নৌকা-নির্মাতা

কাঠের নৌকা পানি বোঝে। ফাইবারগ্লাস শুধু ভাসে।

পর্ব ৭১ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

মস্তফার হাতে কাঠের গন্ধ।

চল্লিশ বছর ধরে এই গন্ধ। শিশু কাঠ, মেহগনি, জারুল, কেওড়া। প্রতিটা কাঠের গন্ধ আলাদা। শিশু ভারী, তীব্র। কেওড়া হালকা, একটু টক। মস্তফা চোখ বন্ধ করে বলতে পারে কোন কাঠ কোনটা। নাকে নিলেই জানে।

বরিশাল। কীর্তনখোলা নদীর ধারে তার কারখানা। কারখানা বললে বেশি বলা হয়। টিনের চাল, তিনদিকে খোলা, একদিকে বাঁশের বেড়া। মাটির মেঝে। কাঠের গুঁড়ো জমে জমে মেঝেটা নরম হয়ে গেছে, পায়ে দেবে যায়।

এখানে মস্তফা নৌকা বানায়।

তার বাবা বানাত। বাবার বাবা বানাত। কত পুরুষ আগে শুরু হয়েছিল কেউ জানে না। মস্তফা জানে বারো বছর বয়সে বাবা তার হাতে একটা বাটালি দিয়েছিল। বলেছিল, "ধর।" এর বেশি শেখানোর দরকার হয়নি। দেখে দেখে শিখেছে। হাতে হাতে শিখেছে। কাঠ কোথায় কাটতে হয়, কোথায় ছেড়ে দিতে হয়, কোথায় জোড়া লাগাতে হয়। কাঠের শিরা কোনদিকে গেছে, সেটা না বুঝলে নৌকা পানিতে ফাটবে।

মস্তফার বয়স এখন বাষট্টি।

একটা কাঠের নৌকা বানাতে ছয় মাস লাগে।

প্রথম মাস: কাঠ বাছাই। মস্তফা নিজে যায় কাঠের আড়তে। প্রতিটা গুঁড়ি হাত দিয়ে দেখে। টোকা মারে। শব্দ শোনে। ভালো কাঠে টোকা মারলে একটা ঠন ঠন আওয়াজ হয়, পরিষ্কার। পচা কাঠ বোবা, শব্দ গিলে খায়।

দ্বিতীয় মাস: কাঠ চেরাই। করাত দিয়ে তক্তা করা। প্রতিটা তক্তার পুরুত্ব সমান হতে হবে। মেশিনে করলে সমান হয়, কিন্তু মস্তফা মেশিন ব্যবহার করে না। হাতে করাত চালায়। বলে, "মেশিন কাঠকে চেনে না। আমি চিনি।"

তৃতীয় মাস: হাড় বসানো। নৌকার কঙ্কাল। পাঁজরের মতো বাঁকা কাঠ, একটার পর একটা। এখানে মাপের ভুল হলে নৌকা বাঁকা হবে। পানিতে একদিকে কাত হবে। মস্তফার চোখই তার মাপার যন্ত্র। সে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে, মাথা একটু কাত করে, তারপর বলে, "ডানদিকে একটু বেশি হয়েছে।" শ্রমিক মাপে। ঠিকই একটু বেশি।

চতুর্থ মাস: তক্তা বসানো। পাঁজরের ওপর তক্তা। প্রতিটা তক্তার জোড়ায় তুলা আর আলকাতরা। পানি ঢুকবে না। এই কাজে ধৈর্য লাগে। তাড়াহুড়ো করলে ফাঁক থাকবে। ফাঁক থাকলে নৌকা ডুববে।

পঞ্চম মাস: ছাদ, হাল, দাঁড়। ছোট ছোট কাজ, কিন্তু প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ। হালের কাঠ সবচেয়ে শক্ত হতে হবে। স্রোতের চাপ সব এখানে পড়ে।

ষষ্ঠ মাস: রং, চূড়ান্ত পরীক্ষা, পানিতে নামানো। মস্তফা নৌকাটা প্রথমবার পানিতে নামানোর সময় নিজে ওঠে। পানি কেমন ধরে দেখে। নৌকা কতটুকু ডোবে দেখে। হাত দিয়ে পানি ছোঁয়। নৌকার গায়ে কান পাতে। পানির শব্দ শোনে।

"কাঠের নৌকা পানির সাথে কথা বলে," মস্তফা বলে। "শুনলে বোঝা যায়।"

গত বছর একটা নৌকা বানিয়েছিল। পঁচিশ ফুট। কেওড়া কাঠ। ছয় মাস খাটল। দুইজন শ্রমিক সাথে ছিল, রহিম আর কাদের। দুজনেই বিশ বছর ধরে মস্তফার সাথে কাজ করে।

কাঠের দাম: পঁয়ত্রিশ হাজার। শ্রমিকের মজুরি: কুড়ি হাজার। আলকাতরা, তুলা, পেরেক, রং: দশ হাজার। মস্তফার নিজের ছয় মাসের শ্রম: হিসাবের বাইরে।

বিক্রি করল আশি হাজার টাকায়।

লাভ পনেরো হাজার। ছয় মাসে। মাসে আড়াই হাজার।

ক্রেতা একজন মাছধরা নৌকার মালিক। পটুয়াখালী থেকে এসেছিল। নৌকাটা দেখে, ছুঁয়ে, টোকা মেরে সন্তুষ্ট হয়ে কিনল। বলল, "মস্তফা ভাই, আপনার নৌকা পানিতে আলাদা চলে। বুঝি পানি কাটে কেমন করে।"

মস্তফা কিছু বলল না। মনে মনে ভাবল, এটা শেষ নৌকা হতে পারে।

ফাইবারগ্লাস এসেছে।

বরিশালের ঘাটে এখন ফাইবারগ্লাসের নৌকা সারি সারি। সাদা, চকচকে, হালকা। দুই সপ্তাহে বানানো যায়। ছাঁচে ঢালাই, শুকানো, পালিশ। কোনো করাত লাগে না। কোনো বাটালি লাগে না। কোনো চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা লাগে না।

দাম পঞ্চাশ হাজার। পঁচিশ ফুট।

মস্তফার কাঠের নৌকা আশি হাজার। একই মাপের।

ত্রিশ হাজার টাকা কম। ছয় মাসের বদলে দুই সপ্তাহ। হিসাব সোজা।

মস্তফা একদিন ঘাটে গেল। ফাইবারগ্লাসের নৌকা দেখল। হাত দিয়ে ছুঁল। মসৃণ, ঠান্ডা, প্লাস্টিকের মতো। টোকা মারল। শব্দ ফাঁপা, বোবা। কাঠের ঠন ঠন নেই। নৌকার ভেতরে ঢুকল। হালকা, দুললেই দোলে। কাঠের নৌকার ভার নেই, স্থিরতা নেই।

"এটা নৌকা না," মস্তফা বলল। "এটা প্লাস্টিকের বাটি।"

কেউ শুনল না। অথবা শুনল, কিন্তু কেউ একমত হলো না।

রহিম চলে গেল আগে। ফাইবারগ্লাসের কারখানায় কাজ নিল। মাসে বারো হাজার টাকা। নিয়মিত।

"মস্তফা ভাই, ক্ষমা করবেন। সংসার আছে।"

মস্তফা কিছু বলল না। কী বলবে? রহিমের তিনটা ছেলেমেয়ে। স্কুলে পড়ে। মাসে আড়াই হাজার টাকায় তিনটা বাচ্চা পড়ানো যায় না।

কাদের রইল আরো তিন মাস। তারপর সেও গেল। অটো চালাতে শুরু করল। দিনে পাঁচশো-ছশো আসে।

মস্তফা একা।

কারখানায় এখন সে একা বসে থাকে। কাঠের গুঁড়ো পুরোনো। নতুন গুঁড়ো পড়ে না। করাত ঝুলছে দেয়ালে। বাটালি, রাঁদা, হাতুড়ি, সব যথাস্থানে আছে। মরিচা ধরতে শুরু করেছে।

মস্তফার ছেলে জামিল ঢাকায় থাকে। গার্মেন্টসে সুপারভাইজার। মাসে পঁচিশ হাজার। ফোনে বলে, "বাবা, ওসব ছাড়ো। ঢাকায় চলে আসো।"

মস্তফা বলে, "আসব।" কিন্তু আসে না।

শেষবারের মতো একটা নৌকা বানাতে চায় মস্তফা।

কিন্তু অর্ডার নেই। কে দেবে আশি হাজার টাকা, ছয় মাস অপেক্ষা করবে, যখন পঞ্চাশ হাজারে দুই সপ্তাহে পাওয়া যায়?

মস্তফা তবু কাঠ কিনল। নিজের জমানো টাকা দিয়ে। শিশু কাঠ। সবচেয়ে ভালো জাত। পনেরো হাজার টাকার কাঠ। কারো জন্য না। নিজের জন্য।

সকালে উঠে কারখানায় আসে। করাত ধরে। কাঠ চেরাই করে। একা। শ্রমিক নেই। সময় লাগবে বেশি। আট মাস, হয়তো দশ। কিছু যায় আসে না।

কাঠে করাত বসালে যে শব্দ হয়, সেটা মস্তফার কাছে সঙ্গীত। বারো বছর বয়স থেকে এই শব্দ শুনছে। করাতের দাঁত কাঠের আঁশে ঢোকে, ছিঁড়ে বের হয়, আবার ঢোকে। ছন্দ আছে এতে। তাল আছে।

মস্তফা করাত চালায়। ঘাম পড়ে কাঠের ওপর। ঘামে কাঠ ভেজে। মস্তফা মনে করে, এই নৌকায় তার ঘাম মিশে থাকবে।

কিন্তু নৌকাটা কেউ কিনবে না। সে জানে।

বিকালে নদীর ঘাটে বসে মস্তফা।

নদীতে নৌকা যায়। বেশিরভাগ ফাইবারগ্লাস। সাদা, চকচকে। ইঞ্জিনের শব্দে পানি কাঁপে। একটা দুইটা কাঠের নৌকা আছে এখনো। পুরোনো। রং ওঠা। তক্তার ফাঁক দিয়ে আলকাতরা গলে বের হচ্ছে। কিন্তু চলছে। পানি কাটছে নিঃশব্দে, যেভাবে কাঠের নৌকা কাটে।

মস্তফা চেনে ওই নৌকাগুলো। কোনটা তার বাবার বানানো। কোনটা তার। একটা নৌকা, প্রায় তিরিশ বছর পুরোনো, এখনো চলছে। মস্তফা নিজে বানিয়েছিল। প্রথম দিকের কাজ। জারুল কাঠ। হালটা একবার বদলাতে হয়েছিল, বাকি সব আগেরই।

ফাইবারগ্লাসের নৌকা কত বছর টেকে? দশ, বারো। তারপর ফেটে যায়, রোদে। মেরামত করা যায় না ঠিকমতো। ফেলে দিতে হয়।

কাঠের নৌকা তিরিশ বছর চলে। মেরামত করা যায়। তক্তা বদলানো যায়। হাড় ঠিক থাকলে নৌকা চলবে।

কিন্তু কে ভাবে তিরিশ বছর? সবাই ভাবে আপাতত কম খরচে কাজ চলুক।

"কাঠের নৌকা পানি বোঝে," মস্তফা বলে। "ফাইবারগ্লাস শুধু ভাসে।"

কথাটা সত্য। কিন্তু সত্য দিয়ে ভাত হয় না।

মস্তফার স্ত্রী রাবেয়া। সে জানে নৌকার অর্ডার নেই। সে জানে মস্তফা নিজের টাকায় কাঠ কিনে নৌকা বানাচ্ছে যেটা কেউ কিনবে না। সে কিছু বলে না।

রাবেয়া সকালে ভাত রান্না করে। দুপুরে কারখানায় খাবার দিয়ে আসে। মস্তফা কাঠের গুঁড়োয় বসে ভাত খায়। ভাতের সাথে শুকনো মরিচ, একটু ডাল। মাছ দুই-তিনদিনে একবার।

রাবেয়ার হাতে ক্যালাস নেই। তার হাতে রান্নার পোড়া দাগ আছে। তেলের ছিটা, আগুনের ছোঁয়া। দুজনের শরীরে কাজের মানচিত্র আঁকা। আলাদা কাজ, আলাদা দাগ।

জামিল ফোনে টাকা পাঠায়। মাসে পাঁচ হাজার। এটা দিয়ে চলে। কারখানা থেকে আয় শূন্য।

রাবেয়া একদিন বলল, "নৌকাটা বানাও। তোমার মন ভালো থাকে।"

এটুকুই। এর বেশি কিছু বলল না। মস্তফাও কিছু বলল না। দুজনে জানে কী হচ্ছে। কথা বলার দরকার নেই।

নৌকার হাড় দাঁড়িয়ে গেছে। কঙ্কালের মতো দেখায়। পাঁজরের বাঁকা কাঠগুলো দুপাশে ছড়ানো। ভেতর থেকে আকাশ দেখা যায়। মস্তফা দাঁড়িয়ে দেখে। সুন্দর লাগে তার। একটা নৌকার কঙ্কাল সুন্দর কেন সেটা সে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিন্তু জানে, যেভাবে পানি জানে কোথায় গড়াতে হবে।

তক্তা বসাতে শুরু করল। একা কাজ। আগে দুজন ধরত দুই মাথায়, মস্তফা মাঝখানে পেরেক মারত। এখন একা। এক মাথা ক্ল্যাম্পে আটকায়, অন্য মাথা কাঁধে ধরে, হাতুড়ি মারে। সময় লাগে তিনগুণ।

হাতুড়ি মারতে গিয়ে বুড়ো আঙুলে লাগল। নখ কালো হলো। ফুলে গেল। মস্তফা আঙুল মুখে নিল, রক্তের স্বাদ পেল, থুতু ফেলল, আবার হাতুড়ি ধরল।

পাড়ার ছেলেরা মাঝে মাঝে এসে দেখে। একটা ছেলে জিজ্ঞেস করল, "দাদু, কার জন্য বানাচ্ছেন?"

মস্তফা বলল, "কারো জন্য না।"

ছেলেটা বুঝল না। ছেলেটার বোঝার কথাও না। বারো বছর বয়সে মস্তফাও বুঝত না। সে শুধু বাবার হাতে বাটালি দেখত, বাবার হাতের ক্যালাস দেখত, তারপর একদিন নিজের হাতেও ক্যালাস হলো।

এই ছেলেটার হাতে ক্যালাস হবে না। সে মোবাইল ফোন ধরবে। কম্পিউটার ধরবে। হাত নরম থাকবে।

১০

নৌকা শেষ হবে আরো চার মাস পরে। হয়তো পাঁচ।

মস্তফা জানে না নৌকা শেষ হলে কী হবে। বিক্রি হবে না। ঘাটে বেঁধে রাখবে হয়তো। পানিতে ভাসিয়ে দেবে। অথবা কারখানায়ই রেখে দেবে, শেষ কাজের সাক্ষী হয়ে।

সন্ধ্যায় কারখানা বন্ধ করে। যন্ত্রপাতি যথাস্থানে রাখে। বাটালির ধার পরীক্ষা করে আঙুলের ডগায়। এখনো ধার আছে। রাঁদায় একটু তেল দেয়, মরিচা থেকে বাঁচাতে। হাতুড়ির বাঁটে কাপড় জড়ায়।

এই যন্ত্রগুলো তার বাবার। হাতুড়ির বাঁট তিনবার বদলেছে, কিন্তু মাথাটা সেই আগেরই। বাটালির ফলা বাবার হাতে ক্ষয়ে পাতলা হয়েছে, মস্তফার হাতে আরো পাতলা।

এগুলো কাকে দেবে? জামিল নেবে না। জামিলের ঢাকায় কারখানা নেই, নদীর ধার নেই, কাঠের গন্ধ নেই।

মস্তফা ঘরে ফেরে। রাবেয়া ভাত বাড়ে। মস্তফা খায়। শোয়।

রাতে নদীর শব্দ আসে জানালা দিয়ে। জোয়ারের পানি উঠছে। পানি কারখানার ভিটে ছুঁয়ে যাচ্ছে। মস্তফার অসমাপ্ত নৌকার কঙ্কাল ভিজছে জোয়ারের ছোঁয়ায়।

নৌকা পানিতে নামেনি এখনো। কিন্তু পানি নৌকার কাছে এসেছে। যেন অপেক্ষা করছে।

মস্তফার যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরছে। তার হাতের ক্যালাস পুরোনো হচ্ছে, নতুন ক্যালাস হচ্ছে না। কারখানায় কাঠের গুঁড়ো পুরোনো। নতুন গুঁড়ো কম পড়ে।

চল্লিশ বছরের কাজ। একজন মানুষের পুরো জীবন। ছয় মাসে একটা নৌকা, বছরে দুইটা, চল্লিশ বছরে আশিটা। আশিটা নৌকা ভাসছে কোথাও, অথবা ডুবে গেছে, অথবা পচে গেছে কোনো ঘাটে। প্রতিটায় মস্তফার ঘাম আছে, হাতের ছাপ আছে, চোখের মাপ আছে।

ফাইবারগ্লাসের কারখানায় কারো ঘাম থাকে না। ছাঁচে ঢালাই হয়, শুকায়, বের হয়। একটার সাথে আরেকটার কোনো তফাত নেই।

মস্তফার প্রতিটা নৌকা আলাদা ছিল। কারণ কাঠ আলাদা, হাত আলাদা, দিন আলাদা।

এটা কেউ বোঝে না আর। বোঝার দরকারও নেই হয়তো। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। মস্তফা পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে বাটালি, পায়ে কাঠের গুঁড়ো।