রাইস মিল শ্রমিক

ধান ভাঙতে গিয়ে আমার ফুসফুস ভাঙছে।

পর্ব ৭৫ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আশরাফ কাশে।

সকালে কাশে। দুপুরে কাশে। রাতে কাশে। ঘুমের মধ্যে কাশে, বউ জেগে যায়। কাশি থামে না। থামলেও একটু পরে আবার শুরু হয়। গলার ভেতরে কিছু একটা আটকে আছে, বের হতে চায়, বের হয় না।

বগুড়া। ধানের দেশ। বগুড়ার চারদিকে ধানক্ষেত। বোরো মৌসুমে সোনালি ধান, আমন মৌসুমে সবুজ ধান। ধান থেকে চাল হয়। চাল থেকে ভাত হয়। ভাত বাঙালির প্রাণ।

চাল হয় রাইস মিলে। বগুড়া শহরের বাইরে, শেরপুর রোডে, একটার পর একটা রাইস মিল। ছোট, বড়, মাঝারি। কোনোটায় আধুনিক মেশিন, কোনোটায় পুরোনো। আশরাফ কাজ করে মোস্তফা রাইস মিলে। পুরোনো মিল। মেশিনগুলো ত্রিশ বছরের। শব্দ বেশি করে। ধুলো বেশি ওড়ায়।

আশরাফ ধান ঢালে মেশিনে। মেশিন ধানের খোসা ছাড়ায়। চাল বের হয়। খোসা বের হয়। খোসা মানে তুষ। তুষ উড়ে বাতাসে। তুষ ভরে যায় ঘরে। তুষ ঢোকে নাকে, মুখে, গলায়, ফুসফুসে।

আশরাফ কাশে।

মিলে ঢোকার সময় একটা দরজা আছে। দরজায় কোনো সাইনবোর্ড নেই। কোনো সতর্কবার্তা নেই। "মাস্ক পরুন" লেখা নেই। কারণ কেউ মাস্ক পরে না। কেউ মাস্ক দেয় না।

আশরাফ যখন প্রথম এসেছিল, বারো বছর আগে, তখন কাশি ছিল না। শরীর ছিল। বিশ বছর বয়স। গ্রাম থেকে এসেছিল, শিবগঞ্জ থেকে। বাবার দুই বিঘা জমি, চারভাই, ভাগে কিছু আসে না। মিলে কাজ পেল। দিনে তিনশো টাকা তখন। এখন চারশো।

প্রথম বছর কিছু হয়নি। দ্বিতীয় বছর মাঝে মাঝে কাশি আসত। ধুলোর কাশি। বাইরে গেলে সেরে যেত। তৃতীয় বছর কাশি একটু বাড়ল। চতুর্থ বছর সকালে কাশি হতো, থুতুতে মাঝে মাঝে একটু কালো কিছু আসত। তুষের রং। পঞ্চম বছর থেকে কাশি সারাদিন।

এখন বারো বছর। কাশি আশরাফের সঙ্গী। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সিঁড়ি উঠলে হাঁপায়। একটু দ্রুত হাঁটলে হাঁপায়। শীতকালে বেশি কষ্ট। ঠান্ডা বাতাসে ফুসফুস জ্বলে।

রাইস মিল লাং। ডাক্তারি পরিভাষা। আশরাফ এই শব্দ জানে না। সে জানে কাশি। সে জানে শ্বাসকষ্ট। সে জানে বুকের ভেতরে একটা কিছু বাজে, সাঁই সাঁই, যখন শ্বাস নেয়।

মিলের ভেতরে ঢুকলে প্রথমে চোখে কিছু দেখা যায় না।

ধুলো। তুষের ধুলো বাতাসে ভাসছে। আলো ঢোকে জানালা দিয়ে, ধুলোর ভেতর দিয়ে ছুরির মতো। ধুলোর কণাগুলো দেখা যায় আলোর রেখায়। কোটি কোটি কণা। ভাসছে, নামছে, উঠছে, আবার ভাসছে।

আশরাফ এই ধুলোর মধ্যে দাঁড়ায়। বারো ঘণ্টা। সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যা ছটা। ফসল তোলার মৌসুমে চৌদ্দ ঘণ্টাও হয়। ভোর চারটা থেকে রাত দশটা।

মেশিনের শব্দ। ঘড়ঘড়, ঘটঘট, ধাতব চিৎকার। কথা বলতে গেলে চিৎকার করতে হয়। পাশের লোকের কথা শোনা যায় না। আশরাফের শ্রবণশক্তি কমেছে। বাড়িতে গেলে বউ বলে, "কানে কম শোনো?" আশরাফ বলে, "জোরে বলো।"

তুষ ছাড়াও আছে। চালের গুঁড়ো। শুকনো ধানের গুঁড়ো। সিলিকার কণা, মাটির কণা, ধানের সাথে যেটুকু মাটি আসে। সব মিলে একটা মিশ্রণ, যেটা বাতাসে ভাসে, নাকে ঢোকে, ফুসফুসে বসে।

একটা রুমাল বেঁধে রাখে নাকে-মুখে। পাতলা সুতির রুমাল। কতটুকু আটকায়? কিছু আটকায়, বেশিরভাগ ঢোকে। ঢোকে কারণ কণাগুলো ক্ষুদ্র, রুমালের ফাঁক দিয়ে পার হয়ে যায়।

N95 মাস্ক দিলে অনেকটা আটকাত। N95 মাস্কের দাম পঞ্চাশ-একশো টাকা। মিলে মালিক দেয় না। আশরাফ কেনে না। পঞ্চাশ টাকায় বাজারের সবজি আসে।

মিলে আরো দশজন কাজ করে।

প্রত্যেকে কাশে। কেউ কম, কেউ বেশি। যারা বেশিদিন আছে তারা বেশি কাশে। নতুন ছেলেরা কম কাশে। এখনো।

জব্বার সবচেয়ে বুড়ো। কুড়ি বছর ধরে কাজ করে। জব্বারের কাশিতে রক্ত আসে মাঝে মাঝে। বুকে ব্যথা হয়। শ্বাস নিতে পারে না ঠিকমতো। হাঁটে ধীরে। কাজ করে ধীরে। মালিক বলে, "জব্বার, তুমি আর পারো না। ছাড়ো।"

জব্বার বলে, "ছাড়লে খাব কী?"

মালিক চুপ। কী বলবে? জব্বারকে পেনশন দেবে? কোনো পেনশন নেই। কোনো চুক্তি নেই। কোনো বিমা নেই। কোনো ক্ষতিপূরণ নেই। জব্বার কাল থেকে না আসলে পরশু থেকে অন্য কেউ আসবে। গ্রাম থেকে। কাজ চায়, পেট চায়, মাস্ক চায় না।

আশরাফ জব্বারের দিকে তাকায়। জব্বারকে দেখে আশরাফ নিজের ভবিষ্যৎ দেখে। আরো আট-দশ বছর। তারপর সেও জব্বার হবে। কাশিতে রক্ত আসবে। শ্বাস নিতে পারবে না। কিন্তু কাজ ছাড়তে পারবে না।

আশরাফের বউ রেখা।

রেখা বগুড়া শহরেই থাকে। ভাড়া ঘরে। একটা ঘর, একটা রান্নাঘর। ভাড়া তিন হাজার। রেখা পাশের বাড়িতে কাজ করে, রান্না-ধোয়ার কাজ। মাসে দুই হাজার পায়।

আশরাফ চারশো দিনে। মাসে বারো হাজার। রেখার দুই হাজার। মোট চৌদ্দ হাজার। ভাড়া তিন হাজার। বাকি এগারো হাজার। তিনটা বাচ্চা, সব ছোট। বড় মেয়ে সুমি, নয়। মেজো ছেলে আকাশ, ছয়। ছোট মেয়ে তিথি, তিন।

এগারো হাজারে পাঁচটা মুখ। মাথাপিছু দুই হাজার দুইশো। দৈনিক তিয়াত্তর টাকা। তিনবেলা খাবার: চব্বিশ টাকা বেলায়।

হিসাব এভাবে করলে মনে হয় অসম্ভব। কিন্তু চলে। চলে কারণ ভাত সস্তা, ডাল সস্তা, সবজি সস্তা। মাছ-মাংস কম খায়। দুধ কেনে না। ফল কেনে না।

রেখা আশরাফের কাশি নিয়ে চিন্তিত। বলে, "ডাক্তার দেখাও।" আশরাফ বলে, "কী হবে ডাক্তার দেখিয়ে? বলবে কাজ ছাড়ো। কাজ ছাড়লে তো মরব।" রেখা চুপ করে।

সত্যি তো। ডাক্তার বলবে ধুলো থেকে দূরে থাকতে। দূরে থাকলে কাজ নেই। কাজ নেই মানে আয় নেই। আয় নেই মানে ভাত নেই। ফুসফুসে ধুলো থাকলে ধীরে মরবে, পেটে ভাত না থাকলে তাড়াতাড়ি মরবে।

আশরাফ ধীরে মরা বেছে নিয়েছে।

ধান আসে ট্রাকে।

ফসলের মৌসুমে দিনে দশটা ট্রাক। প্রতিটায় দুইশো-তিনশো বস্তা ধান। প্রতি বস্তায় আশি কেজি। আশরাফ আর তার সাথীরা ট্রাক থেকে বস্তা নামায়, গুদামে রাখে, মেশিনে ঢালে।

মেশিন চলে। ধান ঢোকে। প্রথম ধাপে খোসা ছাড়ে। দ্বিতীয় ধাপে পালিশ করে। তৃতীয় ধাপে গ্রেডিং। ভালো চাল আলাদা, ভাঙা চাল আলাদা, কুঁড়া আলাদা, তুষ আলাদা।

তুষ বের হয় পাইপ দিয়ে। ঘরের বাইরে পড়ে। ঢিবি হয়ে জমে। এই তুষ জ্বালানি হিসেবে বিক্রি হয়। ইটের ভাটায় যায়। কিছু গরুর খাদ্যে মেশে।

কিন্তু সব তুষ পাইপ দিয়ে বের হয় না। কিছু ঘরের ভেতরেই থাকে। বাতাসে থাকে। মেঝেতে থাকে। দেয়ালে থাকে। ছাদে থাকে। আশরাফের ফুসফুসে থাকে।

মেশিনের পাশে দাঁড়ালে তুষের ধুলো ঝড়ের মতো ওড়ে। চোখ খোলা রাখা যায় না। নিঃশ্বাস নিলে গলা জ্বলে। আশরাফ অভ্যস্ত। অভ্যস্ত মানে সহ্য করতে শিখেছে, মানে শরীর মেনে নিয়েছে, মানে ফুসফুস আর প্রতিবাদ করে না তেমন। শুধু কাশে। কাশি হলো ফুসফুসের শেষ প্রতিবাদ।

মিলের মালিকের নাম আলতাফ হোসেন।

আলতাফ সাহেব শহরে থাকেন। পাকা বাড়ি, তিনতলা। গাড়ি: ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো। সাদা রঙের। এসি আছে, চামড়ার সিট। আলতাফ সাহেব মিলে আসেন দিনে একবার, বিকালে। গাড়ি থেকে নামেন। ম্যানেজারের সাথে কথা বলেন। হিসাব দেখেন। আধা ঘণ্টা থাকেন। চলে যান।

আলতাফ সাহেব মিলের ভেতরে ঢোকেন না। ধুলো আছে। তাঁর অ্যাজমা আছে। ধুলোয় শ্বাসকষ্ট হয়। তাই বাইরে থাকেন। ম্যানেজার বাইরে এসে রিপোর্ট দেয়।

আশরাফ দেখে। প্রাডোটা দেখে। সাদা গাড়ি, ঝকঝকে। তুষের ধুলো পড়েছে গায়ে, ড্রাইভার মুছছে। আশরাফের শরীরেও তুষ পড়ে আছে, কেউ মোছে না।

"ধান থেকে চাল হয়। চাল থেকে ভাত হয়। ভাত আমাদের প্রাণ। কিন্তু ধান ভাঙতে গিয়ে আমার ফুসফুস ভাঙছে।"

আশরাফ এটা ভাবে। বলে না। কাকে বলবে? মালিককে? মালিক বলবেন, "কাজ না করলে যাও।" ম্যানেজারকে? ম্যানেজার বলবে, "মাস্ক পরে নাও।" কোন মাস্ক? কে দেবে?

কেউ দেবে না। কারণ আশরাফ বদলযোগ্য। যেমন মেশিনের একটা পার্টস বদলে যায়, আশরাফও বদলে যাবে। অন্য কেউ আসবে। গ্রাম থেকে। তরুণ, সুস্থ, ফুসফুস পরিষ্কার। বারো বছর কাজ করবে। তারপর সেও কাশবে।

রাতে আশরাফ বাড়ি ফেরে।

হেঁটে। মিল থেকে বাড়ি আধা ঘণ্টার পথ। বগুড়া শহরের ভেতর দিয়ে। রাস্তায় গাড়ি চলে, রিকশা চলে, মানুষ হাঁটে। আশরাফ হাঁটে। ধীরে। ক্লান্ত। শরীরে তুষের গন্ধ। চুলে তুষ, কানে তুষ, নাকের ভেতরে তুষ।

বাড়িতে ঢুকে প্রথম কাজ গোসল। পানি ঢালে মাথায়। পানি নামে ঘোলা। তুষ ধুয়ে যায়। কিন্তু ভেতরের তুষ ধুয়ে যায় না। ফুসফুসে যা ঢুকেছে তা থাকবে।

সুমি বাবার কাছে আসে। "বাবা, আজ স্কুলে কী হয়েছে জানো?" আশরাফ শোনে। শোনার চেষ্টা করে। কাশি আসে মাঝে মাঝে। সুমি অপেক্ষা করে বাবার কাশি থামা পর্যন্ত। তারপর আবার বলে।

রেখা ভাত বাড়ে। আশরাফ খায়। চাল ভালো। মিল থেকে কিছু চাল পায় আশরাফ, ছাড়পোকা চাল, যেটা বিক্রির জন্য গ্রেড করে আলাদা করে রাখে কিন্তু ফেলে দেওয়া হয়। এটা শ্রমিকদের দেয়। এটুকুই সুবিধা।

ভাত খেতে খেতে আশরাফ ভাবে। এই চাল সে নিজে মেশিনে ঢেলেছে। তুষ ওড়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে। ফুসফুস দিয়ে মূল্য দিয়ে। এখন সেই চালের ভাত খাচ্ছে। একটা চক্র। ধান ভাঙে, ফুসফুস ভাঙে, চাল খায়, বেঁচে থাকে, আবার ধান ভাঙে।

মিলের মালিক প্রাডো চালায়। আশরাফ হাঁটে।

এই একটা বাক্যে পুরো গল্পটা আছে। বাকি সব বিস্তার।

আলতাফ সাহেবের ছেলে পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামে। আশরাফের মেয়ে পড়ে সরকারি স্কুলে। আলতাফ সাহেব এসি ঘরে ঘুমান। আশরাফ ফ্যানের নিচে, যখন বিদ্যুৎ থাকে। আলতাফ সাহেবের অ্যাজমার জন্য ইনহেলার আছে, ডাক্তার আছে, ওষুধ আছে। আশরাফের কাশির জন্য প্যারাসিটামল আছে।

আলতাফ সাহেব খারাপ মানুষ? না। তিনি মিলে বিনিয়োগ করেছেন। কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। এগারোজনের কাজ দিয়েছেন। ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি সফল। তিনি আইন ভাঙেননি। কোনো আইন নেই যে বলে রাইস মিলে শ্রমিকদের মাস্ক দিতে হবে। কোনো আইন নেই যে বলে ধুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোনো পরিদর্শক আসে না। কোনো পরিদর্শন হয় না।

ব্যবস্থাটাই এমন। আলতাফ সাহেব ব্যবস্থার সুবিধাভোগী। আশরাফ ব্যবস্থার জ্বালানি। জ্বালানি পুড়ে শেষ হয়, নতুন জ্বালানি আসে।

১০

আশরাফ কাল সকালে আবার যাবে মিলে।

ভোর চারটায় উঠবে। ফজরের নামাজ পড়বে। চা খাবে। হেঁটে যাবে। মিলের দরজা দিয়ে ঢুকবে। ধুলোর ভেতরে ঢুকবে। মেশিনের পাশে দাঁড়াবে। ধান ঢালবে। তুষ উড়বে। কাশবে।

বারো ঘণ্টা পর বের হবে। হেঁটে বাড়ি ফিরবে। গোসল করবে। ভাত খাবে। শুবে। কাশবে।

এটা আজকের দিন। আগামীকালেরও। পরশুরও। পরের মাসেরও। পরের বছরেরও।

কতদিন? যতদিন শরীর সয়। যতদিন ফুসফুস চলে। যতদিন কাশি শুধু কাশি থাকে, রক্ত না আসে।

আশরাফের ফুসফুসে তুষ জমছে। স্তরে স্তরে। বছরের পর বছর। প্রতিটা নিঃশ্বাসে একটু একটু করে। কণায় কণায়। চোখে দেখা যায় না। এক্স-রে করলে দেখা যেত। আশরাফ এক্স-রে করায়নি। করাবেও না। কারণ জেনে কী হবে?

বাইরে প্রাডো যায়। সাদা, চকচকে, এসি চলছে। ভেতরে আলতাফ সাহেব বসে আছেন। ভেতরে মিলে আশরাফ দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই ধানের সাথে জড়িত। একজন মালিক, একজন শ্রমিক। একজন চালায়, একজন হাঁটে।

আশরাফ হাঁটে। কাশতে কাশতে হাঁটে। ধুলোমাখা রাস্তায়, ধুলোমাখা শরীরে, ধুলোমাখা ফুসফুসে।

ধান ভাঙতে গিয়ে ফুসফুস ভাঙছে। কিন্তু ধান তো ভাঙতেই হবে। ভাত তো খেতেই হবে। বাঙালি ভাত ছাড়া বাঁচে না। আশরাফও বাঁচে না। সে ভাত খায়, ধান ভাঙে, ফুসফুস ভাঙে, ভাত খায়।

চক্র ঘোরে। মেশিন ঘোরে। তুষ ওড়ে। আশরাফ কাশে।