হাই স্কুল আছে। কিন্তু ভর্তি হতে টাকা লাগে, বই লাগে, যাতায়াত লাগে। বুধনির পক্ষে দেওয়া সম্ভব না।
সুমতি বাগানে কাজ শুরু করেছে। মায়ের পাশে। একই ঝুড়ি, একই পাতা, একই মজুরি। একশো সত্তর টাকা। পঞ্চম প্রজন্ম।
কিন্তু সুমতি ঠিক বুধনির মতো না। সুমতির চোখে কিছু একটা আছে যেটা বুধনির চোখে নেই। অস্থিরতা। সুমতি ফোন দেখে। বাগানে একটা মোবাইল টাওয়ার আছে, নেটওয়ার্ক পায়। পুরনো একটা স্মার্টফোন কিনেছে তিন হাজার টাকায়। ফেসবুক দেখে। ঢাকা দেখে। চট্টগ্রাম দেখে। অন্য মেয়েদের জীবন দেখে।
সুমতি বলে, "আম্মা, আমি ঢাকায় যাব।"
৭
বুধনি প্রথমে কিছু বলল না।
তারপর বলল, "ঢাকায় কী করবি?"
"গার্মেন্টসে কাজ করব। মিনা দিদি গেছে। সে মাসে পনেরো হাজার পায়।"
পনেরো হাজার। বুধনি হিসাব করল। সে মাসে পায় পাঁচ হাজার একশো। ছাব্বিশ কর্মদিবসে একশো সত্তর করে। বৃষ্টির দিনে কাজ বন্ধ, ছুটিতে কাজ বন্ধ। তিন গুণ পাবে সুমতি।
কিন্তু ঢাকা। বুধনি ঢাকায় যায়নি কোনোদিন। সে জানে না ঢাকা কেমন। সে জানে সুন্দরবন কেমন, মানে চা বাগান কেমন। চা বাগানের বাইরে সে কিছু জানে না।
"যাবি তো যা। কিন্তু ফিরে আসবি না। এখানে ফেরার কিছু নেই।"
বুধনি এটা বলল শক্ত গলায়। কিন্তু ভেতরে কাঁপছিল। মেয়ে চলে যাবে। একা থাকবে সে। সন্তু আছে, কিন্তু সন্তু বারো বছর। ছোট।
সুমতি তাকাল। মায়ের চোখে জল দেখল। কিন্তু বুধনি মুখ ফিরিয়ে নিল। আদিবাসী মেয়েরা সামনে কাঁদে না। পেছনে কাঁদে।
৮
একশো বছরের হিসাব।
১৮৮০ সালে বুধনির পূর্বপুরুষ এসেছিল ছোটনাগপুর থেকে। আসতে রাজি হয়েছিল কারণ ছোটনাগপুরে দুর্ভিক্ষ ছিল। ব্রিটিশরা বলেছিল, "চলো, কাজ আছে, খাবার আছে, জমি দেব।"
তারা এসেছিল। হেঁটে। ট্রেনে। গরুগাড়িতে। কেউ জুতা পরেনি। কেউ জানত না বাংলাদেশ কোথায়, সিলেট কোথায়, চা কী জিনিস।
তারা চা বাগানে ঢুকেছিল। জঙ্গল কেটেছিল। জমি পরিষ্কার করেছিল। চা গাছ লাগিয়েছিল। বাগান তৈরি করেছিল।
তারপর বাগান তাদের হয়নি। বাগান কোম্পানির হয়ে গেছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা পাতা তুলেছে। ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ কোম্পানির জন্য। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানি কোম্পানির জন্য। বাংলাদেশ আমলে বাংলাদেশি কোম্পানির জন্য।
"একশো বছর আগে আমাদের আনা হয়েছিল চা বাগানে কাজ করাতে। একশো বছর পরেও আমরা সেই চা বাগানেই আছি। শুধু শিকল বদলেছে।"
বুধনি এটা একদিন বলেছিল এনজিওর লোককে। এনজিও লোকটা লিখে নিয়েছিল। হয়তো কোনো রিপোর্টে ছাপা হয়েছে। রিপোর্টে ছাপা হলে কী হয়? কিছু হয় না। বুধনি পরদিন সকালে আবার পাতা তুলেছে।
৯
সন্তু। বারো বছর। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বাগানের স্কুলে। স্কুলে বাংলা পড়ানো হয়। কিন্তু ঘরে সুমতি আর বুধনি সাদরি ভাষায় কথা বলে। উরাওঁদের ভাষা। সাদরি মরে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম বাংলা বলে। সাদরি শুধু বুড়ো মানুষরা বলে। বুধনি বলে।
সন্তু সাদরি বুঝতে পারে, কিন্তু বলতে পারে না ভালো। বুধনি বলে, "তুই আমার ভাষাটাও হারিয়ে ফেলবি।"
ভাষা। জমি। সংস্কৃতি। সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে। বুধনির মা করম পূজা করত। করম হলো উরাওঁদের প্রধান উৎসব। ভাদ্র মাসে। করম গাছের ডাল এনে উঠোনে পুঁতে নাচ হয়, গান হয়। বুধনি এখনো করম করে। কিন্তু সুমতি আগ্রহী না। সন্তু জানে না করম কী।
একটা জাতি একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে। ভাষা যাচ্ছে। উৎসব যাচ্ছে। পোশাক যাচ্ছে। নাম যাচ্ছে। বুধনি, মঙ্গল, সন্তু, সুমতি, এগুলো আদিবাসী নাম। পরের প্রজন্মে কেউ রাখবে কি না সন্দেহ।
১০
সকাল। হুইসেল বাজল।
বুধনি ঝুড়ি মাথায় নিয়ে বাগানে যায়। সবুজ সারি। চা গাছের গন্ধ। ভেজা মাটির গন্ধ। কুয়াশা। মৌলভীবাজারের পাহাড়ি বাতাস।
সুমতি পাশে হাঁটে। কাল সুমতি ঢাকায় যাবে। মিনা দিদির ঠিকানায়। গাজীপুরে। একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ হবে। পনেরো হাজার টাকা। বুধনির তিন গুণ।
বুধনি আর সুমতি পাশাপাশি পাতা তোলে। আজ শেষ দিন একসাথে। বুধনি সুমতির হাতের দিকে তাকায়। ছোট হাত। দ্রুত হাত। দুটো পাতা, একটা কুঁড়ি। ডান হাতে ভাঙে, বাম হাতে ঝুড়িতে ফেলে। বুধনি নিজেকে দেখে এই হাতে। ত্রিশ বছর আগে তার হাতও এমন ছিল। দ্রুত। তরুণ।
বুধনি কিছু বলে না। পাতা তোলে। চুপচাপ। সারাদিন।
বিকালে ওজন হয়। বুধনি তেইশ কেজি। সুমতি পঁচিশ কেজি। সুমতি বেশি তুলেছে। তরুণ হাত। ক্লান্ত হয় না তাড়াতাড়ি।
রাতে বুধনি সুমতির ব্যাগ গুছিয়ে দেয়। বেশি কিছু নেই। দুটো শাড়ি, একটা সেলোয়ার-কামিজ, সাবান, চিরুনি, ফোন, চার্জার। আর একটা পুঁটলিতে মুড়ি আর গুড়। রাস্তায় খাবে।
সুমতি ঘুমিয়ে পড়ে। বুধনি জেগে থাকে। মেয়ের মুখের দিকে তাকায়। তারপর চোখ বুজে মনে করে তার মায়ের কথা। তার মাও এই খাটে ঘুমাত। তার মাও এই বাগানে পাতা তুলত। তার মাও একদিন মরে গেছে এই ঘরে। এই বাগানে। জীবনে একবারও বাগানের বাইরে যায়নি।
বুধনি ভাবে, সুমতি বাইরে যাবে। এটা ভালো। এটা প্রথম। চার প্রজন্মে প্রথমবার কেউ বাগানের বাইরে পা রাখবে।
কিন্তু তারপর? গাজীপুরের গার্মেন্টসে কি সুমতির জীবন ভিন্ন হবে? সেখানেও তো সে শ্রমিক। সেখানেও তো সে পাতা তোলে, শুধু পাতার বদলে কাপড় সেলাই করে। সেখানেও তো কোম্পানি দাম ঠিক করে। সেখানেও তো সে ঘর পায় কোম্পানির না, ঘর ভাড়া করে অন্যের। শিকল বদলায়। আকার বদলায়। শিকল থাকে।
ভোরে সুমতি উঠবে। চলে যাবে। বুধনি ঝুড়ি মাথায় নিয়ে বাগানে যাবে। একা। সারাদিন পাতা তুলবে। একা। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরবে। একা। সন্তু আছে। কিন্তু সন্তুও একদিন যাবে। তারপর বুধনি একা থাকবে এই ঘরে, যেটা তার না।
হুইসেল বাজবে। বুধনি উঠবে। পাতা তুলবে। একশো সত্তর টাকা পাবে। মরবে। এই বাগানেই।
বাইরে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। চা বাগানের ঝিঁঝিঁ। একশো বছর ধরে একই আওয়াজ করছে। আওয়াজ বদলায়নি। মজুরি বদলেছে, কিন্তু দারিদ্র্য বদলায়নি। মালিক বদলেছে, কিন্তু শ্রম বদলায়নি। দেশ বদলেছে, কিন্তু শোষণ বদলায়নি।
বুধনি চোখ বোজে। ঘুমানোর চেষ্টা করে। কাল আবার হুইসেল বাজবে।