কুলি
আমার মাথা দিয়ে মানুষের সংসার চলে। আমার মাথা ক্ষয়ে যাচ্ছে।
১
রজবের ঘাড় বাঁকা।
ডানদিকে একটু হেলে আছে। সোজা হয় না। বিশ বছর আগে সোজা ছিল। তারপর মাথায় বোঝা বইতে বইতে মেরুদণ্ড চেপে গেছে, ঘাড়ের হাড় সরে গেছে, পেশি শক্ত হয়ে গেছে একদিকে। এখন সোজা হয়ে দাঁড়ালেও ঘাড় একটু কাত। ঘুমালেও কাত। সারাজীবন কাত।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। ঢাকা। রজব এখানে কুলি। হামাল। মাথায় করে মালপত্র বহন করে। যাত্রীদের ব্যাগ, বাক্স, বস্তা, ট্রাঙ্ক। ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে, প্ল্যাটফর্ম থেকে রিকশায়, রিকশা থেকে বাড়িতে।
রজবের বয়স বায়ান্ন। মেরুদণ্ড বলে ষাটের বেশি। হাঁটু বলে পঁয়ষট্টি। শুধু হাত বলে বায়ান্ন, কারণ হাতে এখনো জোর আছে। মাথায় একশো কেজি তুলতে পারে। একটা ফ্রিজ চার তলায় নিয়ে যেতে পারে। দুটো বস্তা চাল একসাথে বহন করতে পারে।
এই পারাটুকুই তার পুঁজি।
২
রজবের দিন শুরু হয় ভোর পাঁচটায়।
প্ল্যাটফর্মের এক কোণে ঘুমায়। কম্বল একটা, তোশক নেই। মেঝে শক্ত, ঠান্ডা। শীতকালে কষ্ট বেশি। গরমকালে মশা বেশি। কোনো মৌসুমেই ভালো ঘুম হয় না।
উঠে মুখ ধোয়। স্টেশনের বাথরুমে। সারিবদ্ধ কল, সবগুলোতে পানি আসে না। একটা-দুটোতে আসে, সেখানে ভিড়। রজব অপেক্ষা করে। মুখ ধোয়, পা ধোয়, গামছা ভিজিয়ে গায়ে মোছে। গোসল এটাই।
চা খায়। স্টেশনের বাইরে চায়ের দোকানে। পাঁচ টাকার চা। বিস্কুট দুইটা, দশ টাকা। পনেরো টাকার সকালের নাশতা।
তারপর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ায়। ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। চট্টগ্রাম মেইল আসবে সকাল সাতটায়। তার আগে খুলনার ট্রেন। তার আগে সিলেটের।
ট্রেন আসলে যাত্রীরা নামে। কেউ কেউ নিজে মাল বহন করে। কেউ কেউ কুলি খোঁজে। রজব এগিয়ে যায়। "মাল নেব, স্যার?" "বাইরে নিয়ে যাব?"
কেউ রাজি হয়। কেউ হয় না। ভাড়া কত? বলে, "একশো।" যাত্রী বলে, "পঞ্চাশ দেব।" দরদাম হয়। সত্তর-আশিতে মেটে।
৩
একশো কেজি। মাথায়।
রজব যখন তরুণ ছিল, একশো কেজি কিছু মনে হতো না। বিশ বছর বয়সে ট্রাঙ্ক তুলত মাথায়, দৌড়ে যেত সিঁড়ি দিয়ে, ওভারব্রিজ পার করত। ঘাম পড়ত, হাঁফাত, কিন্তু শরীর সইত।
এখন একশো কেজি অন্য জিনিস। মাথায় তোলার সময় হাঁটু কাঁপে। মেরুদণ্ড চ্যাঁচায়। কোমরে একটা চাপ আসে, নিচের দিকে, যেন শরীরটা মাটিতে ঢুকে যেতে চায়। পা ফেলতে কষ্ট হয়। একটা পা, তারপর আরেকটা। ধীরে। ধীরে গেলে যাত্রী বিরক্ত হয়।
রজবের মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষয়ে গেছে। ডাক্তার দেখেনি, কিন্তু ব্যথা বলে দেয়। সকালে ওঠার সময় পিঠ সোজা হতে চায় না। কোমর থেকে পায়ে একটা ব্যথা নামে, বিদ্যুতের মতো। সায়াটিকা হয়তো। রজব এই শব্দ জানে না। সে জানে ব্যথা। ব্যথার চরিত্র জানে, কখন আসে, কোথায় আসে, কতক্ষণ থাকে।
ব্যথানাশক খায়। প্যারাসিটামল। দিনে দুইটা, কখনো তিনটা। ফার্মেসিতে পাতায় কেনে। দশ টাকায় দশটা। এটাই চিকিৎসা।
৪
দিনে কত আয়? নির্ভর করে।
ভালো দিনে পাঁচশো টাকা। ছুটির দিনে, ঈদের আগে, পূজার আগে, যখন ট্রেনে ভিড় থাকে। তখন যাত্রী বেশি, মাল বেশি, কুলির চাহিদা বেশি।
খারাপ দিনে একশো টাকা। কখনো শূন্য। বৃষ্টির দিনে ট্রেন লেট হয়, যাত্রী কম, কাজ নেই।
গড়ে তিনশো টাকা দিনে। মাসে নয় হাজার। এই দিয়ে চলে রজবের সংসার। বউ আছে গ্রামে, ময়মনসিংহে। দুটো ছেলে। বড় ছেলে শামীম, আঠারো, ময়মনসিংহে একটা মোটরসাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ করে। ছোট ছেলে রিপন, চৌদ্দ, স্কুলে পড়ে।
রজব মাসে ছয় হাজার টাকা পাঠায় গ্রামে। বিকাশে। বাকি তিন হাজারে নিজে চলে। খাওয়া, চা, মাঝে মাঝে একটা লুঙ্গি বা গামছা কিনতে হয়। ওষুধ। প্যারাসিটামল।
৫
স্টেশনে কুলির সংখ্যা কমছে না। কিন্তু কাজ কমছে।
ট্রলি এসেছে। প্ল্যাটফর্ম ট্রলি। চাকার ওপর একটা তক্তা। যাত্রী নিজেই মাল ওঠায়, ঠেলে নিয়ে যায়। ট্রলির ভাড়া কুলির চেয়ে কম। কুলি আশি-একশো টাকা চায়। ট্রলি চল্লিশ-পঞ্চাশ।
"আগে মাথায় করে নিতাম। এখন চাকায় যায়। আমার মাথার দরকার ফুরিয়ে গেছে।"
রজব এটা বলে হাসে। হাসিটা তিক্ত। তিক্ত হাসি তিক্ত জীবনের লক্ষণ।
তরুণ ছেলেরা ট্রলি ঠেলে। তাদের মেরুদণ্ড সোজা। ঘাড় সোজা। তারা দ্রুত যায়। যাত্রীরা তাদের পছন্দ করে। দ্রুত, সস্তা, ঝামেলা কম।
রজব দাঁড়িয়ে দেখে। কী করবে? ট্রলি ঠেলবে? সেটাও শরীরের কাজ, কিন্তু সেখানে মাথার দরকার নেই। মাথায় বোঝা তোলাটাই রজবের দক্ষতা। কীভাবে তুলতে হয়, কীভাবে ভারসাম্য রাখতে হয়, কোন পায়ে কতটুকু ভর দিতে হয়। চল্লিশ বছরের দক্ষতা। এখন সেই দক্ষতার দাম চাকার কাছে হেরে গেছে।
চাকা। মানুষের প্রথম আবিষ্কারগুলোর একটা। হাজার হাজার বছর আগে। এখন সেই চাকা রজবের চাকরি খাচ্ছে।
৬
রজবের শরীরের মানচিত্র।
মাথায়: চুল পাতলা হয়ে গেছে সামনের দিকে। বোঝা বহনের ঘর্ষণে। মাথার ওপরে একটা শক্ত জায়গা, চামড়া মোটা, ক্যালাসের মতো। এখানেই বোঝা রাখে। গামছা ভাঁজ করে মাথায় রাখে প্যাড হিসেবে। তবু চামড়া শক্ত হয়ে গেছে।
ঘাড়: বাঁকা। ডানদিকে। কশেরুকা চেপে গেছে।
কাঁধ: একটা উঁচু, একটা নিচু। ডান কাঁধে বোঝা সামলায় বেশি।
পিঠ: গোল হয়ে গেছে। সোজা হয় না।
কোমর: ব্যথা সবসময়। শুয়ে থাকলে কমে, দাঁড়ালে বাড়ে, বোঝা তুললে আরো বাড়ে।
হাঁটু: ফুলে আছে। বাতের মতো। সিঁড়ি নামতে গেলে ক্যাঁচ করে।
পায়ের পাতা: চ্যাপ্টা। আর্চ নেই। চ্যাপ্টা পা ভার বহনের ফল।
এই শরীর দিয়ে রজব রোজগার করে। এই শরীর তার একমাত্র সম্পদ। এই শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে।
"আমার মাথা দিয়ে মানুষের সংসার চলে। আমার মাথা ক্ষয়ে যাচ্ছে।"
৭
একদিন একটা ফ্রিজ বহন করতে হলো।
চার তলায়। লিফট নেই। পুরান ঢাকার একটা বাড়ি। সরু সিঁড়ি। ফ্রিজের ওজন আশি কেজি। একা পারবে না। আরেকজন কুলি নিল, মতিন।
দুজনে ফ্রিজ ধরল। রজব ওপরে, মতিন নিচে। সিঁড়ি সরু, ফ্রিজ চওড়া। দেয়ালে ঠেকে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তুলতে হয়। প্রতিটা ধাপে থামে। নিঃশ্বাস নেয়। আবার তোলে।
দোতলায় রজবের কোমরে টান লাগল। তীব্র। চোখে অন্ধকার দেখল এক মুহূর্ত। কিন্তু ফ্রিজ ছাড়া যায় না। ছেড়ে দিলে মতিনের ওপর পড়বে। রজব দাঁতে দাঁত চেপে ধরল। কোমরের ব্যথা পায়ে নামল, বিদ্যুতের মতো। পা অসাড় হয়ে গেল প্রায়।
তিন তলায় পৌঁছে একটু দাঁড়াল। মতিন বলল, "পারবেন?" রজব মাথা নাড়ল। পারবে।
চার তলায় পৌঁছাল। ফ্রিজ ঘরে ঢোকাল। মালিক পাঁচশো টাকা দিল। দুজনে ভাগ। আড়াইশো করে।
রজব সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল। কোমর সোজা করতে পারে না। পাঁচ মিনিট বসে রইল। তারপর আস্তে আস্তে উঠল। নামল। প্রতিটা সিঁড়িতে কোমর চিৎকার করল।
স্টেশনে ফিরে দুইটা প্যারাসিটামল খেল। শুয়ে পড়ল প্ল্যাটফর্মে। বিকালের ট্রেনের কাজ আর হলো না।
৮
রজবের বউ ফোন করে সপ্তাহে একবার। রিপনের স্কুলের কথা বলে। শামীমের কাজের কথা বলে। বাড়ির চালের কথা বলে, চাল ফুটো হয়ে গেছে, বর্ষায় পানি পড়ে।
"টিন লাগবে। তিনটা টিন। পনেরোশো টাকা।"
রজব বলে, "পাঠাব।" কোথা থেকে পাঠাবে সেটা বলে না।
বউ বলে, "শরীর কেমন?"
"ভালো।"
মিথ্যা। শরীর ভালো না। কিন্তু সত্য বলে কী হবে? বউ কী করবে? চিন্তা করবে। চিন্তায় কিছু হয় না।
রিপন ফোনে বলে, "বাবা, কবে আসবে?"
রজব বলে, "ঈদে।" ঈদে যায়। বছরে দুইবার। ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহা। দুই-তিনদিন থাকে। বউয়ের রান্না খায়। রিপনের সাথে কথা বলে। শামীমের দোকানে যায়, দেখে ছেলে কাজ শিখছে।
তারপর ফেরে। ট্রেনে। কমলাপুরে নামে। প্ল্যাটফর্মে আসে। কম্বল পাতে। শোয়।
গ্রামের বাড়ি ছোট। দুটো ঘর, টিনের চাল, মাটির দেয়াল। উঠোনে একটা আমগাছ। রজবের বাবা লাগিয়েছিল। এখন বড় হয়েছে, ছায়া দেয়। এই ছায়ায় বসতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ছায়ায় বসলে টাকা আসবে না।
৯
একদিন রজব একটা বোঝা তুলতে গিয়ে পারল না।
মাথায় তুলল, কিন্তু হাঁটু ভাঁজ হলো, শরীর কাঁপল, বোঝা পড়ে গেল। যাত্রী রাগ করল। "কী করছে? মালপত্র নষ্ট হবে তো!"
রজব দাঁড়িয়ে দেখল। ব্যাগটা মাটিতে পড়ে আছে। তার শরীর দাঁড়িয়ে আছে। মাথা খালি। হাত খালি। কিন্তু শরীর কাঁপছে।
অন্য একজন কুলি এগিয়ে এল। তরুণ ছেলে। তুলে নিল। চলে গেল।
রজব প্ল্যাটফর্মের পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ভাবল। কত বছর এই কাজ করেছে? বত্রিশ বছর। বিশ বছর বয়স থেকে। বাবাও কুলি ছিল, এই স্টেশনেই। বাবা মারা গেছে পঁয়তাল্লিশে। হার্ট অ্যাটাক। না, ডাক্তার বলেনি হার্ট অ্যাটাক। বাবা হঠাৎ পড়ে গেছিল, প্ল্যাটফর্মে, মাথায় বোঝা নিয়ে। আর ওঠেনি। হয়তো হার্ট, হয়তো স্ট্রোক, হয়তো মেরুদণ্ড ভেঙে গেছিল। কে জানে। ময়নাতদন্ত হয়নি। দরকারও ছিল না। গরিব মানুষের মৃত্যুর কারণ জানার দরকার পড়ে না।
রজবের বয়স এখন বায়ান্ন। বাবা মারা গেছে পঁয়তাল্লিশে। রজব বাবার চেয়ে বেশি বেঁচে আছে। এটা সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য, সে জানে না।
১০
রজব এখনো যায়। রোজ যায়। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ায়।
হালকা বোঝা নেয়। ভারী বোঝা পারে না আর। আগে একশো কেজি তুলত, এখন পঞ্চাশ পারে। আগে দৌড়াত, এখন হাঁটে। আগে সিঁড়ি ভাঙত, এখন ওভারব্রিজে উঠতে থামে তিনবার।
আয় কমেছে। দিনে দুইশো। কখনো দেড়শো। কুলির মধ্যে সবচেয়ে বুড়ো সে। তরুণ ছেলেরা তাকে "চাচা" বলে। সম্মান করে কিছুটা। কখনো একটা কাজ ছেড়ে দেয় তার জন্য। দয়া? হয়তো। হয়তো দয়া না, হয়তো ভয়। তারাও তো একদিন রজব হবে। তাদের ঘাড়ও বাঁকবে। তাদের কোমরেও ব্যথা আসবে। তাদের মাথার দরকারও ফুরিয়ে যাবে।
সন্ধ্যায় রজব প্ল্যাটফর্মে বসে। ট্রেন আসে, যায়। যাত্রীরা আসে, নামে, চলে যায়। প্ল্যাটফর্ম কখনো খালি হয় না। মানুষের স্রোত বইতে থাকে। রজব এই স্রোতের ধারে বসে আছে। স্রোতের অংশ না, ধারের পাথরের মতো। স্রোত পাশ দিয়ে যায়। পাথর ক্ষয়ে যায়।
আজ তিনশো টাকা হয়েছে। ভালো দিন। রজব ভাত খাবে রাতে। স্টেশনের বাইরে একটা হোটেলে। ত্রিশ টাকায় ভাত, ডাল, একটুকরো মাছ। তারপর এসে শুয়ে পড়বে।
কম্বলের নিচে শরীর ব্যথায় কাঁপে। রজব চোখ বন্ধ করে। প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের শব্দ। হুইসেল। লোহার চাকা লোহার লাইনে। কুলির মাথা কুলির ঘাড়ে। দুটোই ক্ষয়ে যাচ্ছে।