জাল বুনন

জাল ছাড়া মাছ ধরা যায় না। কিন্তু জাল বোনার দাম কেউ দেয় না।

পর্ব ৭২ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

নূরজাহানের আঙুলে সুতার দাগ।

দশটা আঙুলের প্রতিটায় সুতা কেটে গেছে, বারবার, একই জায়গায়। চামড়া শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু নিচের মাংসে ব্যথা আছে। নাইলন সুতা ধারালো। দ্রুত টানলে রক্ত বের হয়। ধীরে টানলে সময় বেশি লাগে। নূরজাহান ধীরে টানার সময় পায় না।

কক্সবাজারের একটা মাছ ধরা গ্রাম। শহর থেকে দক্ষিণে, সমুদ্রের কাছে। গ্রামের নাম বলা যায়, কিন্তু বললেও কিছু হবে না। এরকম গ্রাম এই উপকূলে শতখানেক আছে। প্রতিটায় পুরুষেরা সমুদ্রে যায়, মেয়েরা জাল বোনে।

জাল বোনা মেয়েদের কাজ। এটা কেউ ঠিক করে দেয়নি। কোনো আইন নেই, কোনো বিধান নেই। কিন্তু কেউ কখনো প্রশ্ন করে না। পুরুষেরা সমুদ্রে যায় কারণ সমুদ্র বিপজ্জনক, কারণ নৌকা ভারী, কারণ ঢেউ জোরে আসে। মেয়েরা ঘরে বসে জাল বোনে কারণ জাল ধৈর্যের কাজ, কারণ আঙুল সরু হলে গিঁট ভালো হয়, কারণ এটা "হালকা কাজ।"

হালকা কাজ। নূরজাহান এই কথায় হাসে। হাসিটা শুকনো।

একটা জাল বুনতে চার ঘণ্টা লাগে।

সুতা কেনে বাজার থেকে। নাইলন সুতা। এক কেজি দেড়শো টাকা। এক কেজিতে তিনটা জাল হয়। প্রতিটা জাল বিক্রি হয় পঞ্চাশ টাকায়। তিনটায় দেড়শো। সুতার দাম দেড়শো। লাভ শূন্য।

না, শূন্যও না। নূরজাহান নিজের শ্রমের দাম ধরে না। কোনো মেয়ে ধরে না। শ্রমের দাম ধরলে প্রতিটা জালের দাম হয় দুইশো টাকা। কেউ দুইশো দেবে না। পঞ্চাশই কম মনে করে।

"জাল ছাড়া মাছ ধরা যায় না। কিন্তু জাল বোনার দাম কেউ দেয় না।"

নূরজাহান এটা বলে, কিন্তু কাউকে বলে না। নিজের মনে বলে। কে শুনবে? আড়তদার? সে বলবে, "না বুনলে বুনো না। চায়না থেকে জাল আসে, মেশিনে বানানো, সস্তা।" ঠিকই বলবে। চায়নার জাল আসে। মেশিনে বানানো। কিন্তু হাতে বোনা জালের গিঁট শক্ত, চায়নার জাল ছেঁড়ে তাড়াতাড়ি। মাছ ধরার লোকেরা জানে। তাই এখনো কেনে। তাই নূরজাহানের আঙুলে এখনো সুতার দাগ।

নূরজাহানের স্বামীর নাম ছিল আনোয়ার।

ছিল। এখন নেই। নামটা আছে, মানুষটা নেই।

তিন বছর আগে। কার্তিক মাস। মাছ ধরার মৌসুম। আনোয়ার সকালে সমুদ্রে গেল। ট্রলারে। চৌদ্দজন ছিল। আকাশ পরিষ্কার ছিল সকালে। বিকালে মেঘ করল। সন্ধ্যায় বাতাস বাড়ল। রাতে ঝড়।

পরদিন সকালে ট্রলার ফিরল না।

দুইদিন পর ট্রলারের একটা ভাঙা টুকরো ভেসে এল। কাঠের টুকরো। নীল রং। নূরজাহান চিনল। ট্রলারের গলুইয়ের কাঠ। আনোয়ার নিজে রং করেছিল, ঈদের আগে।

চৌদ্দজনের মধ্যে তিনজনের লাশ পাওয়া গেল। আনোয়ারের পাওয়া যায়নি। সমুদ্র নিয়ে গেছে। সমুদ্র ফেরত দেয় না।

জানাজা হলো। লাশ ছাড়া জানাজা। গায়েবানা জানাজা বলে। ইমাম সাহেব দোয়া পড়লেন। নূরজাহান পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখ শুকনো। কাঁদতে পারেনি। পরে কেঁদেছে, রাতে, একা, যখন বাচ্চা দুটো ঘুমিয়ে গেছে।

ক্ষতিপূরণ: শূন্য।

ট্রলারের মালিক বলল, "আমারও তো ট্রলার গেছে। আমি কোথা থেকে দেব?"

সরকারি সাহায্য: দশ হাজার টাকা। একবার। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। চেয়ারম্যান নিজে দিয়ে গেলেন। বললেন, "আর কিছু লাগলে বলবেন।" আর আসেননি।

বিমা: কী বিমা? মাছ ধরার ট্রলারে কোনো বিমা নেই। জেলেদের জীবনবিমা নেই। কেউ করে না। কোনো কোম্পানি করতে চায় না। ঝুঁকি বেশি।

আনোয়ারের মা বেঁচে আছেন। বুড়ি মানুষ। চোখে দেখেন কম। তিনি বললেন, "সমুদ্র দিয়েছে, সমুদ্র নিয়েছে।" এই দর্শন। এই মেনে নেওয়া। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই উপকূলের মানুষ এভাবেই মেনে নেয়। সমুদ্র দেবতা না, কিন্তু দেবতার মতো আচরণ করে। দেয় মাছ, নেয় মানুষ। কোনো হিসাব নেই।

নূরজাহানের দুটো ছেলেমেয়ে। ছেলে ফয়সাল, বারো। মেয়ে রুমা, আট। ফয়সাল স্কুলে যায়। রুমাও। কিন্তু কতদিন যাবে?

নূরজাহান সকাল পাঁচটায় ওঠে।

ফজরের নামাজ পড়ে। চুলা ধরায়। ভাত চাপায়। গত রাতের বাসি তরকারি গরম করে। বাচ্চাদের ডাকে। ফয়সাল আর রুমা খায়। স্কুলে যায়।

তারপর নূরজাহান উঠোনে বসে। পা ছড়িয়ে। সুতার বান্ডিল খোলে। জাল বুনতে শুরু করে।

সকাল ছটা থেকে দুপুর বারোটা। ছয় ঘণ্টায় দেড়টা জাল। মাঝে একবার উঠে চা খায়। চা মানে লাল চা, চিনি দিয়ে। দুধ নেই। দুধ কেনার সামর্থ্য নেই।

দুপুরে ভাত খায়। একটু রান্না করে। ডাল, কখনো সবজি। মাছ পায় কখনো কখনো। পাড়ার জেলেরা দেয়। ছোট মাছ, যেগুলো বিক্রি হয় না। ইলিশ না, লইট্টা, ছুরি, চিংড়ির ছোটগুলো।

বিকালে আবার বসে। তিনটা থেকে সন্ধ্যা ছটা। আরো দেড়টা জাল।

দিনে তিনটা। সপ্তাহে একুশটা। মাসে নব্বইটা। মাসে আয়: নব্বই গুণ পঞ্চাশ, সাড়ে চার হাজার। সুতার খরচ বাদ: শূন্য। না, শূন্যও না। কিছু জাল ছেঁড়া সুতা দিয়ে বানায়, পুরোনো জাল খুলে সুতা বের করে। সেটুকু বাঁচে।

মাসে দেড়-দুই হাজার টাকা হাতে থাকে। এই দিয়ে তিনটা প্রাণ বাঁচে।

সন্ধ্যায় নূরজাহান সমুদ্রের দিকে তাকায়।

এটা অভ্যাস না। এটা যন্ত্রণা। আনোয়ার ফিরবে না, এটা সে জানে। কিন্তু সমুদ্রের দিকে তাকালে একটা কিছু হয় বুকের ভেতরে। ব্যথা? না। ব্যথার চেয়ে নিচে কিছু। একটা শূন্যতা। পেটের ভেতর যেমন না খেয়ে থাকলে চুষে ধরে, তেমন।

সমুদ্র সুন্দর দেখায় সন্ধ্যায়। লাল আলো পানিতে ছড়ায়। ঢেউ ধীর হয়। বাতাসে নুনের গন্ধ। পর্যটকেরা আসে, ছবি তোলে। "কত সুন্দর সমুদ্র!"

নূরজাহানের কাছে সমুদ্র সুন্দর না। সমুদ্র একটা কবর। যার ওপরে কোনো চিহ্ন নেই, কোনো নাম লেখা নেই।

ফয়সাল বলে, "আম্মু, আমি বড় হয়ে সমুদ্রে যাব।"

নূরজাহানের বুক হিম হয়ে যায়। সে বলে, "না।"

ফয়সাল বলে, "কেন? বাবা যেত।"

নূরজাহান কিছু বলে না। কী বলবে? বাবা যেত, বাবা ফেরেনি? এটা বললে ছেলে আরো যেতে চাইবে। বারো বছরের ছেলে, বাবার মতো হতে চায়। বাবার মতো সাহসী হতে চায়। সে জানে না সাহস আর বাধ্যবাধকতার মধ্যে তফাত। আনোয়ার সাহসী ছিল না। আনোয়ারের আর কোনো কাজ জানা ছিল না।

জাল বুনতে বুনতে নূরজাহানের আঙুল চলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। চোখ বন্ধ করেও পারে। ঘুমের মধ্যেও পারে। শরীর মনে রেখেছে। সুতা ধরা, লুপ করা, গিঁট দেওয়া, টানা, আবার সুতা ধরা। একই ছন্দে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

পাশের বাড়ির হালিমাও বোনে। তার ওপাশে সাকিনা। তার ওপাশে জোবেদা। এক সারিতে চার-পাঁচজন মেয়ে, সবাই উঠোনে বসে, সবার পায়ের কাছে সুতার স্তূপ, সবার আঙুলে দাগ।

তারা কথা বলে বুনতে বুনতে। সংসারের কথা। বাচ্চাদের কথা। চালের দামের কথা। কখনো চুপ করে থাকে। চুপ থাকাটাও একসাথে। একা একা চুপ থাকা আর একসাথে চুপ থাকা এক না। একসাথে চুপ থাকায় একটা সান্ত্বনা আছে।

হালিমার স্বামী বেঁচে আছে। সাকিনারও। জোবেদার স্বামী পঙ্গু, ট্রলারে দড়ি পায়ে পেঁচিয়ে পা ভাঙা, এখন হাঁটতে পারে না। জোবেদাও জাল বোনে। তারও আঙুলে দাগ। তারও আয় পঞ্চাশ টাকা জালপ্রতি।

এই গ্রামে মেয়েদের আঙুলের দাগ একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য। যেমন চোখের রং, যেমন চুলের ধরন। মেয়ে মানেই আঙুলে সুতার দাগ। এটা জন্মগত না, কিন্তু জন্মগতের মতোই অবধারিত।

একদিন একটা এনজিও এল। মেয়েদের "ক্ষমতায়ন" করতে। সেমিনার হলো। চেয়ার সাজানো। ব্যানার টাঙানো। "নারীর ক্ষমতায়নে জীবিকা উন্নয়ন।"

একজন ম্যাডাম এলেন ঢাকা থেকে। পরিষ্কার শাড়ি, ল্যাপটপ, প্রজেক্টর। পাওয়ারপয়েন্টে স্লাইড দেখালেন। "বিকল্প আয়ের উৎস," "দক্ষতা উন্নয়ন," "ক্ষুদ্রঋণ।"

নূরজাহান বসে ছিল পেছনের সারিতে। শুনল। ম্যাডাম বললেন, "আপনারা শুধু জাল না বুনে, হাতের কাজ শিখুন। সেলাই, বুটিক। রপ্তানিযোগ্য পণ্য বানান।"

একজন জিজ্ঞেস করল, "শিখব কোথায়?"

ম্যাডাম বললেন, "আমরা প্রশিক্ষণ দেব। তিন মাসের কোর্স।"

আরেকজন বলল, "তিন মাস জাল না বুনলে খাব কী?"

ম্যাডাম চুপ করলেন। তারপর বললেন, "আমরা একটা ভাতা দেওয়ার চেষ্টা করব।"

চেষ্টা। নূরজাহান এই শব্দটা চেনে। চেষ্টা মানে হবে না। চেষ্টা মানে ছবি তুলে চলে যাবেন, রিপোর্ট লিখবেন, ফান্ডিং পাবেন।

সেমিনার শেষে চা-বিস্কুট দিল। নূরজাহান চা খেল। বিস্কুট পকেটে রাখল, রুমার জন্য।

এনজিও আর আসেনি।

রাতে ঝড় হলে নূরজাহান ঘুমাতে পারে না।

বাতাসের শব্দ শুনলে বুক কাঁপে। টিনের চালে বৃষ্টির ঘা পড়লে মনে হয় সমুদ্র আসছে। সমুদ্র সবকিছু গিলে খাবে। নূরজাহানকে, ফয়সালকে, রুমাকে, এই ঘরটাকে, এই উঠোনটাকে যেখানে সে জাল বোনে।

আনোয়ার যেদিন গেল সেদিনও এমন ঝড় হয়েছিল। হঠাৎ। আকাশ পরিষ্কার ছিল, তারপর কালো হলো, তারপর সব ভেঙে পড়ল।

নূরজাহান বাচ্চা দুটোকে জড়িয়ে ধরে। ফয়সাল ঘুমিয়ে আছে। রুমা একটু নড়ে, আবার ঘুমায়। নূরজাহান জেগে থাকে। ঝড় থামা পর্যন্ত। কখনো ঝড় থামে মধ্যরাতে। কখনো ভোরে।

সকালে উঠে সে দেখে উঠোনে পানি জমেছে। সুতা ভিজে গেছে। গত রাতে শুকাতে দেওয়া জাল উড়ে গেছে কোথায়। পঞ্চাশ টাকা। সকালের প্রথম হিসাব, প্রথম লোকসান।

নূরজাহান সুতা শুকাতে দেয়। নতুন সুতা বের করে। বসে। বোনে।

সমুদ্র দেখা যায় এখান থেকে। ধূসর, বিশাল, উদাসীন। সমুদ্র জানে না নূরজাহান কে। সমুদ্র জানে না আনোয়ার কে ছিল। সমুদ্রের কোনো স্মৃতি নেই।

নূরজাহানের আছে। তাই সে বোনে। জাল বোনে। গিঁট দেয়। সুতা টানে। আঙুল কাটে। আবার বোনে।

জাল ছাড়া সমুদ্র থেকে কিছু পাওয়া যায় না। সমুদ্র শুধু নেয়। জাল দিয়ে কিছু কেড়ে নিতে হয়।

নূরজাহানের জাল। নূরজাহানের আঙুল। নূরজাহানের যুদ্ধ। পঞ্চাশ টাকা জালপ্রতি।