লবণ চাষি
লবণ ছাড়া খাবারের স্বাদ নেই। কিন্তু লবণ চাষির জীবনে স্বাদ নেই।
১
আয়েশার পায়ে লবণ।
খালি পায়ে হাঁটে লবণের মাঠে। চামড়া ফেটে গেছে। ফাটলে লবণ ঢোকে। জ্বলে। প্রথম কয়েক বছর জ্বলত, এখন আর তেমন জ্বলে না। চামড়া মরে গেছে। সাদা হয়ে গেছে পায়ের তলা, গোড়ালি, আঙুলের ফাঁক। দেখলে মনে হয় পায়ে চুন মাখা। চুন না, লবণ। লবণ চামড়ায় ঢুকে বসে গেছে, বের হয় না।
কক্সবাজারের দক্ষিণে। সমুদ্রের কাছে। ম্যানগ্রোভের পাশে। এখানে জমি সমতল, বালুমিশ্রিত মাটি, জোয়ারের পানি আসে। এই জমিতে ফসল হয় না। ধান হয় না, সবজি হয় না। লবণ হয়।
নভেম্বর থেকে মে। শীতের শেষ থেকে গরমের শেষ। ছয় মাস। এই ছয় মাস লবণের মৌসুম। বাকি ছয় মাস বর্ষা, মাঠ ডুবে যায়, কাজ নেই।
আয়েশার বয়স পঁয়ত্রিশ। দেখলে পঞ্চাশ মনে হয়। রোদে পুড়ে চামড়া কালো হয়ে গেছে। চোখের পাশে কুঁচকে গেছে চামড়া, রোদের দিকে তাকাতে তাকাতে। চুল রুক্ষ, শুকনো, লবণাক্ত হাওয়ায়।
২
লবণ কীভাবে হয় সেটা শহরের মানুষ জানে না।
সোজা। সমুদ্রের পানি মাঠে আনো। রোদে শুকাতে দাও। পানি বাষ্প হয়ে যাবে, লবণ পড়ে থাকবে।
এতটুকু সোজা। বাকিটা সোজা না।
প্রথমে মাঠ তৈরি করতে হয়। মাটি সমান করতে হয়, চাপ দিয়ে শক্ত করতে হয়, পানি যাতে গড়িয়ে না যায়। এটা করে আয়েশা খালি পায়ে মাটি মাড়িয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটে, একই জায়গায়, মাটি শক্ত না হওয়া পর্যন্ত।
তারপর চ্যানেল কাটতে হয়। ছোট ছোট নালা, সমুদ্রের পানি আসবে। পানি আসলে মাঠে ছড়িয়ে দিতে হয়। বালতি দিয়ে, হাত দিয়ে, পা দিয়ে। মেশিন নেই। পাম্প নেই। শরীর আছে।
রোদ করবে বাকি কাজ। কিন্তু রোদ যথেষ্ট না হলে পানি শুকাবে না। মেঘ করলে, বৃষ্টি হলে, সব নষ্ট। আবার শুরু।
একটা মাঠ থেকে লবণ তুলতে সাত-আট দিন লাগে। রোদ ভালো থাকলে। তুললে ঢিবি করে রাখতে হয়। ঢিবিতে চট দিতে হয়, বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে।
আয়েশা একা করে না। গ্রামের আরো দশ-বারোজন মেয়ে-পুরুষ। সবাই মাঠের মালিকের শ্রমিক। মাঠ আয়েশার না। মালিক চট্টগ্রাম শহরে থাকেন। বছরে দুইবার আসেন। হিসাব নেন। লবণ বিক্রির টাকা নেন।
৩
দিনমজুরি দেড়শো টাকা।
সকাল ছটা থেকে বিকাল পাঁচটা। এগারো ঘণ্টা। মাঝে দুপুরে এক ঘণ্টা বিশ্রাম। ভাত খায়। পানি খায়। তারপর আবার মাঠে।
রোদ। শীতের রোদ নরম, সহনীয়। ফেব্রুয়ারি থেকে রোদ বাড়ে। মার্চে তীব্র। এপ্রিলে দুপুরের রোদে মাটি পুড়ে যায়। মে মাসে লবণের মাঠে দাঁড়ালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সাদা লবণ, সাদা মাটি, সাদা আলো। সব সাদা। চোখ ঠিকরে যায়।
আয়েশার চোখ খারাপ হচ্ছে।
ডাক্তারের কাছে যায়নি। কিন্তু বোঝে। দূরের জিনিস ঝাপসা দেখে। সন্ধ্যায় কম দেখে। চোখে পানি পড়ে, জ্বালা করে। লবণের রোদের প্রতিফলন। বছরের পর বছর। চোখের রেটিনা পুড়ছে ধীরে ধীরে। সানগ্লাস পরলে হয়তো কিছুটা রক্ষা হতো। সানগ্লাসের দাম দুইশো টাকা। আয়েশার কাছে দুইশো টাকা সানগ্লাসের জন্য খরচ করা বিলাসিতা।
"লবণ ছাড়া খাবারের স্বাদ নেই," আয়েশা বলে। "কিন্তু লবণ চাষির জীবনে স্বাদ নেই।"
৪
আয়েশার স্বামী করিম। সেও লবণের মাঠে কাজ করে। দুজনে মিলে দিনে তিনশো টাকা। মাসে নয় হাজার। ছয় মাস কাজ, ছয় মাস বেকার। বছরে চুয়ান্ন হাজার টাকা।
দুইটা বাচ্চা। ছেলে সোহেল, দশ। মেয়ে পারুল, সাত। স্কুলে যায় দুজনেই। স্কুল ফ্রি, কিন্তু খাতা-কলম ফ্রি না, জুতা ফ্রি না, ইউনিফর্ম ফ্রি না।
বর্ষায় কাজ নেই। করিম তখন দিনমজুরি করে। যেখানে পায়। মাটি কাটা, ইট ভাঙা, রাস্তা মেরামত। কাজ পেলে দুইশো টাকা। না পেলে শূন্য। কোনো দিন পায়, কোনো দিন পায় না।
আয়েশা বর্ষায় বসে থাকে। জাল বোনে না, মাছ ধরে না, কিছু করে না। রান্না করে, বাচ্চা সামলায়, ঘরের কাজ করে। এটা কাজ, কিন্তু এর কোনো মজুরি নেই।
বর্ষায় ধার করে চলতে হয়। দোকানদারের কাছে বাকি খায়। লবণের মৌসুম শুরু হলে শোধ দেয়। চক্র এটা। বছরের পর বছর ঘুরছে। শেষ নেই।
৫
লবণের দাম ঠিক করে আয়েশা না। ব্যবসায়ীরা করে।
মাঠ থেকে লবণ ওঠে। ঢিবিতে জমা হয়। তারপর ট্রাক আসে। ব্যবসায়ী আসে। দাম বলে। মণ প্রতি দুইশো-আড়াইশো টাকা। মালিক বিক্রি করে। শ্রমিকরা দাম নিয়ে কিছু বলে না। বলার অধিকার নেই। বলার জায়গা নেই।
বাজারে লবণ কত? কেজিতে চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা। মণে দুই হাজার। কিন্তু মাঠ থেকে যায় দুইশোতে। মাঝখানে দশগুণ। এই দশগুণ কোথায় যায়? পরিবহনে কিছু। প্রক্রিয়াজাতকরণে কিছু। প্যাকেজিংয়ে কিছু। বাকিটা মুনাফা। ব্যবসায়ীর মুনাফা, পাইকারের মুনাফা, খুচরা বিক্রেতার মুনাফা।
আয়েশার মুনাফা: দেড়শো টাকা দিনে।
সে হিসাব জানে না। জানলেও কিছু বদলাবে না। লবণ তাকে চিনবে না বাজারে। আয়েশার ঘামে ভেজা লবণ, আয়েশার পায়ের ফাটলে ঢোকা লবণ, প্যাকেটে গেলে সব এক। সব সাদা। সব লবণ।
৬
গত বছর ঘূর্ণিঝড় এসেছিল।
মে মাসের শেষে। মৌসুমের শেষ। লবণ প্রায় সব তোলা হয়ে গেছে। ঢিবিতে জমা। ট্রাক আসেনি এখনো।
ঝড়ের আগে সতর্কবার্তা পেল। রেডিওতে। "ঘূর্ণিঝড় আসছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যান।"
আয়েশা বাচ্চাদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গেল। করিমও গেল। সবাই গেল। আশ্রয়কেন্দ্র মানে স্কুলঘর। পাকা দালান। মাথার ওপর ছাদ। চারদিকে দেয়াল।
ঝড় এল রাতে। বাতাসের শব্দ। টিনের চাল ওড়ার শব্দ। গাছ ভাঙার শব্দ। পানি ঢোকার শব্দ।
সকালে ঝড় থামল। আয়েশা বের হলো। দেখল।
লবণের মাঠ সমুদ্রের পানিতে ডুবে গেছে। ঢিবিগুলো গলে গেছে। লবণ মিশে গেছে সমুদ্রের পানিতে, যেখান থেকে এসেছিল সেখানেই ফিরে গেছে।
ছয় মাসের কাজ। শত শত মণ লবণ। সব গেছে।
আয়েশা দাঁড়িয়ে দেখল। কাঁদল না। কাঁদলে কী হবে? পানি নামলে আবার মাঠ তৈরি করবে। আবার পানি আনবে। আবার রোদে শুকাবে। আবার লবণ তুলবে।
এটাই চক্র। সমুদ্র দেয়, সমুদ্র নেয়। রোদ দেয়, ঝড় নেয়। আয়েশা মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, খালি পায়ে।
৭
সোহেল জিজ্ঞেস করে, "আম্মা, তোমার পা এমন সাদা কেন?"
আয়েশা বলে, "লবণ।"
"ব্যথা করে?"
"না।"
মিথ্যা। ব্যথা করে। কিন্তু মায়েরা ব্যথার কথা বলে না। বললে বাচ্চারা ভয় পায়। বললে নিজেও ভয় পায়।
আয়েশার শরীর একটা যন্ত্রের মতো কাজ করে। সকালে চালু হয়, রাতে বন্ধ হয়। মাঝখানে হাঁটে, বহন করে, ঝুঁকে ওঠে, বসে, উঠে দাঁড়ায়। কোমরে ব্যথা। হাঁটুতে ব্যথা। ঘাড়ে ব্যথা। সব ব্যথা সহ্য করা যায়, কারণ সহ্য না করলে বিকল্প নেই।
চোখের ব্যথাটা ভয়ের। কারণ চোখ গেলে কাজ যাবে। কাজ গেলে খাওয়া যাবে। হাত-পায়ের ব্যথায় কাজ থামে না। চোখের ব্যথায় থামতে পারে।
আয়েশা মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে দাঁড়ায়। মাঠে। লবণের ওপর। রোদে। চোখ বন্ধ করলে আলো নেই, সাদা নেই, ঝলকানি নেই। কয়েক সেকেন্ড বিশ্রাম। তারপর চোখ খোলে। আবার সাদা। সব সাদা। লবণ সাদা, আকাশ সাদা, আলো সাদা, পায়ের চামড়া সাদা।
রঙের জগতে সাদা মানে শুদ্ধতা। আয়েশার জগতে সাদা মানে ক্ষয়।
৮
করিম সন্ধ্যায় বসে থাকে। ক্লান্ত। পিঠ ব্যথা। হাত ব্যথা। সে বলে, "এ কাজ আর পারি না।"
আয়েশা বলে, "তাহলে কী করবে?"
করিম চুপ। কী করবে? লবণ ছাড়া এই এলাকায় কাজ নেই। জমি চাষের উপযুক্ত না, লবণাক্ত। মাছ ধরতে নৌকা লাগে, জাল লাগে, পুঁজি লাগে। ঢাকায় যেতে পারে, কিন্তু ঢাকায় গিয়ে কী করবে? রিকশা চালাবে? সেটাও শরীরের কাজ। শরীর তো ক্ষয়ে যাচ্ছে।
পারুল বড় হচ্ছে। সাত বছর। আয়েশা ভাবে, পারুলকে পড়াতে হবে। পারুল যেন লবণের মাঠে না আসে। পারুলের পায়ে যেন লবণ না ধরে। পারুলের চোখ যেন না পুড়ে।
কিন্তু পড়ানোর খরচ? হাইস্কুলে গেলে বই লাগবে, কোচিং লাগবে, যাতায়াত লাগবে। দেড়শো টাকা দিনমজুরিতে এসব হয় না।
আয়েশা হিসাব করে না। হিসাব করলে ভয় পায়। সে শুধু আজকের দিনটা দেখে। আজ কাজ আছে, আজ ভাত আছে, আজ বাচ্চারা স্কুলে গেছে। আজকে নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।
আগামীকাল? আগামীকাল আসুক, তারপর দেখা যাবে।
৯
শীত আসছে। লবণের মৌসুম শুরু হবে।
আয়েশা মাঠে যাবে। খালি পায়ে। সকাল ছটায়। রোদ উঠবে। পানি আসবে সমুদ্র থেকে। পানি শুকাবে রোদে। লবণ পড়বে মাটিতে। সাদা স্ফটিক। ঝকঝকে।
আয়েশা তুলবে। ঢিবিতে রাখবে। ট্রাক আসবে। নিয়ে যাবে। কারখানায় যাবে। প্যাকেট হবে। দোকানে যাবে। কেউ কিনবে। রান্নায় দেবে। খাবে। বলবে, "লবণটা একটু কম হয়েছে" অথবা "বেশি হয়েছে।"
কেউ ভাববে না কার পায়ের ঘাম এই লবণে মিশেছে। কার চোখ এই লবণ বানাতে পুড়েছে। কার পায়ের চামড়া এই লবণে ফেটেছে।
লবণের কোনো স্মৃতি নেই। লবণ মনে রাখে না কে তাকে তুলেছে। লবণ শুধু স্বাদ দেয়। সেটুকুই তার কাজ।
আয়েশারও তাই। স্বাদ দেওয়া। অন্যের খাবারে স্বাদ দেওয়া। নিজের জীবনে স্বাদ নেই। নিজের জীবন নোনা, তেতো, শুকনো। রোদে পোড়া। ঝড়ে ভাঙা। বর্ষায় ডোবা।
আয়েশা হাঁটে। লবণের মাঠে। খালি পায়ে। পায়ের ছাপ পড়ে লবণে। কিন্তু লবণ ভরাট করে দেয় ছাপ। কোনো চিহ্ন থাকে না।